যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া ও পাওয়ার তরিকা

জলের শ্যাওলা প্রথমেই স্পষ্ট করে বলে নেওয়া ভাল যে, যুক্তরাষ্ট্র আজ অবধি বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের কোথাও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়নি, এটা প্রমাণীত সত্য এবং ভবিষ্যতেও হবেও না। কেন হবে না ? কঠিন প্রশ্ন মনে হলেও উত্তরটি জলের মতন সহজ। কারণ যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থ হাসিল হয়ে গেলেই দূরে সরে যায় বা বলা যায় লাথি মেরে চলে যায় (জানি শব্দটি কঠিন তবে বাস্তবতা এমনটাই)। একটি প্রমাণ কেউ দেখাতে পারবেন না যে, যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের কোন দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনকি একটি উদহারণও কেউ দেখাতে পারবেন না যে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থের বাহিরে কিছু করেছে।

বিশ্বের সব দেশই প্রথমে নিজেদের স্বার্থ আগে দেখে তবে বহু উদাহরণ আছে বিশ্বের বহু দেশ স্বার্থ হাসিল না হলেও মানবিক কারণে হোক বা ভিন্ন কোন কারণে হোক, সেই সকল দেশের উপর খড়গহস্ত হয় না। কিন্ত যুক্তরাষ্ট্র মানবিক কারণেও কখনো ছাড় দেয় নাই এবং ভবিষ্যতেও দেবে না। এর মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তির রূপে নিজেদের তৈরী করতে বিশ্বব্যাপী যুদ্ধ বিগ্রহ বাঁধিয়েই রেখেছে। আরও কঠিনভাবে বললে বলতে হয়, মহাসত্য হলো বিশ্বে যত যুদ্ধ এই অবধি হয়েছে এবং বর্তমানেও চলছে সর্বত্রই যুক্তরাষ্ট্রের হাত সর্বত্রই ছিল এবং আছে। তাহলে সহজ ভাবনায় বলাই যায় যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই।

একটি সহজ প্রশ্ন: বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র কি এতটা তৎপর বাংলাদেশে কখনোই হয়েছিল ? এই উত্তরটিও সহজ এবং উত্তরটি সরাসরি, না। তাহলে প্রশ্ন জাগে, কেন যুক্তরাষ্ট্র হঠাৎই বাংলাদেশে এতটা তৎপর হয়ে উঠলো ? জানি সবাই ভাবছেন এটা আবার কোন কঠিন প্রশ্ন হলো নাকি ? কারণ সবার উত্তর হবে ভূরাজনীতি। হ্যা উত্তর সঠিক এবং স্বাভাবিকও বটে। তবে প্রশ্নটি কেন, ইহা না ভেবে প্রশ্নটি একটু ভিন্নভাবে ভাবুন। প্রশ্নটি করুন, কেন এর সাথে কখন জড়িয়ে। তাহলে আবার উত্তরটি অতটা সহজভাবে মনে আসবে না।

কখন থেকে ? এটা একটু আপন বুঝ থেকে বলার চেষ্টা করবো অতঃপর আপনার ভাবনার সাথে মিলে কিনা ? মিলিয়ে দেখতে পারেন। আমরা আওয়ামী সরকারের শত- হাজার সমালোচনা করি , গালাগাল করি, সবই ঠিক আছে। তবে সমস্যা হলো, আমরা দুইয়ে দুইয়ে চার এর জায়গায় দর্শন ও ক্ষমতাকে একত্রিত করে পাঁচ হিসেব করি, স্রেফ সমালোচনার জন্য। তবে চার ফলাফলটি আমরা যে কোন কারণেই হোক উহ্য রাখি। হোক সেটা রাজনৈতিক দর্শনের কারণে, হোক সেটা ক্ষমতার কারণে, হোক সেটা চুরি- দূর্ণীতির কারণে কিংবা অত্যাচার- নির্যাতন বা অমানবিকতার কারণে বা স্রেফ বিরোধীতার কারণে।

