এই সময়ের রাজনীতি এবং করণীয়

ভূমিকা

বর্তমানের রাজনৈতিক সংকট হঠাৎ করেই আবির্ভূত হয়নি। এটা দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিকভাবে চলে আসা সংকটের একটি পরিণতি মাত্র, বর্তমানে সেটা আরো ঘনিভূত হয়েছে এবং চরমমাত্রায় উপনীত হয়েছে। সর্বশেষ একাদশ সংসদ নির্বাচনকে সামনে নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা এবং না করা নিয়ে শাসকদল আওয়ামী লীগ ও ক্ষমতার বাইরে থাকা বিএনপি যখন মুখোমুখি। নানা মহল নানা ফর্মূলা হাজির করছে, ঠিক তখন বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন প্রশ্নে কয়েকটি বামপন্থী কমিউনিস্ট সংগঠন (গণমুক্তি ইউনিয়ন, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ, বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক পার্টি এবং কমিউনিস্ট ইউনিয়ন) মিলে ২০১৮ সালের ৯ অক্টোবর সংবাদ সম্মেলন করে। সেখানে বাম ঐক্য ফ্রন্ট নামে একটি জোটের ঘোষণা দেওয়া হয়। ওই জোটের তরফ থেকে সেখানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে নিজেদের বক্তব্য হাজির করা হয়। এখানে মূলত সেই বক্তব্যটিই ব্যাখ্যা করা হয়েছে এবং পরিশীলিত আকারে হাজির করা হয়েছে। বাম ঐক্য জোটের পক্ষ থেকে ও অনুমোদনে বর্তমান লেখাটি উপস্থাপন করেছেন কমিউনিস্ট ইউনিয়নের আহ্বায়ক ইমাম গাজ্জালী। বাম ঐক্য ফ্রন্টের নেতাদের মধ্যে আলাপ আলোচনার পর সংযোজন বিয়োজনে এটি যুক্ত বক্তব্য হয়ে ওঠে।

এর আগে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০১৮ সালের ২ নভেম্বর এবং নির্বাচনের পরে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ফরহাদ মণিসিংহ স্মৃতি ট্রাস্টের শহীদ মুনির আজাদ সেমিনার কক্ষে সেমিনার করে বক্তব্যটি উপস্থাপন করা হয়। এছাড়া চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে, লালমণিরহাটের জোতদার মিলনায়তনে এবং দিনাজপুর প্রেসক্লাবে একই বক্তব্য নিয়ে সেমিনার করা হয়।
এসব সেমিনার থেকে বিভিন্নজন মতামত দেন। সে সব মতামতকে আমলে নিয়ে আমাদের বক্তব্যকে আরো পরিশীলিত করা হয়েছে।

এই বক্তব্যে বাংলাদেশের তথা পাকিস্তান পর্বের, এমনকি ব্রিটিশ পর্বের কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংক্ষেপে বিচারমূলক সমালোচনা করা হয়েছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলন দুর্বল বিভক্ত ক্ষয়িষ্ণু ও তত্ত্বগত সমস্যায় নিপতিত। বর্তমানে এই পরিস্থিতি আরো প্রকট হয়েছে, কমিউনিস্ট আন্দোলনের এমন দুর্দশা ইতোপুর্বে আর দেখা যায়নি। বামপন্থী কমিউনিস্টদের এই সংকটের কারণে দেশের গরিব মেহনতিদের লড়াইও দুর্বল হয়ে পড়েছে। লুটপাট দুর্নীতি অনাচারের বিরুদ্ধে জোরালো প্রতিবাদ নেই। আর বুর্জোয়ারা বাধাহীন একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তারে সক্ষম হয়েছে আর দেশে ধর্মীয় ফ্যাসীবাদেরও প্রভাব বেড়েছে।

অপরদিকে, শত সংকট থাকা সত্ত্বেও, কমিউনিস্টদের তুলনায় বুর্জোয়ারা সংহত ও ঐক্যবদ্ধ। এ কারণে তারা পরাক্রমশালী এবং শাসন ক্ষমতা লাভে সক্ষম। তাই বুর্জোয়াদের সংকট ব্যাখ্যার পাশাপাশি কমিউনিস্ট আন্দোলনের সংকটের প্রতি বেশি মনোযোগী হওয়া বাঞ্ছনীয়। বাম প্রগতিশীল কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক কর্মসূচি এমন যে, সেখানে ইচ্ছে থাকলেও বুর্জোয়ারা তাদের শ্রেণির করণেই আসতে পারে না।

এই লেখায় বলা হয়েছে, কেন কমিউনিস্টরা ক্ষমতা দখলের রাজনীতির চেয়ে মজুরদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকেন আর রাজনৈতিক আন্দোলনের দায়িত্ব ছেড়ে দেন বুর্জোয়াদের ওপর। একারণে কমিউনিস্টগণ সাতচল্লিশে ব্রিটিশ তাড়াতে বিনাশর্তে মুসলিম লীগ ও কংগ্রেসের ঐক্য চেয়েছেন। শেষে পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন দিয়ে মন্দের ভাল খুঁজতে গেছেন। একাত্তরেও মওলানা ভাসানীকে ‘জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব’ বলে, প্রকারন্তে ছয় দফায় গা ভাসাতে হয়েছে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও কী করে বিপ্লবী কমিউনিস্টগণ দুই নেত্রীর ঐক্য কামনা করেছেন। তাদের সাথে অভিন্ন কর্মসুচি দিয়েছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিজেদের স্বতন্ত্র অবস্থান বজায় রাখতে পারেননি।

আজকে কমিউনিস্ট আন্দোলনের যে দুদর্শা চলছে, এর কারণ শুধু সাংগাঠনিক নয়, প্রধানত রাজনৈতিক। এটা শুধু চীন রাশিয়ায় সমাজতন্ত্রের পতনের কারণে নয়। দেশের রাজনৈতিক আন্দোলনে কমিউনিস্ট বিপ্লবীরা যে ভূমিকা রেখেছেন তার মধ্যেই বর্তমানের দুর্দশার প্রধান কারণ নিহিত রয়েছে। এই লেখায় অতি সংক্ষেপে তার ব্যাখ্যার চেষ্টা হয়েছে।
আমাদের উদ্দেশ্য, দেশের রাজনৈতিক সংকটে সঠিক কর্মসূচি হাজির করা এবং একই সাথে জাতীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট আন্দোলন গড়ে তোলা। সেখানে এই লেখার বক্তব্য কাজে আসবে বলেই আমাদের বিশ্বাস।

বিপ্লবী শুভেচ্ছাসহ

নাসিরউদ্দীন আহমেদ নাসু
সমন্বয়ক
বাম ঐক্য ফ্রন্ট

এই সময়ের রাজনীতি এবং করণীয়

প্রাক কথন
বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলা নির্বাচনব্যবস্থার কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দেওয়া হয়েছে গত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যাওয়া এই নির্বাচনী ব্যবস্থাকে আর পুনরুজ্জীবন ঘটানো সম্ভব নয়। নির্বাচনব্যবস্থার মতোই ভেঙে পড়েছে এদেশের নির্বাহী বিভাগ। বিচার বিভাগ মানুষের আস্থা হারিয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাদ্য, কৃষি খাত এবং পরিবহন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে। ভেঙে পড়েছে প্রকৃতির বাস্তুসংস্থান, ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে জীববৈচিত্র্য। এর মধ্যে শুরু হওয়া কোভিড-১৯ এর আঘাত দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুর্দশার চিত্র আরো সামনে নিয়ে এসেছে এবং অর্থনীতির ভঙ্গুর দশাকে আরো স্পষ্ট করে তুলেছে। এর সঙ্গে শুরু হয়েছে মন্দা, চলছে ছাঁটাই। ঝুঁকিতে পড়েছে জীবন ও জীবিকা। এসবের প্রতিক্রিয়া আরো বহুদিন থাকবে বলে সতর্ক করে দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। এমন পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার জন্য শোষণ লুটতরাজ বন্ধ করার পরিবর্তে আরো বাড়ানো হয়েছে, এর মাত্রা সহ্যের সীমা অতিক্রম করেছে। বেড়েছে দরিদ্রতা ও বৈষম্য। মেহনতিদের জন্য বেঁচে থাকা এদেশে দুরূহ হয়ে উঠেছে। এর ওপর গড়ে উঠেছে কালো টাকার পাহাড়। চলছে অর্থ পাচার ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আর বড় বড় মেগা প্রজেক্টের নামে হরিলুট।

শোষণ লুটতরাজে পরিণতিতে মানুষের পাশাপাশি প্রকৃতিও ভিষণভাবে পর্যুদস্ত হয়। এর ফলে প্রকৃতি বিগড়ে গিয়ে প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে ওঠে। কোভিড হলো শোষণ লুটতরাজে পর্যুদস্ত হওয়া প্রকৃতির প্রতিশোধ। ভ্যাকসিন ও মাস্ক এর সাময়িক সমাধান। কোভিড সহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে মানবজাতিকে বাঁচানোর একমাত্র পথ যে শোষণমূলক ও লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থার উচ্ছেদ, সেই ব্যাপারটি এখন জোরালোভাবে উপলব্ধি করার সময় এসে গেছে। সময় থাকতে মানুষের ও প্রকৃতির ওপর থেকে পুঁজিতান্ত্রিক শোষণ লুণ্ঠন উচ্ছেদ না করা গেলে কোভিড এবং এ ধরনের দুর্যোগ থেকে রেহাই পাওয়া মোটেই সম্ভব নয়। তাই শুধু মানবিক সমাজ গড়ার জন্যই নয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রেহাই পেতেও শোষণ লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থার উচ্ছেদ জরুরি।

এদিকে, বৈশ্বিক পুঁজিবাদের সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে। দেশে দেশে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের উত্থান হচ্ছে, বিপরীতে তীব্র হচ্ছে মানুষের লড়াই। আর বাংলাদেশে শুরু হয়েছে পাল্টাপাল্টি দ্বি-দলীয় ধারার অবসানের যুগ, যা নব্বইয়ের পর থেকে চলে আসছে। যে সময়ে জোর করে টানা তৃতীয় দফা ক্ষমতায় আসা এই সরকার নিয়মতান্ত্রিক ক্ষমতা হস্তান্তরের সকল পথ নিজেরাই বন্ধ করে রেখেছে। মধ্যরাতের কারসাজির ভোটে জিতে অন্যায়ভাবে ক্ষমতায় থাকার জন্য সরকার গুম-খুন-জেল-জুলুম নির্যাতনের মাধ্যমে একটা ভীতিকর পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে। সকলের মুখ বন্ধ করে এভাবেই গায়ের জোরে টিকে আছে। কিছু উপকারভোগী ছাড়া সরকারের জনসমর্থন তলানিতে। মানুষ বিক্ষুব্ধ, কিন্তু কথা বলার স্বাধীনতা নাই। দেশে চলছে ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন। সব মিলে সময়টি দাঁড়িয়ে আছে বড় একটা পরিবর্তনের মুখে, বলা চলে এটা একটা বিশেষ যুগ সন্ধিক্ষণ। এই সময়টি আমলে আনা ও করণীয় হাজির করা অতিশয় জরুরি ব্যাপার।
অপরদিকে, ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি এত শোষণ লুটপাট অন্যায় অপকর্ম ও গণবিরোধী কার্যকলাপে লিপ্ত ছিলো যে, বর্তমানের গণক্ষোভকে ধারণ করতে সম্পূর্ণ অক্ষম হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতি থেকে পরিত্রাণের জন্য সময় দাবি করছে বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থানের।

