মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে ‘হুতি’ এখন বহুল আলোচিত একটি নাম। ইয়েমেনের গণ্ডি পেরিয়ে লোহিত সাগর, সৌদি আরব, ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল—সব মিলিয়ে আঞ্চলিক ভূরাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছে এই সংগঠন। কিন্তু হুতিদের নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে একটি সরলীকরণ প্রায়ই দেখা যায়—হুতিরা ইরানের তৈরি একটি প্রক্সি বাহিনী, আর সৌদি আরব তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে। বাস্তবতা অবশ্য এত সরল নয়।
হুতিদের আনুষ্ঠানিক নাম ‘আনসার আল্লাহ’। তাদের উত্থান উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়া সম্প্রদায়ের রাজনৈতিক ও ধর্মীয় আন্দোলনের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৯৯০-এর দশকে হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতির নেতৃত্বে আন্দোলনটি সংগঠিত রূপ পেতে শুরু করে। ইয়েমেনের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলি আবদুল্লাহ সালেহর সরকারের সঙ্গে ২০০৪ সালে তাদের সশস্ত্র সংঘাত শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক বছরে একাধিক দফায় যুদ্ধ চলে।
অর্থাৎ হুতিদের জন্ম সৌদি আরব বা ইরানের সঙ্গে বিরোধ থেকে হয়নি। এর শিকড় ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে। উত্তর ইয়েমেনের জায়দি জনগোষ্ঠীর একটি অংশ মনে করত, রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় তাদের প্রভাব ক্রমশ কমছে। একই সঙ্গে সৌদি প্রভাব, সালেহ সরকারের কর্তৃত্ববাদী শাসন এবং ইয়েমেনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দুরবস্থা হুতিদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।
২০১১ সালের আরব বসন্ত ইয়েমেনের রাজনৈতিক কাঠামোকে আরও দুর্বল করে দেয়। প্রেসিডেন্ট সালেহ ক্ষমতা ছাড়েন। তাঁর স্থলাভিষিক্ত হন আবদরাব্বুহ মনসুর হাদি। কিন্তু নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থা স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে দেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। হাদি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এরপর ইয়েমেনের সংকট আর কেবল অভ্যন্তরীণ থাকেনি।
২০১৫ সালে সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট ইয়েমেনে অভিযান শুরু করে। তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য ছিল হাদি সরকারকে পুনর্বহাল করা এবং হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকানো। এভাবেই ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ রূপ নেয় আঞ্চলিক সংঘাতে।
সৌদি আরবের উদ্বেগের অন্যতম কারণ ছিল তার দক্ষিণ সীমান্তের নিরাপত্তা। হুতিদের হাতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্রের সক্ষমতা বাড়তে থাকে। সৌদি শহর ও স্থাপনায় হামলা হয়। পাল্টা সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট ইয়েমেনে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। এতে যুদ্ধের মানবিক মূল্যও ভয়াবহ হয়ে ওঠে।
এই পর্যায়ে ইরানের ভূমিকা সামনে আসে। ইরান হুতিদের রাজনৈতিক ও সামরিক সহযোগিতা দিয়েছে—এমন অভিযোগ বহু বছর ধরে রয়েছে এবং হুতিদের অস্ত্র ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতার সঙ্গে ইরানের প্রযুক্তিগত সহায়তার সম্পর্ক নিয়ে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা হয়েছে। তবে হুতিদের পুরোপুরি ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে দেখলে বিষয়টির স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতা আড়াল হয়ে যায়। হুতিদের নিজস্ব সংগঠন, রাজনৈতিক স্বার্থ ও ইয়েমেনের অভ্যন্তরে সামাজিক ভিত্তি রয়েছে। ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ হলেও হুতিদের সব সিদ্ধান্তকে শুধু তেহরানের নির্দেশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যথাযথ নয়।
২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি ইয়েমেনে সহিংসতা কমানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছিল। পরবর্তী সময়ে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগও শুরু হয়। বন্দিবিনিময়, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং রাজনৈতিক সমঝোতা নিয়ে আলোচনা এগোয়। এতে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়—দীর্ঘ যুদ্ধের পরও আলোচনার দরজা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
