হিসেবটা শক্তিতে নয় বন্ধুত্বের ভারসাম্যতে

জলের শ্যাওলা- “সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়” (Friendship with all, enmity with none) স্বাধীনতা অর্জনের পর বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রণীত এই নীতি অনুসরণ করে এসেছে। পাশাপাশি বাংলাদেশ নিজেকে সুরক্ষিত রাখার জন্য শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির সঙ্গে ‘ব্যালেন্স অব পাওয়ার’ (Balance of Power) শক্তির ভারসাম্য
নীতিও অনুসরণ করে আসছে। বলাই বাহুল্য যুদ্ধে ধ্বংসাত্মক নতুন রাষ্ট্রের এমন নীতি গ্রহণ সার্বিক অর্থেই ছিল শতভাগ সঠিক ও বাঞ্ছনীয়।

দেশ যখন ক্রিকেট জ্বরে ভুগছে এবং পাশাপাশি ইউরোপ ও ল্যাটিন আমেরিকার কোপাকাপ ফুটবলও বেশ রমরমা চলছে, তেমন সময়ে নিশ্চয়ই পূর্ব তালিকা অনুযায়ী তবে কাকতালীয় গত ২২ জুন আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ভারত সফরে একটি চুক্তি বা সমঝোতা স্বারকে স্বাক্ষর করে এসেছেন। যদিও আমাদের সংবিধানের আলোকে রাষ্ট্রের যে কোন চুক্তির বিষয়ে সংসদে তুলে ধরার কথা এবং সংসদের বিনিময়ে রাষ্ট্রের জনগণকে তা অবহিত করার বিধান রয়েছে এবং রাষ্ট্র সেটা করতে বাধ্য। তবে যেহেতু আমাদের সংসদ নিয়েই বড় রকমের প্রশ্ন রয়েছে, তাই বলাই বাহুল্য জনগণ সেই সংসদ থেকে কতটুকু আর আশা করে এবং আরও বলা যায়, আমাদের সংবিধানকে বৃদ্ধা অঙ্গুলি প্রদর্শন বরাবরই আমাদের সংসদে হয়ে আসে। অবশ্যই প্রশ্ন তোলা যায়, যে সংসদ নিয়েই প্রশ্ন তোলা সুযোগ থাকে, সেই সরকারের কতটুকু অধিকার থাকে রাষ্ট্র ট্যু রাষ্ট্র চুক্তি বা সমঝোতা করার অথবা দেশ পরিচালনার? আজকের এই লেখা সেটা আলোচনার বিষয় নয় তবে এটাও সত্য কাগজে কলমে দেশে একটি বৈধ সরকার বহাল আছে।

“চুক্তি ও সমঝোতা ” শব্দ দুইটির অর্থ কাছাকাছি মনে হলেও বাস্তবিক অর্থে শব্দ দুইটির মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়েছে । ইংরেজি শব্দভাণ্ডারে চুক্তি শব্দটির প্রতিশব্দ , agreement বা contract সাধারণত আমাদের দেশের পত্র পত্রিকায় Agreement শব্দটিই বহুল প্রচলিত। অপরপক্ষে, সমঝোতা স্মারকের ইংরেজি প্রতিশব্দ Memorandum of Understanding, যার সংক্ষিপ্ত রূপ বলতে বুঝায় MoU. “চুক্তি’ বা ‘সমঝোতা স্বাক্ষর’ করার পূর্বে একটি শর্ত বরাবরই প্রতিপাদ্য হয় যে, স্বাক্ষরকারী উভয় পক্ষকে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন হতে হবে। অর্থাৎ স্বাক্ষরকারী নিজ স্বার্থ সম্পর্কে শতভাগ সচেষ্ট থাকাকেই সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন বলে বুঝানো হয়ে থাকে। ‘চুক্তি’ ও ‘সমঝোতা’ স্মারকের মধ্যে মৌলিক একটি পার্থক্য আছে। মৌলিক পার্থক্যটি হলো, চুক্তি ভঙ্গের ক্ষেত্রে ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষ প্রতিকার প্রার্থনা করে আদালতে (এখানে কেবলমাত্র রাষ্ট্র ট্যু রাষ্ট্র চুক্তির কথা বলছি) মামলা করতে পারে। কিন্তু সমঝোতার ক্ষেত্রে সে ধরনের মামলা দায়েরের কোনো সুযোগ নেই। মোদ্দা কথা, যার আইনগত ভিত্তি আছে সেটাই চুক্তি এবং যার আইন গত কোন ভিত্তি নেই সেটা সমঝোতা ।

