ভারতের ওড়িশায় রহস্যজনক ভাবে মৃত্যু হল রাশিয়ার এক ধনী আইনপ্রণেতার। রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের তীব্র সমালোচক হিসেবে পরিচিত সেই আইনপ্রণেতার নাম পাভেল আন্তভ। ওড়িশার একটি হোটেলে রহস্যজনকভাবে মৃত্যু হয় তার। হোটেল থেকে পড়ে গিয়ে পাভেলের মৃত্যু হয় বলে প্রাথমিকভাবে জানা গিয়েছে।
শনিবার তিনি ওডিশার তিন-তারকা সাই ইন্টারন্যাশনাল হোটেলের তিন তলার জানালা দিয়ে পড়ে গিয়ে মারা যান বলে কলকাতায় নিযুক্ত রাশিয়ার কনসাল জেনারেল জানিয়েছেন।
তবে কীভাবে হোটেল থেকে তিনি পড়ে গেলেন, সেই নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েছে। জানা গিয়েছে, নিদজের ৬৬তম জন্মদিন উপলক্ষে ওড়িশার রায়গড় অঞ্চলে ছুটিতে কাটাতে এসেছিলেন পাভেল। সেখানকারই এক হোটেল থেকে পড়ে গিয়ে এই মর্মান্তিক পরিণতি হল তার।
এ নিয়ে ওডিশার ওই হোটেলে দু’দিনের ব্যবধানে দুই রুশ পর্যটকের রহস্যজনক মৃত্যু হলো।
রাশিয়ার অন্যতম ধনকুবের পাভেল অ্যান্তভ নিজের ৬৬তম জন্মদিন উদযাপনের জন্য ওডিশার রায়গড়ে এসেছিলেন। গত ফেব্রুয়ারিতে ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলার তীব্র সমালোচনা করে ব্লগ লেখার পর দেশটিতে ব্যাপক চাপের মুখে পড়েছিলেন তিনি।
প্রশাসনিক চাপের মুখে পুতিনের সমালোচনা করে দেওয়া পোস্টের জন্য ক্ষমাও চেয়েছিলেন তিনি। ব্লগে ইউক্রেন যুদ্ধকে রুশ ‘সন্ত্রাস’ বলে অভিহিত করেছিলেন পাভেল। পরে নিজেকে ‘পুতিনের সমর্থক’ হিসেবে দাবি করেন তিনি।
এর আগে, গত বৃহস্পতিবার ওডিশায় ঘুরতে আসা পাভেলের আরেক পুরুষ সঙ্গীর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। ওই দিন হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান বলে ওডিশা কর্তৃপক্ষ জানায়। এর দুদিন পর শনিবার রাশিয়ার ধনকুবের এই আইনপ্রণেতার প্রাণহানি ঘটেছে।
কলকাতায় নিযুক্ত রাশিয়ার কনসাল জেনারেল অ্যালেক্সি ইদামকিন দেশটির বার্তা সংস্থা তাসকে বলেছেন, পাভেল অ্যান্তভ ওডিশা রাজ্যের রায়গড়ের একটি হোটেলের জানালা থেকে ‘পড়ে’ গেছেন।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, রাশিয়ার ‘মাংস মুঘল’ পাভেল অ্যান্তভ হোটেলের ছাদ থেকে লাফিয়ে পড়েছেন। পরে ভারতীয় গাইড তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যান। হাসপাতালে নেওয়ার পরপরই চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এই আইনপ্রণেতার সঙ্গে যে চারজন ওডিশায় ছুটি কাটাতে আসেন তাদের মধ্যে ভ্লাদিমির বুদানোভ (৬১) নামের আরেক রাশিয়ান ছিলেন। গত বৃহস্পতিবার হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে তিনি মারা যান। এই দলের বাকি দু’জনের পরিচয় জানা যায়নি বলে জানিয়েছেন রুশ কনসাল জেনারেল অ্যালেক্সি ইদামকিন।
