ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা নিয়ে বলতে গেলে ইতি ও প্রীতি কথার বহুকথা বলা প্রয়োজন। ইতিকথা বলতে গেলে উপকথা, কাহিনি, ইতিহাসের ডালপালার সমাহার হবে আবার প্রীতি কথা বলতে গেলে সন্তোষ, তৃপ্তি, ভালোবাসা, অনুরাগের সমাহার হবে। একইভাবে ফ্রাঙ্কফুর্টে প্রবাসীদের আয়োজনে ‘ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা’ নিয়েও ইতি ও প্রীতি কথায় একই উপসর্গের সমাহার হবে যা নিতান্তই প্রয়োজনীয় ও স্বাভাবিকও বটে।
ছোট্ট করে বলতে গেলে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা সমন্ধে নিশ্চিত সবার জানা আছে কেননা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা একমাত্র বইমেলা যা সমগ্র বিশ্বের সর্ব বৃহৎ বইমেলা। যেখানে সমাগম ঘটে বিশ্বের সকল বড় বড় প্রকাশক, লেখক ও শিল্পি- সাহিত্যীকদের। এই বইমেলায় বিশ্বের এমন কোন দেশ খুঁজে পাওয়া ভার যাদের আগমন ঘটে না। হয়তোবা হাতেগুণে দু, চার বা দশটি দেশের উপস্থিতি নেই। প্রতি বছর অক্টোবর মাসে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলাটির জন্য তাবৎ বিশ্বের সকল প্রকাশক ও লেখকরা মুখিয়েই থাকেন কেননা বইয়ের জগত নিয়ে বিনা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা সবই যেন শূণ্য।

ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ইতিকথা বলা খুব বেশি প্রয়োজন নেই কেননা আজকের দিনে ডিজিট্যাল যুগে মাত্র একটি শব্দ ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা লিখে সার্চ দিলেই সব হাতের মুঠোয় চলে আসে। তবে হ্যা ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার প্রীতি কথায়, তৃপ্তি ও ভালবাসার কথা বলার বহুকিছুই রয়ে যায়। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার সেই বহুকিছু বলাটাও কলমে তুলতে গেলে মহাকাব্য হবে। তবে ছোট্ট বললে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ইতিহাস দীর্ঘ ৭৫ বছরের ইতিহাস।

১৯৪৯ সালে শুরু হওয়া বিশ্বের সর্ববৃহৎ বইমেলা জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা। এবারের আয়োজন ৭৫ তম আয়োজন যা কিনা হীরক জয়ন্তী। তাবৎ বিশ্বের সাথে বরাবরের মতন এবারও অংশ নিয়েছে বাংলাদেশ। ১৮ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এ মেলায় সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের প্যাভিলিয়নে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, বঙ্গবন্ধু ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক বহু বইয়ের সমাহার ও প্রদর্শিত হয়েছে।

২০ অক্টোবর শুক্রবার জার্মানির প্রবাসী শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার নির্বাহী সম্পাদক হাবিব বাবুল ভাইয়ের আমন্ত্রণে এবারের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার পক্ষ থেকে আমার নিজেরও আগমন ঘটে। এছাড়াও শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার আইরিন পারভীন ইতালি থেকে এসেছিলেন। আমেরিকা থেকে শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার সৌরভ আদনানের আসার কথা থাকলেও যেকোন কারণে সৌরভ আদনান আসতে পারেননি। বলাই বাহুল্য যে, শুদ্ধস্বর ডটকম পত্রিকার শুদ্ধস্বর পরিবারের চার দেশের চারজনের একজনের অনুপস্থিতির কারণে কিছুটা কমতি রয়েই গেছে। তবে ভাল লেগেছে লন্ডন থেকে আগত মিলটন ভাইয়ের আগমনে।

এবারের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলায় বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে জার্মানিস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের রাষ্ট্রদূত মো. মোশাররফ হোসেন ভূইয়া সহ বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক মিনার মনসুর, বাংলাদেশ দূতাবাস বার্লিনের মিনিস্টার (বাণিজ্যিক) মো. সাইফুল ইসলাম, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রাজীব কুমার সরকার ও সিনিয়র সহকারী সচিব মো. সগীর হোসেন উপস্থিত ছিলেন। এছাড়াও এবারের বইমেলায় অসংখ্য বাংলাদেশী জার্মানি প্রবাসী সহ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশী প্রবাসী দর্শনার্থী অংশগ্রহণ করেন। সত্যি বলতে সকল বাংলাদেশী ও বাংলাদেশী প্রবাসীদের এক মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল এবারের ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ প্যাভিলিয়নে।

