ঘর বা সঙ্গী নিয়ে অহংকার এক অপ্রয়োজনীয় সামাজিক অভ্যাস

আমাদের সমাজে অনেকেই নিজের ঘর বা সঙ্গী নিয়ে অহংকার করেন, যা একদমই অপ্রয়োজনীয়। বিশেষত, যাঁরা সঙ্গীহীন বা যাঁদের বিয়ে টিকেনি, তাঁদের প্রতি অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করা যেন একটি সাধারণ প্রবণতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যেকোনো সম্পর্ক, বিশেষ করে বৈবাহিক সম্পর্ক, সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। এটি কারও জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে না। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে, কিছু মানুষ নিজেদের ঘর বা সঙ্গীকে ‘সফলতার মাপকাঠি’ হিসেবে উপস্থাপন করে, এবং অন্যদের ব্যক্তিগত পরিস্থিতি নিয়ে তীর্যক মন্তব্য করেন। এই ধরনের আচরণ কেবল অসংসদ্রতাই প্রকাশ করে না, এটি অন্যদের মানসিক শান্তি নষ্ট করতেও ভূমিকা রাখে।
মনে রাখা জরুরি, সবার জীবনের পথ এক নয়। কেউ সঙ্গী ছাড়াই সুখী থাকতে পারেন, আবার কেউ সঙ্গী থাকা সত্ত্বেও অসুখী। অন্যের জীবনে কষ্ট বা ব্যর্থতা নিয়ে উপহাস করা বা খোঁচা দেওয়া কোনো সভ্যতার নিদর্শন হতে পারে না। বরং এটি মানুষের প্রতি সহমর্মিতা দেখানোর সুযোগ।
যদিও আইনিকভাবে বৈধ, ভালোবাসাহীন সম্পর্ক নৈতিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। বিবাহের ভিত্তি শুধু আইন বা সামাজিক নিয়ম নয়, এটি পারস্পরিক সম্মান, বিশ্বাস এবং আবেগের উপর নির্ভরশীল। যদি সেই উপাদানগুলো অনুপস্থিত থাকে, তবে সম্পর্কটি তিক্ততায় পরিণত হতে পারে।
সুতরাং ঘর বা সঙ্গী নিয়ে অহংকার করার কিছু নেই। আমার মতে, যেখানে ভালোবাসা, বিশ্বাস, সম্মান ও শ্রদ্ধা থাকে, সেখানেই আসল ঘর এবং সেখানেই প্রকৃত সম্পর্ক।
যদিও অনেকেই বিভিন্ন কারণে অসুখী এবং অস্বাস্থ্যকর বিবাহে আটকে থাকেন। কেউ শুধুমাত্র সামাজিকতা ও একটি আইনি সনদের জন্য সারাজীবন অসুখী বিবাহে কাটিয়ে দেন। কেউ আবার পরিবর্তনের ভয়, আর্থিক অনিশ্চয়তা বা ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় এমন সম্পর্ক চালিয়ে যান। কেউ কেউ এমন সঙ্গীর সঙ্গে জীবন কাটান, যিনি সহিংস, স্বার্থপর, নিষ্ঠুর, দায়িত্বজ্ঞানহীন বা বিশ্বাসঘাতক। অনেকেই এমন জীবনসঙ্গীর সঙ্গে থাকেন যিনি বারবার মিথ্যা বলেন, খারাপ মেজাজের অধিকারী কিংবা পরকীয়ায় লিপ্ত। কেবল সমাজে বিবাহিত পরিচয়ের জন্য তাঁরা এমন সম্পর্ক ধরে রাখেন। যদিও তারা একই ছাদের নিচে থাকেন, প্রকৃতপক্ষে তারা আলাদা জীবনযাপন করেন, একে অপরের সঙ্গে সময় কাটান না। তবুও সমাজে নিজেদের এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন তারা অত্যন্ত সুখী এবং সম্মানিত। কারণ তাদের জীবনে রয়েছে ‘স্বামী’ বা ‘স্ত্রী’ নামের পরিচিতি এবং একটি বিবাহ সনদ।
যখন একটি সম্পর্ক স্থায়ীভাবে ভালোবাসাহীন ও তিক্ত হয়ে পড়ে, এবং কোনো দম্পতি বিচ্ছেদকে উপযুক্ত সমাধান হিসেবে বিবেচনা করেন, তখন তারা সাধারণত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে ব্যক্তিগত পরিস্থিতি, সমাজ, সংস্কৃতি এবং মানসিক অবস্থার বিষয়গুলো গভীরভাবে বিবেচনা করে থাকেন।
আমাদের সংস্কৃতিতে বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে বহু পুরোনো এবং অপ্রচলিত ধারণা রয়েছে। ফলে, একবিংশ শতাব্দীতেও বিবাহ বিচ্ছেদকে একটি কলঙ্ক বা লজ্জা হিসেবে দেখা হয়। এর প্রভাব নারীদের উপর তুলনামূলকভাবে বেশি পড়ে।
যদিও বিবাহ বিচ্ছেদ একটি কষ্টকর এবং বেদনাদায়ক অভিজ্ঞতা, এটি একইসঙ্গে মহৎ ও সাহসিকতার উদাহরণ হতে পারে। কারণ এটি এমন একটি পদক্ষেপ, যেখানে আপনি নিজেকে সহিংসতা, অপব্যবহার এবং বেদনাদায়ক সম্পর্ক থেকে মুক্ত করেন এবং টিকে থাকার শক্তি দেখান।
যেসব নারী বা পুরুষ নিজেদের এই ধরনের সম্পর্ক থেকে মুক্ত করতে সাহস দেখিয়েছেন, তাদের প্রতি আমার অকুণ্ঠ শ্রদ্ধা।
তাই আসুন, অহংকার নয়, বরং একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হই। অন্যের পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করি এবং মানুষকে তার নিজের মতো করে বাঁচতে দিই। জীবন সবার জন্যই মূল্যবান, এবং আমরা যদি একে অপরকে সম্মান দিই, তবেই সমাজে সত্যিকারের সুখ ও শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে।
অন্যকে হেয় করে নিজেকে মহান প্রমাণ করার চেষ্টা কখনোই সত্যিকারের শ্রেষ্ঠত্বের চিহ্ন হতে পারে না।
হুসনা খান হাসি
০২/১২/২০২৪
লন্ডন, ইউকে

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.