সংষ্কারের নামে যতই টালবাহানা হোক ভোট একটা হতেই হবে- সে ছোট প্যাকেজে ডিসেম্বরে বা বড় প্যাকেজে পরের বছর জুনে। সংষ্কারের কথায় পরে আসছি আপাতত: মাঠের ভোটের হিসাবটা দেখে আসা যাক। মোটা দাগে যদি বলি বাংলাদেশে ভোট দুই ভাগে বিভক্ত। এটা সেই আবহমান কাল ধরে। আওয়ামী ভোট আর এন্টি আওয়ামী ভোট। আওয়ামী ভোটের মধ্যে আছে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদী বা ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনাধারী’ বলে দাবীদাররা। এই ভাগে আওয়ামী লীগ ছাড়াও আছে তাদের আদর্শের অনুসারি কিছু ছোটখাট দল। এদের অবশ্য উল্লেখযোগ্য কোন ভোট নাই। আওয়ামী লীগ দিলে ইলেকশনে দুই একটা সীট পায়। তবে এরা সাধারনত: যা আছে আওয়ামী লীগকেই দিয়ে থাকে। ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট আওয়ামী ভোটব্যাংক হিসেবে বিবেচিত। মোট ভোটারের দশ শতাংশ এরা। ওদিকে এন্টি আওয়ামী গ্রুপের প্রধান স্টেক হোল্ডার বিএনপি। কিছু আছে সমমনা। ধর্মভিত্তিক দলগুলোও এন্টি আওয়ামী ভোটস্টকের অংশীদার। তবে শো শা পোজপাজের তুলনায় এদের ভোটের হার একেবারেই নগন্য।
বাংলাদেশের নির্বাচনগুলোর ফলাফল পর্যালোচনা করলে দেখা যায় আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট ছাব্বিশ থেকে আটচল্লিশ শতাংশ। ’৭৩এর নির্বাচনে বিএনপি ছিল না। তাছাড়া স্বাধীন বাংলাদেশে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাব ও দাপট থাকায় জালজালিয়াতি ব্য্যালট বাক্স ছিনতাই প্রার্থী গায়েব সন্ত্রাস সহিংসতা করে সে নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোট ছিল ৭৩ শতাংশ। বাদবাকি সবাই মিলে ২০ শতাংশের মত। ’৭৯এর নির্বাচন হয় মার্শাল ল’র মধ্যে। জিয়াউর রহমান তখন ক্ষমতায়। এ নির্বাচনে শত প্রতিকূলতার মধ্যেও আওয়ামী লীগ পায় প্রায় ২৫ শতাংশ ভোট। ক্ষমতায় থেকে নির্বাচন করে প্রধান দল বিএনপি ৪১ শতাংশ। ’৮৬এর নির্বাচনও মার্শাল ল’র মধ্যে। এতে প্রধান প্রতিদ্বন্ধি ক্ষমতাসীন জাতীয় পার্টি। বিএনপি বর্জন করে। এতেও আওয়ামী লীগের কালেকশন ২৬ শতাংশ। ’৮৮তে কোন বিরোধী দল অংশ নেয় নাই। বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে স্বচ্ছ নির্বাচন হিসেবে বিবেচিত ’৯১এর নির্বাচন। এখানে আওয়ামী লীগ পায় ৩০ পার্সেন্ট। তাদের সমমনারা নিজেদের মত করে নির্বাচন করে পেয়েছিল সব মিলিয়ে ৬ শতাংশের মত ভোট। এতে বিএনপির ছিল ৩০ শতাংশ, জামাত ও জাতীয় পার্টির ১২ শতাংশ করে। ’৯৬এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ছিল সাড়ে ৩৭ শতাংশ। বিএনপি পেয়েছিল সাড়ে ৩৩ শতাংশ। জাতীয় পার্টি সাড়ে ১৬, জামাত প্রায় ৯। ২০০১এ আওয়ামী লীগের ভোট বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ শতাংশ। সে নির্বাচনে তারা ছিল সদ্য ক্ষমতাত্যাগী। এতে বিএনপিরও ছিল ৪০ শতাংশের ওপরে। ’০৮এ আওয়ামী লীগ-বিএনপি জোটগতভাবে নির্বাচন করে। আওয়ামী লীগের মহাজোট পায় সাড়ে ৫৬ শতাংশ। এতে আওয়ামী লীগের একক প্রাপ্তি ছিল ৪৮ শতাংশ। বিএনপি জোটের সাড়ে ৩৭ শতাংশ। বিএনপি একক সাড়ে ৩২। পরের তিনটা নির্বাচনকে নির্বাচন ধরা হয় না। কাজেই ও হিসাব বাদ।