শুধু সরকার নয়, ক্ষয়রোগে ধরা পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থার পতন এখন একটি আঘাতের অপেক্ষা করছে। এই সময় দাবি করছে, এমন সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক কর্মসূচি, তাকে বহন করার মতো রাজনৈতিক শক্তি। যে শক্তিতে জেগে উঠতে পারে বিপুল জনগোষ্ঠী। সঠিক রাজনীতি থাকলে দল না থাকলেও দল গড়ে ওঠে। সেই রাজনৈতিক কর্মসূচি ও সেই রাজনৈতিক শক্তির উত্থান এখন ইতিহাসের দাবি। একমাত্র সেই শক্তির আঘাতেই ভেঙে পড়তে পারে শত শত বছর ধরে গড়ে ওঠা শোষণ ও লুণ্ঠনমূলক অপশক্তির শক্ত ভিত। সেই কর্মসূচির প্রতি মনোযোগী হওয়া এখন কাজের কথা।

বাংলাদেশের এই পরিস্থিতি হঠাৎ করেই সৃষ্টি হয়নি, এটা হলো পুনর্জীবিত হওয়া উপনিবেশিক শাসনপদ্ধতির ফলশ্রুতি। এই শাসনপদ্ধতিতে চলছে দেশীয় শাসকশ্রেণির সীমাহীন শোষণ, লুণ্ঠন ও দুর্বৃত্তায়ন। যার ওপর ভর করে জারি আছে সাম্রাজ্যবাদী শোষণ লুণ্ঠন, ভারতীয় আধিপত্য ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। বাংলাদেশ পর্বে যার যাত্রা শুরু হয়েছে বাহাত্তর সাল থেকেই, ব্রিটিশ শাসনের ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানের ফেলে যাওয়া পচাগলা উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের পুনরুজ্জীবনের মাধ্যমে।

একাত্তরের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধে ও স্বাধীনতা যুদ্ধে পাকিস্তানের জাতিগত শোষণ, লুণ্ঠন, নিপীড়ন ও বঞ্চনার বিরুদ্ধে যে মাত্রায় ক্ষোভ ঘৃণা ও লড়াই ছিল, সে তুলনায় একটি আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার আকাক্সক্ষা ছিল না, ছিল সেটা অতিশয় ক্ষীণ ধারায়। এ কারণে পাকিস্তানি লিগ্যাসি প্রত্যাখ্যান করার প্রচণ্ড আবেগ তৈরি হলেও, ব্রিটিশ উপনিবেশিক লিগ্যাসি ছুড়ে ফেলার কোনো আকাক্সক্ষা ছিল না। যার কারণে ইকবাল হলের নামকরণ জহুরুল হক হয়, জিন্না হলের নামকরণ সূর্যসেন হয় কিন্তু ‘কার্জন হল’ বহালই থেকে যায়। ব্রিটিশের উপনিবেশিক ও পাকিস্তানের আভ্যন্তরীণ জাতিগত নিপীড়ণের ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রের লিগ্যাসিকে প্রত্যখ্যান করে নিজেদের মতো একটি শোষণহীন আধুনিক রাষ্ট্র গড়ার বাসনা এতটাই দুর্বল ছিল যে, সেই দুর্বলতার সুযোগে এত যুদ্ধ এত রক্তপাতের পরেও পরাজিত ও পুরানো লিগ্যাসি বার বার ফিরে ফিরে আসে। এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উপনিবেশিক (ব্রিটিশ) ও আভ্যন্তরীণ জাতিগত শোষণ, লুণ্ঠন ও বঞ্চনার (পাকিস্তান) লিগ্যাসির ভাবাদর্শ। আর এদের গর্ভে জন্ম নেওয়া দুর্বৃত্তদের শাসন শোষণ লুণ্ঠন এখন ষোলোকলায় পূর্ণ।

আমরা জানি, মানুষের মধ্যে যত বেশি ক্ষোভ থাকে, শাসকদের পায়ের নিচ থেকে তত বেশি মাটি সরে যায়। উচ্ছেদ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। এ কারণে তারা ততবেশি প্রতিপক্ষ দমনে আগ্রাসী ও ফ্যাসিস্ট হয়ে ওঠে। ফ্যাসিস্টরা হত্যা খুন দমনপীড়ন করে টিকে থাকে, নতুবা জনরোষে উচ্ছেদ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়। শেষ নিঃশ্বাস থাকা পর্যন্ত তারা দমনপীড়ন চালাতেই থাকে, এতটুকুও বিরতি দেয় না। বর্তমান শাসকশ্রেণির এর ব্যতিক্রম নয়। উপরন্তু প্রতিপক্ষকে দমন-উচ্ছেদ করেও যখন পার পায় না, তখন বাঁচার জন্য আশ্রয় নেয় এমন স্পর্শকাতর বিষয় ও প্রত্যয়ের ওপর, যা নিয়ে মানুষের আবেগ অনুভূতি জড়িয়ে থাকে। যেমন মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্ম। এই সরকারও বাঁচার জন্য কখনো মুক্তিযুদ্ধের কাছে, কখনো ধর্মের আশ্রয় নিয়ে থাকে। সাধারণ মানুষ সরকারের এই গণধোঁকা বুঝে ফেলেছে। মানুষ মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী ভাষ্য প্রত্যাখ্যান করে এর গণভাষ্য নির্মাণ করতে চায়।

অবৈধ সুবিধা নেওয়ার জন্য জনসমর্থন শূন্যের কোটায় থাকা বর্তমান সরকারকে জানপ্রাণ দিয়ে রক্ষা করে যাচ্ছে পদস্থ সামরিক বেসামরিক আমলা, বিচারপতি ও বিচারক, পুলিশ কর্মকর্তা, গণমাধ্যমের কর্মকর্তা আর উচ্ছিষ্টভোগী বুদ্ধিজীবীরা। এরা কাজটি করছে রাষ্ট্র ও সরকারের পার্থক্য সম্পূর্ণ ঘুচিয়ে ফেলে। আওয়ামী বশংবদ বুদ্ধিজীবী এবং অনুগত কবি সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের ধারাটি বাংলাদেশে খুবই শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। এদের বড় অংশ এসেছে এক সময়কার বামপন্থীদের ভেতর থেকে। এরা প্রগতিশীলতার ভড়ং দেখায়। সরকারকে রক্ষার জন্য ধর্মনিরপেক্ষতা ও মুক্তিযুদ্ধের দোহাই দেয় আর জঙ্গি জুজুর ভয় দেখায়। সরকার রক্ষার নানা চমকপ্রদ কৌশল বের করতে এরা সিদ্ধহস্ত। আওয়ামী লীগ যত অপরাধই করুক, তার বিরুদ্ধে যাওয়ার মতো নৈতিক শক্তি-সাহস ও মেধার জোর নেই সরকারের উচ্ছিষ্ট খাওয়া এই লেখক বুদ্ধিজীবীদের। বরং তাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগে এই পোষমানারা। এরাই ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শিক খুঁটি। এ ব্যাপারে পুরোপুরি নির্ভার হয়ে সরকার একবার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে ধর্মীয় শক্তিকে, আরেকবার পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে মেকি ধর্মনিরপেক্ষবাদীদের। সরকার জানে যে, এদের কোনো অংশই শাসকদের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াবে না। এদের স্বরূপ উন্মোচনের কাজটি বকেয়া পড়ে আছে। পকেটে থাকা এই দুই শক্তিকে সরকার নিজেই মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেশে একটা কৃত্রিম দ্বন্দ্বের পরিবেশ তৈরি করে। কখনো নাস্তিক-আস্তিক দ্বন্দ্বে, কখনো স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষের দ্বন্দ্বে। এধরনের আরো কৃত্রিম দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করার জন্য সরকারের বহু লোক বসে আছে। এসব কারণে শোষণ লুণ্ঠন হত্যা খুন ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে জনগণের লড়াই বিভ্রান্ত হওয়ার পরিবেশ তৈরি হয়। এ কাজে সরকার কখনো কখনো সফলও হয়। আর সরকার একই সঙ্গে ধর্মীয় শক্তি এবং তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ শক্তির সমর্থন জারি রাখতে পারে। যে ফাঁকি ও প্রতারণার কারণে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধ ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্গে ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের সহাবস্থান ঘটাতে সক্ষম হয়েছে, সেই প্রতারণা ও ফাঁকি উন্মোচন করা জরুরি। এজন্য মুক্তিযুদ্ধের নামে আওয়ামী আনুগত্য এবং মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তত্ত্বগত বিভ্রান্তিÑএই দুই-ই থেকে মুক্ত থাকা দরকার।

আমরা জানি, আঞ্চলিক আধিপত্যবাদী শক্তি ভারত, এশীয় পরাশক্তি চীন, বিশ্ব পরাশক্তি ও সাম্রাজ্যবাদের মোড়ল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং তার সঙ্গে শক্তিধর রাশিয়া নিজ নিজ স্বার্থের জায়গা থেকে সমর্থন দিয়ে সরকারকে টিকিয়ে রাখছে। আর সরকারের জনবিচ্ছিন্নতার সুযোগ নিয়ে তারা আদায় করে নিচ্ছে অন্যায় স্বার্থ, বাড়িয়ে দিয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও আধিপত্যের চাপ। সরকারের যোগসাজশে, যার যেখানে যতটুকু শক্তি ও সুযোগ আছে, তার সবটুকু ব্যবহার করে ব্যাপক লুটতরাজে তারাও অংশ নিচ্ছে সমানতালে। গণবিরোধী অবস্থানের কারণে সরকার এসব শক্তিশালী দেশের সঙ্গে যে কোনো বাণিজ্যিক ও কূটনৈতিক দরকষাকষির যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছে। এ কারণে ভারতের সঙ্গে আচরণ হয় দাসোচিত। সীমান্ত সমস্যা, বাণিজ্যিক বৈষম্য ও অভিন্ন নদীর পানি বন্টনের সমস্যা সমাধান হয় না। এক কোটির অধিক প্রবাসী মর্যাদার জীবন যাপন করতে পারেন না। শক্তিধরের সঙ্গে করতে হয় অমর্যাদাকর গণস্বার্থবিরোধী ও নতজানু চুক্তি। যা জনগণের সামনে প্রকাশ করতে ভয় পায় সরকার।

অন্যদিকে, প্রায় ২০ কোটি লোকের বাজার, দক্ষিণ এশিয়ার ওপর প্রভাব বিস্তারের ভূ-রাজনৈতিক গুরুত্ব, দেশের তেল-গ্যাস সহ প্রাকৃতিক সম্পদের কারণে বাংলাদেশ এখন শক্তিধর দেশগুলোর মৃগয়াক্ষেত্র। পদ্মার উজানে ভারত (ফারাক্কা) এবং ব্রহ্মপুত্র নদের উজানে চীন যখন বাঁধ দেয়, সরকার তখন অসহায় দর্শক। আত্মমর্যাদাহীন তাঁবেদারি পররাষ্ট্রনীতির কারণে চীন-ভারতের আগ্রাসী দ্বন্দ্বের ঘুটি এখন বাংলাদেশ। ভারতের ওপর নির্ভর করে এই অঞ্চলে আরো প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ কাজে লাগাতে মরিয়া মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ। অন্যায় স্বার্থ উদ্ধারে, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যবাদী শক্তিধর দেশগুলোর দ্বন্দ্বে, বাংলাদেশ হতে চলেছে বলির পাঁঠা। বাংলাদেশের মানুষ এই পরিস্থিতির শিকার হতে চায় না। জনসম্মুখে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন ও ভারতের সঙ্গে সম্পাদিত সরকারের সকল চুক্তি ও সমঝোতা প্রকাশ, অসম্মানজনক চুক্তি ও সমঝোতা বাতিলের দাবিতে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা বাংলাদেশের মানুষ আত্মমর্যাদাশীল পররাষ্ট্রনীতি চায়, তারা পরাশক্তির দাবার ঘুঁটি হতে চায় না। তারা দাসোচিত সম্পর্কের জায়গা থেকে বের হতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচতে এই ফ্যাসিবাদী শোষণ নিগড় থেকে বের হতে চায়।

বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থাকে বুর্জোয়ারাই প্রত্যাখ্যান করে : এই উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় যতটুকু অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়া সম্ভব, নানা সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতাসহ সেটা সংঘটিত হয়েছিল একানব্বইয়ের নির্বাচনে। কারণ ওই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল গণঅভ্যুত্থানের পটভূমে। এছাড়া অতীতের কোনো নির্বাচনই অন্তত একানব্বইয়ের মতো সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ হয়নি। এরপর এদেশে কোনো দিনই স্বাভাবিক নির্বাচনের মাধ্যমে নিয়মতান্ত্রিক পথে ক্ষমতা হস্তান্তরের ইতিহাস নেই। তবু সেই নির্বাচনকে সূক্ষ্ম কারচুপি বলেছিলেন শেখ হাসিনা। এরপর ভোট ও ভাতের অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ১৯৯২-৯৬ সালে আওয়ামী লীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তুলেছিল। এতে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, বরং নব্বইয়ের অভ্যুত্থানে অর্জিত গণতন্ত্রটুকু আওয়ামী লীগ নিজেই হরণ করে নেয়।

১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও প্রশাসন যন্ত্রের মাধ্যমে পেশীশক্তির প্রয়োগ করা হয়েছিল। তখন কুমিল্লার মুরাদনগরে সম্ভাব্য বিজয়ী প্রার্থী ছিলেন জাসদের ইঞ্জিনিয়ার আব্দুর রশিদ। ওই আসনের ব্যালট বাক্স নিরাপত্তার নামে হেলিকপ্টারে বঙ্গভবনে এনে গণনা করে আওয়ামী লীগ নেতা খন্দকার মোশতাক আহমেদকে বিজয়ী দেখানো হয়। একই বছরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তখনকার জাসদ ছাত্রলীগের ভিপি প্রার্থী আ ফ ম মাহবুবুল হকের নিশ্চিত বিজয় বানচাল করার জন্য ডাকসু নির্বাচনের ব্যালেট বাক্স হাইজাক করা হয়েছিল। একইভাবে আওয়ামী লীগ নেতা তাহের উদ্দিন ঠাকুরকেও জোর করে জিতিয়ে আনা হয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার একটি আসন থেকে। বরিশালের একটি আসন থেকে জেতা জাসদের মেজর জলিল এবং আরেকটি আসন থেকে জেতা রাশেদ খান মেননকেও পরাজয় দেখানো হয়। বিরোধী দলগুলো বড় জোর ২০ থেকে ২৫টি আসন পেত, সেটাই আওয়ামী লীগ মেনে নিতে পারেনি। সামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানের শাসনকালে ১৯৭৯ সালের দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়াও গণভোট (হ্যাঁ/না ভোট) নেওয়া হয়েছিল। সেখানে গণনা অনুযায়ী নয়, শাসকশ্রেণির আকাক্সক্ষা অনুযায়ী ফলাফল দেখানো হয়। স্বৈরাচার এরশাদের শাসনামলে তৃতীয় ও চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছিল টাউট-বাটপাড়দের গায়ের জোরে জিতিয়ে আনার পদক্ষেপ। ১৯৯৩ সালের ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিরপুরে একটি আসনে এবং ১৯৯৪ সালের ২০ মার্চ মাগুরার একটি আসনের উপনির্বাচনে বিএনপি সরকার আওয়ামী লীগের প্রার্থীকে জোর করে হারিয়ে দিয়েছিল বলে অভিযোগ করে আওয়ামী লীগ। এ কারণে ১৯৯৪ সালের ২৭ জুন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াত মিলে যৌথ সংবাদ সম্মেলন করে নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি জানায় এবং সেই সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। এজন্য ১৯৯১ সাল থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত হরতাল হয় ১৭১ দিন। ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মাত্র ২১ শতাংশ ভোট পড়েছিল, প্রায় ভোটারবিহীন এবং বিরোধীদলবিহীন একতরফা নির্বাচন করে বিএনপি পায় ২৭৮টি আসন, তাতেও শেষরক্ষা হয় না। খালেদা জিয়া পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এই সংসদের মেয়াদ ছিল ১১ দিন। ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় চার মাস পরে বিচারপতি মুহম্মদ হাবিবুর রহমানকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ২২ জুন এক সংবাদ সম্মেলন করে খালেদা জিয়া সেই নির্বাচন সম্পর্কে ‘পুকুর চুরি’র অভিযোগ তোলেন। এরপর ২০০১ সালের ২ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়, তখন ‘স্থূল কারচুপির’ অভিযোগ তুলে শেখ হাসিনা সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করার ঘোষণা দেন।

দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অবাধ ও সুষ্ঠু হবে না, এমন অভিযোগে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচন বর্জন করে বিএনপি। ভোটারবিহীন একতরফা নির্বাচনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ ছাড়াই, শরীক দলগুলোকে কয়েকটি আসন খয়রাত করে, একতরফা ভাবে সকল আসনে জয় পায় আওয়ামী লীগ। এরপর ২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বরে মধ্যরাতের কারসাজির নির্বাচনে টানা তৃতীয় দফায়  ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনার সরকার। অর্থাৎ এদেশে সকল নির্বাচনের ব্যাপারেই ঘোরতর আপত্তি তুলে বুর্জোয়াদের বিরোধী অংশই সেটা প্রত্যাখ্যান করে। বর্তমান স্বৈরতান্ত্রিক সংবিধান ও অগণতান্ত্রিক আইনকানুনের বদৌলতেই এ রকম জোরজবরদস্তিমূলক নির্বাচন করে পার পাওয়া যায়, ক্ষমতায় থাকা যায় এবং তার পাকা ব্যবস্থাও করতে পারছে শাসকশ্রেণির দলগুলো।

মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী ভাষ্য বনাম গণভাষ্য : মুক্তিযুদ্ধে মানুষের আবেগ অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে আর আগের মতো শোষণ লুটতরাজ হত্যা ও নির্যাতনমূলক শাসন জারি রাখা এই সরকারের পক্ষে দুঃসাধ্য হয়ে পড়ছে। মানুষ ‘মুক্তিযুদ্ধের আওয়ামী বয়ান’ প্রত্যাখ্যান করেছে। এর বিপরীতে মুক্তিযুদ্ধের গণভাষ্য নির্মানের প্রয়োজনীয়তা মানুষ ক্রমশ উপলব্ধি করা শুরু করেছে।
কারণ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ কেবল ৯ মাসের সামরিক তৎপরতা নয়। জাতীয় মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতাযুদ্ধ হলো রক্তপাতময় রাজনীতি। প্রথমদিকে যে রাজনীতি গড়ে উঠেছিল ষাটের দশকে বামপন্থী ছাত্র সংগঠনের তৎপরতায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে গড়ে ওঠা বিপ্লবী তরুণ প্রজন্মের হাত ধরে। তার আগে ১৯৫৭ সালের কাগমারি সম্মেলনে মওলানা ভাসানীর ‘স্লামালেকুম’- সেই স্বাধিকার আন্দোলনের পথ ধরে যার যাত্রা শুরু হয়। ’৬৬ তে কমিউনিস্ট পার্টির বিভাজন, বিভক্ত পার্টির উভয়াংশের জাতীয় সংগ্রাম ও শ্রেণিসংগ্রামের মধ্যে মেলবন্ধন ঘটানোর ব্যর্থতা, পরবর্তীতে সামরিক স্বৈরাচার আইয়ুব খান সম্পর্কে একাংশের নমনীয়তা এবং মুক্তিযুদ্ধে লেনিনীয় করণীয় নির্ধারণে ব্যর্থতা বামপন্থীদের সেই স্বাধিকার আন্দোলনের উজ্জ্বলতা ফিকে হতে থাকে। অপরদিকে বামপন্থীদের স্বাধিকারের আন্দোলনের ফসল গ্রাস করতে থাকে ৬৬’র ছয় দফার আন্দোলন।

অপরদিকে, বাষট্টিতে গড়ে ওঠা ছাত্রলীগের নিউক্লিয়াসপন্থীদের তৎপরতায় স্বাধীনতার রাজনীতি নতুন করে প্রাণ পায়। ছাত্রলীগের এই অংশটিই শেখ মুজিবুর রহমানের কাল্ট গড়ে তোলে এবং তার মাধ্যমেই আওয়ামী লীগকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বে প্রতিস্থাপন করে। এরাই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১১ দফার ভিত্তিতে, পুরো ছাত্রসমাজের মাধ্যমে ছয় দফাকে জনগণের কাছে নিয়ে যায়। ছয় দফা নিয়ে প্রথম হরতাল সফল করে ছাত্রলীগের এই অংশই। এমনকি নিউক্লিয়াসের নেতৃত্বই আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির মিটিংয়ে ছয় দফাকে অনুমোদন দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করে সফল হয়।

আওয়ামী লীগের সুবিধার দিক হলো, শেখ মুজিবুর রহমান যেভাবেই হোক, ছয় দফার মতো একটি বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক কর্মসূচি হাজির করতে সক্ষম হয়েছিলেন। ষাটের দশকের উত্তাল সময়কে বামপন্থী ছাত্র-তরুণরা নির্মাণ করতে সক্ষম হলেও, জাতিগত নিপীড়নের বিরুদ্ধে কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি বিভক্ত কমিউনিস্টদের কোনো দল বা ধারা জনগণের সামনে হাজির করতে সক্ষম হননি। এই বাস্তবতায় শেখ মুজিবুর রহমানের উত্থাপিত ছয় দফা উত্তাল ষাটের দশকে প্রবল মুক্তি আকাক্সক্ষী জনগোষ্ঠীর সামনে একটি রাজনৈতিক দিশা হিসাবে উপস্থাপিত হয়। স্বভাবতই সকল ধারার আন্দোলনের সকল অর্জন গিয়ে জমা পড়ে শেখ মুজিবুর রহমানের ৬ দফার ঝুলিতে। যার ধারাবাহিকতায় ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান পরবর্র্তীতে সত্তরের নির্বাচনের ভূমিধস বিজয় শেখ মুজিবুর রহমানকে বিশালাকার রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বে পরিণত করে। আন্দোলন যারাই করুক, যুদ্ধে যারাই অংশ নিক, বাস্তবতা হল শেখ মুজিবের নামে ও নেতৃত্বেই দেশ স্বাধীন হয়।

মুক্তিযুদ্ধে স্পষ্টতই দুইটি ধারা বিদ্যমান ছিল ১. কমিউনিস্ট ধারা ২. বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারা। কমিউনিস্ট ধারা ছিল বিভক্ত ও তত্ত্বগত জটিলতায় নিমজ্জিত। আর তাদের চেয়ে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারা ছিল সংহত ও ঐক্যবদ্ধ। তাদের পক্ষে ছিল রাজনৈতিক ও সামরিক দিক থেকে ভারতের এবং রাশিয়ার আন্তর্জাতিক সহযোগিতা। বামপন্থীরা জানপ্রাণ দিয়ে স্বাধিকার ও স্বাধীনতার রাজনৈতিক জমিন প্রস্তুত করলেও, দিন শেষে তা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারার ঝুলিতেই জমা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের তেমন অংশ গ্রহণ না থাকলেও, নেতৃত্বটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল শেখ মুজিবের। এভাবেই মুক্তিযুদ্ধে বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারা প্রধান রাজনৈতিক ধারায় পরিণত হয়।

অপরদিকে, পূর্ববাংলায় ক্রিয়াশীল সহযোগী কমিউনিস্ট পার্টিকে এড়িয়ে সেই সময়ে ইন্দিরা মুজিব বলয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পাশে দাঁড়ায় তখনকার সোভিয়েত ইউনিয়ন। রুশপন্থী বলে পরিচিত কমিউনিস্টরা সেখানে অনুঘটকের কাজ করে মাত্র।
অপরদিকে, রাশিয়ার সঙ্গে বিরোধের জের ধরে গণচীন বাংলাদেশের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের বিপক্ষে অবস্থান নেয়। এর প্রভাব পড়ে চীনপন্থী নামে পরিচিত কমিউনিস্টদের আরেকাংশের ওপর।

