–
আজ ১৭ই নভেম্বর।
১৯৭৬ সালের এই দিনটি আমাদের দেশের রাজনীতির প্রবাদপুরুষ মজলুম জননেতা মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানীর প্রয়াণ দিবস। উনি প্রাণত্যাগ করেন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায়। এ নিয়ে আমার কিছু স্মৃতি আছে।
আমি তখন দৈনিক কিষানের বার্তা সম্পাদক। অফিস সেগুন বাগিচার এক বিরাট বাড়ীতে। মাত্র দশ দিন আগে কাগজটা সাপ্তাহিক থেকে দৈনিকে গড়িয়েছে। গোছগাছের কাজ তখনও চলছে। ১৭ তারিখ দুপুর থেকেই আমি অফিসে। বিকেল সাড়ে তিন কি চারটার দিকে ঢাকা মেডিকেল থেকে আমাদের প্রতিনিধি ফোন করে জানান, হুজুরের অবস্থা ভাল না! দেখতে চাইলে যেন এখনই চলে আসি।
ক’দিন যাবত তিনি ঢাকা মেডিকেলে ভর্তী ছিলেন। বেশ কিছুদিন শরীরটা ভাল যাচ্ছিলো না। নিয়মিত খোঁজখবর রাখতাম। সেদিন অবস্থা গুরুতর শুনে খটকা লাগে! সেগুন বাগিচা থেকে মেডিকেল, রিকশায় আট থেকে দশ মিনিটেই পৌঁছি। দোতালায় যে কেবিনে হুজুর ছিলেন আগেও গেছি দুইএকবার। গিয়ে দেখি বাইরের লোক কেউ নাই। তখনও কেউ এসে পৌঁছায় নাই। হুজুর সোজা চিৎ হয়ে শুয়ে বেডে। চোখদু’টো বোজা। একপাশে স্ত্রী আলেমা ভাসানী থ’ হয়ে বসে, অপলক তাকিয়ে হুজুরের মুখের দিকে। পায়ের দিকটায় দু’টো নার্স হতভম্বের মত দাঁড়িয়ে। যেন কিছু বুঝে উঠতে পারছে না।
রুমে ঢুকে হুজরের মুখের দিকে তাকিয়ে মনে হলো ঘুমিয়ে আছেন। রুমের পরিবেশটাও এমন মনে হলোনা যে উনি মারা গেছেন। একবার ভ্রম হয় কেউ কি আমাকে বোকা বানালো! নার্সদের জিজ্ঞেস করি কি হয়েছে। ওরা আমতা আমতা করতে থাকে। হুজুরের স্ত্রীকে শুধাই খালাম্মা কি হয়েছে। তিনি কান্নাজড়িতে কন্ঠে বলেন, উনি তো ভালাই আছাল। একটু আগে উইঠা নামাজ পড়লো, বইসা খাইলো। নার্সরা কি জানি অষুধ খাওয়াইলো, তারপর ছটফট করতে করতে শুইয়া পড়লো। এখন তো চোখ খুলে না। বলে ‘ও বাবুর বাপ’ বলে হুজুরকে ডাকতে থাকেন। ভাল করে তাকাই হুজুরের মুখের দিকে। বুকটা স্থির। ওঠানামা করছে না। এবার একটু কড়াভাবে নার্সদের কাছে জানতে চাই কি হয়েছে ওনার। একজন বলে কি হয়েছে তারাও বুঝতে পারছে না। ধমক দিয়ে শুধাই উনি কি মারা গেছেন? ওরা বলে আমরা বুঝতে পারতেছি না। স্যারদের খবর দেওয়া হয়েছে। উনারা এসে বলতে পারবেন। এর মধ্যে নিশ্চিত হয়ে যাই হুজুর আর নাই। মনে মনে ইন্নালিল্লাহ পড়ি। মাথার একপাশে বসে খালাম্মা ফুপিয়ে ফুপিয়ে কান্না করে চলেন। মাঝেমাঝে নার্সদেরকে বকা দেন। এবার বেশ জোরে ধমক দিয়ে শুধাই, কি অষুধ দিছিলেন? ওরা খানিকটা কম্পিতকন্ঠে বলে, রোজ যা দেই। ভুল অষুধ দিছিলেন? ওরা একইভাবে আমতা আমতা করতে থাকে।
