কূটনৈতিক ভাষায় প্রতিমন্ত্রী ও গুলি

হাইকোর্টের সামনে একজন নুরা পাগলা ছিলো, ৮০ দশকে ( অনেকের মনে থাকতে পারে )। একবার হাইকোর্টের সামনে দিয়ে যাবার সময় নুরা পাগলাকে বলতে শুনেছিলাম, গাজার কোলকিতে টান দিচ্ছে আর বলছে, “অতী ভজন ভালা না”।

 

আওয়ামী বন্ধুরা বা আওয়ামী শুভাকাঙ্খীরা যত কথাই বলুন, যত ভারতের রাষ্ট্রীয় প্রোটকলের যুক্তি তুলে ধরুন আর যতই  জনমানুষদের বেকুব ভাবেন, বাস্তবতা কিন্ত ভিন্ন।  বলছিলাম আমাদের রাষ্ট্র প্রধানকে ভারতে প্রতিমন্ত্রী দ্বারা অভ্যর্থনা (reception) এর কথা।

 

কে না জানে, এই সরকার ভারতের উপর অতীমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে উঠেছিলো। এই সরকার শুরু থেকেই ভারতের উপর অতীমাত্রায় আস্থাশীল এবং ভারতের জন্য অনেক অনেক করেছে। কারণটিও বেশ পরিষ্কার। বাঙালী বাবু ভারতের সাবেক প্রেসিডেন্ট প্রণব বাবু উনার নিজের বয়ানে বইতেই লিখে গেছেন। বাংলাদেশ সরকার ভারতকে অনেক দিয়েছে বটে তবে তেমন কিছুই আনতে পারেনি। এটা আমার কথা নয়। স্বয়ং ভারতের জাতীয় পত্র পত্রিকার খবর। ভারতের বুদ্ধিজীবিরাই এমন শত কলাম লিখেছেন।

 

এতটাই ভারত নির্ভরশীলতা ছিলো যে, মূলত সেই নির্ভরশীলতাকে শক্তি ভেবে, আমেরিকার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি থেকে শুরু করে হিলারী ক্লিনটনকেও টেলিফৌনে কড়া কথা শুনাতে বা একপ্রকার ধমকের সুরে বলতেও দ্বিতীয়বার ভাবেননি, আমাদের সরকার প্রধান।  সমস্যা হলো, আমেরিকা যতই বন্ধু সুলভ আচরণ দেখাক, ওই সাদা চামড়ার জাতিরা সহজে কিছুই ভুলে না কিন্ত। প্রতিশোধ ওদের রক্তে জড়িয়ে।

 

অতঃপর সরকার ভারত নির্ভরশীলতা ঠিকই অনুধাবন করেছে। এখানে একটি কথা বলা ভালো, মাননীয় শেখ হাসিনা যে কৌশল (strategy) অবলম্বন করেছিলো, অতী বেশি দিয়ে হলেও, ভারতের সাথে সব সমস্যার সমাধানের পথেই হেঁটে ছিলেন কিন্ত।  বলাই বাহুল্য, এতবড় শক্তীর সাথে কৌশল মন্দ ছিলো না। তবে কানার কাছে রাত আর দিনের মূল্য সমান। বলছিলাম ভারতের কথা। ওদের ভাবনায় দাদাগীরি, ইহাই সত্য।

 

অতঃপর সরকার যখন তার উপলব্ধি থেকে ভারতের উপর নির্ভরশীলতা কমানোর পথে হাঁটা শুরু করে এবং  চীনের দিকে ঝুঁকে পরে, একটু  ভারসাম্যতা (balance) করার দিকে মোড় নেয়, ঠিক সেখানটায়, দাদাদের কলিজায় ধাক্কাটি মূলত লেগেছে। এদিকে চীন আবার ভারত থেকে বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে এনে নিজেদের দরবারের মুরিদ বানাতে উঠেপরে লেগেছে।

 

বিশ্ব পরাশক্তী বলে কথা। এই যে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমানায় হঠাৎ হঠাৎ সেল পড়তেছে, এই সময়ে। এগুলো কিন্ত হালকা করে দেখার বিষয় মোটেও নয়। কে জানে, চীনের হুকুমে মিয়ানমার সরকার এগুলো করছে কিনা ? অনেক উদহারণ আছে, কূটনৈতিক ভাষা কিন্ত গুলি ছুড়েও হয়।

