বৈষম্যের দেয়ালঘেরা শ্রমিকজীবন

আকস্মিক বন্যা আর ঘূর্ণিঝড়ের মতো মাঝে মাঝেই মানুষের ফুঁসে ওঠার দেশ, বাংলাদেশ। রাজনৈতিক দাবিতে গড়ে ওঠা আন্দোলনের দেশ, গণ-অভ্যুত্থানের দেশ। এই ভূখণ্ডেই ভাষা আন্দোলন, শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৯-এর অভ্যুত্থান এবং ১৯৯০-এর অভ্যুত্থান। এ ছাড়া ১৯৯২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে গণ-আদালত এবং ২০১৩ সালে গণজাগরণ মঞ্চের মতো বিপুল জনতার অংশগ্রহণমূলক আন্দোলন হয়েছিল। এদের মধ্যে সবচেয়ে বড় যুগান্তকারী ঘটনা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ। সমাজ এগিয়ে যায় কিন্তু লাখ-কোটি মানুষের অংশগ্রহণে গড়া আন্দোলনের ফলে সেই প্রভাব সমাজ থেকে হারিয়ে যায় না। বারবার সংকটে পড়লে দেশের মানুষ এসব আন্দোলন থেকে প্রেরণা নেয়, শক্তি পায়। এবারের আন্দোলন এত তীব্র হওয়ার পেছনে আওয়ামী লীগের অত্যাচার, অহমিকা ও অপমান করার বিরুদ্ধে ক্ষোভ যেমন কাজ করেছে, অতীত আন্দোলনের শিক্ষাও তেমনি ভূমিকা পালন করেছে। অতীতের গণ-অভ্যুত্থানে আইয়ুব খান ১০ বছরের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারেনি, এরশাদ ৯ বছরের মধ্যে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। ২০১৪ সালের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পর আওয়ামী লীগও ১০ বছরের বেশি থাকতে পারেনি। গণ-আন্দোলনের চাপে তাদের পদত্যাগ ও দেশত্যাগ করতে হয়েছে।

প্রায় এক হাজারের মতো মানুষের মৃত্যু, চার শতাধিক মানুষের চোখ হারানো, হাজার হাজার আহত হওয়ার ঘটনা স্বাধীনতার আগে ও পরে কোনো আন্দোলনে দেখেনি বাংলাদেশের মানুষ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সহিংস কায়দায় দমন করতে গিয়ে এবং আন্দোলনকালীন সহিংসতায় এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে। ১৬ জুলাই থেকে ৩ আগস্ট পর্যন্ত নিহত হয়েছে ৩৪১ জন এবং ৪ আগস্ট থেকে ২৩ আগস্ট পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে ৪১৬ জন। এর মধ্যে ঢাকায় মৃত্যু হয়েছে ৩৭২ জনের এবং ঢাকার বাইরে মৃত্যুবরণ করেছে ৩৮৫ জন। নিহতদের মধ্যে শিক্ষার্থী ৯১ জন, নারী শিশু ৯৩ জন। বাকিদের মধ্যে রাজনৈতিক দলের কিছু নেতাকর্মী ছাড়া সবাই শ্রমজীবী। শিশুদের মধ্যে বেশিরভাগই শ্রমজীবী শিশু বা শিশুশ্রমিক। শ্রমজীবীদের মধ্যে যারা মৃত্যুবরণ করেছে তারা প্রায় সবাই অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের শ্রমিক। হকার, দোকান কর্মচারী, পরিবহন শ্রমিক, রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, গার্মেন্টস শ্রমিকসহ দরিদ্র শ্রমজীবীরাই জীবন দিয়েছে। আহত হয়েছে তারাই বেশি। অর্থনৈতিক বঞ্চনা তাদের বিক্ষোভের পথে টেনে এনেছে। আওয়ামী লীগের ১৫ বছরের শাসনকাল বহুদিন আলোচনার বিষয় হয়ে থাকবে। কেন তারা ২০০৮ সালে এক ভূমিধস বিজয়ে ক্ষমতায় এসে ২০২৪ সালে গণরোষে দেশত্যাগ করে আত্মরক্ষা করতে বাধ্য হলো? এ সময়কালে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নয়ন, নানা চোখ ধাঁধানো মেগা প্রকল্প সত্ত্বেও শ্রমজীবীদের বঞ্চনা চাপা দেওয়া যায়নি। বরং তা প্রকট হয়েছে দিনে দিনে। দ্রব্যমূল্যের লাগামছাড়া ঊর্ধ্বগতি আর স্বল্প মজুরি শ্রমজীবীদের জীবনে নাভিশ্বাস এনে দিয়েছে। বৈষম্য মাপার সূচক গিনি সহগ, পালমা মেথড সব বিচারেই বৈষম্য চরমে উঠেছে। আর ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মুখে দেশ ইউরোপ হয়ে যাওয়া, শ্রমিকরা আগের চেয়ে ভালো আছে এসব কথা শুনে সংসার চালাতে হাঁসফাঁস করা শ্রমজীবীরা ভেতরে ভেতরে ফুঁসে উঠেছে। এর সঙ্গে দেখেছে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের বিপুল সম্পদ ও বিলাসী জীবন। নিজেদের জীবনের সঙ্গে এর কোনো মিল না দেখে বিক্ষোভ তীব্র রূপ নিয়েছে সাধারণ মানুষের মনে।