আওয়ামী লীগের ধারার মুক্তিযুদ্ধে সহযোগিতার মাসুল ভারত কড়াগণ্ডায় আদায় করছে প্রায় অর্ধশতক ধরে। মুক্তিযুদ্ধে ও স্বাধীনতাযুদ্ধে ‘সহযোগিতা’র মূল্য আদায় করতে ভারত দিয়েছে সীমান্ত হত্যা, বঞ্চিত করেছে পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে আর চাপিয়ে দিয়েছে অন্যায় চুক্তি ও বাণিজ্যিক বৈষম্য। বাংলাদেশ এখন ভারতের শিক্ষা চিকিৎসা ও পণ্যের প্রতিযোগিতাহীন বাজার। আর এর সঙ্গে বজায় রয়েছে ভারতের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্য।
মুক্তিযুদ্ধে বিভক্ত কমিউনিস্টদের অধিকাংশ গ্রুপের ছিল বিভ্রান্তিমূলক তত্ত্বগত অবস্থান। যা তাদের কর্মীদের অসীম সাহস ও অপ্রতিরোধ্য আকাক্সক্ষাকে দমিয়ে রাখে। এত বিভক্তি ও এত বিভ্রান্তি সত্ত্বেও এসব হতোদ্যম বামপন্থার সম্মিলিত সামরিক তৎপরতা ছিল অপরিমেয়। বরিশালের পেয়ারা বাগানে গেরিলা ঘাটি গড়ে তুলে সিরাজ সিকদারের প্রতিরোধ যুদ্ধ, নরসিংদীর শিবপুরে কাজী জাফর, মান্নান ভূঁইয়া, রুমি, জুনোদের যুদ্ধ; সিরাজগঞ্জে পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির ইসমাইল গ্রুপের নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধ, চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলায় পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির স্থানীয় নেতা কমরেড আহমদ হোসেনের নেতৃত্বে প্রথম মুক্তিযুদ্ধ শুরুর ঘটনার ওপর আলো পড়েনি। এছাড়া টাঙ্গাইল, নোয়াখালী, যশোর, নড়াইল, খুলনা সাতক্ষীরায় প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছে। এসব এলাকায় কোথাও কোথাও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি, কোথাও কোথাও পূর্ব বাংলা সর্বহারা পার্টি ও কোথাও কোথাও পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে প্রতিরোধ যুদ্ধ হয়েছে। এমন অসংখ্য ঘটনা এখনো চাপা পড়ে আছে, তেমন আলোচনায় আসেনি। কুমিল্লার বেতিয়ারায় ন্যাপ সিপিবি ছাত্র ইউনিয়নের মুক্তিযোদ্ধারা পাক বাহিনীর হাতে শহীদ হন। রাজশাহী অঞ্চলে যুদ্ধ করেছে মাইতি গ্রুপ। এছাড়া কমিউনিস্ট পার্টির হাতিয়ার গ্রুপও যুদ্ধ করেছে। ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে মুক্তিযোদ্ধারা ফেরার আগে অন্তত ছয় মাস দেশে প্রতিরোধ যুদ্ধ জারি রেখেছিল বামপন্থী কমিউনিস্টরাই। ছাত্র ইউনিয়নের উভয় গ্রুপ, ন্যাপ, কমিউনিস্টদের বিভিন্ন গ্রুপ দলীয় পরিচয় অগ্রাহ্য করে সাধারণ মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সাহসের সঙ্গে যুদ্ধ করেছে। এছাড়া ভারত ফেরত মুক্তিযোদ্ধাদের কমিউনিস্টবিরোধী অবস্থানের কারণে বামপন্থীদের জাতীয় মুক্তিযুদ্ধের মূলস্রোতে ভূমিকা রাখা দুরূহ হয়ে উঠে। এসব নিয়ে এখনো বিস্তৃত গবেষণার দাবি রাখে। মুক্তিযুদ্ধের এসব ভাষ্য এখনো নির্মিত হয়নি।

অপরদিকে, জাসদের স্বপক্ষ ত্যাগ; মেনন, দীলিপ বড়ুয়া ও ন্যাপের সরকারে যোগদান, বিএনপি জামাত মোকাবেলা আর মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তির নামে আওয়ামী লীগের প্রতি কমিউনিস্টদের একটি পরিচিত অংশের নমনীয়তা ও দুর্বলতা, সরকারের বিরুদ্ধে তাদের কার্যকর লড়াই গড়ে তুলতে অনীহা, সর্বোপরি কমিউনিস্টদের ক্ষয়িষ্ণু অবস্থানের কারণেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামী লীগের একচ্ছত্র প্রভাব তৈরি হয়েছে, তারা এখন যা বলছে, তা-ই সত্য হয়ে যাচ্ছে। হেফাজতের মতো চরম সাম্প্রদায়িক ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির পৃষ্ঠপোষক হয়েও আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নহীন থাকছে।

টিকে থাকার আরেক প্রয়াস : শোষণ লুটতরাজ নির্যাতনে শুধু মুক্তিযুদ্ধকে ব্যবহার করে আর সুবিধা করতে না পেরে এখন ঝুঁকে পড়ছে ধর্মভিত্তিক দলগুলোর প্রতি। কব্জায় এনেছে হেফাজতে ইসলামকে। অপরদিকে, ধর্মীয় সাম্প্রদায়িক শক্তি এগিয়ে এসেছে সরকারকে রক্ষা করার জন্য। দলে দলে জামায়াতের লোকজন ও উগ্র ইসলামপন্থীরা আশ্রয় নিয়েছে আওয়ামী লীগের ছায়াতলে। মুক্তচিন্তার মানুষকে হত্যা ও হত্যাচেষ্টার সুযোগ দিয়ে, পাঠ্যপুস্তক থেকে হিন্দু ও প্রগতিশীলদের লেখা বাদ দিয়ে, দাওরায়ে হাদিসকে মাস্টার্সের মর্যাদা দিয়ে ধর্মীয় ফ্যাসিস্টদের কাছে গ্রহণীয় হওয়ার চেষ্টা করে চলেছে সরকার।

অপরদিকে, বাঁচার শেষ দাওয়ায় হিসেবে রুই কাতলাকে আড়াল করে, কখনো অপরাধের দায়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া এমপি মন্ত্রীদের, কখনো ক্যাসিনোকাণ্ডে জড়িতদের এবং কখনো নিম্নপর্যায়ের দুর্নীতিবাজ ও দলের দুর্নীতিবাজদের ধরপাকড় শুরু করে সরকার। এতে একদিকে জনরোষকে প্রশমিত করা যায় অপরদিকে রুই কাতলা দুর্নীতিবাজ ও লুটেরা গোষ্ঠী আড়াল থাকে।

ভাল খারাপের সমীকরণ : সরকারের অপকর্ম ঢাকার জন্য একটা সমীকরণ আছে। এটা সরকারকে রক্ষার আরেক কৌশল। যে কৌশলটি আওয়ামীপন্থী বুদ্ধিজীবী, আওয়ামী অনুগত মিডিয়া এমনকি আওয়ামী লীগের প্রতি সহানুভূতিশীল একশ্রেণির বামপন্থীরা হরহামেশায় প্রয়োগ করে। সরকারের নানা অংশের গণবিরোধী ও গণধিকৃত কর্মকান্ডকে বিচ্ছিন্ন করে দেখানো হয়। সব সময় দলকে, দলের শীর্ষ নেতৃত্বকে বিতর্কের ঊর্ধে রাখা হয়। সেটা প্রমাণে সক্ষম না হলে বলা হয় শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগ খারাপ, শেখ মুজিবের আওয়ামী লীগ ভালো। এটা সরকারের গণবিরোধী চরিত্রকে ঢেকে রাখার আরেক প্রয়াস এবং আওয়ামী দুঃশাসনের অন্যতম রক্ষাকবজ।

সংকটের উৎসের সন্ধান : সংক্ষেপে বর্ণিত বাংলাদেশের এই রাজনৈতিক সংকট সাধারণভাবে বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত বাংলাদেশের সাংবিধানিক সংকট এবং একই সঙ্গে দেশীয় পুঁজিবাদ বিকশিত না হওয়ার সংকট। এসব সংকট একটার সঙ্গে আরেকটা গভীরভাবে সম্পর্কিত, পরস্পরের পরিপূরক। বাংলাদেশের মতো ব্যাপকহারে অর্থ পাচার, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম-খুন, চুরিচামারি, ব্যাপকহারে ঘুষ-দুর্নীতি, লুটপাট, অযোগ্যদের দায়িত্বপূর্ণ স্থানে বসানো, অনিয়ম, লুটতরাজ, অপচয়, কালাকানুন ও আমলাতন্ত্র উন্নত পুঁজিবাদী দেশে দৃশ্যমান নয়। বাংলাদেশে এসব গণবিরোধী ও দেশবিরোধী কার্যকলাপ চলে আইনগত কাঠামোর মধ্যেই। যা ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনকাঠামোরই অনুসঙ্গ। উপনিবেশিক শাসকরা এই আইন ও রাষ্ট্র কাঠামো তৈরি করেছিল ব্যাপকহারে শোষণ ও লুটপাট এবং এদেশ থেকে সম্পদ পাচার করার জন্য। সেই কাজের উপযোগী আইনকাঠামো ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা তৈরি করেছিল। সেটাই দুই দুইবার স্বাধীনতা, এত উত্থানপতন, গণঅভ্যুত্থানের পরও বহাল রয়েছে। তাই সেই রাষ্ট্রের কর্ণধার হিসেবে আমাদের শাসকদের চরিত্র দেশদ্রোহীর মতো হয়। এ সবই শাসনতান্ত্রিক সংকট। এই রাষ্ট্রব্যবস্থা ও আইনকাঠামোর মধ্যে পুঁজির সুষম বিকাশ হয় না, এমন পরিস্থিতির মধ্যে পুঁজির বিকাশ হয় বেদনাদায়ক (চধরহভঁষষ) পথে। তাই উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ রাষ্ট্রে যেমন স্বাভাবিক পথে সুষমভাবে পুঁজির বিকাশ সম্ভব হয় না, তেমনি গড়ে ওঠে না ন্যূনতম গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ বিশ্ব পুঁজিবাদের সাধারণ সংকট এবং একই সঙ্গে দেশীয় পুঁজিবাদ বিকশিত না হওয়ার সংকট- বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে।

বাংলাদেশের রাষ্ট্র হলো সীমাবদ্ধতাসহ অনুন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। আরো সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্র হল উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ অনুন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট হল সাধারণভাবে বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকট। এর সঙ্গে যুক্ত উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের সংকট। আমাদের জন্য উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের শাসনতান্ত্রিক সংকটের সমাধানই বিশ্ব পুঁজিবাদের সংকট মোকাবিলার বাস্তবোচিত পথ।