আমার একটি বিষয় বুঝে আসে না, আমরা সবাই একবাক্য উচ্চারণ করি, ‘সমালোচনা হোক গঠনমূলক’ তবে চর্চায় আমরা সত্যিই সেটা করি কি ? নিজেকে একবার প্রশ্নটি করে দেখুনতো, কি উত্তর আসে ? সেটা রাজনীতিবিদ, বুদ্ধিজীবি, সুশীল থেকে শুরু করে সাধারণ জনমানুষ, মূলত কেউ সেই চর্চাটা করি না। আমরা আসলেই জানি না এবং বুঝি না যে, সত্যকে সত্য বলেও, সরকারের ভাল কাজের প্রশংসা করেও (স্মরণে রাখুন সব সরকারই অনেক ভাল কাজ করে, তা না হলে এই বাংলাদেশ এত দূর এগিয়ে যেতো না), সততার ভিত্তিতে সঠিক সমালোচনা করলে, দেশ ও জাতির মঙ্গল হয়। আমাদের মানসিকতা মূলত নেগেটিভ মানসিকতা, সেটা ব্যক্তি জীবনেও অতিমাত্রায় এবং সেটার প্রভাবটা সমালোচনাতেও বেশ পরিলক্ষিত হয়। মানুন আর নাই বা মানুন, আমরা ব্যক্তিজীবনে যেমন পরের ভাল দেখতে পারি না, সহ্য করতে পারি না, হিংসে বহন করি (খুব কম সংখ্যক আছে, যারা এমনটা করেন না), সে কারণেই আমাদের রাজনীতিতেও সেটারই প্রভাব বেশি। ফলাফল দলগুলি বেশি, মাদামারি- কাটাকাটি এবং ষড়যন্ত্রও বেশি কেননা আমাদের দ্বারাই রাজনীতি চলে, আমরাই সেই রাজনীতির অংশ এবং আমাদের সেই মানসিকতার মানুষদের মধ্য থেকেই কেউ না কেউ নেতা হয়ে আমাদের রাজনীতি পরিচালনা করেন। সুতরাং প্রভাব যে আছে, সেটা অস্বীকার করা মানেই আমি/ আপনি অসত্যর সাথে যাচ্ছি।

কখন থেকে ? উত্তরটি লেখার পূর্বে আরও একটি বিষয় বলে নেওয়া ভাল। আপনি জানেন কি, অত্র অঞ্চলে একমাত্র দেশ বাংলাদেশ, যার একটি নির্দিষ্ট মানচিত্র আছে যেখানে ভৌগোলিকভাবে জল ও স্থল দুটো সীমানাই নির্দিষ্ট করা আছে। অর্থাৎ মানচিত্রে সেটা শতভাগ চিহ্নিত করা আছে। যা অত্র অঞ্চলে দেখা পাওয়া ভার। কিভাবে সেটা হলো ?

এই কিভাবে হলো সেটা আমি/ আপনি/ আমরা সবাই জানি তবে ওটা আলোচনায় আনি না কেননা তাহলে সরকারের প্রশংসা চলে আসবেই। সুতরাং যতটা সম্ভব এই মানচিত্রের আলোচনা না করাটাই ভাল। তাহলে সরকারের সমালোচনার সুযোগ বেশি এবং রাজনীতিতেও ফয়দা বেশি। জনগণকেও ধোঁয়াশার মাঝে রাখতে সুবিধে বেশি। জনগণের যত বেশি অজানা থাকবে বা ধোঁয়াশার মাঝে থাকবে ততই রয়েছে রাজনীতিতে নেট লাভ। আমরা জানি এবং প্রতিনিয়তই খবরে পড়েছি এবং বর্তমানেও পড়ি, এই সরকার ভারতের কাছে বিক্রি হয়ে আছে। এই বিক্রির কথাটাই অনেকে সরাসরি বলেন, বেশিরভাগই বিরোধী মতের আবার অনেকে না ধরি মাছ না ছুঁই পানির মতন একটু ঘুরিয়ে প্যাচিয়ে বলে দুই কুল রক্ষা করেন (যাক সেটা উনাদের আপন বিষয়)। বলাই বাহুল্য এই প্রকৃতির বুদ্ধিজীবীরা একটু বেশি ধূর্ত এবং বেশ কৌশলি বটে।