শ্রমজীবীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ এই আন্দোলনের একটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক। একদিকে নিজেদের জীবনের বঞ্চনা, অন্যদিকে ছাত্র আন্দোলনের ওপর নির্মম আক্রমণ শ্রমিকদের প্রভাবিত করেছে। অসংগঠিত শ্রমিকদের প্রতিদিনের পুলিশি হয়রানি, ক্ষমতাসীন দলের চাঁদাবাজি, বস্তিতে নির্যাতন-নিপীড়ন তাদের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম দিয়েছে, কিন্তু প্রতিকারের পথ পায়নি। ১৯২৩ সালে মজুরি আন্দোলন করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে ৪ জন শ্রমিক জীবন দিয়েও তাদের প্রত্যাশিত মজুরি পায়নি। বরং হাজার হাজার শ্রমিকের নামে মামলা হয়েছে, শত শত শ্রমিক চাকরি হারিয়েছে, আহত হয়েছে অনেক। ছাত্র আন্দোলন তাদের রাস্তায় নেমে ক্ষোভ প্রকাশের পথ করে দিয়েছে। এই আন্দোলনে রিকশাচালক, সিএনজিচালক, টেম্পো শ্রমিক, পরিবহন শ্রমিক, রাস্তায় পণ্য বিক্রেতা, হকার বেশি অংশ নিয়েছিল। কারণ সরকার তাদের চাকরি দেয়নি, তারা নিজেরা নিজেদের কাজ খুঁজে নিয়েছে কিন্তু পুলিশ ও সরকারি দলের চাঁদাবাজরা তাদের কষ্টের রোজগারে ভাগ বসাত। দেশের শ্রমজীবীদের ৮৫ শতাংশের বেশি অসংগঠিত খাতের শ্রমিক। যাদের চাকরি বা কাজের কোনো নিশ্চয়তা নেই, মাসিক মজুরি নেই, তারা জীবনের কোনো ভবিষ্যৎ দেখে না, কাজ নেই তো মজুরি নেই বা হাত চললে ভাত জোটে এমন অবস্থা। একটা জরিপে দেখা যায়, দেশে ৪ শতাধিক ধরনের কাজ আছে। কাগজ কুড়ানো থেকে প্লেন চালানো পর্যন্ত সমস্ত কাজেই নিয়োজিত আছে শ্রমশক্তি। সমাজে প্রয়োজন আছে কিন্তু সব শ্রমের আইনি স্বীকৃতি নেই । দু-একটা দৃষ্টান্ত দিলে বিষয়টা স্পষ্ট হবে। দেশে গৃহকর্মী আছে ২০ লাখেরও বেশি কিন্তু গৃহকর্মীদের শ্রম আইনে স্বীকৃতি নেই, ট্রেড ইউনিয়ন করার আইনগত অধিকার নেই । তেমনি ১৫ লাখের বেশি প্রাইভেট গাড়ি চালক আছে, বিআরটিএ থেকে তাদের পরীক্ষা নেওয়ার পর হালকা যানবাহনের চালক হিসেবে লাইসেন্স দেওয়া হয়। কিন্তু শ্রম আইনে তাদের স্বীকৃতি নেই । বিবিএসের রিপোর্টে দেখা যাচ্ছে, দেশে ৩৫ লাখের বেশি শিশু শ্রমে নিয়োজিত। এরা সবাই দরিদ্র পরিবারের সন্তান। দেশের অর্থনীতিতে তাদের শ্রমের ভূমিকা আছে কিন্তু অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুফল তাদের জীবনে নেই। নারী শ্রমিক দেশের সর্বত্র। মাটি কাটা, ইট ভাঙা, নির্মাণ শ্রমিকের মতো হাড়ভাঙ্গা পরিশ্রম করছে নারীরা। কিন্তু মজুরি বৈষম্যের শিকার তারা পদে পদে। এ ধরনের নানা বৈষম্য ও বঞ্চনার প্রতিকার পাবে, এটাই তো ছিল প্রত্যাশা। গণ-অভ্যুত্থান হলো, নতুন সরকার এখন ক্ষমতায়, শ্রমিকদের কথা মনে থাকবে তো তাদের?