গণতন্ত্র বিনির্মাণে ব্রিটিশ উপনিবেশবাদের ফাঁকি : বাংলাদেশে বাহাত্তরের সংবিধানের মাধ্যমে উপনিবেশিক রাষ্ট্রের পুনরুজ্জীবন ঘটেছে। ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসকেরা তার শোষণ ও লুটতরাজের স্বার্থেই, তাদের সুবিধামতো সীমাবদ্ধ গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছিল। সেটা ফলাও করে প্রচারে আনলেও তাদের আসল উদ্দেশ্য ছিল লুটতরাজ। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্রিটেন ১৭৬৫ থেকে ১৯৩৮ সালের মধ্যে অর্থাৎ ১৭৩ বছরে উপমহাদেশ থেকে ৯ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন পাউন্ড (৪৫ ট্রিলিয়ন ডলার) লুটপাট করে নানাভাবে পাচার করে নিয়ে গেছে। বাংলায় দুইটি দুর্ভিক্ষ ‘উপহার’ দেয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ, যেখানে দুই বাংলা মিলে সোয়া কোটি লোকের প্রাণহানি ঘটে। আইন করেই ব্রিটিশ তাদের লুটপাট, অর্থ পাচারসহ যাবতীয় অপকর্ম করত, বেআইনি পথে নয়। একদিকে আইনের প্রতি শ্রদ্ধা করতে শেখাতো এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার কথা বলত নানাভাবে। আর আরেকদিকে আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাবোধের ফাঁক দিয়ে, আইনের নামেই চালাত লুটপাট। আইনের ফাঁক দিয়ে অবাধ লুটতরাজের এই পদ্ধতি পুণর্বহাল থাকার কারণে কোনো ব্রিটিশ কলোনিতে স্বাধীনমতো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দাঁড়ায়নি, পৃথিবীর কোনো ব্রিটিশ কলোনিতেই সফল হয়নি সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। ব্রিটিশরা ‘ভারতীয়দের আধুনিক করতে’ এসেছে বলেও একটা ধারণা পাকাপোক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এমনকি ব্রিটিশ শাসনের উপকারভোগী বহু দেশীয় বুদ্ধিজীবী কবি সাহিত্যিক লেখক এই ধারণা তৈরি করার জন্য জানপ্রাণ দিয়ে খেটে গেছেন। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও এর বাইরে নন। এখনো ইতিহাসের এই ধারাটিই প্রধান, শক্তিশালী ও প্রভাবশালী। এই ধারণার পক্ষে কিঞ্চিত বাস্তবতা থাকলেও সত্যটা হলো এটাই যে, ব্রিটিশ আসার বহু আগেই উপমহাদেশে নালন্দা মহাবিহারের মতো বিশ্ববিদ্যালয় ছিল, যেখানে সেই সময়েই ১২ হাজার শিক্ষার্থী লেখাপড়া করত। গ্রিস, ইন্দোনেশিয়া, থাইল্যান্ড, চীন, জাপান, তিব্বতসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে সেখানে শিক্ষার্থীরা আসতেন জ্ঞানার্জনের জন্য। এক সময় নালন্দা মহাবিহারের মহাচার্য ছিলেন বাঙালী পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর। প্রতিটি বৌদ্ধবিহারই ছিল জ্ঞানচর্চার পীঠস্থান। গণিতে শূন্যের ব্যবহার শিখিয়েছে উপমহাদেশ। ব্রিটিশ আসার আগেই এদেশে লন্ডনের চেয়েও নদী-কেন্দ্রিক জাঁকজমকময় নগর গড়ে উঠেছিল। ঢাকার মসলিনের কদর ছিল বিশ্বব্যাপী। সুপ্রাচীন সিন্ধু সভ্যতার উত্তরাধিকার বহন করত ভারতবর্ষ, এমনকি বাংলা। ব্রিটিশ আসার আগেই বাংলার সঙ্গে চীন ও আফ্রিকার নৌবাণিজ্যের প্রমাণ মেলে। কার্ল মার্কস ভারতবর্ষকে তাদের ভাষা ও ধর্মের উৎসভূমি বলে অভিহিত করেছেন। অষ্টম শতাব্দীর শেষ ও নবম শতাব্দীর শুরুর দিকে মধ্য এশিয়ায় মোহাম্মদ ইব্ন মুসা আল খোরজমী রচনা করেন তার বিখ্যাত গণিতশাস্ত্র ‘আল জব্র’। যেখান থেকেই অ্যালজেব্রা শব্দের উৎপত্তি। গণিতবিদ ছাড়াও তিনি ছিলেন জ্যোতিবিজ্ঞানি, ভূগোলবিদ ও ইতিহাসবেত্তা। ভারতীয় বীজগণিত ও গ্রীক জ্যামিতির সংশ্লেষ ঘটেছে তার সৃষ্টিতে। সেটাই বর্তমানকালের আধুনিক গণিতবিদ্যার ভিত্তিস্থল। এই ভূখণ্ডে নিজেদের মত আধুনিকতা নির্মানের এমন বহু ঐতিহ্য, বহু উপাদান, বহু শর্ত ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।

ব্রিটিশ অনুগতরা যতই বলুক, সত্যটা হল এটাই যে, ব্রিটিশ আমাদের যে আধুনিকতা দিয়েছিল, সেটা ছিল আধুনিকতার অনুকৃতি। সেটা ছিল উপনিবেশিক আধুনিকতা। যে আধুনিকতা দিয়ে সমাজতন্ত্র তো দূরের কথা, বুর্জোয়া গণতন্ত্র নির্মাণও করা সম্ভব নয়। কারণ ‘বুর্জোয়া শ্রেণি নিজের ছাঁচে জগৎ গড়ে তোলে’। সেই জগৎ বুর্জোয়া জগৎ নয়, সেখানে পাওয়া যাবে বুর্জোয়াদের ঠাঁট। আমাদের প্রয়োজন উপমহাদেশের আধুনিকতার নতুন ভিত্তি নির্মাণ, যে আধুনিকতার মধ্যে শুধু মানুষই নয়, প্রকৃতিও সুরক্ষিত থাকবে। এজন্যই বাহাত্তরের সংবিধানের মাধ্যমে পুনর্জীবিত হওয়া উপনিবেশিক রাষ্ট্রের অবসান ঘটিয়ে একটি সমাজতন্ত্র অভিমুখী জনবান্ধব ও প্রকৃতিবান্ধব আধুনিক সমাজ নির্মান এখন সময়ের দাবি।

আধুনিকতা বনাম উপনিবেশিক আধুনিকতা : ইউরোপের বিশেষত পশ্চিম ইউরোপে যেভাবে আধুনিক পুঁজিবাদী বুর্জোয়া সমাজ ও রাষ্ট্র এবং সেই সঙ্গে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল, সেভাবে বাংলাদেশ সহ উপমহাদেশে গড়ে উঠেনি। ইউরোপে গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের ভিত্তি ছিল রেঁনেসাস (জবহধরংংধহবপ) ও আলোকায়ন (ঊহষরমযঃবহসবহঃ)। আর আমাদের এখানে গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সংঘটিত হয়েছিল উপনিবেশিকতার হাত ধরে আর জাতীয় সংগ্রাম ও শ্রেণি সংগ্রামের প্রভাবে। উপরন্তু ক্ষমতাসীন বুর্জোয়া শাসকশ্রেণি তাদের শাসন নিষ্কন্টক রাখার জন্য সে সব জাতীয় সংগ্রাম ও শ্রেণি সংগ্রামের গণতান্ত্রিক অর্জনগুলো ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। এ কাজে শাসকদের জন্য সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র হল ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। মসজিদ, মন্দির, মক্তব, মাদরাসা ও গোরস্তানের জন্য কাঁড়ি কাঁড়ি টাকা ঢালে ভোটের জন্য। উপনিবেশিকতার হাত ধরে আসা পুঁজিবাদ নিজেই বিকশিত হচ্ছে উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ রাষ্ট্রের নানা জটিলতা ও সীমাবদ্ধতার মধ্যদিয়ে। এসব শাসকশ্রেণির ওপর ভর করেই জারি আছে সাম্রাজ্যবাদের শোষণ লুণ্ঠন, আঞ্চলিক আধিপত্য ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ। যে কাজটি ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসকশ্রেণি করত বাইরে থেকে এসে, একই কাজ একই রাষ্ট্রকাঠামোতে দেশীয় শাসকশ্রেণি করছে দেশের ভেতর থেকেই। যে কারণে ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসকদের উচ্ছেদ করা হয়েছে, একই কারণে দেশীয় শাসক শ্রেণিকেও উচ্ছেদ করা জরুরি হয়ে পড়েছে। এই শাসকশ্রেণি বুর্জোয়াশ্রেণিই দেশের জনগণের বিশেষত মেহনতি জনগণের প্রধান প্রতিপক্ষ। সেই সঙ্গে উচ্ছেদ করতে হবে এই উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। এদের উচ্ছেদের ধারায় দেশে জোরদার হতে পারে আধুনিক সমাজ নির্মাণের আয়োজন। জয়যুক্ত হতে পারে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন।

কীভাবে একটি স্বাধীন দেশের সংবিধানে উপনিবেশিক রাষ্ট্রের পুনরুজ্জীবন ঘটল : বাংলাদেশের সংবিধানকে বার বার পরিবর্তন করে তাকে আরো স্বৈরতান্ত্রিক ও আরো অগণতান্ত্রিক রূপ দেওয়া হয়েছে। তা সত্ত্বেও বাংলাদেশের সংবিধানকে আলোচনার স্বার্থে আমরা এখানে ‘বাহাত্তরের সংবিধান’ বলেই অভিহিত করছি।

বাহাত্তরের সংবিধানের একাদশ ভাগে অর্থাৎ একেবারে শেষ দিকে একটি প্রায় অনুল্লেখ্য অনুচ্ছেদ হলো ১৪৯। যাতে বলা হয়েছে-“এই সংবিধানের বিধানাবলী সাপেক্ষে সকল প্রচলিত আইনের কার্যকারিতা অব্যাহত থাকিবে, তবে অনুরূপ আইন এই সংবিধানের অধীন প্রণীত আইনের দ্বারা সংশোধিত বা রহিত হইতে পারিবে।”

‘প্রচলিত আইন’ অর্থ এই সংবিধান প্রবর্তনের অব্যবহিত পূর্বে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সীমানায় বা তার অংশবিশেষে আইনের ক্ষমতাসম্পন্ন কিন্তু কার্যক্ষেত্রে সক্রিয় থাকুক বা না থাকুক, এমন যে কোনো আইন। অর্থাৎ সংবিধানটি গৃহীত হওয়ার পূর্বে যা ছিল, সংবিধান গৃহীত হওয়ার পরও তাই আছে- অর্থাৎ পাকিস্তানি আমলে যে সব আইন, বিধি-বিধান জারি ছিল, যা ছিলো ব্রিটিশদের পরিত্যক্ত- তাই দাড়ি, কমা সমেত বাংলাদেশে জারি করা হলো। এত রক্ত এত যুদ্ধ এত আন্দোলনের পরেও ব্রিটিশ ও পাকিস্তানী আমলের পচা গলা আমলাতান্ত্রিক রাষ্ট্রকেই কার্বন কপি করে বাহাত্তরের সংবিধানে খাড়া করা হলো।

অপরদিকে, বাংলাদেশের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার বা মুজিবনগর সরকার কর্তৃক ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষিত ঘোষণাপত্রের আইনের ধারাবাহিকতা বলবৎকরণ আদেশে বলা হয়েছে, ‘স্বাধীনতা ঘোষণাপত্র প্রদত্ত ক্ষমতাবলে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল তারিখে এ আদেশ জারি করছি যে, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে যে সকল আইন চালু ছিল, তা ঘোষণাপত্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একইভাবে চালু থাকবে, তবে প্রয়োজনীয় সংশোধনী সার্বভৌম স্বাধীন বাংলাদেশ গঠনের জন্য করা যাবে।’

সেখানে আরো বলা হয়, ‘সকল সরকারি, সামরিক, বেসামরিক, বিচার বিভাগীয় এবং কূটনৈতিক কর্মকর্তা ও কর্মচারী যারা বাংলাদেশের প্রতি আনুগত্যের শপথ গ্রহণ করেছেন, তারা এতদিন পর্যন্ত নিয়োগবিধির আওতায় যে শর্তে কাজে বহাল ছিলেন, সেই একই শর্তে তারা চাকুরিতে বহাল থাকবেন।’

যতদিন বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ চলেছে এবং দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে, ১৯৭২ সালের ১৬ ডিসেম্বর যখন নতুন সংবিধান প্রণীত হয় তখন সংবিধান হিসেবে এর কার্যকারিতার সমাপ্তি ঘটে। অর্থাৎ যুদ্ধচলাকালে এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে সংবিধান প্রণীত ও গৃহীত হওয়ার আগ পর্যন্ত আগের আইনই বলবৎ ছিল, পরবর্তীকালে প্রণীত সংবিধানেও তার ধারাবাহিকতা বজায় থাকে।
এই সংবিধানে অর্থ পাচার, জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের অনুমোদন আছে। এই সংবিধান কেড়ে নিয়েছে ক্ষুদ্র জাতি সত্ত্বার অধিকার। এছাড়া এই সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে করেছে সীমাহীন ক্ষমতার অধিকারী।

