ট্রাম্পের ট্যারিফ নীতি ভাবিয়ে তুলছে সারা দুনিয়াকে। এটা কি পাগলামি নাকি পরিকল্পিত, তা নিয়েও চলছে আলোচনা। জাতে মাতাল তালে ঠিক বাংলা ভাষার এই প্রবাদটি কবে থেকে প্রচলিত, তা জানা নেই। এটা নিশ্চয়ই ভাষার উৎপত্তি ও বিকাশ নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারা জানেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ প্রতিদিনের নানা ঘটনায় এর সত্যতা ও প্রয়োগ দেখতে পান। পুঁজিবাদী বিশ্ব অর্থনীতি এমনভাবে পরস্পর সম্পর্কিত যে, ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ বা বাড়ির পাশে ভারত-পাকিস্তান কিংবা দূরের রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ প্রভাব ফেলে দেশের বাজারে। শুধু তাই নয়, কোনো দেশ বা অঞ্চলের প্রাকৃতিক দুর্যোগ কিংবা প্রযুক্তিগত আবিষ্কার প্রভাবিত করে অন্য দেশগুলোকে। জিডিপির বিবেচনায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ আমেরিকা যার জিডিপি প্রায় ২৭ হাজার বিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি চীন, যার জিডিপি প্রায় ২০ হাজার বিলিয়ন ডলার (তুলনায় বাংলাদেশের জিডিপি ৪৫০ বিলিয়ন ডলার) তাদের মধ্যে বাণিজ্য বিরোধ হলে এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সারা বিশ্বে।
প্রশ্ন উঠতে পারে, মুক্তবাজার অর্থনীতিতে বাণিজ্য বিরোধ কেন হবে? গত শতকের আশির দশকে যখন অর্থনীতির সব রোগের মহৌষধ হিসেবে মুক্তবাজার দাওয়াই ফেরি করা হচ্ছিল, বিতর্ক তখন থেকেই। যখন মুক্তবাজারের মহিমা কীর্তন করা হচ্ছিল, তখন মুক্তবাজারের পক্ষের অর্থনীতিবিদ, রাজনীতিবিদরা ব্যাখ্যা করেছেন কীভাবে সারা দুনিয়া একটি বিশ্ব গ্রাম বা গ্লোবাল ভিলেজে রূপান্তরিত হবে এবং তার ফলে বিশ্বের দেশে দেশে উন্নয়নের জোয়ার বয়ে যাবে। শুধু তাই নয়, এর সুফল পৌঁছে যাবে প্রত্যন্ত অঞ্চলে, প্রান্তিক মানুষের ঘরে ঘরে। অপর পক্ষে, মুক্তবাজারের বিরোধীরা আশঙ্কা করছিলেন ভয়াবহ বিপদের। তারা বলেছিলেন, মুক্তবাজারের নামে উন্মুক্ত করে দেওয়া হবে গরিব দেশের বাজার। ধনীরা বাজার উন্মুক্ত করবে না। এমনিতেই প্রযুক্তির বিকাশ তাদের দেশে হয়েছে। ফলে নিম্ন প্রযুক্তির দেশ থেকে পণ্য গিয়ে তাদের দেশে বাজারে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবে না। কিন্তু ধনী দেশগুলো অসম বাণিজ্যের সুফল নেবে। দেশে দেশে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়বে, আংশিক ও স্থানীয় যুদ্ধের আশঙ্কা বাড়বে। শুল্ক ও অশুল্ক বাধার দেয়াল তুলে বাণিজ্য এবং রাজনীতি দুটোকেই নিয়ন্ত্রণ করবে ধনী দেশগুলো। প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ সরাসরিভাবে বললে প্রাকৃতিক সম্পদ দখল, বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রণ, রাজনৈতিক প্রভাব বলয় তৈরি ইত্যাদি কারণে প্রায় সব মহাদেশের দেশে অল্প স্বল্প যুদ্ধ লাগানো হয়েছে। যুদ্ধের অর্থনীতি এখন প্রধান নিয়ামক হয়ে দাঁড়িয়েছে। যুদ্ধ অর্থনীতির প্রভাব সাধারণ মানুষের জীবন বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের জীবনকে কতভাবে দুর্বিষহ করে তুলছে, তা এখন আর আলোচনার বিষয় নয় এটা নিষ্ঠুর বাস্তবতা। কথিত মুক্তবাজার অর্থনীতি যে পুঁজিবাদী অর্থনীতির মোড়লদের ইচ্ছায় পরিচালিত হয়, বাজারের অদৃশ্য হাত যে এখন প্রকটভাবে নিয়ন্ত্রণ করে বাজারকে এবং অদৃশ্য হাত এখন কোনো রাখঢাক না করেই নিজেকে উন্মুক্ত করেছে এগুলো আর শুধু রাজনৈতিক কথা নয়, দৃশ্যমান বাস্তবতা। ট্রাম্পের ঘোষণা ও পদক্ষেপ, বাস্তবতার প্রতিফলন মাত্র।