শ্রম আইনের শুরুতেই বলা হয়েছে, এই শ্রম আইন সমগ্র বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য। কিন্তু ইপিজেড ও স্পেশাল ইকনোমিক জোনে এই আইন কার্যকর নয়। বলা হয়েছে, সব শ্রমিক এই আইনের আওতায় আসবে, কিন্তু আইনের প্রথমেই কোন কোন শ্রমিক শ্রম আইনের সুরক্ষা পাবে না তা উল্লেখ করা হয়েছে। এদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে, গৃহকর্মী ও হালকা যানবাহনের চালক। শ্রম আইনে আছে, নিয়োগপত্র-পরিচয়পত্র ছাড়া কাজে নিয়োগ করা যাবে না। কিন্তু ৭০ লাখ পরিবহন শ্রমিক নিয়োগপত্র পাচ্ছে না যুগের পর যুগ। মালিকদের লে-অফ করার অধিকার আছে, ছাঁটাই করার অধিকার আছে, অসদাচরণের অভিযোগ তুলে চাকরি থেকে ছাঁটাই এবং পাওনা থেকে বঞ্চিত করার পথ খোলা রাখা হয়েছে। কর্মঘণ্টা বাড়ানোর সুযোগ রেখে অতিরিক্ত সময় খাটানোর সুযোগ রাখা হয়েছে। কিন্তু শ্রমিকদের অধিকার পদে পদে সংকুচিত করা হয়েছে এই আইনে। ট্রেড ইউনিয়ন হলো শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংস্থা। ট্রেড ইউনিয়ন গঠন প্রক্রিয়া একদিকে জটিল, অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন রক্ষা করাও কঠিন করে তোলা হয়েছে। দেশের ৭ কোটি ৩৬ লাখ শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ৩২ লাখ শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়নের সদস্য। এ থেকে বোঝা যায় ট্রেড ইউনিয়ন করা এবং টিকিয়ে রাখা কত কঠিন। শ্রমিকদের জীবনে সংকট আছে কিন্তু সংগঠিত হওয়ার অধিকার ও আন্দোলনের সংস্থা সংখ্যায় কম ও শক্তি দুর্বল। ফলে মজুরি ও অধিকারের প্রশ্নে দরকষাকষি করার ক্ষমতাও কম। তাই আন্দোলন কারখানায় না করে রাস্তায় নেমে আসে শ্রমিকরা। দ্রব্যমূল্য, বাড়ি ভাড়া, বিদ্যুৎ পানির দাম, বাস ভাড়া দফায় দফায় বাড়লেও শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণের জন্য ৫ বছর পর মজুরি বোর্ড গঠনের আইন করা হয়েছে। ফলে বাজার দর, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধি কখনই তাল মেলাতে পারে না। প্রকৃত অর্থে শ্রমিকরা মজুরি হারায়। ফলে রেশন দরে খাদ্যসামগ্রী প্রদান, ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে জাতীয় ন্যূনতম মজুরি বোর্ড গঠন ও ট্রেড ইউনিয়ন করার দাবি গুরুত্বের সঙ্গে ভাবতে হবে।