কেন বিক্রির বয়ানটি বলে ? কারণ সত্যি অর্থেই বর্তমান সরকার ভারতকে বহুকিছু দিয়েছে তবে বিনিময়ে কিছুই পায়নি। এটা সত্য এবং জলের মতন পরিষ্কার সত্য। এই সত্যকে বিক্রি বলে বিক্রি করার পূর্বে একটিবারের জন্য বলবে না, এই সরকার দীর্ঘদিনের একটি জমাট বাঁধা মহাসমস্যা, সীমান্ত সমস্যার কঠিন সমাধান করতে পেরেছে। মূলত এই সরকারের লক্ষ্যটি কি ছিল ? বুঝাই যায় যে, যেহেতু আমরা ভারত দ্বারা বেষ্টিত এবং ভারত আমাদের মূলত একমাত্র প্রতিবেশি। ভারত আবার বড় রাষ্ট্র ও বিশ্বে একপ্রকার পরাশক্তির দেশ। এই ভারতের সাথে লড়াই- ঝগড়া করে দেশ স্বাধীন হবার পর থেকে আজ অবধি সীমান্তের কোন সমাধানই আসেনি। সুতরাং বেশি দিয়ে হলেও সমাধান হোক এবং সীমান্তের ঝামেলা চুকে যাক, সেই পথে এই সরকার হেঁটেছে এবং সেই সমাধান কিন্ত এসেছে। আরও বলা যায় বিগত সরকার (বিএনপি/ জামায়াত) ভারতের সেভেন সিস্টার অঞ্চলে যে ঝামেলা বাঁধিয়ে ছিল (১০ ট্রাক অস্ত্রের কথা নিশ্চয়ই স্মরণে আছে), সেটারও সমাধান কিন্ত এই সরকারই করেছে। হ্যা, জানি আমাদের সংবিধান যদিও ভিন্ন কিছু বলে (আজকে সংবিধান আলোচনার বিষয় নয়) তবুও বড় ও একমাত্র প্রতিবেশীর সাথে দেশের সংবিধানের একটি বিশেষ আনুচ্ছেদকে পাশ কাটিয়েই সেটা করা হয়েছে তবে সেটা নিশ্চয়ই দেশের মঙ্গল ভেবেই করা হয়েছ। এটা কি অস্বীকার করার উপায় আছে ?

এবার আরও একটু আগে দেখুন। স্থলসীমান্তের সমাধান হলেও জলসীমান্তের সমাধান আবার ভারতের পাশে মায়ানমারও সাথে জড়িয়ে ছিল। যত কথাই বলুন বা সরকারের সমালোচনা করুন, মহাসত্য হলো এই সরকার আন্তর্জাতিক আদালতে সেই জলসীমার সমাধান করতে সক্ষম হয়েছে এবং আমরা একটি নির্দিষ্ট জলসীমা করতে পেরেছি। যে সমস্যাটি স্রেফ ভারতের সাথে নয়, মায়ানমারের সাথেও ছিল। এই যে সমাধানটি এলো, এটা কি চাট্টিখানি কথা ? সরকারের শত সমালোচনা আছে এবং থাকবে তবে এই স্থল আর জলসীমার কি প্রশংসা হতে পারে না ? মহাসত্য হলো এই দুটো বড় সমস্যার সমাধান কিন্ত এই সরকারই করেছে। ভিন্ন কোন সরকারের দ্বারা সেটা হয়নি। উল্টো জলসীমা নিয়ে কোন কাজই হয়নি এবং স্থলসীমায় সেভেন সিস্টারে ঝামেলা পাকানো হয়েছিল। এই সত্য অস্বীকার করা মানেই আমি/ আপনি/ আমদের বচন অস্ত্র এবং অসত্যের সাথে যাবে। এখানে আরও একটু স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, এই সরকার জটিল দুটি সমস্যার সমাধান করেছে বলেই যা ইচ্ছে বা যেভাবে ইচ্ছে তাই করবে, ভোট- নির্বাচন- গণতন্ত্র নিয়ে ছেলে খেলা খেলবে, এটাকে সমর্থন করা হবে সরাসরি অন্যায়ের সাথে হাঁটা, সেটা কখনোই কাম্য নয় এবং অবশ্যই কঠিন প্রতিবাদ হওয়া উচিও।