এ ব্যাপারে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত : আইন প্রণয়ন ও অর্থ সংক্রান্ত পদ্ধতির বিধান নির্ধারিত করা আছে অনুচ্ছেদ ৮০-৯২ এ। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৮১ অনুযায়ী কর আরোপ, নিয়ন্ত্রণ, রদবদল, মওকুফ, সরকার কর্তৃক ঋণ গ্রহণ, গ্যারান্টিদান কিংবা সরকারের আর্থিক দায়দায়িত্ব সম্পর্কিত আইন সংশোধন ইত্যকার যাবতীয় বিল অর্থবিলের আওতাভুক্ত করা হয়েছে। সহজভাবে বললে রাষ্ট্র কীভাবে, কার কাছ থেকে কত টাকা আদায় করে, কার জন্য কত টাকা খরচ করবে, তা নির্ধারণের জন্য যে বিল আনা হয় তাকে অর্থ বিল বলা হয়। সংবিধানের ৮৩ নং অনুচ্ছেদ যদিও সংসদ সদস্য কর্তৃক পাশকৃত আইনের অনুমোদন ছাড়া এ কাজটি করার ক্ষমতা কাউকে দেয়নি কিন্তু অনুচ্ছেদ ৮১(৩) অনুযায়ী স্পীকার কোনো বিলকে অর্থ বিল হিসাবে সার্টিফিকেট দেওয়ার পর এ বিষয় চূড়ান্ত এবং এ সম্পর্কে আদালতে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না। রাষ্ট্রের অর্থ যে কোনোভাবে খরচ করলে, আত্মসাৎ করলে এবং লুণ্ঠন করলে তার বৈধতার এক চমৎকার আইনি প্রক্রিয়া।

’৭২-এর সংবিধানে ‘বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সীমার মধ্যে অবস্থিত সকল প্রকার খনিজ ও অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রীর উপর রাষ্ট্রীয় মালিকানা’ ঘোষণা করা হয়েছে ১৪৩ নং অনুচ্ছেদে এবং পরবর্তী অনুচ্ছেদ অর্থাৎ ১৪৪ অনুচ্ছেদে সরকারকে বিভিন্ন প্রকার কারবার বা ব্যবসা পরিচালনার ক্ষমতা অর্পণ করেছে এবং অনুচ্ছেদ ১৪৫-এ প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী কর্তৃত্বে বিভিন্ন চুক্তি বা দলিল করার ক্ষমতা অর্পণ করেছে। কিন্তু আন্তর্জাতিক চুক্তি বিষয়ে কোনো অনুচ্ছেদ যুক্ত করেনি। কোনো চুক্তি, হোক তা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক তা সম্পাদনের পূর্বে বা পরে জনগণের কোনো মতামত গ্রহণের জন্য কোনভাবেই জনগণের কাছে বা তার প্রতিনিধির কাছে উপস্থাপনের কোনো ব্যবস্থা রাখেনি। সেজন্য ’৭২-এর সংবিধান অনুযায়ী তেল-গ্যাস-কয়লা রপ্তানি, অন্য কোনো রাষ্ট্রের সাথে কোনো প্রকার চুক্তি, হোক তা ট্রানজিট বা করিডোর, কোনো কিছুর জন্যই চুক্তির আগে বা পরে তা কোথাও আলোচনার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা নেই।

এই সংবিধান অনুযায়ী ব্যাংক-বীমা লুটপাট করা যায়, লুটপাটকৃত অর্থের উৎস না জানিয়েই বিনিয়োগ করা যায়। সংবিধান অনুযায়ীই যেমন বিনা বিচারে খুন করা যায়, সংবিধান অনুযায়ী তেমন বিনা বিচারে আটক রেখে নির্যাতন করা যায়। তেমনি যত খুশি লুটপাট করে অর্থ সম্পদের মালিক হওয়া যায় (অনু: ৪২) এর সকল কিছুর পক্ষে আইন তৈরি করাই আছে, আর না থাকলে ইচ্ছা করলেই তৈরি করা যায়। ’৭২-এর সংবিধান কোনো ভাবেই তার প্রতিবন্ধক নয়।
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২-এ বলা হয়েছে, ‘আইনানুযায়ী ব্যতীত জীবন ও ব্যক্তি স্বাধীনতা হইতে কোন ব্যক্তিকে বঞ্চিত করা যাইবে না।’ তার অর্থ দাঁড়ায়- আইনের মাধ্যমে ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা যাবে না, অর্থাৎ আইন নির্ধারিত পদ্ধতিতে তা করা যাবে। অর্থাৎ আইনের মাধ্যমে একজনকে হত্যা করা যাবে। এভাবেই ‘ক্রসফায়ার’-এর মতো বর্বর ব্যবস্থাটিও সংবিধানসম্মত হয়ে রয়েছে। কারণ দেখানো যায় ‘ক্রসফায়ার’ও আইনসম্মত। এর ফলে প্রতিপক্ষকে হত্যা করা যায়, বিরোধীদের মতপ্রকাশকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে রেখে দেওয়া সম্ভব হয় এই সংবিধান অনুযায়ী।

এই পদ্ধতিতে ১৮৯৮ সালে ব্রিটিশ প্রবর্তিত ফৌজদারি কার্যবিধি বা সংবিধানের ১৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, আইন তার ৪৬ ধারা অনুযায়ী বিচারে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হতে পারে এমন অভিযোগে অভিযুক্ত আসামিকে গ্রেফতার করার ক্ষেত্রে ছাড়া পুলিশ কাউকে হত্যা করতে পারবে না। তবে এমন কোনো ঘটনা ঘটলে ১৮৬১ সালে প্রবর্তিত পি.আর.বি-এর ১৫৭ নং রেজুলেশন অনুযায়ী একটি প্রশাসনিক তদন্তে গুলি ছোঁড়ার ঘটনাটিকে লঁংঃরভরবফ করলেই হত্যাকাণ্ডটি আইন অনুযায়ী হয়ে যায়। সেই জন্য পুলিশের/র‌্যাবের গুলিতে নিহত প্রত্যেককে সন্ত্রাসী ও খুনের মামলার আসামি হতে হয়। এভাবে প্রতিপক্ষকে দমন করার আইনি বৈধতা দেয় সংবিধান। ফলে বাংলাদেশের সংবিধান দেশের সরকারকে ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচার হওয়ার দিকে ঠেলে দেয়।

প্রধানমন্ত্রীর হাতে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা : সংবিধানের ১ম ভাগের অনুচ্ছেদ ৭-এ পরিষ্কারভাবে ঘোষণা করেছে, ‘প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ’। কিন্তু বাক্যটি একটি সেমিকোলন (;) চিহ্ন দিয়ে ঘোষণা করা হয়েছে যে, ‘এই ক্ষমতা কেবল সংবিধানের অধীনে ও কর্তৃত্বে কার্যকর হইবে।’ সংবিধানের ৪র্থ ভাগের অনুচ্ছেদ ৪৮(৩) লক্ষ্য করলেই দেখা যাবে, রাষ্ট্রপতি প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ব্যতীত সকল ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করেন। অর্থাৎ সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে যে সকল ক্ষমতা দিয়েছে বলে প্রাথমিক পাঠে মনে হয় তার কোনোটাই তার এখতিয়ারাধীন নয়, সবই তিনি প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োগ করতে বাধ্য। বিচারপতি বা নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ, যে কোনো দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির দণ্ড মওকুফ, কোনো কিছুই প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ ব্যতীত করার ক্ষমতা সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে দেয়নি।

প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ-প্রক্রিয়া বাদ দিয়ে রাষ্ট্রপতি নিজে কোনো সার্বভৌম সিদ্ধান্ত নেবেন সেই ক্ষমতা সংবিধান তাকে দেয়নি। যদি প্রধানমন্ত্রীর কোনো রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ড বা পররাষ্ট্রীয় সম্পর্ক নির্ণয়, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা, দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব কিংবা বাংলাদেশের সংবিধানের সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ হয় তাহলে তার বিচার কে করবে? এই বিচারের সুযোগ আমাদের সংবিধানে নেই। বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি মার্কিন প্রেসিডেন্টকে ইমপিচ বা অভিশংসন করা যায়। আর আমাদের আছে এমন সংবিধান যাতে প্রধানমন্ত্রীকে ইমপিচ করা দূরে থাক, সাংবিধানকিভাবে তার কাছে জবাবদিহিতা চাইবার ও আদায় করবার কোনো সুযোগ নেই, ব্যবস্থাও নেই।
সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকে প্রজাতন্ত্রের নির্বাহী ক্ষমতার অধিকারী করেছে (অনু: ৫৫), মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপমন্ত্রী নিয়োগ ও নিয়োগের অবসান ঘটানোর এখতিয়ারও সংবিধান প্রধানমন্ত্রীকেই দিয়েছে [অনু: ৫৬(১) ও ৫৮(২)]। মন্ত্রিসভাকে যদিও যৌথভাবে সংসদের কাছে দায়বদ্ধ করা হয়েছে [অনু: ৫৫(৩)]।

কিন্তু সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ [(১) কোনো নির্বাচনে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রার্থীরূপে মনোনীত হইয়া কোনো ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হইলে তিনি যদি (ক) উক্ত দল হইতে পদত্যাগ করেন, অথবা (খ) সংসদে উক্ত দলের বিপক্ষে ভোট দান করেন, তাহা হইলে সংসদে তাঁহার আসন শূন্য হইবে] উল্টো সংসদকে দলের কাছে জিম্মি করে দিয়েছে এবং প্রধানমন্ত্রী যদি দলীয় প্রধান হন তবে সংবিধান তার কাছে যে ক্ষমতা অর্পণ করেছে তা পৃথিবীর যে কোনো এক নায়কের চেয়েও বেশি। সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে উচ্চকণ্ঠে রাষ্ট্রের সকল ক্ষমতার মালিকানা জনগণের বলে ঘোষণা করলেও তা ভোগ করার সকল ক্ষমতা নিরঙ্কুশ করে দিয়েছে প্রধানমন্ত্রীকে।

সংকট, তার ফলশ্রুতি : বাংলাদেশের উপনিবেশিক কাঠামোবদ্ধ পুঁজিবাদী রাষ্ট্র অনুমোদিত হয়েছে বাহাত্তরের সংবিধানে। বর্তমানে বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট হলো সাংবিধানিক সংকট। এই সাংবিধানিক সংকটের জের ধরেই স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশে বার বার সামরিক শাসন জারি হয়েছে। দীর্ঘ এক দশকের রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের পর নব্বইয়ে সামরিক স্বৈরাচারকে পরাস্থ করা হলেও, সেই সময় এই শাসনতান্ত্রিক সংকটের অতিশয় জরুরি প্রশ্নটি সেভাবে কেউ উত্থাপন করেননি। এই পর্বটি সমাধান না করে এগুনো সম্ভব না, বরং আরো নতুন নতুন জটিলতা এসে আমাদের নিমজ্জিত করে দেবে, আমাদের জটিলতায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
আমাদের মতে, বর্তমানের ঘনীভূত সংকটকালের একমাত্র সমাধান, সকল নিপীড়িত শ্রেণি ও জাতিস্বত্তার অংশগ্রহণে বিপ্লবী গণঅভ্যুত্থান। তার আগে প্রয়োজন তাদের সঠিক রাজনৈতিক রণনীতি আর রণনীতিতে সজ্জিত একটি বিপ্লবী শক্তির উপস্থিতি। দেশে বিপ্লবী শক্তির আপাত উপস্থিতি না থাকলেও, দুই দুইটি গণঅভ্যুত্থানের (’৬৯ ও ’৯০) গৌরবোজ্জ্বল ঐতিহ্যমণ্ডিত বাংলাদেশে সঠিক রাজনৈতিক রণনীতি এবং তার ভিত্তিতে প্রণীত কর্মসূচির বাস্তব অনুশীলনে সেই বিপ্লবী শক্তির উত্থান সম্ভব।