তিনি বলেন, রায়গড়ের হোটেলে চারজনের একটি ট্যুর গ্রুপ অবস্থান করছিল। বৃহস্পতিবার ভ্লাদিমির বুদানোভ নামের একজন মারা যান। এর দুদিন পর শনিবার রাশিয়ার ভ্লাদিমির অঞ্চলের আইনসভার ডেপুটি পাভেল অ্যান্তভ জানালা দিয়ে নিচে পড়ে মারা গেছেন।
ওডিশার তিন-তারকা সাই ইন্টারন্যাশনাল হোটেলে অ্যান্তভের মৃত্যুর তথ্য নিশ্চিত করেছেন ভ্লাদিমির আইনসভার ভাইস স্পিকার ভ্লাদিস্লাভ কার্তুখিন। অ্যান্তভ তার স্ত্রী ও এক মেয়েকে রেখে গেছেন।
২০১৯ সালে ফোর্বস রাশিয়া জানিয়েছিল, রুশ আইনপ্রণেতা পাভেল অ্যান্তভের ঘোষিত বার্ষিক আয়ের পরিমাণ ১৩০ মিলিয়ন ইউরো। যে কারণে তাকে আয়ের দিক বিবেচনায় রাশিয়ার সবচেয়ে ধনী আইনপ্রণেতা হিসেবে অভিহিত করা হয়।
রাশিয়ায় জনগণের দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি ছিলেন পাভেল। ২০১৯ সালে দেশের সবচেয়ে বেশি আয় করা জনপ্রতিনিধির তালিকায় নাম ছিল তাঁর। সরকারি হিসাবে ওই বছর পাভেলের রোজগার ছিল প্রায় ১ হাজার ৩০১ কোটি টাকা (ভারতীয় মুদ্রায়)।
চলতি বছর প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সমালোচনা করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন এই রুশ রাজনীতিক।
ইউক্রেনে রুশ হামলা নিয়ে পুতিনের সমালোচনা শোনা গিয়েছিল পাভেলের মুখে। চলতি বছরের জুন মাসে ইউক্রেনে একটি রুশ ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর সমাজমাধ্যমে তিনি লিখেছিলেন, ‘ইউক্রেনে যা হচ্ছে, তাকে সন্ত্রাসবাদ ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।’
পাভেলের এই মন্তব্য ভাল চোখে দেখেননি পুতিন। রুশ সংবাদমাধ্যমে দাবি, এই পোস্টের পরেই চার দিক থেকে পাভেলের উপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। চাপের মুখে মন্তব্য প্রত্যাহার করে ক্ষমা চাইতে বাধ্য হন পাভেল।
ইতিহাস বলছে, রুশ রাজনীতিতে পুতিন বিরোধীদের পরিণতি খুব একটা ভাল হয়নি কখনওই। প্রায় প্রত্যেককেই রহস্যজনক ভাবে মরতে হয়েছে। ভারতে ঘুরতে এসে পাভেলের অস্বাভাবিক মৃত্যু তাই নতুন করে উস্কে দিয়েছে বিতর্ক।
গত কয়েক বছরে রাশিয়ার বেশ কয়েক জন স্বনামধন্য রাজনীতিবিদ কিংবা রাজনৈতিক সমালোচকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। ঘটনাচক্রে তারা প্রত্যেকেই কোনও না কোনও ভাবে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সমালোচনা করেছিলেন।
চলতি বছরের সেপ্টেম্বর মাসে রাভিল ম্যাগানভ নামের এক ব্যক্তির মৃত্যু হয় হাসপাতালের জানলা থেকে নীচে পড়ে গিয়ে। পুতিনের সমালোচনা করে বিতর্কে জড়িয়েছিলেন তিনিও।
এর পর পুতিনের সমালোচনাকারী হিসাবে পরিচিত আর এক রুশ কূটনীতিক ড্যান রাপোপর্টের মৃত্যু হয় অনুরূপ ভাবে। ওয়াশিংটনের একটি বহুতল থেকে পড়ে গিয়েছিলেন তিনি। মৃত্যুর কিছু দিন আগেই বলেছিলেন, পুতিনের সেনা দিনের পর দিন দুর্বল হচ্ছে।