এই জলসীমাই হয়েছে বাংলাদেশের জন্য এখন কাল। কারণ এই জলসীমা অত্র অঞ্চলে প্রভাব রাখতে সক্ষম হবে সর্বোচ্চ সুবিধের অঞ্চল হিসেবে। যুক্তরাষ্ট্রের মূল চাওয়া-পাওয়ার অঞ্চল এই জলসীমা, এটা স্পষ্ট। এখানে আরও একটু স্পষ্ট করা ভাল যে, শুধুমাত্র এই জলসীমাই একমাত্র কারণ অবশ্যই নয়। বর্তমান সরকার যেভাবেই হোক আর যে করেই হোক, অত্র অঞ্চলের তিন ডিন্ন প্রভাবশালী দেশের সাথে বেশ জড়িয়ে গেছে। ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোন মাথা ব্যথা মূলত নেই। কেননা ভারতের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্ক বা লেনদেন, আদান- প্রদান বাংলাদেশের জন্মলঘ্ন থেকেই ছিল, আছে এবং থাকবে। তাছাড়াও মূলত ভারত বাংলাদেশের একমাত্র ও বড় প্রতিবেশি এবং সীমানার দিক থেকে চারিদিকেই। বিনা ভারতে বাংলাদেশ বিশ্ব ব্রক্ষ্মাণ্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়া সত্যি অর্থেই মুশকিল।

এখানেও একটি উদহারণ দিলেই পরিষ্কার হবে। পূর্বের বিএনপি- জামায়াত সরকার কিন্ত বেশ চেষ্টা করেছিল বিনা ভারত উত্তরমুখি সম্পর্ক গড়ে তুলতে। স্মরণে আসে কি, সেই সময়ে থাইল্যান্ডের প্রেসিডেন্ট থাকসিন নিজে বিমান নিয়ে উড়ে এসে মাননীয় সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে বাংলাদেশ থেকে উড়িয়ে নিয়ে আন্তর্জাতিক উত্তরমুখি সম্পর্কের একটি প্রভাব দেখিয়েছিল। তবে কঠিন সত্য হলো সেই উত্তরমুখি আন্তর্জাতিক সম্পর্ক অবশেষে ফলাফল হয়েছে শূণ্য। সেখানে আবার ভারতের আঁতে ঘা লেগেছিল। বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর চর্চাটাই এমনটা হয় । হোক সেটা রাশিয়া, চীন বা ভারত বা ভিন্নদেশ। তবে যুক্তরাষ্ট্রের মূল সমস্যা হলো চীন ও রাশিয়া। কেননা বর্তমান সরকার চীন ও রাশিয়ার সাথে বেশ দহরম- মহরম ভাবে চলছে। চীন ও রাশিয়ার সাথে এই দহরম- মহরম আমেরিকার জন্য বড় অ্যালার্জি। চীন রাশিয়ার প্রভাব থেকে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্র দূরে রাখার প্রয়াসেই বা মুক্ত রাখতে বর্তমানে মায়ানমার ছেড়ে বাংলাদেশের উপর পা বাড়িয়ে দিয়েছে বেশি করে। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের বেশ ভাল করেই জানা আছে, অত্র অঞ্চলে বাংলাদেশের জলসীমাই তাদের মূল ভরসাস্থল হয়ে উঠবে।

এইতো গতকাল বরিশালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সিনিয়র রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেনন কি বলেছেন ? ” বাংলাদেশ ঘাঁটি স্থাপনে ব্যর্থ হয়েই শাসক পরিবর্তনে নেমেছে যুক্তরাষ্ট্র “। হ্যা আমরা বলতেই পারি নৌকার মাঝি হয়ে সিনিয়র রাজনীতিবিদ রাশেদ খান মেনন এখন সরকারের পক্ষে ছাফাই গাইছেন। অনেকে ইতিমধ্যেই দালাল বলেও উচ্চারণ করছেন। সবই ঠিক আছে। তবে মেনন সাহেবের বচনের সত্যতা কি প্রমাণ সহ কেউ উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন ? বলছিলাম, আসলেই সরকারের ভিতরে কি ঘটেছে ? সেটাতো আমাদের মোটেও জানা নেই। আমরা চক্ষু বন্ধ করে দর্শন বা রাজনৈতিক কারণে ধুর ধুর করছি তবে আসলেই কি ঘটেছে ? সেটা কিন্ত আমরা আসলেই জানি না, ইহাই কঠিন সত্য । যুক্তরাষ্ট্র যে ঘাঁটি চাইবে বা চাচ্ছে, ইহাতো ছোট্ট শিশুও অনুধাবন করে নিশ্চয়ই।