তবে হ্যা, সমঝোতা স্মারক আইনগতভাবে বাধ্যমূলক না হলেও কিন্তু সমঝোতায় আন্তরিকতার মাত্রা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ইঙ্গিতবহন করে। এমনকি বলা যায় (রাষ্ট্র ট্যু রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে), সমঝোতা স্মারক আইনসঙ্গত চুক্তির প্রথম পদক্ষেপ। বাংলাদেশ সংবিধানের ১৪৫ এবং ১৪৫ক নং অনুচ্ছেদে চুক্তি সম্পর্কে স্পষ্ট করে সব উল্লেখ করা আছে (এখানে সেটা আর উল্লেখ করছি না)। “চুক্তি এবং সমঝোতা” শব্দ দুইটির মৌলিক পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও বলা যায় চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক একটি অপরটির পরিপূরক।

কেন আমি চুক্তি ও সমঝোতার কথা উল্লেখ করছি। লক্ষ্য করুন ‘চুক্তি ও সমঝোতা’ একে অপরের পরিপূরক এবং স্পষ্টতই উল্লেখ আছে স্বাক্ষরকারী দুই পক্ষকেই স্বার্থের বিষয়ে সচেতন থাকা এবং সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন থাকা।

ভারতকে ট্রানজিট সুবিধা দেওয়া বাংলাদেশের জন্য একেবারে নতুন কোন বিষয়, তা কিন্ত মোটেও নয়। একটু পিছনে ফিরে দেখলে কি দেখতে পাই ?

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে প্রথমবারের মতো “অভ্যন্তরীণ নৌ-ট্রানজিট ও বাণিজ্য” প্রটোকল স্বাক্ষর হয়েছিলো বলে নথিপত্র ঘেঁটে পাওয়া যায়। এরপর স্থলপথে ট্রানজিট সুবিধা পেতে ২০১০ সালে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি চুক্তি (লক্ষ্যণীয যে চুক্তি) সম্পন্ন করে ভারত। ২০১৮ সালে দুই দেশের মধ্যে আরেকটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়, যার মাধ্যমে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্রবন্দর ব্যবহার করে সড়কপথে ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলোতে পণ্য পরিবহনেরও অনুমতি পায় ভারত। আরও লক্ষ্যণীয় যে, বর্তমানে পাঁচটি রুটে বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে তিনটি যাত্রীবাহী ইন্টারচেঞ্জ, বাকি দুটি পণ্যবাহী। গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় (পার্থক্যটি এখানে লিখছি না) বর্তমান পদ্ধতিতে ট্রেন সীমান্তে আসার পর বাংলাদেশি ইঞ্জিনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে আসে এবং পার হয় অর্থাৎ বাংলাদেশে ভূমিতে বাংলাদেশি চালকরাই তা চালিয়ে আনেন। ফেরার সময়েও একই রকম পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।

২২ জুন প্রধানমন্ত্রীদের স্বাক্ষরিত সমঝোতাতে মূলত কি কি উপসর্গ উল্লেখ করা আছে? এখানে একটি সমস্যার কথা তুলে ধরতেই হয়। সমস্যাটি হলো, মূল সমঝোতায় সত্যিই কি কি উপসর্গ, সুযোগ- সুবিধা বা স্বার্থরক্ষা উল্লেখ আছে বা কিভাবে স্বার্থরক্ষা হবে? সেগুলো উল্লেখ থাকলেও (ধারণা করছি উল্লেখ আছে) তথ্যপ্রবাহের অভাবের কারণে সত্যিই সত্য জানা বেশ মুশকিলই বটে। হ্যা দেশের জাতীয় গণমাধ্যমে বহু খবর প্রকাশিত হয়েছে, বহু বিশেষজ্ঞদের মতামত বা ভাষ্য এসেছে, বহুজনে অভিজ্ঞতার আলোকে বহুকিছুই লিখেছেন বটে তবে কোনভাবেই সমঝোতার মৃল উপসর্গগুলো মোটেও সামনে আসেনি। বহু ঘাটাঘাটি করে যা দেখেছি বেশিরভাগই পুরানো চুক্তিতে কি ছিল এবং কি হওয়া উচিত বা কিভাবে স্বার্থ রক্ষার সুযোগ গ্রহণ করা উচিত? ইত্যাদি ইত্যাদি সেগুলোই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে।

