বইমেলার বিড়ম্বনা

বইমেলার সাথে আমাদের অনেক আবেগ জড়িত। ভাষা আন্দোলনের আবেগ। একুশে ফেব্রুয়ারির আবেগ। তাই দেশে-প্রবাসে বইমেলা শুনলেই আমরা অনেকেই ছুটে যাই। ছুটে যাই প্রাণের টানে। বইমেলা আমাদের প্রাণের মেলা।

বইমেলা মানে শুধু বই বিক্রি নয়। বইমেলার উদ্দেশ্য হল লেখক, প্রকাশক, পাঠক, অনুরাগীদের একত্রিত হওয়ার বা মিলনমেলার সুযোগ তৈরি করা। যেখানে পাওয়া যাবে নতুন বইয়ের খবর, কেনা যাবে পছন্দের বই, মত বিনিময় করা যাবে প্রিয় লেখকের সাথে।
কিন্তু দুঃখজক হলেও সত্য যে, বইমেলায় এখন নানারকম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়। প্রকাশকদের সাথে অনেক লেখকরাও নেমে পড়েন বই হকারিতে। লেখকদের হাঁকাহাঁকি ডাকাডাকিতে বইমেলা মাঝে মাঝেই হয়ে ওঠে বইয়ের আড়ৎ।

বইমেলায় বইপ্রেমিরাই আসেন। কিন্তু বইমেলায় যোগ দেওয়া মানে এই নয় যে বই কিনতেই হবে ।
বই কেনার কোনো ইচ্ছা ছাড়াও মানুষ বইমেলায় আসে। নানা কারণের মধ্যে রয়েছে: নতুন লেখক আবিষ্কার করা, সাহিত্যের প্রবণতা অন্বেষণ করা, লেখকের আলোচনা বা প্যানেলে অংশ নেওয়া, পেশাদার লেখক, প্রকাশকদের সাথে নেটওয়ার্কিং করা, বা কেবল বই এবং সাহিত্যের জগতে সময় কাটানো। বই কিনতেও মানুষ আসেন। তবে বই কেনাটা নির্ভর করে তার ইচ্ছা, আগ্রহ, পছন্দ এরকম অনেক বিষয়ের ওপর।
সব পাঠক সব ধরনের বই পড়েন না। সব পাঠক সব বই কিনেন না। কিন্তু বইমেলায় আসা অনেক লেখক ও প্রকাশকরা থাকেন তাদের বই ‘পুশসেল’ করার মতলবে। কোনো পাঠক-ক্রেতা যদি তার বইটা না নেন তখন তারা খুবই বিরক্ত হোন, অসংলগ্ন আচরণ করেন। তখন পাঠক-ক্রেতা পড়েন ভীষণ একরকম বিড়ম্বনায়।

তাদের বুঝা উচিত, বইমেলা থেকে একজন পাঠক-ক্রেতার বই না কেনার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে:
১. পাঠকের ব্যক্তিগত পাঠরুচি: ব্যক্তি মানুষের পছন্দ আলাদা হয়। সবাই সব বিষয়ের বই পড়েন না। প্রত্যেকের ভিন্ন রুচি ভিন্ন স্বাদ ভিন্ন ঘরানা থাকে। নিজের পছন্দের সাথে যায় না এমন একটি বই কিনতে একজন ক্রেতা উৎসাহী নাও হতে পারেন।

২. বইয়ের মান : অনেক বইয়ের বিষয়বস্তু, উপস্থাপনা, ডিজাইন মানসম্মত নয়। অথবা অনেক ভুল-ত্রুটিতে ভরা বা ভালভাবে সম্পাদিত নয়। এরকম ত্রুটিপূর্ণ অনাকর্ষণীয় বই পাঠক টানতে ব্যর্থ হবেই।