আচ্ছা ভাবুনতো রাশিয়া কেন হঠাৎই বলে উঠলো,” বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্র (পুরানো ও চর্চিত চাল) আরব বসন্ত ঘটাতে চাইছে। হতে পারে রাশিয়া তাদের স্বার্থের কথা ভেবেই অগ্রীম কিছু বানিয়ে বলছে বা সত্য বলছে আথবা অর্ধসত্য বলছে। রাশিয়ার গোয়েন্দাগিরিওতো বিশ্ব বাজারে কম শক্তিশালী নয়। হয়তোবা জেনেই বলছে ধরেই নিচ্ছি। মোদ্দা কথা হলো বাংলাদেশ এখন জলসীমার কারণেই হয়ে গেছে গরিবের বউ, যা সবার ভাবি। আরব বসন্তের কথা একটু বলতেই হয়। যে সব দেশে আরব বসন্ত ঘটিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র এবং যে সব আত্মার বাণী শুনিয়ে ঘটিয়েছিল, সেই সব দেশে কি সত্যিই কোন গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রমঅধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। উত্তর এক কথায়, না।

লিবিয়ার উদহারণটি বলি, লিবিয়ায় গাদ্দাফি সরকারের আমলে তেলের মূল্য কত ছিল ? উত্তর একপ্রকার বিনা পয়সার। বিদ্যুতের মূল্য কত ছিল ? সেটাও একপ্রকার বিনা পয়সার। মরু অঞ্চল লিবায়ায় দুইশত চার বিলিয়ন ডলার খরচে গাদ্দাফি সরকার বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করেছিল এবং জনগণ সেই পানি পেতো বিনা পয়সায়। নতুন বিবাহ করা জুটির জন্য গাদ্দাফি সরকার লিবিয়ার পঞ্চাশ হাজার ডলার রাষ্ট্রীয় উপহার প্রদান করতো। এই সবই সেই সময়ের পত্রিকায় নিশ্চয়ই সবার পড়া আছে। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র দ্বারা আরব বসন্তের পরে লিবিয়ান জনগণের নিকট জিজ্ঞেসা করুন, এখন কি সেই সব সুবিধে পাচ্ছে? পাচ্ছে কি পঞ্চাশ হাজার ডলার নববিবাহীত জুটি ? উত্তর হবে সব গোল্লায় গেছে।

আচ্ছা ইরাকের দিকে একটু নজর দিলে কি দেখতে পাই ? ইরাকে কি কেমিক্যাল অস্ত্র পাওয়া গিয়েছিল ? উত্তর হলো না এবং যুক্তরাষ্ট্র সরকারের তদন্ত সংস্থার প্রধান নিজেই বিশ্ব মিডিয়ায় প্রকাশ্য বয়ানে বলেছেন (ইরাক যুদ্ধ শেষে), ইরাকে কোনপ্রকার কেমিক্যাল অস্ত্র ছিল না। লক্ষ্যণীয় যে বয়ানটি এসেছিল যুদ্ধ শেষে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের লেখা বইয়েও (বইটির নাম এই মূহূর্তে স্মরণ হচ্ছে না) উল্লেখ আছে ওটা ছিল ভুল তথ্য আমাদের গোয়েন্দা সংস্থার। তবে ফলাফল কি হয়েছে ? ইউরোপের পত্রিকায় (ইউরোপে বহু বিশ্বস্ত পত্রিকা আছে) সেই সময় পড়েছিলাম, যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক যুদ্ধে একুশ বিলিয়ন ডলার খরচ হয়েছিল। আরও পড়েছিলাম, যুক্তরাষ্ট্র ইরাক থেকে মোট ৬৪% মাটির নিচের অপরিশোধীতো তেল প্রথম দফায় নিয়ে গিয়েছিল। যার মোট মূল্য ছিল বাইশ বিলিয়ন ডলার।