এখানে আরও উল্লেখ্য যে, ভারতের মতন বৃহৎ ও শক্তিশালী প্রতিবেশীর সাথে, যারা বরাবরই বড় ভাই বা দাদা স্বরূপ আচরণে লিপ্ত, তাদের কাছ থেকে কিভাবে আপন স্বার্থ হাসিল করা সম্ভব, সে বিষয়ে কারও কোন বিশ্লেষণ নেই এবং আমি সন্দিহান আদৌ অবগত আছেন কিনা, সত্যিই পথ কি ? হতে পারে কেউ কেউ হয়তো উল্লেখ করেছেন তবে আমার নজরে আসেনি। এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করতেই হয় (অবশ্যই আপন মত) আমাদের দেশের আমলা- বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে রাজনীতিবিদ সহ প্রায় সবাই, বা সবাই, আন্তর্জাতিকভাবে দেশের স্বার্থ রক্ষা নিয়ে স্পষ্ট মতামত দিতে সক্ষম হন না। ভাল করে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, সবাই আমাদের দেশের অর্থনৈতিক- রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে বেশ অবগত থাকেন এবং দূর্বলতা সম্পর্কেও বেশ অবগত তবে মতামত বা কার্যক্রমে বৈদেশের প্রতিই বেশি ঝুঁকে কথা বলেন। অপরদিকে কিছু কিছু ব্যক্তিত্ব অবশ্যই আছেন যারা বৈদেশের তোয়াক্কা মোটেও করেন না তবে তাদের বচনে একপ্রকার গোঁয়ার্তুমি (দুঃখিত এমন শব্দটিই ব্যবহার করতে হলো) ছাড়া ভিন্ন কিছু পাওয়া মুশকিল।

আসলে নতুন সমঝোতা বা চুক্তিতে (চুক্তি না সমঝোতা? সেটাই পরিষ্কার তথ্য নেই) মূলত কি আছে ? যতটুকু তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, নতুন যে সমঝোতা হয়েছে, সেটির আওতায় ভারতের মালবাহী ট্রেন পশ্চিমবঙ্গের গেদে সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের চুয়াডাঙ্গায় প্রবেশ করবে বলে জানা যাচ্ছে। এখানে আবার উল্লেখ করতেই হয়, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের নতুন স্বাক্ষরিত ট্রানজিট চুক্তিটির বিষয়ে দুই দেশের সরকারের পক্ষ থেকে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ না করায় লাভ-ক্ষতির বিষয়টি এখনও পুরোপুরি স্পষ্ট হওয়া যাচ্ছে না।

প্রশ্ন থেকে যায়, এখন অবধি প্রকাশিত তথ্য এবং ট্রানজিটের অতীত অভিজ্ঞতা থেকে বাংলাদেশের লাভের বিষয়ে খুব একটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ আছে কি? এ যাবৎ যা অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জনগণ পেয়েছে, সেই সূত্রে বলাই যায় যে, নতুন এই চুক্তির বিনিময়ে বাংলাদেশ তেমন কিছু পাবে বলে আশা করাও কঠিন।

একটু লক্ষ্য করুন, ২০১০ সালে একটি ট্রানজিট চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছিল। সেই সময়ে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করেই বলা হয়েছিলো যে, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ আর্থিকভাবে বেশ লাভবান হবে। মূলত, পণ্য পরিবহনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে টন প্রতি হিসেবে ভারত একটি ট্রানজিট ফি বা মাশুল দিয়ে থাকে। কোন এক সময়ে দেশের স্থানীয় জাতীয় পত্রিকার খবরে পড়েছিলাম, সব মিলিয়ে প্রতি টনে বাংলাদেশ মাশুল পায় মাত্র তিনশ টাকার মতো। তবে লক্ষ্যণীয় যে, সেই সময়ে সরকার থেকে বড় জোর গলায় বলা হয়েছিল (সেই সময়ের পত্রিকাগুলোতে সরকারের মন্ত্রীমহাদয়দের বচন ঘেঁটে দেখতে পারেন), “বছরে প্রায় পাঁচশ মিলিয়ন ডলারের মতো লাভ হবে”। প্রশ্ন হলো সত্যিই তেমন কিছু ঘটেছে কি ? উত্তরটি সরসরি বলা যায়, না। আমি কি তথ্যের ভিত্তিতে উত্তর ‘না’ বলছি ? এখানে একটু মনস্তাত্ত্বিকভাবে ভাবুন তাহলেই কেন উত্তর ‘না’, সেটা মিলে যাবে। যদি মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার আয় হতো তাহলে সেই সব মন্ত্রীমহাদয় সহ সরকার নিজেই উচ্চস্বরে সব প্রমাণ সহ জাতিকে জানিয়ে দিত। আমি জানি না, এমন কোন উচ্চস্বর দেশের জনগণ শুনেছেন কিনা ?