বাংলাদেশি পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপের কথা জানিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টাকে চিঠি লিখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। চিঠিতে তিনি লেখেন, ‘আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক নিয়ে অনেক বছর আলোচনা করেছি এবং এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি যে, বাংলাদেশের শুল্ক ও অশুল্ক, নীতিসমূহ এবং বাণিজ্যিক প্রতিবন্ধকতার কারণে যে দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী বাণিজ্যঘাটতি তৈরি হয়েছে, তা থেকে আমাদের অবশ্যই সরে আসতে হবে। দুঃখজনকভাবে, আমাদের সম্পর্ক একে অপরের সমকক্ষ থেকে অনেক দূরে। ২০২৫ সালের ১ আগস্ট থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো বাংলাদেশের সব ধরনের পণ্যের ওপর আমরা মাত্র ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করব। এই শুল্ক সব খাতভিত্তিক শুল্কের অতিরিক্ত হিসেবে প্রযোজ্য হবে। উচ্চ শুল্ক এড়ানোর উদ্দেশ্যে ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে পণ্য পাঠানো হলে, সেগুলোর ওপরও সেই উচ্চ শুল্ক আরোপ হবে। অনুগ্রহ করে এটা অনুধাবন করেন যে, ৩৫ শতাংশ সংখ্যাটি আপনার দেশের সঙ্গে আমাদের যে বাণিজ্যঘাটতি বৈষম্য রয়েছে, তা দূর করার জন্য যা প্রয়োজন তার থেকে অনেক কম। আপনি অবগত যে, যদি বাংলাদেশ বা আপনার দেশের বিভিন্ন কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য উৎপাদন বা তৈরি করার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে কোনো শুল্ক আরোপ করা হবে না। বস্তুত আমরা সম্ভাব্য সব কিছু করব যাতে দ্রুত, পেশাদারত্ব ও নিয়মিতভাবে অনুমোদন পাওয়া যায়, অন্যভাবে বললে, কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই সেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। যদি কোনো কারণে আপনি আপনার শুল্ক বৃদ্ধি করার সিদ্ধান্ত নেন, তখন যে পরিমাণ শুল্ক বাড়াবেন, তা আমাদের আরোপিত ৩৫ শতাংশ শুল্কের ওপর যোগ করা হবে। অনুগ্রহ করে এটা উপলব্ধি করুন যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যঘাটতি, যেটা স্থায়ী হওয়ার নয়, সেটা তৈরির পেছনে ভূমিকা রাখা বাংলাদেশের অনেক বছরের শুল্ক ও অশুল্ক নীতিগুলো এবং বাণিজ্য বাধা সংশোধন করার লক্ষ্যে এসব শুল্ক আরোপ করা হয়েছে। এই ঘাটতি আমাদের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুতর হুমকি এবং সত্যিকার অর্থে আমাদের জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি! আপনার বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে আমরা আগামী বছরগুলোতে আপনার সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চাই। আপনি যদি এখন পর্যন্ত বন্ধ রাখা আপনার বাণিজ্য বাজার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য উন্মুক্ত করতে চান এবং শুল্ক, অশুল্ক নীতি ও বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা দূর করেন, তাহলে আমরা সম্ভবত এই চিঠির কিছু অংশ পুনর্বিবেচনা করতে পারি। এই শুল্কহার আপনার দেশের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের ওপর ভিত্তি করে বাড়ানো বা কমানো হতে পারে। আপনি কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর হতাশ হবেন না।’
এই আশ্বাসে কি হতাশা বা উদ্বেগ দূর হবে? শুধু বাংলাদেশ নয়। পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া, কাজাখস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা, লাওস, মিয়ানমার, বসনিয়া ও হার্জেগোভিনা, তিউনিসিয়া, ইন্দোনেশিয়া, সার্বিয়া, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডসহ ১৪টি দেশের ওপর নতুন করে শুল্কহার নির্ধারণ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। এরপর আরও সাতটি দেশের জন্য নতুন শুল্কহার নির্ধারণ করেছে। গত বুধবার ফিলিপাইন, ব্রুনেই, মলডোভা, আলজেরিয়া, ইরাক, লিবিয়া ও শ্রীলঙ্কার উদ্দেশে চিঠি পাঠিয়েছে। অর্থাৎ মোট ২১টি দেশের জন্য নতুন পাল্টা শুল্কহার নির্ধারণ করলেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। ১ আগস্ট থেকে তা কার্যকর হবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের মোট শুল্ক ভার কত দাঁড়াবে? ইউএস ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানি হওয়া বাংলাদেশি পণ্যে যত শুল্ক আদায় করা হয়েছে, তা গড় করলে হার দাঁড়ায় ১৫ শতাংশের মতো। আরও ৩৫ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে বাংলাদেশ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পণ্য রপ্তানিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। পাল্টা শুল্ক নিয়ে কেবল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে বাংলাদেশ। গত তিন মাসে দরকষাকষি শেষে যুক্তরাজ্য ও ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যচুক্তি হয়েছে। ভারতের সঙ্গে চুক্তির বিষয়টিও কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। গত এপ্রিলে ভিয়েতনামের ওপর ৪৬ শতাংশ পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল যুক্তরাষ্ট্র। দরকষাকষির পর এখন সেটি কমে ২০ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপান থেকে আমদানি করা পণ্যের ওপর নতুন করে ২৫ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করেছে মার্কিন প্রশাসন। এ ছাড়া মিয়ানমার ও লাওসের পণ্যের ওপর ৪০ শতাংশ, দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর ৩০ শতাংশ, মালয়েশিয়ার ওপর ২৫ শতাংশ, তিউনিসিয়ার ওপর ২৫ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়ার ওপর ৩২ শতাংশ, বসনিয়ার ওপর ৩০ শতাংশ, সার্বিয়ার ওপর ৩৫ শতাংশ, কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডের ওপর ৩৬ শতাংশ এবং কাজাখস্তানের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্কহার নির্ধারণ করা হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দরকষাকষিতে পিছিয়ে থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশের রপ্তানিকারকরা। তারা বলছেন, বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে আলোচনা করা হয়নি। তিন মাস যখন শেষ হতে যাচ্ছে, তখন তারা বৈঠকে বসছেন। অথচ বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানির একক বড় বাজার হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) হিসাবে, গত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ ৮৬৯ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছে, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের ১৮ শতাংশের কিছু বেশি। আবার রপ্তানি পণ্যের ৮৫ শতাংশের বেশি তৈরি পোশাক। এ ছাড়া মাথার টুপি বা ক্যাপ, চামড়ার জুতা, হোম টেক্সটাইল, পরচুলা এবং অন্যান্য চামড়াজাত পণ্যও রপ্তানি হয়। অতিরিক্ত ৫০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হলে পণ্য রপ্তানিতে কী প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে উদ্বিগ্ন সবাই। শুল্ক বাড়লে পণ্যের দাম বাড়বে। ফলে আশঙ্কা করা হচ্ছে, বাড়তি দামে অনেক মার্কিন ক্রেতা পোশাক কিনতে আগ্রহী হবেন না। শুধু তা-ই নয়, এই শুল্কের কারণে ইইউর বাজারেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। সমস্যা সবার হলেও বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কি প্রভাব বেশি পড়বে? বাংলাদেশের গার্মেন্টস নির্ভরতা কমানোর উদ্যোগ না নিলে, এই ঝুঁকি সবসময়ই থাকবে। ভাবতে হবে, সস্তা মজুরির শ্রমিক, সস্তা পণ্য উৎপাদন আর একক পণ্যের ওপর নির্ভরশীলতা কত দিন বাংলাদেশের ব্যবসায়ী ও রাষ্ট্রকে সুবিধা দেবে? মুক্তবাজার অর্থনীতি যে মুক্ত নয়, এটা বিবেচনায় নিয়ে কৃষি, শিক্ষা ও গবেষণায় গুরুত্ব দেওয়া, নিজস্ব কাঁচামালনির্ভর পণ্য পাট, চামড়া, চায়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারে উদ্যোগ নেওয়া আর অর্থনীতির প্রাণ বাঁচানো প্রবাসী শ্রমিকদের রেমিট্যান্সের ব্যাপারে অধিক মনোযোগ দেওয়া দরকার। মনে রাখা প্রয়োজন, ট্যারিফ নীতির চাইতেও দুর্নীতি ও টাকা পাচারে দেশের ক্ষতি অনেক বেশি। আমেরিকা তার নিজের স্বার্থ দেখবে। বাংলাদেশ কি দেশের মানুষের কথা ভাববে না? আমেরিকার ট্যারিফ ধাক্কা যেন, দেশের অর্থনীতির ছিদ্রপথ বন্ধে সরকারকে মনোযোগী করে।
রাজেকুজ্জামান রতন
রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক ।