আচ্ছা ভাবুনতো, আফগানিস্তানে আমেরিকা কি শুধুমাত্র রাশিয়ানদের ঠেকাতে গিয়েছিল? নাকি তেল পাচারের জন্য পাইপ লাইন ছিল মূল উদ্দেশ্য? কেননা তেলতো আর কাগজের প্যাকেট বা পকেটে করে নেওয়া সম্ভব নয় নিশ্চয়ই? তেল নিতে পাইপ লাইন লাগে যে। মোদ্দা কথা, তেল নেওয়া শেষ, আফগানিস্তান থেকে অপমান হয়ে ফিরে যেতেও যুক্তরাষ্ট্রের কোন লজ্জা হয় নাই। ইহাই যুক্তরাষ্ট্র নয় কি ? (এই আলোচনা বিশাল/ আজকে নয়)। আচ্ছা যুক্তরাষ্ট্র কি ইরাক/ ইরানে সাড়ে নয় বছর যুদ্ধ বাঁধিয়ে রাখেনি ? ইরান দেরীতে হলেও অনুধাবন করতে সক্ষম হয়েছিল বলেই আজকে ইরান আবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শত্রুদের একটি নয় কি ?

ওই যে আরব বসন্তের কথা বললাম, সেই আরব বসন্ত শুরু হয়েছিল তিউনিশিয়ার বেন আলীকে হানার মধ্য দিয়ে এবং ইজিপ্টে হুসনি মোবারক পর্যন্ত গড়িয়েছিল। সেই সব দেশে কারা পরবর্তীতে ক্ষমতায়ন হয়েছিল ? লাভের গুর পিঁপড়ে হজম করেনি ? হ্যা করেছিল এবং সেই সব দেশেও গণতন্ত্র, মানবাধিকার, শ্রমঅধিকার ন্যায়ের শাসন ব্যবস্থা আসেনি। কেননা যুক্তরাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য ন্যায় প্রতিষ্ঠা করা নয়।

আসুন ছোট্ট করে দেখি যুক্তরাষ্ট্র তাদের স্বার্থের উদ্ধার দেশে দেশে কিভাবে করে ? প্রথমত যুক্তরাষ্ট্র যে কাজটি করে সেটা হলো মিডিয়াকে টার্গেট, বহু প্রমাণ আছে। সেই হিসেব বা কৌশলের কারণে যে দেশ টার্গেট থাকে, সেই সব দেশের মিডিয়ার ব্যক্তিত্বদের (যুক্তরাষ্ট্র বা ভিন্ন দেশে বসবাস করা মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের) প্রথমেই নগদ টাকায় খরিদ করে নেয় এবং তাদের দেশের প্রভাবশালী মিডিয়ার মাধ্যমেই প্রথমে এই সব খরিদ করা মিডিয়ার ব্যক্তিত্বদের বহুল সুযোগ তৈরী করে দেয়। সুযোগ তৈরী করে দেয় যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় নেতাদের প্রেস কনফারেন্সে প্রশ্ন করার এবং সেগুলো তাদের তৈরী করা প্রশ্নই মূলত ওই সব খরিদ করা মিডিয়ার ব্যক্তিত্বদের দিয়ে উত্থাপন করায় এবং বহুল প্রচারের সুযোগ তৈরী করে দেয় এবং এগুলো সব চোখ ধাঁধানো গণতন্ত্রের প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে ঘটায়। এই কাজটি যে শুধুমাত্র যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়া ব্যবহারের করে ঘটায় তেমনটা মোটেও নয়। এই কাজটি ধীরে ধীরে ওই সব দেশের মিডিয়ার ব্যক্তিত্বদের দ্বারাও ঘটায়। এবার একটু লক্ষ্য করুন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেস কনফারেন্সগুলো বাংলাদেশকে নিয়ে এবং বাংলাদেশেও বিশেষ কিছু মিডিয়া ব্যক্তিত্বদের। নাম উল্লেখ করছি না কারণ নাম উল্লেখ করা সহজ তবে প্রমাণ দেওয়া কঠিন। তবে যদি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেস কনফারেন্সগুলো ও বাংলাদেশের কিছু মিডিয়া ভাল করে পর্যবেক্ষণ করেন, সেই নামগুলো বুঝতে খুব বেশি বেগ পেতে হবে না। এই মিডিয়ার ব্যবহার ফলপ্রসূ না হলে যাবে দ্বিতীয়ধাপে। স্মরণে রাখুন যুক্তরাষ্ট্র নিজেরা কথা বলেন কম তবে মিডিয়ার দ্বারা বেশি করে প্রকাশ করায়।

