“জলের শ্যাওলা”- কত গালাগালে আমার গোলা ভরে আছে তা বলে শেষ হবার নয়। গালাগালের গোলা দেখে নিজেকে ধনীই মনে হয় কেননা গোলা ভরা যে। যাকগে ওই সব গালাগাল’ও একদিন কাজে দেবে যদি পজেটিভলি ব্যবহার করতে পারি। থাক সে আলাপ।
সেই শুরু থেকেই শতভাগ স্রোতের বিপরীতে সাঁতরিয়ে বারবার এবং প্রতিবার লিখেই গেছি, “রাজনৈতিক ফর্মে অভ্যুত্থান হয়নি এবং খেসারত দিতে হবে এই রাষ্ট্রকে”! আহ্ কতবার লিখেছি এই কথাটি এবং গালাগাল হজম করেছি।
লক্ষ্য করুন, অসত্য বা ষড়যন্ত্র দিয়ে একটি রাষ্ট্রে কিছু পরিবর্তন ঘটলে সেটা পজিটিভ ফল দিতে পারে না কেননা গোড়াতেই গলদ যে। এটা সবার জানা। যত কথাই আমরা বলি না কেন, মাত্র ৩৬ দিনে যে অভ্যুত্থান ঘটেছিল সেটা ছিল একটি কঠিন থেকেও কঠিনতম সরকারের বিপরীতে অস্বাভাবিক একটি অভ্যুত্থান। প্রথমত শতভাগ ষড়যন্ত্র ছিল এই অভ্যুত্থানে। দ্বিতীয়ত মার্কিনিদের হাত ও অর্থ ছিল এই অভ্যুত্থানে। তৃতীয়ত ইউনূস সাহেব মার্কিনিদের পাশার গুঁটি ছিলেন।
ভাবুন, বিএনপির মতন এত্তবড় একটি রাজনৈতিক দল কেন অভ্যুত্থান ঘটাতে পারেনি শত সহি কারণ থাকার পরেও? এই যে বিএনপি পারেনি তার জন্য জনমানুষেরাও যেমন দায়ী। সাথে আবার আমাদের রাজনৈতিক দলগুলো আবার তারচেয়েও বেশি দায়ী। কেননা একটি রাষ্ট্রের জনমানুষেরা দলমত নির্বিশেষে তখনই যে কোন রাজনৈতিক দলের পিছনে সহি রাজনৈতিক আন্দোলনে সামিল হয় যখন, সেই আন্দোলন হয় রাষ্ট্রের স্বার্থে। যদি ধরেও নেই, বিএনপি রাষ্ট্রের স্বার্থেই আন্দোলনে ছিল তবুও বলতেই হয় আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতার কথা কেননা আমাদের বৃহৎ রাজনৈতিক দলগুলোও জনমানুষের মনে সেই বিশ্বাস আনতে সক্ষম হয়নি। রাজনৈতিক দলগুলো যে বিশ্বাস জনমানুষের মনে গেঁথে দিয়েছে, সেটা হলো ক্ষমতা কেননা আমাদের দেশে রাজনৈতিক চর্চা মানেই ক্ষমতার চর্চা যে। সুতরাং জনমানুষেরা কেন বিএনপির এত লম্বা আন্দোলনে শরিক হয়নি? উত্তরটি ভবিষ্যতে আমাদের যেকোন রাজনৈতিক দলের আলাদা করে ভাবা প্রয়োজন।
ভাবুন, ইউনূস সাহেব পাশার গুঁটি কেন হবে না? এতদিন ধরে মার্কিনিরাই ইউনূস সাহেবকে বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ বানিয়েছিল। মার্কিনিরা পিছন থেকে তুলে না ধরলে ইউনূস সাহেব বড়জোর একটি নোবেল পেতেন স্রেফ ক্লিনটন বন্ধুত্বের কল্যাণেই। আমার বেশ স্মরণে আছে, ইউনূস নোবেল পাচ্ছেন এমন কথা একটানা দশ বছর ধরে শুনেছিলাম। আমি বহু সাক্ষী ইউরোপীয়ানদের হাজির করতে