“জলের শ্যাওলা”- আন্তর্জাতিক খবর, ইরানের তিনটি পারমানবিক স্থাপনা গুঁড়িয়ে দিয়েছে মার্কিনিদের বোমারু বিমান। চীন, উত্তর কোরিয়া, রাশিয়া, নিউজিল্যান্ডসহ অনেক দেশ প্রতিবাদ করেছে। মার্কিন নাগরিকসহ বহু দেশের নাগরিকরা প্রতিবাদ জানিয়েছে। এমনকি ল্যাটিন আমেরিকার কয়েকটি দেশের নাগরিকরাও প্রতিবাদ, নিন্দা জানিয়েছে। আমাদের বৃহৎ প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সরকারের পক্ষ থেকে কোন প্রতিবাদ নাই এবং যা বেশ অনুধাবনীয বটে তবে ভারতের বিরোধী দল ভারতীয় কংগ্রেস নেত্রী সোনিয়া গান্ধী প্রতিবাদ জানিয়েছেন। যদিও বলাই বাহুল্য যে, কংগ্রেস এই মুহূর্তে ক্ষমতায় থাকলে বিজেপির চরিত্রটাই শতভাগ দেখা মিলতো। কংগ্রেস বর্তমানে বিরোধীদলে, প্রতিবাদের সুবিধা সেখানেই মাত্র।
প্রশ্ন হলো ইরানতো মুসলিম দেশ তাহলে আমরা যে এত এত আবেগি মুসলমান এবং এত এত পার্সেন্টের মুসলমানের দেশ বলি, বাংলাদেশ কেন কোন নিন্দা জানায়নি? অথবা বাংলাদেশ সরকারের ইউনূস যে শান্তির দূত হিসেবে বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত, সেই ইউনূস কেন প্রতিবাদ জানায়নি? এমনকি সরকারের কোন প্রতিনিধি কেন কোন প্রতিবাদ জানায়নি? ইরান একটি মুসলিম রাষ্ট্র হওয়ার পরেও আমাদের দেশের ধর্মীয় রাজনৈতিকদলসমুহের পক্ষ থেকেও কোন প্রতিবাদ বা নিন্দা জানানো হয়নি, কেন? এমনকি নিন্দা জানায়নি আমাদের দেশের বিএনপিসহ সরকারের সমর্থক বিভিন্ন রাজনৈতিকদলগুলোও। একবারও ভেবেছেন কি, কেন?
জ্বি হা, ওখানেই মার্কিনিদের গ্যাঁড়াকলে বাংলাদেশ।
আমরা যত কথাই বলি আর লিখি, বাস্তবতা শুনতে কঠিন ও অসহ্য লাগলেও, কঠিন বাস্তবতা হচ্ছে, পূর্বের দীর্ঘদিনের কঠিন সরকারের প্রধান “শেখ হাসিনা” (আপনি পছন্দ করুন আর নাইবা করুন) যেভাবে আন্তর্জাতিক রাজনীতিকে বাংলাদেশের পক্ষে রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন, সেখান থেকে বর্তমান বাংলাদেশকে ছিনিয়ে নিয়ে, ইউনূস সাহেবের দ্বারা মার্কিনিরা তাদের কর্ম ও চাওয়া- পাওয়ার পথটা বেশ সুগম করে ফেলেছে। এই যে মার্কিনিরা এই কাজটি ইউনূস দ্বারা করতে সক্ষম হয়েছে এবং বর্তমানে বিএনপির মতন বৃহত্তর দল যারা এত দীর্ঘ সময় আন্দোলন- সংগ্রাম করলো, সেই দলটিও মূলত ইউনূস ক্রিয়ায় মার্কিনিদের খপ্পরে বেশ ভালভাবেই পড়েছে বলেই অনুমান হয় এবং পাশাপাশি মূলত বাংলাদেশটাই মার্কিনিদের খপ্পরে পড়েছে। যা বাস্তবিক অর্থেই বাংলাদেশের জন্য বড় আন্তর্জাতিক গ্যাঁড়াকল। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক ভুরাজনীতির স্বীকার বলে আমরা যা লিখি ও বলি, মূলত সেটা সঠিক ও বাস্তব এবং সেটা ইউনূস দ্বারাই ঘটেছে, ইহাই শতভাগ কঠিন সত্য। এই গ্যাঁড়াকল থেকে এই দেশটি আগামীতে আর বের হয়ে আসতে পারবে কিনা? কোটি ডলারের প্রশ্ন সেটা। তবে উত্তরটি সম্ভবত সহজ, আর হবার নয় এবং পাশাপাশি ইউনূস হবে অত্র অঞ্চলের দ্বিতীয় নাম ‘মিরজাফর’।
কেন মার্কিনিদের এই গ্যাঁড়াকল থেকে আর বের হওয়া সম্ভব হবার নয়? উত্তরটি বুঝার সুবিধার্থে ভিন্নভাবে দেই।