দ্বিতীয় ধাপে থাকে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে অর্থায়ন করা। সাম্প্রতিককালে পাকিস্তানের দিকে তাকালে তার নমুনা পেয়ে যাবেন। আমি বলছি না যে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের বিরোধীদলকে অর্থায়ন করে। তবে এত অত্যাচার- নির্যাতন এবং বিরোধীদলের ব্যবসা বানিজ্য এখনতো সব লাটে উঠার কথা দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাহিরে থাকার কারণেই, তারপরেও এত বিশাল বিশাল সমাবেশের খরচ কোথা থেকে জোগার হয় ? এমন একটি প্রশ্ন যে কারও মনে জাগতেই পারে। নিশ্চয়ই এমন প্রশ্ন জাগ্রত হওয়া অন্যায় নয় ? যেখানে দলের বড় বড় নেতারা আদালত পাড়া আর জেলের দরজায় দিনগুনতেই শেষ, সেখানে ব্যবসা করাতো একপ্রকার অস্বাভাবিকও বটে। তারপরেও কোটি কোটি টাকা যে খরচ হচ্ছে না, তা তো নয়। তাই এমন প্রশ্ন জাগে। এটা শুধুমাত্র জাগ্রত হওয়া একটি প্রশ্ন, খেলা মনে বলা, কোন প্রকার আঙ্গুল তুলা অবশ্যই নয়। যুক্তরাষ্ট্র যখন দ্বিতীয়ধাপে কার্যকর কিছু করতে না পারে (যে সব দেশে দ্বিতীয়ধাপ প্রয়োগ হয়েছে/ যেমন পাকিস্তান একটি উদহারণ) তখন তৃতীয়ধাপে এগিয়ে যায়।

তৃতীয়ধাপ হয়, জাতিসংঘের মিলিটারী মিশন। জাতিসংঘ মানেই কিন্ত মূলত যুক্তরাষ্ট্র। উদহারণ চান ? স্মরণ হয় কি, জাতিসংঘকে জর্জ বুশ সরাসরি বৃদ্ধা অঙ্গুলি প্রদর্শন করেই কিন্ত ইরাকে যুদ্ধ করেছিল। স্মরণে আসে কি, জাতিসংঘের সেই ভেটোর কথা? বুশ তখন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিল, “হয় আমাদের সাথে নতুবা জঙ্গিদের সাথে থাকুন” (Either you are with us or with terrorists) এই বয়ান দিয়ে জাতিসংঘকে কোন প্রকার পাত্তাই দেয়নি এবং বিশ্ব কি সেটা মেনে নেয়নি ? জাতিসংঘ সেই সময়ে কি ক্ষমতা দেখাতে পেরেছিল ? অর্থাৎ বলাই বাহুল্য যে, জাতিসংঘ যুক্তরাষ্ট্রের কথারই মূল্য দেয়। সেই সূত্রেই যুক্তরাষ্ট্র ওই সব দেশের জাতিসংঘের মিলিটারী ফেরত পাঠিয়ে বা আর অংশগ্রহণ করতে না দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করে, ওই সব রাষ্ট্রের আর্মি অংশকে কাবু করে সরকারের বিরুদ্ধে লাগিয়ে দেবার প্রয়াস নেয়। বিশ্বে ছোট ছোট দেশের আর্মিগুলো জাতিসংঘের আয় রোজগার সহজে অবহেলা করতে চায় না কারণ জাতিসংঘের মিলিটারী হিসেবে আয়- রোজগারের অঙ্কটি মোটেও কম নয় এবং সেই সুযোগটাই আমেরিকা গ্রহণ করে। এই তৃতীয়ধাপেও যদি ফল না আসে তখন চতুর্থধাপে এগুবে।