’৭৯ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত আওয়ামী লীগের প্রাপ্ত ভোটের গড় হিসাব ধরলে দাঁড়ায় ৩৬ থেকে ৩৭ শতাংশে। বিএনপিরও ৩৭। বাকি ২৬ পার্সেন্ট কিছু জাতীয় পার্টি কিছু জামাত, অন্যান্ন এবং নন কমিটেড। জাতীয় পার্টি জামাত জাসদ সিপিবি চরমোনাই ইত্যাকার অপ্রধান দলের ভোট কখনও আওয়ামী বাক্সে যায় কখনও বিএনপির। কিছু আবার নিজেরাও পৃথকভাবে নির্বাচন করে। গত নির্বাচনে মোট ভোটার ছিল প্রায় ১২ কোটী। এবার এখনও তালিকার আপডেট চলছে। তাতে মৃত এবং ভূয়া ভোট বাদ দিলে কিছু কমবে। আবার নতুন ভোটার যুক্ত হলে সব মিলিয়ে সেই ১২ সাড়ে ১২ কোটীর মত হতে পারে। শতাংশের হিসাবে এতে আওয়ামী লীগের ভোট আছে সাড়ে ৪ কোটীর মত। গন অভ্যুত্থানে উৎখাত হওয়ায় এ দলের ইমেজের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। হাজার বিশেকের মত বিদেশে পালিয়েছে। বাকিরা দেশেই আছে। ভোট এলে এরা ভোটও দেবে, আওয়ামী লীগ দলগতভাবে মাঠে না থাকলেও। দলের নেতৃত্বের ওপর বীতশ্রদ্ধ হয়ে যদি দল বা পক্ষত্যাগ করে, এদের সংখ্যা কত হতে পারে, ৫০ লাখ বা ১ কোটী। তারপরও সামনের নির্বাচনে এ দলের ভোট আছে কমপক্ষে ৩ কোটী, যার ১ কোটীর মত ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের। ৩৭ পার্সেন্ট হিসেবে বিএনপিরও সাড়ে ৪ কোটীর মত ভোট। ধরলাম বিদ্যমান পরিস্থিতিতে বা সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন দল গঠন, পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির ওপর বীতশ্রদ্ধা- ইত্যাদী কারনে বিএনপির কিছু ভোট কমবে। কত কমতে পারে! ৫০ লাখ। তারপরও ৪ কোটী।
এ অবস্থায় ফেয়ার ইলেকশন হলে বিএনপিরই জেতার কথা। কিন্তু ইদানীংকালে কারও কারও কথাবার্তা এবং উদ্যোগে মনে হচ্ছে তারা চাইছে না ভোটে জিতে বিএনপি সরকার গঠন করুক। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন দল বানানো হয়েছে। তারা টাকাওয়ালাদেরও সহযোগীতা পাচ্ছে। নতুন রাজনীতি নতুন বন্দোবস্তের তত্ব নিয়ে প্রচার প্রপাগান্ডা চালানো হচ্ছে। জামাতঘেষা কিছু বুদ্ধিজীবিকে দেখা যাচ্ছে বিএনপির বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ছড়াতে। সবই মানলাম, কিন্তু ভোট এলে বিএনপির ভোটারদেরকে ঠেকানো যাবে কিভাবে। তারা যদি ঠিকমত ভোট দিতে পারে তাহলে তো বিএনপি জিতে যায়! ডিজিএফআইয়ের মেকানিজম বা ইলেকশন ইঞ্জিনীয়ারিং ছাড়া ভোটের রেজাল্ট পাল্টে দেয়ার কোন পথ আছে কি! সামনের নির্বাচন কি ’১৪ ’১৮ ’২৪ স্টাইলে করা যাবে! ছেলেরা দল করেছে। খুব ভালভাল কথা বলছে। তারাও নির্বাচনে যাবে। এবং স্বাভাবিকভাবেই আশা করছে মেজরিটি হয়ে সরকার গঠন করবে। কিভাবে! সবচেয়ে বড় কথা ওদের ভোটটা কোথায়! ভোট তো সব ভাগ হয়ে আছে। জামাতের ভোট সলিড। এদিকওদিক হবে না। আওয়ামী লীগ নির্বাচন করতে না পারলে ভোট বিএনপিকে দেবে। তাতে বিএনপির জেতা নিশ্চিত। বলা হচ্ছে এবার ১ কোটীর মত তরুন যুবক নতুন ভোটার হবে। তারা সবাই ছাত্রদের দলকে ভোট দেবে। দিলো। কেউ কেউ হিসাব দিচ্ছে তরুন যুবকদের ভোট ৪ কোটীর মত। এরাও নতুন দলের ভোটার। কিন্তু এই তরুন যুবকরা তো আগে থেকেই বিএনপি আওয়ামী লীগে ভাগ হয়ে আছে। কি এমন কান্ড ঘটেছে বা কি এমন রাজনীতি উত্থাপিত হয়েছে যে সবাই দলত্যাগ করে নতুন দলের পক্ষ নেবে। কই, এ পর্যন্ত তো শোনা গেল না কেউ একজন ছাত্রদল যুবদল ত্যাগ করে ছাত্রদের দলে যোগ দিয়েছে!