কর্মক্ষেত্রে মৃত্যুর বেদনাময় স্মৃতি আছে কিন্তু দায়ীদের শাস্তির দৃষ্টান্ত নেই। রানা প্লাজা, তাজরিন, টাম্পাকো, বিএম কন্টেইনার, সেজান জুস এই নামগুলো খুবই পরিচিত। এই পরিচিতি কিন্তু উৎপাদনের জন্য নয় বরং শ্রমিক নিহত হওয়ার জন্য। এর আগে স্পেকট্রাম, কেডিএসসহ অনেক কারখানার নাম উল্লেখ করা যাবে যেখানে আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে শ্রমিকের মৃত্যু ঘটেছে। এসব মৃত্যুকে কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড বলা হলেও দায়ীদের শাস্তি হয়নি। কর্মক্ষেত্রে শ্রমিকের মৃত্যু হলে ক্ষতিপূরণ মাত্র ২ লাখ টাকা। আহত হয়ে চিরস্থায়ী পঙ্গু হলে ক্ষতিপূরণ আড়াই লাখ টাকা। ফলে ক্ষতিপূরণ নির্ধারণের মানদণ্ড তৈরি এবং আইএলও কনভেনশন অনুযায়ী আজীবন আয়ের সমান ক্ষতিপূরণ, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের দাবি করেছে শ্রমিকরা। যৌবনে শ্রম দিয়ে বৃদ্ধ বয়সে অসহায় হয়ে পড়া শ্রমিকদের জন্য পেনশনের দাবি বিবেচনায় নিতে হবে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার ভাণ্ডার পূর্ণ হয়ে উঠে প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দ্বারা। কিন্তু সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে বিপুল অর্থ ব্যয় করে বিদেশে যেতে বাধ্য হয়। বিদেশে হয়রানি ও দেশে বিড়ম্বনা তাদের নিত্যদিনের ঘটনা। এর অবসান কি হবে না?

শ্রমিকের জীবন যেন বৈষম্যের দেয়াল ঘেরা। আইনে বৈষম্য, মজুরিতে বৈষম্য, নারী-পুরুষ শ্রমিকের বৈষম্য, অধিকারে বৈষম্য শ্রমিকদের জীবনে প্রভাব ফেলে। তারা খাদ্য, পুষ্টি, শিক্ষা, চিকিৎসার অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়। এর প্রভাব পড়ে তাদের পরবর্তী প্রজন্মের ওপরও। মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, জিডিপি বৃদ্ধি, রপ্তানি আয় বৃদ্ধি, রেমিট্যান্স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে শ্রমিকের জীবনমানটাও যেন বৃদ্ধি পায় সে পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্তর্বর্তী সরকার সব করতে পারবে না সেটা সবাই জানে। কিন্তু বৈষম্য দূর করার পথে যেন হাঁটতে শুরু করে, উপেক্ষিত যেন না হয় সেটাই শ্রমজীবীদের প্রত্যাশা।

রাজেকুজ্জামান রতন

রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.