পারবো, যাদের আমি নিজেই সেই সময়ে বলতাম, ইউনূস সাহেব নোবেল পাবেন। অনেক ইউরোপিয়ান আমার কথায় কত হেসেছিলেন, তা আর বলার। ইউনূস এইতো নোবেল পাচ্ছেন, এইতো পাচ্ছেন অতঃপর পেলেন বটে তবে সেই সময়ক্ষেপণও বিনা কারণে নয়, এটা আজকের দিনে পরিষ্কার হয়ে সামনে ভেসে উঠছে। বিনা স্বার্থে মার্কিনিরা কেন ইউনূস সাহেবকে এও উঁচুতে উঠাবেন? স্রেফ ক্লিনটন বন্ধুত্ব? না এবং মোটেও না। মার্কিনিরা যে মাস্টারপ্লান করে বিশ্ব পরাশক্তিদের সর্বোচ্চ, ওটা সঠিক প্লান ও প্রয়োগের দ্বারাই। ইউনূস সাহেব ছিলেন তেমন মাস্টারপ্লানের একটি অংশ মাত্র অত্র অঞ্চলে এবং সেই প্রয়োগটাই এবার ঘটিয়েছে, মার্কিনিরা।
এমন কিছু ঘটবে দেশে, সেটা এপ্রিলেই আমার লেখা কলাম, “লু- হাওয়ায়” লিখেছিলাম। ডোনাল্ড লু যখন পাকিস্তান গেলো এবং তার পরপরই ইমরান খানের পতন হলো। মানুন আর নাইবা মানুন, ইমরান খান পাকিস্তানের জনগণকে সাথে নিয়েই এবং পাকিস্তানের সরকারে চিরাচরিত সেনাদের হস্তক্ষেপের বিপরীতেই দাঁড়িয়েছিল এবং যা মার্কিনিদের জন্য ছিল অস্বস্তিকর এবং ক্ষতিকারক। কেননা চীন হলো মূলত মার্কিনিদের শত্রু এবং চীন মোকাবিলায় কোন একদিন পাকিস্তানের মতন একটি সেনা বাহিনী মার্কিনিদের হাতে থাকতে হবেই হবে (আমি যুদ্ধের কথা বলছি না/ পার্থক্য আছে) এবং সেখানে সরকারে সেনা বাহিনীর শক্তির ক্রিয়া না থাকলে বা খর্ব হলে, এক সময় জনগণের চাওয়ায় সেনা বাহিনী মার্কিনিদের হাতছাড়া হবার সম্ভাবনা গড়ে উঠতে পারে। অর্থাৎ পাকিস্তানের মতন একটি রাষ্ট্রে কিছুটা শক্তিধর গণতন্ত্রের চর্চা হলেই ওটা হতো মার্কিনিদের জন্য পাকিস্তান সেনাবাহিনী হাতছাড়া হবার জো। যাকগে এই আলোচনা অনেক বড়, বহুবার লিখেছি, আজ নয়। তবে পাকিস্তানে একমাত্র ইমরান সরকারই দেশটিতে নিম্নের পক্ষে গণতান্ত্রিক দেশে রুপান্তরের প্রচেষ্টা নিয়েছিল। তবে মার্কিনিরা সেটা হতে দেয়নি। অতঃপর কত বাজে নিউজ ইমরান খানকে নিয়ে পাকিস্তানের গণমাধ্যমেই প্রকাশ হয়েছে, জেল থেকে ছাড়া হবার পরে। নিশ্চয়ই সেটা সবার জানা আছে। আমি আর সেটা লিখে ইমরান খানকে ছোটো করছি না। যদিও ইমরান খানের ছোটো হবার কিছুই নেই।