এরা আবার চায় না পতিত আওয়ামী লীগ নির্বাচন করুক। পারলে জাতীয় পাার্টিকেও ঠেকিয়ে দেয়। ধরলাম আওয়ামী লীগ এলো না, এদের ভোটগুলো কোথায় যাবে! স্বচ্ছ নির্বাচনের কথা বললে তো এদেরকেও ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিতে হবে। এরা তো সবাই দেশেই আছে। এমন তো না ৩/৪ কোটী লোক দেশত্যাগ করেছে। আওয়ামী লীগ ইলেকশন করতে না পারলে বিএনপির ষোল আনা লাভ। বরঞ্চ আওয়ামী লীগ এলেই সরকারবিরোধী ভোট ভাগ হয়ে যাবে। তাতে লাভ ছাত্রদেরই। ’৯১এর নির্বাচনেও শেখ হাসিনা এই ভুলটা করেছিল। তখন জাতীয় পার্টির ভোট ছিল প্রধানত: এন্টি আওয়ামী লীগ বা জাতীয়তাবাদী ঘরানার ভোট। বেগম জিয়া চান নাই জাতীয় পার্টি ইলেকশন করে সে ভোট ভাগ করুক। সে জন্য তিনি ‘স্বৈরাচারকে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না’ বলে ছাত্রদেরকে জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছিলেন। এই ফাঁদে পা দেন শেখ হাসিনাও। তিনিও দাবী করেন জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন করতে দেওয়া হবে না। তারপরও বিচারপতি শাহাবুদ্ধিনের দৃঢ়তায় জাতীয় পার্টি ইলেকশনে অংশ নেয় এবং চরম প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে ৩৫টা সীটে জেতে। অথচ জাতীয় পার্টি যদি সেদিন সমান সুযোগ সুবিধা নিয়ে নির্বাচন করতে পারতো বিএনপির সীট কমতো। তাতে শেখ হাসিনা সরকার গঠন করতো। এই বিষয়টা শেখ হাসিনা পরে বুঝতে পেরেছিলেন।
আজকে প্রফেসর ইউনুস বা নির্বাচনে ছাত্রদের নতুন দল হচ্ছে আওয়ামী লীগের প্রধান শত্রু। তারা চাইবে সরকারের প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে বিএনপি জিতে সরকার গঠন করুক। আওয়ামী লীগ নির্বাচনে না এলে বা করতে না পারলে বিএনপির জন্য শাপে বর। এই সরল হিসাবটা যাদের মাথায় নাই তারা কি রাজনীতি করবে আমি বুঝতে পারি না! আফগানিস্তানে মাদ্রাসার ছাত্র বা তালিবানরা দল গঠন করে নানা চড়াই উৎরাই যুদ্ধবিগ্রহ করে আজ সরকার পরিচালনায়। তাদের পেছনে ছিলেন একজন শিক্ষক বা মাদ্রাসার উস্তাদ। মোল্লা ওমর। এদের মোল্লা ওমরটা যে কে !
সাঈদ তারেক , লেখক সাংবাদিক ।