 

তবে এখানে একটি কথা বলতেই হয়, ভারত বলেন আর চীন বলেন, ওরা দুজনেই বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর সাথে সমান তালে শক্তিশালী হতে চায়, ভালো কথা। এশিয়ার দেশ শক্তিশালী হওয়া মানে একপ্রকার আমরাও শক্তিশালী হওয়া বটে। তবে এই দুই দেশের ভাবনায় অন্তত একটি গণ্ডগোল স্পষ্ট দেখা যায়। দুই দেশই পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে অবহেলা করে এগুচ্ছে। প্রশ্ন হলো, পড়শীকে অবহেলা করে বিশ্ব পরাশক্তি হওয়া যায় কী ?

 

যত কথাই বলি না কেনো, মোদ্দা কথা হলো আমাদের মতন রাষ্ট্র চীন/ ভারতের সামনে দূর্বল রাষ্ট্র।  তারচেয়েও বড় সমস্যা হলো আমাদের রাজনীতিতে জাতীগত অমিল, জাতীয় বিষয়ে অমিল, জাতীয় বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো ও রাজনীতিবিদদের অমিল এবং ক্ষমতার লড়াইয়ে প্বার্শবর্তী দেশের উপর নির্ভরশীলতাই মূলত আমাদেরকে আরও দূর্বল করে রেখেছে।

 

ফলাফল: আমাদের রাষ্ট্র প্রধানকে প্রয়োজনে ভারত সরকার তাদের রাষ্ট্রীয় প্রোটকল ভেঙে স্বয়ং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নিজে বিমানবন্দরে এসে লালগালিচায় অভ্যর্থনা জানান আবার প্রয়োজনে ধমক দেবার জন্য প্রতিমন্ত্রীকে পাঠান। ঠিক তেমনটাই চীন সরকার মিয়ানমার সরকারকে দিয়ে প্রয়োজনে সীমান্ত এলাকায় গুলি ছোড়েন। দেখিয়ে দেন এবং বুঝিয়ে দেন, ভবিষ্যতে কি হতে পারে ?

 

মূলত এমন ধমক থেকে নিজেদের রক্ষার একমাত্র সমাধান হলো আমাদের নিজেদের রাজনীতি এবং বলাই বাহুল্য যে, সেই রাজনীতি নির্ভর করে আমাদের রাজনীতিবিদদের কর্মের উপর।

 

শেষে ছোট্ট করে বলি, এই দেশটির জন্মের পিছনে এত রক্ত।  সেই রক্তের মূল্যায়ন করুন, বলছিলাম আমাদের রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্য। এই রাষ্ট্রটি আপনারাই পরিচালনা করবেন, ভিন্ন কেউ নয়। ক্ষমতায় আপনারাই থাকবেন, ভিন্ন কেউ নয়। তবে জনগণকে যত বেশি মূল্যায়ন করবেন, ততই রাষ্ট্রের মঙ্গল।

 

মোদ্দা কথা, ক্ষমতার জন্য ভারতের কাছে ধরনা না দিয়ে ( দেশের বড় দলগুলোর উদ্দেশ্য বলছি),  জনগণের কাছে ধরনা দিলে সরকার কখনোই দূর্বল হয় না। কঠিন সত্য হলো, বর্তমান সরকার যদি জনগণের মতের উপর বেশি নির্ভরশীল হতো, তাহলে ভারত সরকার একটু হলেও ভাবতো। এমনকি চীন সরকারও। একটি রাষ্ট্রের মূল শক্তি জনগণ, পড়শী দেশ নয়।

 

লেখার শেষে সেই নুরা পাগলার কথাই একটু ঘুরিয়ে বলি। অতী ভজন ভালা না। তবে জনগণকে যত বেশি ভজবেন ততই রাষ্ট্রের ভালা।

 

বুলবুল তালুকদার 

যুগ্ম সম্পাদক, শুদ্ধস্বর.কম 

 

 

 

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.