আসুন একটু সম্ভাবনার কথা ভাববো। এই সম্ভাবনার কথা বলার পূর্বে একটি কথা স্পষ্ট করে বলতেই হয়। বিশ্ব দিনে দিনে ছোটো হয়ে আসছে। বিশ্বের এক দেশ অপর দেশের উপর দিনে দিনে নির্ভরশীল হচ্ছে। এই নির্ভরশীলতার ব্যাতিরেকে সহজভাবে কোন দেশের একক পথে চলাটা বেশ মুশকিলই বটে। এমন উদহারণ এই বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডে এখনও আছে। উত্তর কোরিয়া তার একটি উদহারণ বটে। ইউরোপে বসবাসের সুবাদে ইউরোপকেই উদহারণ হিসেবে বলছি। ইউরোপ একটি মহাদেশ অথচ নিজেদের সুবিধার ভাবনা থেকে (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ক্ষতির পরে এই ভাবনা কাজ করে) এই মহাদেশটি এখন ধীরে ধীরে একটি দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং কতদূর এগিয়েছে? তা না বললেও সবার নিশ্চয়ই জানা আছে বিষয়টি।

বর্তমানে ইউরোপের একটি দেশের সাথে অন্য দেশের বর্ডার থাকলেও নেই পাহারা বা তারেরবন্ধন। নেই কোন বর্ডার পুলিশ বা আলাদা চাপ। কাজটি অবশ্যই সহজ ছিল না তবে ঘটেছে। কিভাবে এবং কেন ? নিশ্চয়ই অনেকের জানা আছে বিষয়টি তবে আজকে সেই আলোচনা নয়। ইউরোপের দেশগুলো একে অপরের সাথে হাত বাড়িয়েছে সমান্তরালে এবং বড় দেশগুলোর হাত বেশ প্রশস্ত ছিল, যা স্বাভাবিকও বটে। এখন সবাই সেটার সুফল পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতে আরও পাবে। উদহারণটি দেবার করণ বেশ সহজ। বিশ্ব এখন একে অপরের সাথে বন্ধুত্বের বন্ধনে এগুচ্ছে নিজেদের স্বার্থেই। আমি বেশ অবগত আছি যে, ইউরোপের উদহারণটি বাংলাদেশ- ভারত বা এশিয়ার দেশগুলোর পক্ষে সহজভাবে গ্রহণযোগ্যতা পাবে না, নানাবিধ কারণেই। তাছাড়াও এশিয়ার বড় দেশগুলোর হাত মোটেও প্রশস্ত নয়। তবে মূল সমস্যাটি হলো আমাদের এশিয়া অঞ্চলের রাষ্ট্রগুলোর সরকারের যে মানসিকতা এবং এই মানসিকতা নির্ভর করে আবার সঠিক ও শতভাগ গণতন্ত্রের উপর। তাই বলাই যায এশিয়ার অঞ্চলের দেশগুলোতে গোড়াতেই গণ্ডগোল পাকানো।

সম্ভাবনা তাহলে কি হতে পারে ? অতীতে না পারলেও নতুন চুক্তি বা সমঝোতার মাধ্যমে মাশুলের হার বাড়ানোর একটি সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে মনে করি। সেটা কিভাবে ? সেটা হতে পারে একটি “বেনিফিট শেয়ারিংয় ফর্মুলায়”। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য আনা-নেওয়ার সুযোগের ফলে আগের তুলনায় ভারতের পণ্য পরিবহন ব্যয় অনেক কমে আসবে। কাজেই তাদের যত টাকা সাশ্রয় হচ্ছে, সেটি বিবেচনায় নিয়ে একটি বেনিফিট শেয়ারিংয় ফর্মুলায় বাংলাদেশকে দর কষাকষি অবশ্যই করা উচিত বলে মনে করি।