চতুর্থধাপে আমেরিকার খেলা চলে স্যাংশন বা ভিসানীতি। কেননা এই নীতি দুটোতে ওই সব রাষ্ট্রের বড় বড় দূর্ণীতিবাজ রাজনৈতিক ও ব্যবসায়ীদের বেশ বেকায়দায় ফেলতে পারে। তবে এই প্রক্রিয়াটি খুবই ধীরে প্রয়োগ করে এবং এই প্রক্রিয়ায় বেশ কৌশলিও থাকে। এই প্রক্রিয়া মূলত সরকার বা বিরোধীদল দুই দিকেই বন্দুক তাক করে রাখা সহজ যেন কেউ খুব বেশি সাহসী হতে না পারে। স্মরণ করুন, আমাদের দেশে যখন ভিসানীতির বয়ান আসলো তখন আমাদের মূল দুই দলের নেতারা কি কি বয়ান দিয়েছিলেন ? বয়ানগুলো ছিল, আমরা নয়, তোমদের উপর স্যাংশন ইত্যাদি ইত্যাদি। এর মূল কারণ যুক্তরাষ্ট্র বেশ ভাল করেই জানে যে, যে সব রাষ্ট্রে যুক্তরাষ্ট্র স্বার্থ হাসিল করতে যায়, ওই সব রাষ্ট্রের হর্তাকর্তারা বেশির ভাগ বা প্রায় সবাই বড় বড় দূর্ণীতিবাজই হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় সফল না হলেই পা বাড়ায় পঞ্চমধাপে। তৃতীয় ও চতুর্থদধাপ অবশ্য সিরিয়াললি কখনোই থাকে না। অবস্থা বুঝে তৃতীয় ও চতুর্থধাপের কার্যক্রম উঠি নামা করিয়ে থাকে।

এই পঞ্চমধাপ হলো গিয়ে, লোভ লালসা আর ভরসা দিয়ে ওই সব দেশে যে করেই হোক আর্মি ‘কু’ করে রাষ্ট্রের ক্ষমতা আর্মির হাতে তুলে দেওয়া। এমন শত উদহারণ দেওয়া যাবে তবে প্রয়োজন আছে বলে মনে করছি না। এই ধাপে আমেরিকা যখন সফল হতে ব্যর্থ হয় তখন কঠিন ও শেষ প্রক্রিয়াটি বা অস্ত্রটি তারা ব্যবহারের ক্ষেত্রে একটুও কার্পণ্য করে না। সেই শেষ ধাপের অস্ত্র হোলো মূলত, ‘গুপ্তহত্যা’। ওই সব রাষ্ট্রের প্রধানকে সরাসরি গুপ্তহত্যায় লিপ্ত হয়। এই গুপ্তহত্যার উদহারণও নিশ্চয়ই আপনাদের ভুরি ভুরি জানা আছে।

ও হ্যা, যুক্তরাষ্ট্র শুধুমাত্র স্বার্থ নয় কখনও কখনও স্রেফ প্রতিশোধ নিতেও বহু রাষ্ট্রের প্রধানদের গুপ্তহত্যা করে থাকে এবং করেছে। বাংলাদেশও কি তার একটি উদহারণ নয় ? সুতরাং সময়েই সাবধান হওয়া হবে আমাদের রাজনৈতিক দল ও রাজনীতিবিদদের বুদ্ধিমত্তার পরিচয়। তবে সেই বুদ্ধিমত্তার পরিচয় আমাদের রাজনীতিবিদরা দেবেন, এটা ভাবটা অবশ্য শতভাগ বোকার স্বর্গে থাকা সমান।

 

বুলবুল তালুকদার 
শুদ্ধস্বর ডটকম 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.