অর্থাৎ সঠিক রণনীতি বাস্তবায়নে যেমন ব্যাপক জনগণের বিপ্লবী উত্থান দরকার, আবার বিপ্লবী উত্থানের জন্যও দরকার সঠিক রণনীতি। অতীতেও এমন সংকটকালে, জনগণের লড়াইয়ের সামনে দেশের প্রগতিশীল বামপন্থী কমিউনিস্টগণ লেনিনীয় পথ তুলে ধরতে পারেননি। সঠিক রাজনৈতিক কর্মসূচি উত্থাপন করতে সক্ষম হননি। যার ফলে জনগণের আন্দোলন দিকভ্রান্ত হয়েছে, আন্দোলনের ফসল মেহনতিদের গোলায় ওঠেনি। তারই ফলাফল হলো দেশের এই দুরবস্থা তথা বর্তমানের পুঁজিবাদী শোষণ লুণ্ঠন ও দুর্বৃত্ত শাসন। এবারো যদি সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে তারও ফল হতে পারে আরো ভয়ংকর। প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তি দল ও কর্মসূচির অভাবে আরো প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির উত্থান অনিবার্য হয়ে উঠবে। ভারতের মোদি সরকারের পুনরুত্থান আমাদের সামনে সেই উদাহরণই তুলে ধরে।

সাধারণত জাতীয় সংকটকালে সঠিক কর্মসূচি ও শক্তির অনুপস্থিতিতে মানুষ সামনে যাকে পায়, তাকেই অবলম্বন করে বাঁচতে চায়। বিশুদ্ধ তত্ত্ব ও সাচ্চা পার্টির জন্য অপেক্ষা করে না। সেই অবলম্বন যদি আরো প্রতিক্রিয়াশীল হয়, তবুও। সঠিক পথের অনুপস্থিতিতে তাৎক্ষণিক বিবেচনায় শয়তানকে তাড়াতে পিশাচের সঙ্গেও হাত মেলায় মানুষ। সঠিক প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির অনুপস্থিতিতে ফ্যাসিবাদের বিপরীতে আরো চরম ধর্মীয় জঙ্গিগোষ্ঠীর উত্থানকে উপভোগ করতে পারে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত। যাতে শোষণ লুণ্ঠনমূলক ব্যবস্থার উচ্ছেদের ঝুকি থেকে মুক্ত থাকে দক্ষিণ এশিয়া। একই সঙ্গে জঙ্গিবাদের ছুতো তুলে, ইরাক আফগানিস্তানের মতো, এদেশকেও আরেক দফা নরক বানাতে পারে। সঠিক গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তি ও রাজনীতির অনপুস্থিতিতে ভারতের হিন্দু মৌলবাদী শক্তির উত্থানের প্রতিক্রিয়ায় এখানেও ইসলামি মৌলবাদী শক্তির উত্থান-দেশকে নরক বানানোর ফাঁদে ফেলে দেওয়ার শর্ত তৈরি করতে পারে।

আমরা বিশ্বাস করি, ক্ষমতা দখল করার মত নির্ভরযোগ্য প্রগতিশীল বিপ্লবী রাজনৈতিক শক্তি ও দল না থাকলেও, সঠিক রাজনীতি থাকলে সেই বিপ্লবী শক্তির উত্থানের কাজ শুরু করা যায়। সে ক্ষেত্রে দল না থাকলেও দল গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। মেহনতিদের আন্দোলনের সামনে সঠিক রাজনৈতিক দিশা থাকলে, সেই আন্দোলন পথ হারায় না। কারণ জনতার আন্দোলনই একটি বিপ্লবী শক্তির উত্থান ঘটাতে সক্ষম। বিপ্লবী শক্তির উত্থানের অর্থ হলো সম্পর্কের পুরানো সমীকরণ ভেঙে ফেলে দেওয়া। নীরব আন্দোলনের কালে যা অনুধাবন করা মুশকিল। আমরা জনতার আন্দোলনের ওপর আস্থাশীল, তাকে যথাযথ পরিণতির দিকে নিয়ে যেতে, যাদের সঙ্গে যতটুকু মতে-পথে মিলবে, ততটুকু ঐক্য নিয়েই কাজ করতে চাই। সেক্ষেত্রে আমরা দল ও জোটের বিন্যাস ও পুনর্বিন্যাসের ব্যাপারে শিথিল থাকব।

ব্যক্তি শাসক ও ব্যবস্থা প্রসঙ্গে : বাংলাদেশে দুটি গণঅভ্যুত্থানে দুই সামরিক স্বৈরাচার উচ্ছেদ হয়েছে। প্রথমে জেনারেল আইয়ুব খান পরে জেনারেল এরশাদ। এই দুইটি ঘটনায় জনরোষের সামনে ব্যক্তি স্বৈরাচারকেই যেভাবে সামনে আনা হয়েছিল, তাতে আড়ালে থেকে গেছে স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থা, আলোচনায় আসেনি অতিশয় জরুরি শ্রেণি-প্রশ্নটি। যার ফলশ্রুতিতে আইয়ুবের বদলে ইয়াহিয়ার সামরিক শাসন জায়েজ হতে পারে, আর এরশাদের বদলে হাসিনা খালেদা ‘গণতান্ত্রিক স্বৈরাচারী’ ব্যবস্থা জারি রাখতে পারে, আর জায়েজ হয় পতিত স্বৈরাচার। তাই খেয়াল রাখতে হবে, স্বৈরশাসক বা ফ্যাসিস্টকে শুধু দলের প্রতিনিধি বা ব্যক্তি হিসাবে নয়, তাকে শ্রেণি এবং স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপনের রাজনৈতিক লাইন হাজির করতে হবে। যাতে এক স্বৈর শাসকের বদলে আরেক স্বৈরশাসকের ক্ষমতা দখল অসম্ভব হয়ে ওঠে। এমন কর্মসূচি হাজির করা দরকার, যাতে পুরনো ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, যেখানে ইচ্ছা থাকলেও শোষক-লুটেরা শ্রেণির দলগুলোর অংশ গ্রহণ করতে না পারে।

বামপন্থী ও কমিউনিস্টদের দল ও জোটের ঐক্য প্রসঙ্গে : নব্বইয়ের পর বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পরিচয়ের বেশ কয়েকটি দল জোড়াতালি দিয়ে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ওয়ার্কার্স পার্টি গঠন করেছিল। কিন্তু যে সব প্রতিশ্রুতি নিয়ে ঐক্য হয়েছিল, তা সফল হয়নি। সেই ঐক্য টেকেনি। নানা গ্রুপে বিভক্ত হয়েছে, ভাঙনের পর্ব দীর্ঘদিন চলমান ছিল। অর্থাৎ ঐক্য জোড়াতালি দিয়ে হয় না, একটি সঠিক রাজনৈতিক রণনৈতিক লাইনকে ঘিরেই ঐক্য দরকার।

এছাড়া, জোট গঠন করতে এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালে আওয়ামী লীগকে ঘিরে বামপন্থীদের একাংশ (সাবেক রুশপন্থীরা ও জাসদ ঘরানা) মিলে গড়ে তুলেছিল ১৫ দল। আর খালেদাকে ঘিরে বামপন্থীদের আরেক অংশ (সাবেক চীনাপন্থীরা) মিলে গড়ে তুলেছিল ৭ দল। পরে ১৯৮৬ সালের ২০ মে আওয়ামী লীগ এরশাদের অধীনে নির্বাচনে গেলে, সেই নির্বাচন প্রত্যাখ্যান করে ১৫ দল থেকে ও ৭ দল থেকে বের হয়ে আসা বামপন্থীরা মিলে গড়ে তুলেছিল পাঁচ দল।

এরশাদ ক্ষমতা দখলের আগে আওয়ামী লীগ ছিল বহু খণ্ডে বিভক্ত, শক্তিহীন, নেতৃত্বহীন, ক্ষয়িষ্ণু দল। তখন দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে ছিল হতাশা। অপরদিকে সামরিক কুদেতায় নিহত দলের প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমানের করুণ মৃত্যুর পর নিঃশেষ হওয়ার সম্ভাব্য পরিনতির দিকে ক্রমেই ধাবিত হচ্ছিল বিএনপি। দলচ্যুত, নীতিচ্যুত, বিভ্রান্ত ও হতাশাগ্রস্ত গণবিচ্ছিন্ন তথাকথিত প্রগতিশীলদের নিয়ে গঠিত দলটির তেমন কোনো জনভিত্তিই ছিল না তখন। এরশাদবিরোধী আন্দোলনের ধারায় দুইটি দলই শক্তিশালী হয়েছে, বিপরীতে শক্তি ক্ষয় পেয়েছে বামপন্থী কমিউনিস্টদের। আন্দোলনের যে কৌশলের কারণে তাদের এই করুণ পরিনতি, তার গ্রহণযোগ্য জবাব এখনো তৈরি হয়নি।

প্রত্যাখ্যাত হওয়ার অবস্থান থেকে আওয়ামী লীগ তার গ্রহণযোগ্যতা ফিরে পায় এবং নিঃশেষ হওয়ার সম্ভাব্য পরিনতি থেকে বিএনপি জনভিত্তি খুঁজে পায় মূলত এরশাদবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়েই। স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনের পরিণতিতেই শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং শাসন ক্ষমতার নতুন করে বৈধতা পায় দল দুটি। আর সেই কাজের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ জোগানদাতা দেশের বামপন্থী কমিউনিস্টরা। পরবর্তীতে বামপন্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠা ৫ দলীয় জোটও দুই নেত্রীকে এক করে আন্দোলন তেজি করতে চেয়েছে। এসব বামপন্থী নানাভাবে ওই দ্বি-দলীয় ধারাটিকেই পরিপুষ্ট করেছে।

ওই দুই দলের ক্ষমতায়নের মধ্যেই বামপন্থীরা দেশের গণতন্ত্রের সম্ভাবনা দেখেছেন, দেখেছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ। এভাবেই দ্বি-দলীয় রাজনীতি নতুন করে শক্তিশালী হয়েছে এবং ক্ষমতা দখলের বৈধতা অর্জন করেছে। এই বৈধতার ওপর ভর করেই বাংলাদেশের বুর্জোয়া শাসক শ্রেণি দুই দলকে কেন্দ্র করেই তাদের সীমাহীন শোষণ লুণ্ঠন, চুরিচামারি, নির্যাতন এবং যাবতীয় অপকর্ম জারি রাখতে সক্ষম হয়েছে। দুই দলের শোষণ নিপীড়নে মানুষ যখন অতিষ্ট, তখন দ্বি-দলীয় পাল্টাপাল্টির বিপরীতে বাম বিকল্পের সেøাগান দিচ্ছেন বামপন্থী কমিউনিস্টদের কেউ কেউ। কিন্তু বিগত দিনের আন্দোলনে দ্বি-দলীয় ধারাকে পরিপুষ্ট করার যে অপরাধ তারা করেছেন, তার আত্ম সমালোচনা না করে, দ্বি-দলীয় পাল্টাপাল্টির বিরুদ্ধে সেøাগান কখনোই হালে পানি পেতে পারে না, পাইওনি।

নব্বই পরবর্তি খালেদা জিয়ার সময়ে পাঁচ দল এবং সিপিবি মিলে গড়ে তোলে গণতান্ত্রিক বাম ফ্রন্ট। পরে ক্ষমতার তৃতীয় রাজনৈতিক ধারা তৈরি এবং বাহাত্তরের সংবিধান পুনঃপ্রতিষ্ঠার সেøাগান দিয়ে গণতান্ত্রিক বাম ফ্রন্টের সঙ্গে ন্যাপ ও গণফোরাম, গণ আজাদী লীগ সমন্বয়ে ১১ দল গঠন করা হয়েছিল। ১১ দলের গুরুত্বপূর্ণ দল ওয়ার্কার্স পার্টি, ন্যাপ, গণফোরাম, গণআজাদী লীগ সাম্প্রদায়িক ও জঙ্গিবাদী শক্তির উত্থান মোকাবিলার কথা বলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোট বেঁধে গড়ে তোলে ১৪ দল। এভাবেই তারা এখন সরকারের ক্ষমতার অংশীদার। এভাবেই বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এবং ১১ দল তার কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলে। এ ঘটনার পর বাসদ, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পাটিসহ বেশ কয়েকটি গ্রুপ মিলে গঠন করেছিল গণমুক্তি। সেই সময় ৫ বাম দল নামেও কয়েকটি বামপন্থী গ্রুপ ক্রিয়াশীল ছিল।