অতঃপর লু সাহেব বাংলাদেশ আসলেন। টিভির পর্দায় গরম গরম পিঠা খেলেন আর হাসলেন। তখন লিখলাম লু হাওয়া চোরাইবালির দিকেই ঠেলে দিল দেশটাকে। লু চলে গেলেন। দুই মাসও পাড় হলো না। চলে এলো পাঁচ আগস্ট। আহ্ আকাশে বাতাসে কত আনন্দ। সবই ঠিক আছে তবে সেই একই কথা বলতে হয়, অভ্যুত্থানের গোড়ায় গলদ। জনমানুষেরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজপথে নেমেছিল কারণ কঠিন আওয়ামীদের শাসনের পতন করার জন্য। তবে জনমানুষেরা অভ্যুত্থানের পিছনের উপসর্গ ‘ষড়যন্ত্র- অর্থ ও মার্কিনিদের হাত’ এগুলোর কিছুই জানতো না যে। সুতরাং বলাই বাহুল্য যে, জনগণ শতভাগ সঠিক ছিল এবং নৈতিকতার দিক থেকেও শতভাগ সঠিক ছিল। জনগণের সেই নৈতিকতাটি বিএনপির মতন এত্তবড় দল কোন কাজেই লাগাতে সক্ষম হয়নি এবং সেটা ছিল বিএনপির রাজনৈতিক পরাজয়ের সামিল। জনমানুষের এই নৈতিকতা নিয়ে আলাদা ব্যাখ্যার প্রয়োজন। তবে আবার বলি জনমানুষেরা শতভাগ সঠিক ছিল এবং ভবিষ্যতে সেই গণ জনমানুষের কোনভাবেই কোন শাস্তির আওতায় আনা হবে চরম অন্যায় ও ভুল। কেন আমি কথাটি লিখছি? যদি কোনদিন (বর্তমানে অসম্ভব বলেই মনে করি) আওয়ামীরা ক্ষমতায়ন হয়, তখনও গণ জনমানুষের শাস্তির কথা ভাবাটা হবে আওয়ামীদের জন্য বড় ভুল। বিষয়টি মাথায় থাকবে এবং সময়ে অবশ্যই লেখার ইচ্ছা রইল।
শুরুতেই লিখেছি, “জেনে শুনে বিষ পান” হ্যা সেই বিষ পান করেছে দেশের বিরুদ্ধে গিয়ে এবং অর্থের লোভে বিশেষ বিশেষ গোষ্ঠীর অংশ এবং ইউনূস সাহেব অর্থ নয় তবে শিরোমনি হিসেবে বিষ পান করেছেন অথবা বাধ্য হয়েছেন। সুতরাং শাস্তি ভবিষ্যতে হতেই হবে তবে সেটা কোনভাবেই রাস্তায় লাফালাফি- ঝাঁপাঝাঁপি বা উল্লাস করেছে, সেই জনমানুষের অবশ্যই নয়। সেটা হতেই হবে সেই গোষ্ঠীর যে বা যারা ছিল মার্কিনিদের অর্থের কাঙ্গাল এবং ষড়যন্ত্রের কাণ্ডারীদের ও শীর্ষ শিরোমনির।
আমি লক্ষ্য করছি, ইউনূস সাহেব চলে যেতে চান এমন একটি খবরে একদল পারেতো এক্ষুনি ইউনূসকে শূলে চড়িয়ে দেয় এবং সাথে বিশাল জনমানুষেরদের’ও শূলে চড়িয়ে দিচ্ছে। এমন ভাবটা আবার দেশের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনবে। ইউরোপে এত চমৎকার গণতন্ত্র তবে স্মরণে রাখুন (ইতিহাসে পাবেন), ইউরোপের এই গণতন্ত্রের পিছনে পঞ্চাশ মিলিয়নের উপরে মানুষের রক্ত ছিল অতঃপর সমগ্র ইউরোপ আজকের দিনে গণতান্ত্রিক ইউরোপে রূপান্তরিত হয়েছে এবং ভবিষ্যতের কথা ভেবে পুরো ভহাদেশ একটি দেধে রূপান্তরিত হয়েছে। কথাটি স্রেফ স্মরণ করিয়ে দেওয়া মাত্র।
আগামীর বাংলাদেশের জন্য এখন থেকেই ভাবুন, অভ্যুত্থানের (যেভাবেই হোক) এত রক্তের শতভাগ মূল্যায়ন করে এবং স্রেফ দেশের গণতন্ত্রের জন্য ভেবে এগুলেই দেশ একটি পথ খুঁজে পাবে। নতুবা এই রক্ত থামবার নয় কিন্ত।

বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