সবার স্মরণে থাকার কথা যে, জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্য দেশের মধ্য থেকে একটি দেশের ভেটো দ্বারাই বিশ্বের যে কোন কিছু বিনষ্ট হতে পারে অথবা ভাল হতে পারে। ভাল হতে বলছি যুদ্ধ যদি কোন ভেটো দ্বারা বন্ধ হয়। আপনাদের আরও স্মরণে থাকার কথা, ইরাক যুদ্ধের পূর্বে জাতিসংঘে ভেটো এসেছিল এবং ওটাই জাতিসংঘের ইতিহাসে প্রথম কোন ভেটো যা মূলত মানা হয়নি। কারা মানেনি? মার্কিনিরাই সেই ভেটো উপেক্ষা করেছিল এবং মার্কিনিরা ইরাক আক্রমণ করেছিল।
সবার স্মরণে থাকার কথা, জুনিয়র জর্জ ডাব্লিউ বুশ ইরাক যুদ্ধের পূর্বে কি বলেছিল? সবার স্মরণে বলছি জর্জ ডাব্লিউ বুশের সেই বচনটি।
“Either you are with us or with terrorists” –
হয় তোমরা আমাদের সাথে অথবা অনুমান হবে তোমরা জঙ্গিদের সাথে। এই এক বচন দিয়ে ইরাকে কেমিক্যাল অস্ত্রের খোঁজে মার্কিনিরা। যদিও মার্কিনিদের বেশ জানা ছিল, ইরাকে তেমন কিছুই নেই। অতঃপর বিশ্বের প্রায় সকল দেশ ঘুরেফিরে মার্কিনিদের সমর্থন যুগিয়েছিল সরাসরি। কোথায় সেই ভেটো? আর কোথায় সেই বিশ্বের মহান সব দেশগুলোর প্রতিশ্রুতির বচন? সব হারিয়ে গিয়েছিল। বিস্তারিত আর লিখছি না কারণ বহুবার বিষয়টি লিখেছিলাম বলেই তবে ইরাক যুদ্ধ কেউ থামাতে পেরেছিল কি? ভাবতে পারেন।
এখানে একটু ভিন্ন বিষয় বলি। আমেরিকা নেটো জোটভুক্ত দেশগুলোর সদস্য। নেটোর একটি আর্টিকেল কথা স্মরণ করুন। পাঁচ নাম্বার আর্টিকেল। যে আর্টিকেল বিশ্বের সব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের জানা আছে যে, নেটের কোন দেশ কখনও কোন যুদ্ধে জড়ালে, নেটোর অন্যান্য সকল দেশ সেই যুদ্ধে সরাসরি অংশ নিতে বাধ্য থাকিবে। এটা সবয়ংক্রিয়ভাবেই হবে, আর্টিকেলটাই এমনভাবে করা। এখন ভাববার বিষয় হলো যদি নেটো জোট এই যুদ্ধে জড়িয়ে যায় তাহলে এই যুদ্ধের মাত্রা কি হতে পারে? আমি নিজে সেটা না ভেবে আপনাদের ভাববার জন্য রেখে দিলাম।
প্রশ্ন হতে পারে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যে B- 52 বোমারু বিমান দ্বারা আক্রমণের হুমকি দিচ্ছে সেটা কেন? দুটো বিষয় হবার সম্ভাবনা আছে। এক) মার্কিনিদের চাওয়া হতে পারে ইরানকে একেবারেই পঙ্গু করে দেওয়া এবং সেটা করতে হলে ইরানের সকল পরমাণু কেন্দ্র চিরতরে ধ্বংস করে দিয়েই করতে হবে এবং দুই) ইরানকে পঙ্গু করা মানেই রাশিয়াকে অনেকটাই দূর্বল করে দেওয়া যা বরাবরই মার্কিনিদের চাওয়া। একটি খবরে দেখলাম, এই B- 52 বোমারু বিমান ইতিমধ্যেই ভারত মহাসাগরে অবস্থানরত আছে।
একটি কথা ছোট্ট করে বলে রাখি। খবর দেখে যা অনুমান হয়, ইরান বা ইসরাইল দুই দেশই no return পয়েন্টে চলে গেছে। বিষয়টি অনুধাবন করার যে, যুদ্ধটা মূলত মার্কিনিদের দ্বারা ইসরাইল শুরু করেছে। ইরানের যুদ্ধ বন্ধ করার কোন সুযোগ নেই। ইরান তাদের অস্তিত্বের কারণেই যুদ্ধ চালাতে বাধ্য হবেই হবে। অন্যদিকে ইরান মার্কিনিদের সাথে যংই পারমানবিক চুক্তির আওতায় আসে তাহলে সেটা হবে সরাসরি ইরানের চিরতরে পরাজয়। সেটা ইরান হতে দেবে না বলেই অনুমান হয়। অর্থাৎ বুঝাই যাচ্ছে এই যুদ্ধ ভয়ানক রুপ নিতে যাচ্ছে।