অল্পকথায় ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার কথা বলার পরে বলতেই হয় ফ্রাঙ্কফুর্টে “ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা” র কথা। আজ থেকে ৭৫ বছর পূর্বে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার যাত্রা যেখানে শুরু হয়েছিল। এই ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরেই “ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা”র যাত্রা এবছরই শুরু হয়। ফ্রাঙ্কফুর্টে অবস্থিত বাংলাদেশী প্রবাসীদের আপ্রাণ চেষ্টায় এবার “ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা” চালু হয়। বাংলাদেশের বইমেলাটি ফ্রাঙ্কফুর্ট শহরের প্রাণকেন্দ্র ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা থেকে কিছুটা দূরে একটি সুপারমার্কেটের উপর তলায় নিরিবিলি একটি হলরুম ” Titus Zentrum” এ আয়োজিত ছিল।

সত্যি বলতে প্রবাস জীবনে প্রবাসীদের নানান জীবন জটিলতার মাঝেও বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের কৃষ্টি কালচারের একপ্রকার আত্মীক ও হৃদয়ের একান্ত টান না থাকলে এমন একটি বাংলা বইমেলার আয়োজন করা কখনোই সম্ভব নয়। জার্মানে অবস্থিত প্রবাসী বাংলাদেশীদের এমন আয়োজনে সত্যিই আপ্লুত ও মোহিত হয়েছি। মোটাদাগে সবার সাথে কথা বলে যতটুকু জেনেছি, শুনেছি, বুঝেছি সব উল্লেখ করা আজকে সম্ভব নয় কেননা জার্মানি প্রবাসীদের এই অক্লান্ত পরিশ্রমের, এই “ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা”র কথায় সকলের সঠিক নামধাম সহ না লিখতে পারলে সেটা অসমাপ্ত রয়ে যাবে। তবে হ্যা কোন এক লেখায় জার্মানির সকল পরিশ্রমী প্রবাসীদের নামলাম সহ লেখার ইচ্ছে রইল।

তবে ছোট্ট করে কিছু কথা বাংলাদেশ নিয়ে বলতেই হয়। বাংলাদেশ জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র বা বাংলাদেশের যে সকল প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্য নিয়ে কাজ করে থাকেন, সেই সকল প্রতিষ্ঠান যদি জার্মানির প্রবাসীদের সাথে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে একত্রিত হয়ে কাজ করেন এবং একটু সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়, তাহলে নিশ্চিত হয়েই বলা যায় ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা বহুদূর এগিয়ে যেতে পারবে।

সহজ ভাষায় যদি বলি, জার্মানির উদ্যমী প্রবাসীদের পাশে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্যের প্রতিষ্ঠানগুলো যদি একটু বেশি সংযুক্ত হয়ে কাজ করে, একপ্রকার Communication bridge of art literature (শিল্প সাহিত্যের যোগাযোগ সেতু) গড়ে তুলতে সক্ষম হয় তাহলে জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্ট শহর থেকেই বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্যকে এগিয়ে নিতে এবং বৈদেশে বাংলাদেশের শিল্প সাহিত্যকে পরিচিত করতে অতীব কার্যকরী হবেই হবে।

লেখার শেষে হৃদয়ের একটি প্রত্যাশার কথা বলতেই হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার যেখানে ৭৫ বছরে হীরক জুবিলি শেষ হলো, ঠিক সেখান থেকে ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা’র যাত্রা শুরু হলো। ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা’র এই যাত্রা আজ থেকে ২৫ বছর পর ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার শততম বছরের উৎসবে “ফ্রাঙ্কফুর্ট বাংলা বইমেলা”র প্রথম রৌপ্য জুবিলি হোক, সেটাই কামনা করি।
বুলবুল তালুকদার
শুদ্ধস্বর ডটকম

