রাশিয়া থেকে তেল কেনার দায়ে ভারতের বিরুদ্ধে ১০০ শতাংশ শুল্ক আমেরিকার

আমেরিকার অভিযোগ, বিভিন্ন দেশকে তেল বিক্রি করে সেই অর্থে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে রাশিয়া। তাই ভ্লাদিমির পুতিনের দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে জব্দ করতে তাদের তেল বিক্রিতে রাশ টানার কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন।

 

এ বার আর কেবল হুমকি-হুঁশিয়ারি নয়। রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্য ভারত এবং চিনের মতো দেশগুলির উপর শাস্তিমূলক পদক্ষেপও করতে পারবেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। বুধবার মার্কিন আইনসভা (কংগ্রেস)-র নিম্নকক্ষ হাউস অফ রিপ্রেজ়েন্টিটিভসে এই মর্মে বিল পাস হল। এই বিলে বলা হয়েছে, যে দেশগুলি রাশিয়া এবং ইরান থেকে তেল আমদানি করে, তাদের বিরুদ্ধে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক আরোপ করা যাবে। এ বার কতটা শুল্ক ধার্য হবে, আদৌ হবে কি না, সেই বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।

আমেরিকার প্রাক্তন রিপাবলিকান সেনেটর লিন্ডসে গ্রাহামের নামাঙ্কিত এই বিল (লিন্ডসে ও গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অফ ২০২৬) গত মাসেই মার্কিন আইনসভার উচ্চকক্ষ সেনেটে পাস করানো হয়েছিল। বিলের পক্ষে ভোট দিয়েছিলেন ৮৬ জন। আর বিপক্ষে ১১ জন। বুধবার এই বিল পেশ করা হয় নিম্নকক্ষে। সেখানে বিলের পক্ষে ভোট পড়ে ২৬২টি। আর বিপক্ষে ১৫৯টি। ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির অধিকাংশ সদস্য তো বটেই, বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টির বেশ কয়েকজনও বিলের পক্ষে ভোট দেন। আইনসভার দুই কক্ষেই বিলটি পাস হয়ে যাওয়ায় এখন এটি সরাসরি হোয়াইট হাউসে চলে যাবে। বিলে ট্রাম্প স্বাক্ষর করলেই আইনে পরিণত হবে এটি।

আমেরিকার অভিযোগ, বিভিন্ন দেশকে তেল বিক্রি করে সেই অর্থে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালাচ্ছে রাশিয়া। তাই ভ্লাদিমির পুতিনের দেশকে অর্থনৈতিক ভাবে জব্দ করতে তাদের তেল বিক্রিতে রাশ টানার কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন। ২০২২ সালে ইউক্রেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পরেই বিভিন্ন দেশকে সস্তায় তেল বিক্রির প্রস্তাব দেয় রাশিয়া। মস্কোর এই প্রস্তাব লুফে নেয় বহু দেশই। সেই দেশ থেকে তেল আমদানির নিরিখে প্রথম দুই স্থানে আছে যথাক্রমে চিন এবং ভারত।

অভ্যন্তরীণ তেলের বিপুল চাহিদা মেটাতে ভারত অনেকটাই রাশিয়ার অশোধিত তেলের উপর নির্ভরশীল। তেলবাহী জাহাজের আনাগোনার পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে ‘কেপলার’ জানিয়েছে, অগস্ট মাসে ভারত প্রতি দিন ২১ লক্ষ ব্যারেল অশোধিত তেল রাশিয়া থেকে আমদানি করেছে। ভারতে আমদানিকৃত তেলের ৪৫ শতাংশই আসে রাশিয়া থেকে। পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের আবহে এ ক্ষেত্রে নয়াদিল্লির রুশ নির্ভরতা আরও কিছুটা বেড়েছে। শেষ দু’মাসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমদানি করা তেলের পরিমাণের নিরিখে ৫০ শতাংশ রাশিয়া থেকে আনিয়েছে ভারত।

এর আগে রাশিয়া থেকে তেল বা গ্যাস কেনে এমন পাঁচটি দেশের (ভারত এবং চিন-সহ) ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। মার্কিন আইনসভায় পাস হওয়া এই বিলে অবশ্য বলা হয়েছে, দেশগুলির পণ্যের উপর সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা যাবে। আইনসভা শুল্ক আরোপে ছাড়পত্র দিলেও ট্রাম্প এই বিষয়ে কী পদক্ষেপ করেন সেটাই দেখার। কূটনীতিকদের একাংশ মনে করছেন, আইনসভায় সদ্য পাস হওয়া এই প্রস্তাবিত আইনকে হাতিয়ার করে ভারত এবং চিনের মতো দেশগুলির সঙ্গে দর কষাকষির পথে হাঁটতে পারেন ট্রাম্প। ভারত-আমেরিকার বাণিজ্যচুক্তির ক্ষেত্রে অতিরিক্ত সুবিধা দাবি করতে পারে ওয়াশিংটন।

কূটনীতিকদের ওই অংশটি এ-ও মনে করছেন যে, এখনই হয়তো ভারতের বিরুদ্ধে চড়া শুল্ক আরোপের পথে হাঁটবে না আমেরিকা। কারণ, পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধের কারণে হরমুজ় কিংবা বাব-এল-মান্দেব প্রণালী ধরে তেলবাহী জাহাজ চলাচল করছে না। বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে ফের একটা অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এই আবহে ট্রাম্প এই সরবরাহ শৃঙ্খল বা সাপ্লাই চেনে এখনই হয়তো বাধা দেবেন না বলে মত তাঁদের। সে ক্ষেত্রে নভেম্বরে আমেরিকার মধ্যবর্তী নির্বাচন (মিডটার্ম ইলেকশন)-এর ফল বেরোনো পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেন ট্রাম্প।

রিপাবলিকানদের দাবি, এই বিলের লক্ষ্যই হল পুতিনকে যুদ্ধের পথ থেকে সরিয়ে এনে ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে বাধ্য করা। কিন্তু রাশিয়াকে সরাসরি ‘শাস্তি’ না-দিয়ে কেন কেবল সে দেশের সঙ্গে বাণিজ্য করা দেশগুলির উপর শুল্ক আরোপ হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিরোধী ডেমোক্র্যাটদের একাংশ। এই বিষয়ে বিলে সংশোধনীও আনেন তাঁরা। সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন না-থাকায় ওই সংশোধনী প্রস্তাব অবশ্য খারিজ হয়ে যায়। সুত্র : আনন্দবাজার পত্রিকা ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.