এখানে উল্লেখ করতে হয়, এই সরকারের এক সময়কার উপদেষ্টা (বর্তমানেও আছেন কিনা? জানি না) মশিউর রহমানের সেই, “ভদ্রতা” সূত্র (নিশ্চয়ই সবার জানা আছে সেই ভদ্রতা সূত্রের কথা) শতভাগ পরিত্যাগ করেই এগিয়ে যাওয়া উচিত। সরকার কোন পথে হাঁটবে ? তথ্যসূত্রের অভাবে সেটা বলা সত্যিই বেশ মুশকিল। তবে স্মরণে রাখা উচিত যে, রাষ্ট্র ট্যু রাষ্ট্র চুক্তি বা সমঝোতা একক বা ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এটা জাতিগত বিষয়। জাতির স্বার্থ জড়িত। কেন কথাগুলো বলছি ? স্মরণে আছে নিশ্চয়ই, এই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীই বিগত দিনে ভারত গিয়েছিলেন তিস্তার সমাধান করতে। উল্টো আমাদের তিস্তার সমাধানের বিপরীতে, ফেনি নদীর পানি দিয়ে এসেছিলেন, মানবিকতার সূত্রে। আমরা ছোটো ও ভাটির দেশ হয়েও মানবিক এটা অবশ্যই ভাল তবে আমাদেরও জল লাগে যে। প্রশ্ন থেকেই যায়, আমাদের প্রতি ভারত কতটা মানবিক ?

এমনকি মোদী সরকার নিজেই আমাদের দেশে এসেও কত প্রতিজ্ঞা করে ফিরে গেছেন। তিস্তার চুক্তি কেবলমাত্র সময়ে ব্যপার ছিল। অথচ তখন তিস্তা চুক্তি দূরের কথা, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার যে অঙ্গরাজ্যর সাথে চুক্তি করিয়ে দেবে, সেই পশ্চিমবঙ্গের আমাদের মমতা বাবুর বুকে সেই দয়া খেলেনি এবং তিনি তখন মোদীর সাথে সফরসঙ্গীই হননি। তিস্তা তার আগের তিস্তাতেই ঘুরপাক খাচ্ছে অথচ আমরা দেশের বুক চিরে রেল পারাপার করছি। এখানে আবারও উল্লেখ করতেই হয়, যোগাযোগ লাগবেই, সংযুক্ত হতেই হবে, সংযোগ হবার সাথেই দেশের অর্থনৈতিক সংযোগ বাড়বে। পুরানো নৌ- স্থল বা রেল চুক্তিতে কতটুকু বাংলাদেশ পেয়েছে? এই হিসেব কষলে ভারতের লজ্জা হবার কথা। জেনে- বুঝেও পুরানো লাভ- লোকসান হিসেব পাশ কাটিয়েই বলছি, যদি শুধুমাত্র রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলে চুক্তি হয়ে থাকে (সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না) বা বারবার ভারতকে বিশ্বাসে করে হয়ে থাকে বা কেবলমাত্র আশায় আশায় কোন চুক্তি হয়ে থাকে (আমরা মূল চুক্তির কিছুই জানি না যে), তাহলে সেটা হবে এই রাষ্ট্রের জন্য আত্মহত্যার সামিল। আমি অবশ্যই বিশ্বাস রাখতে চাই, তেমন কিছু ঘটেনি।

লেখার শেষে এসে উপদেষ্টা মশিউর রহমানের সেই ‘ভদ্রতা’ সূত্রকে সামনে রেখে একটি জার্মান ভাষার প্রবাদ বলেই শেষ করবো। এই প্রবাদটি শুধুমাত্র ব্যক্তিগত নয়, আন্তর্জাতিকতায়ও সমভাবেই প্রদত্ত হয়।
প্রবাদটি জার্মানি ভাষায়, “Strenge Rechnung machen gute Freundschaften ” ( উচ্চারণ: স্ট্রেনঙ্গে রেখনুন্ঙগ মাক্ট গুতে ফ্রয়েণ্ডসাফ্ট) অর্থাৎ কঠোর হিসাব ভালো বন্ধুত্ব তৈরি করে।

বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.