এবার ছোট্ট করে মুসলিম দেশগুলোর কথা বলেই শেষ করব। মুসলিম দেশগুলোর মূলত বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডে কোন প্রকার শক্ত মেরুদন্ড নেই, ইহাই সত্য এবং সকল মুসলিম দেশ মূলত মার্কিনিদের পা চাটা সদস্য। মুসলিম দেশগুলোতে ক্ষমতায় বসাবে এমন প্রতিশ্রুতির মার্কিনিরা দিলেই সবাই নত মাথায় বরাবরই মেনে নিয়েছেন এবং আগামীতেও সেটাই ঘটবে কারণ মুসলিম সকল দেশ মূলত মেরুদন্ডহীন। লক্ষ্য করুন, মুসলিম উন্মা নামে বিরাট একটি সংগঠন আছে “OIC” আবার পাশাপাশি আছে আরব লীগ, সম্ভবত। মূলত বিশ্ব অনুবাদে এদের মূলত কোন ফাংশনই নেই। উল্টো মুসলিম উম্মা নামের সকল সংগঠন বরাবরই ইসরাইলসহ মার্কিনিদের কাছেই আত্মসমর্পণ করে এসেছে এবং ভবিষ্যতেও তেমনটাই ঘটবে এবং কারণ বহুবিধ। সেই কারণে আজকে যাচ্ছি না।
মুসলিম উম্মার নাম যে সকল দেশ আছে, বড়জোর তারা অবশেষে মার্কিনিদের কাছে ইরানকে তুলে দেবার পথ দেখাতে পারবে অর্থাৎ যুদ্ধ বন্ধ করার পায়তারা করতে পারে তবে সেখানে মার্কিনিদের যা চাওয়ার ছিল সেটা শতভাগ পূর্ণ করেই ঘটবে, নতুবা নয়। যাকগে সামনে দিনে আরও কিছুটা সময় পরে যুদ্ধ বিষয়টি আরও পরিষ্কার হবে নিশ্চিত। আপাতত সেখান থেকে সরে এসে আমাদের দেশের কথায় আসি।
লেখার শুরুতেই লিখেছি, বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে যে বাস্তবিক অর্থেই গ্যাঁড়াকলে পড়েছে, সেটার প্রথম প্রমাণ হলো, আমাদের সকল আবেগি ধর্মীয় রাজনৈতিক দলসমূহের সকল ধর্মীয়নেতা নামের কাণ্ডারীগণসহ বিএনপি ও সরকারের পক্ষেই ভারসাম্য রাখা যে সকল দল আছে এবং আগামীর ক্ষমতায় চেয়ে অছে, তাদের দ্বারা মুসলিম দেশ ইরান হোক বা ভিন্ন কোন দেশ হোক, ক্ষমতায় যেতে হলে মার্কিনিদের বিরুদ্ধে যাবার কোন সুযোগ নেই।
ঠিক সে কারণেই আগামীতে এই বাংলাদেশটি মার্কিনিদের গ্যাঁড়াকল থেকেও এমন সব দল, ধর্মীয় রাজনৈতিক নেতা বা তথাকথিত গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা বা দল দ্বারা বাংলাদেশকে গ্যাঁড়াকল থেকে বাঁচানোর কোন সুযোগই পাবে না বা ক্ষমতাই থাকবে না। হ্যা একদল (হোক ধর্মীয় নেতা বা ভিন্ন) ক্ষমতার চেয়ার নিশ্চিত পাবে। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর (ধর্মীয় বা ভিন্ন) ভাব ও ক্রিয়া দেখে বলাই যায়, আয় মার্কিনি আয়, ক্ষমতার ভাগ্যটা যেন খুলে যায়, এমন ছড়া কাটছে। সুতরাং এটা জলের মতন পরিষ্কার যে, এমন সব ধর্মীয় রাজনীতির নেতা বলেন আর গণতান্ত্রিক রাজনীতির নেতা বলে বা যডযন্ত্রে ক্ষমতায় বসা ইউনূস বলেন, তাদের কাছ থেকে ইরান যুদ্ধ নিয়ে প্রতিবাদ আশা করা আর বাংলাদেশকে গ্যাঁড়াকল থেকে বাঁচানোর আশা করা, কাঠের গরুর কাছে দুধ চাওয়া সম যে।
অতএব বলাই বাহুল্য যে, আগামীতে বাংলাদেশ আর বাংলাদেশ থাকছে না। লেখার মাঝেই লিখেছি আবার উল্লেখ করছি বাধ্য হয়েই কারণ সত্য সর্বদাই সত্য যে, শেখ হাসিনার মানের আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশকে রক্ষা করাটা ইতিহাস হয়ে সামনে আসবেই একদিন। কারো পছন্দ হোক বা না হোক অথবা যে যে দলই করুক, সত্যকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