কিন্তু ইয়েমেনের সংকটের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, এখানে শুধু দুই পক্ষ নেই। হুতিদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি সরকার, দক্ষিণাঞ্চলের বিচ্ছিন্নতাবাদী ও রাজনৈতিক শক্তি, বিভিন্ন উপজাতীয় গোষ্ঠী এবং অন্যান্য সশস্ত্র পক্ষ রয়েছে। ফলে সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে একটি চুক্তি হলেও সেটি ইয়েমেনের স্থায়ী শান্তির জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে।
আরেকটি বড় সমস্যা অর্থনীতি। যুদ্ধ ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করেছে। তেল ও গ্যাসের আয়, বন্দর, বিমান চলাচল, কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকারি কর্মচারীদের বেতন—সবই রাজনৈতিক বিরোধের অংশ হয়ে গেছে। ফলে সামরিক সংঘাত থামলেও অর্থনৈতিক কাঠামো পুনর্গঠন না হলে অস্থিরতা আবার ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে।
এখানেই সমাধানের মূল প্রশ্নটি আসে। ইয়েমেনের সংকটের স্থায়ী সমাধান সামরিক বিজয়ে সম্ভব কি না, সেটিই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। প্রায় এক দশকের সংঘাত দেখিয়েছে, কোনো পক্ষই সহজে অন্য পক্ষকে সামরিকভাবে নিশ্চিহ্ন করতে পারেনি। বরং যুদ্ধ ইয়েমেনের রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে দুর্বল করেছে এবং সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়েছে।
সমাধানের জন্য প্রথম প্রয়োজন একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাজনৈতিক প্রক্রিয়া। হুতি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেনি কর্তৃপক্ষ, দক্ষিণ ইয়েমেনের রাজনৈতিক শক্তি এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ পক্ষকে আলোচনার টেবিলে আনতে হবে। দ্বিতীয়ত, সৌদি আরব ও হুতিদের মধ্যে স্থায়ী সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা প্রয়োজন। সৌদি ভূখণ্ডে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা বন্ধের পাশাপাশি ইয়েমেনে সামরিক হস্তক্ষেপ ও বিমান হামলা বন্ধের নিশ্চয়তাও আলোচনার অংশ হতে পারে।
তৃতীয়ত, ইয়েমেনের অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান জরুরি। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন, সরকারি কর্মীদের বেতন প্রদান, তেল-গ্যাসের রাজস্ব ব্যবস্থাপনা এবং বন্দর ও বিমানবন্দর চালু রাখা—এসব বিষয়কে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার না করে জাতীয় সমঝোতার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে।
চতুর্থত, আঞ্চলিক শক্তিগুলোর ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমলে ইয়েমেনের ওপর তার ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। একইভাবে ওমানের মতো দেশ, যারা বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রেখেছে, তারা মধ্যস্থতায় ভূমিকা রাখতে পারে। জাতিসংঘের রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকেও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।
তবে শেষ পর্যন্ত ইয়েমেনের সমস্যার সমাধান ইয়েমেনিদেরই করতে হবে। সৌদি আরব, ইরান, ওমান, যুক্তরাষ্ট্র কিংবা অন্য কোনো শক্তি ইয়েমেনের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। তারা সর্বোচ্চ সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
হুতিদের সামরিক শক্তি উপেক্ষা করে ইয়েমেনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করা যেমন বাস্তবসম্মত নয়, তেমনি তাদের একতরফা আধিপত্যও স্থায়ী শান্তির নিশ্চয়তা দেয় না। প্রয়োজন এমন একটি রাজনৈতিক সমঝোতা, যেখানে ইয়েমেনের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরি হবে।
ইয়েমেনের যুদ্ধ তাই কেবল সৌদি আরব বনাম হুতি সংঘাত নয়। এটি একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রের ক্ষমতার লড়াই, যার সঙ্গে জড়িয়ে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর ভূরাজনীতি। সেই কারণেই এর সমাধানও একমাত্র সামরিক পথে সম্ভব নয়। যুদ্ধ যত দীর্ঘ হবে, আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা তত গভীর হবে। আর রাজনৈতিক সমঝোতা যত এগোবে, ইয়েমেনের জনগণের জন্য স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ তত বাড়বে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি হুতিরা জিতবে কি না, সৌদি আরব জিতবে কি না—এমন নয়। আসল প্রশ্ন হলো, ইয়েমেন কি তার জনগণের জন্য একটি কার্যকর, নিরাপদ ও রাজনৈতিকভাবে অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্র হিসেবে আবার দাঁড়াতে পারবে? মধ্যপ্রাচ্যের শান্তির বৃহত্তর স্বার্থেও উত্তরটি গুরুত্বপূর্ণ।
লেখক: হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