৩. পাঠকের পূর্ব পাঠ-অভিজ্ঞতা : পাঠক যদি নিজে কোনো বিষয়ে নিজে ধারণা রাখেন তখন তার ধারণার সাথে যায় না বা মিলে না এমন বই তিনি কিনবেন না।
৪. জানাশোনার পর্যায়: একটা বিষয়ে যদি একজন পাঠক বেশ উঁচু পর্যায়ের ধারণা রাখেন তিনি প্রাথমিক পর্যায়ের একটা বই কিনবেন না। আবার প্রাথমিক পর্যায়ের একজন পাঠক একই বিষয়ে উচ্চ পর্যায়ের একটা বইতে দাঁত বসাতে পারবেন না।
৫. সময় বা কাল: জীবনের সব কালে সব বই আকর্ষণীয় মনে হয় না। শৈশবে যে বই ভালো লেগেছিলো যৌবনে সেই বই মনে দোলা নাও জাগাতে পারে।
৬. বইয়ের মূল্য: সব বইমেলাতে মূল্য ছাড় দেয়া হয় না। প্রকাশকরা অনেক সময় বইয়ের মূল্য এমনভাবে নির্ধারণ করেন যা ক্রেতাকে নিরুৎসাহিত করে। বিশেষ করে অনলাইনে পাওয়া বইয়ের দামের তুলনায় সেগুলোর দাম অনেক বেশি হয়।

তালিকা আর দীর্ঘ না করি। মোদ্দা কথা, বইমেলা থেকে পাঠকের একটা বই না কেনার অনেক কারণ রয়েছে।
সুতরাং বইমেলা বা অন্য কোনো জায়গায় কাউকে বই কিনতে বাধ্য করা উচিত নয়। অথবা মেলা থেকে কেউ কোনো বই না কিনলে তাকে অপদস্ত করা বা হীনচোখে দেখাটা অযৌক্তিক অনৈতিক। কোথায়, কখন বা কী বই কিনবেন তা বেছে নেওয়ার স্বাধীনতা পাঠকের রয়েছে। থাকা উচিত।
বইমেলায় লেখকরা তাদের প্রকাশনা প্রদর্শন করবেন, সম্ভাব্য পাঠকদের সাথে সংযোগ করবেন-ঠিক আছে। কিন্তু একটি বই কেনার সিদ্ধান্ত সর্বদা স্বেচ্ছায় হওয়া উচিত এবং পাঠকের আগ্রহ ও পছন্দের উপর ভিত্তি করে হওয়া উচিত। একটি বই কেনার জন্য জবরদস্তি বা চাপ নৈতিক নয়। একজন মানুষের স্বাধীনভাবে কোনোকিছু পছন্দ করার অধিকার রয়েছে। এই জোরজবরদস্তি সেই অধিকারের বিরুদ্ধে যায়।

কোনো লেখকের পক্ষে বই মেলা বা অন্য কোনো স্থানে তাদের বই না কেনার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় পাঠকদের আক্রমণ বা সমালোচনা করা উপযুক্ত নয়। লেখকদের, যেকোনো পেশাদারদের মতো, একটি সম্মানজনক এবং ইতিবাচক অনলাইন উপস্থিতি বজায় রাখা উচিত।

পাঠক এবং সম্ভাব্য পাঠকদের সাথে জড়িত হওয়া উচিত বিনয়ী এবং প্রশংসামূলক পদ্ধতিতে। আক্রমণ করার পরিবর্তে, লেখকরা করতে পারেন:

২. কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করুন: যারা তাদের বইমেলার বুথ পরিদর্শন করেন বা তাদের কাজের প্রতি আগ্রহ প্রকাশ করেন তাদের ধন্যবাদ, তারা কেনাকাটা করুক না কেন।
২. তথ্য প্রদান করুন: কাউকে কেনার জন্য চাপ না দিয়ে তাদের বই, আসন্ন ইভেন্ট এবং পাঠকরা তাদের কাজ কোথায় খুঁজে পেতে পারেন সে সম্পর্কে বিশদ বিবরণ শেয়ার করুন।
৩. কথোপকথনে নিযুক্ত থাকুন: পাঠকদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ এবং যোগাযোগযোগ্য উপায়ে তাদের লেখা, লেখার প্রক্রিয়া এবং সম্পর্কিত বিষয়গুলি নিয়ে আলোচনা করার জন্য উন্মুক্ত হন।
৪. পছন্দগুলিকে সম্মান করুন: বুঝুন যে পাঠকদের ক্রয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার বিভিন্ন কারণ রয়েছে এবং সেই পছন্দগুলির জন্য তাদের সমালোচনা করা বা আক্রমণ করা উপযুক্ত নয়৷

পাঠকদের সাথে আলাপচারিতায় পেশাদারিত্ব এবং সম্মান বজায় রাখা, বইমেলায় ব্যক্তিগতভাবে হোক বা সোশ্যাল মিডিয়ায় অনলাইনে, লেখক-পাঠক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য এবং একটি সহায়ক ভক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
হুসনা খান হাসি
লন্ডন

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.