নার্সদেরকে জেরা এবং হুজুরের স্ত্রীর সাথে কথা বলে যা জানা গেল- সকাল থেকে হুজুর বেশ ভাল ছিলেন। সবার সাথে স্বাভাবিকভাবে কথা বলেছেন। যোহরের নামাজ পড়েছেন। দুপুরের খাবারও খেয়েছেন। এরপর নার্সদের কেউ অসাবধানতাবশত: তাকে অন্য কোন অষুধ খাইয়েছে। রিএ্যাকশন হয়ে হুজুরের হার্টবিট বা প্যালপিটিশন বেড়ে যায়। যেটা তিনি সহ্য করতে পারেন নাই, হার্ট এ্যাটাক হয়ে গেছে। এর মধ্যে দু’জন ডাক্তার ছুটে আসেন। সিনিয়রজন হুজুরের পালস পরীক্ষা করেন। স্টেথিষ্কোপ দিয়ে হার্টবিট খোঁজার চেষ্টা করেন। তারপর নার্সদের কাছে জানতে চান কি হয়েছিল। ওরা একইভাবে আমতা আমতা করে কিছু বলে। এক ডাক্তার হুজুরের ফাইলটা নিয়ে দেখেন, অষুধগুলো দেখেন। তারপর অন্য ডাক্তারের কানেকানে কিছু বলেন। ইতিমধ্যে খালাম্মা বেশ জোরে কান্না শুরু করেছেন। নার্সদেরকে বকাঝকা করে চলেছেন। বলেন ওরাই তাকে মেরে ফেলেছে। আমি ডাক্তারদেরকে বলি হুজুর তো ভালই ছিলেন। নার্সরা তাকে ভুল অষুধ খাইয়েছে। এক ডাক্তার আমার পরিচয় জানতে চায়। সাংবাদিক জেনে একটু সংযতকন্ঠে বলে, দেখেন এটা আমাদের চিকিৎসার ব্যপার। আমরা দেখছি। আপনি এখন যান এখান থেকে। আমি তর্ক জুড়ে দেই। বারবার বলতে থাকি ভুল অষুধ খাইয়ে হুজুরকে মেরে ফেলা হয়েছে। এর মধ্যে আরও কয়েকজন এসে যান। বাবু ভাই (হুজুরের বড় ছেলে নাসের খান ভাসানী) চলে আসেন। বড় ডাক্তার। একে একে দলের নেতা কর্মীরা আসতে থাকে। পুলিশ আসে। ভীড় বেড়ে চলে। আমার কথাটা মানুষের কলরবে চাপা পড়ে যায়। ভীড় ঠেলে চলে আসি সেখান থেকে।
ভুল অষুধে যে হুজুরের মৃত্যু হয়েছে এ কথাটা আমি পরদিন আমার দৈনিকে লিখেছিলাম। লীড হেডিংয়ে। এ নিয়ে সম্ভবত: কিছুদিন হৈ চৈও চলেছিল। একটা তদন্ত কমিটিও হয়েছিল। ওই পর্যন্তই। রাষ্ট্রক্ষমতায় তখন জিয়াউর রহমান। ভরা মার্শাল ল’র যুগ। হয়তো সরকার চেয়েছিল এ নিয়ে যেন আর ঘাঁটাঘাটি না হয়। হুজুরের দল ন্যাপের নেতারা তখন জিয়াউর রহমানের সাথে যোগ দিয়ে মন্ত্রী এমপি হবার ছক কষছেন। তারাও হয়তো সরকারকে এ নিয়ে বিব্রত করতে চান নাই। ফলে হুজুরের মৃত্যুরহস্য উদ্ঘাটনের তদন্ত কমিটি ওভাবেই পড়ে থাকলো। মওলানা ভাসানীর মৃত্যু- রহস্যাবৃতই রয়ে রইলো!
ছবি পরিচিতি: আওয়ামী দু:শাষনের প্রতিবাদ এবং বিভিন্ন দাবী দাওয়া আদায়ের লক্ষ্যে মাওলানা ভাসানী ১৯৭৩ সালের ১৫ই মে থেকে আমরন অনশনে যান। বয়স তখন তার ৯০। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দের অনুরোধে আট দিন পর ২২শে মে তিনি অনশন ভঙ্গ করেন। অনশনস্থল ছিল মতিঝিল ন্যাপ কার্যালয়। এই সময়কালেই শুয়ে থাকা অবস্থায় হুজুরের এই ছবিটি তোলা।
সাঈদ তারেক , লেখক, সাংবাদিক ।