এরপর গণমুক্তি, ৫ বাম দল মিলে গঠন করা হয়েছিল বাম মোর্চা, পরে বাম মোর্চা ভেঙে বের হয়ে সিপিবি-বাসদ আলাদাভাবে কাজ শুরু করে। সেখানে রাজনীতির চেয়ে সংগঠনের ব্যাপ্তি বিস্তারকে বেশি বিবেচনায় নেওয়া হয়। বর্তমানে সাবেক বাম মোর্চাভুক্ত দলের সঙ্গে সিপিবি মিলে গঠন করা হয়েছে গণতান্ত্রিক বাম জোট, যা এখনো কার্যকর।

বাংলাদেশে এভাবেই একাধিকবার বামপন্থীদের মোর্চা বা জোট গঠনের ঘটনা ঘটে। যা প্রায় একই দলসমূহের নানা আঙ্গিকের বিন্যাস-পুনর্বিন্যাস। এসব মোর্চা বা জোট বা ফ্রন্ট গঠন সময়ের রাজনীতি সংঘটনে কিছু কিছু ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনে সক্ষম হলেও মোটাদাগে মেহনতিদের রাজনীতির বিকাশ সাধনে সক্ষম হয়নি। এসব ফ্রন্ট বা জোট বা মোর্চা মেহনতিদের স্বার্থে সরকারবিরোধী কোনো কার্যকর রাজনৈতিক আন্দোলন গড়ে তুলতে সক্ষম হয়নি। বিভিন্ন সময়ে সরকারের নানা দুঃশাসনের প্রতিবাদ সংঘটিত করলেও, সমাজ রূপান্তরের কর্মসূচিভিত্তিক রাজনীতি হাজির করতে পারেনি। তাই পুনরায় বামপন্থী কমিউনিস্টদের মোর্চা বা জোট গঠন করতে হলে, পূর্বেকার সকল জোট মোর্চা বা ফ্রন্ট কেন কার্যকর থাকল না, সেই জোট বা ফ্রন্ট গঠন কেন সফল হলো না-তার একটা গ্রহণযোগ্য জবাব থাকা দরকার। ইতোপূর্বেও গঠিত হওয়া সকল জোট বা ফ্রন্ট গঠনের একটা বিচারমূলক সমালোচনা দাঁড় করানো দরকার। তা না করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য যেন-তেন-ভাবে জোট করলেই তা পুরনো বৃত্তে ঘুরপাক খেতে বাধ্য।

আমাদের মতে, মেহনতি জনগণের মৌলিক শত্রুদের প্রশ্নে একমত হলে ইস্যুভিত্তিক ঐক্য গড়া যায়। আর প্রধানশত্রু প্রশ্নে একমত হলে রণনীতি প্রশ্নে একমত হওয়া যায়। দেশীয় শাসকশ্রেণিকে উচ্ছেদের প্রশ্নটি সামনে এলে কর্মসূচিভিত্তিক ঐক্য গড়া এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্য জোট গঠন সম্ভব।

রাষ্ট্র বিপ্লব এবং সমাজ বিপ্লব : ‘তৈরি রাষ্ট্রযন্ত্রটা শুধু দখলে পেয়েই শ্রমিক শ্রেণি তা নিজের কাজে লাগতে পারে না।’ দখলে নেওয়া তৈরি রাষ্ট্রকে ভেঙে শ্রমিকদের নিজের মতো করে গড়ে নিতে হয়। এটা বিপ্লবের বুনিয়াদি প্রশ্ন। এটা রাষ্ট্রের বেলায় যেমন সমাজের বেলায় তেমন। বিপ্লবের প্রশ্নে দখল করা রাষ্ট্রকে ভেঙে শ্রমিকরাষ্ট্র গড়তে না পারলে যেমন বিপ্লব টেকে না, তেমনি পুরনো সমাজ বহাল রেখে কখনও শ্রমিকদের রাষ্ট্র টিকবে না, টিকতে পারে না। কারণ বাংলাদেশের সমাজ হলো ধর্মীয় কাঠামোবদ্ধ পশ্চাৎপদ সমাজ। অনেক ইতিবাচক শর্ত থাকা সত্ত্বেও ইউরোপের মত এখানে বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ঘটেনি। সমাজের ঘাসমূলে কূপমন্ডুকতা দূর হয়নি। ক্ষুদ্র স্বার্থবোধ, কুসংস্কার ও অন্ধকারাচ্ছন্ন থেকে সমাজ মুক্ত নয়। আত্মশক্তি অর্জনে ঘাটতি রয়েছে। ধর্মীয় নিগড় থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব হয়নি। রাজনীতির সংস্কৃতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে রয়েছে সাম্প্রদায়িকতা। ধর্মীয় পীর, জঙ্গিবাদ ও প্রতিক্রিয়ার রমরমা অবস্থান। এমন পরিস্থিতি কখনো প্রগতির শক্তিকে ধারণ করতে পারে না। সমাজকে পশ্চাৎপদ রেখে বিপ্লব সাধনের অর্থ হলো ঘরে শত্রু রেখে যুদ্ধযাত্রার শামিল।

ইউরোপে সংঘটিত রেনেসাঁসের কারণে সমাজটা প্রগতিকে ধারণ করার উপযোগী হয়ে উঠেছিল। অর্থাৎ পরিবর্তনের উপযোগী সমাজটি রেনেসাঁসের মাধ্যমে তৈরি হয়েছিল। তাই সেখানে শ্রমিক বিপ্লবের জন্য শুধু তৈরি রাষ্ট্র দখল ও তা নিজেদের মতো নির্মাণই যথেষ্ট ছিল। কিন্তু আমাদের মতো ধর্মীয় কাঠামোবদ্ধ পশ্চাৎপদ সমাজের বেলায় রাষ্ট্র দখল ও নতুন রাষ্ট্র বিনির্মাণের পাশাপাশি পুরনো সমাজটাও খোল নলচে বদলে ফেলার আয়োজন দরকার। কারণ সমাজটি পরিবর্তনকে ধারণ করার উপযোগী না হলে, যে কোনো পরিবর্তনকে পেছন থেকে টেনে ধরে থাকবে সমাজের অন্ধকার। রাজনৈতিক কর্মসূচি প্রণয়নের সময় এই বিষয়টি বিবেচনায় রাখা দরকার। এ কাজে রাজনৈতিক কর্মীর পাশাপাশি লেখক বুদ্ধিজীবী কবি সাহিত্যিক শিল্পী চলচ্চিত্র নির্মাতা নাট্যকার এদের দায় বেশি। এখন দরকার সমাজে আরেকটি রেনেসাঁসের কাজ শুরু করা। যাতে যে কোনো পরিবর্তনের ধারায় মানুষ সহজে যুক্ত হতে পারে।

পরিবর্তিত আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি-জাতীয় পার্টির ক্ষমতায়নে বামপন্থীদের দায় : পঁচাত্তরে শেখ মুজিবুর রহমানের করুণ মৃত্যুর পর চীনাপন্থী কমিউনিস্টদের বড় অংশ ঝাঁকে ঝাঁকে গিয়ে ভিড়তে থাকে জিয়ার দলে, পরবর্তিতে এরশাদের দলও গড়ে তুলতে থাকেন তারা। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে এক সময় স্বাধিকারের রাজনীতির পাটাতন নির্মাণ, পরে সেখান থেকে ইউটার্ন নিয়ে মুক্তিযুদ্ধের রাজনীতিতে বিভ্রান্তকর ভূমিকার কারণে, একদিকে এখানকার চীনাপন্থী কমিউনিস্টরা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, অপরদিকে রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও ভারত ফেরত মুজিববাদীদের হামলার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।

সেখান থেকে বাঁচতে, সাময়িকভাবে লড়াই স্থগিত রেখে, আত্ম-সমালোচনা করে, নতুন রাজনৈতিক লাইন অনুসন্ধান করে বের করা দরকার। তার ভিত্তিতে নতুন করে লড়াই শুরু করা প্রয়োজন, সেই কষ্টকর কাজ বাদ দিয়ে, মেহনতি শ্রেণির ক্ষমতায়নের রাজনীতি স্থগিত রেখে দলে দলে ভিড়তে থাকেন জিয়ার দলে। পরবর্তীতে এরশাদের দলে। মান্নান ভুইয়া, তরিকুল ইসলাম, সাদেক হোসেন খোকা, মির্জা ফখরুল, রুহুল কবির রিজভী, কাজী জাফর আহমেদ, খালেদুর রহমান টিটো, আলমগীর কবির Ñএরকম ডজন ডজন নাম উল্লেখ করা যায়। একইসঙ্গে বিএনপি ধারার বুদ্ধিজীবীরাও এসেছেন একই জায়গা থেকে, যেমন ড. মাহবুবউল্লাহ, সাদেক খান, মাহফুজুল্লাহ, পিয়াস করিম, ফ র মাহমুদ হাসান, জাফরুল্লাহ চৌধুরী প্রভৃতি। আওয়ামী লীগ ঠেকাতে এরা উঠে-পড়ে লেগেছিল সামরিক শাসকদের দলকে ক্ষমতায় রাখতে, তাদের বৈধতা দিতে। এরশাদের সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনকালে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সাতদল ভুক্ত কমিউনিস্টরা কমবেশি সকলেই অভিযুক্ত।

একইভাবে একুশ বছর (জিয়া+এরশাদ+খালেদা সময়কাল) ক্ষমতার বাইরে ছিল আওয়ামী লীগ। এতে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য জাসদ ও রুশপন্থী ঘারানার বামপন্থী কমিউনিস্টরা যারপরনাই ব্যস্ত হয়ে যায়। জাসদ আরেক ধাপ এগিয়ে একটা রাজনৈতিক বিবরণী (political narrative) তৈরি করে। তা হলো, ‘মুক্তিযোদ্ধা বনাম মুক্তিযোদ্ধা মারামারি করে রাজাকারদের ক্ষমতায় যাওয়ার জায়গা করে দেওয়া হয়েছে।’ একই কথা বার বার আওয়ামী লীগ ও তার বামপন্থী মিত্ররা বলতে থাকে। তারা এসব কথা বলত এক নাগাড়ে। ফিরে ফিরে বলত। একই সঙ্গে তারা আরেকটি রাজনৈতিক বিবরণী তৈরি করে। তা হলো, ‘পঁচাত্তরের পটপরিবর্তনের পর দেশ পাকিস্তানমুখী যাত্রা শুরু করে।’ আওয়ামী লীগ ও তার মিত্ররা আরো জোরে জোরে এসব কথা বলতে থাকে।

অথচ আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় কেন ছেদ ঘটল, জাসদ কেন টিকল না। এতবড় শক্তি কেন অপচয় হলো, তার কারণ অনুসন্ধান করে আরো শক্তভাবে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করার কষ্টকর কাজ স্থগিত রেখে, নিজেরা ক্ষমতায় যাওয়ার চিন্তা বাদ দিয়ে তারাও আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় আনার জন্য পাগলপারা হয়ে যায়। এ কাজ শুধু জাসদ একা করেনি। এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালের ১৫ দল ভুক্ত শরিক বামপন্থী সকল দলের ক্ষেত্রেই কমবেশি একই কথা খাটে। কেউ ক্ষমতায় গিয়ে, কেউ ক্ষমতায় না গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের নামে আওয়ামী লীগের সেবা করে চলেছে। আজ যে আওয়ামী লীগ দফায় দফায় ক্ষমতায় থেকে ফ্যাসিবাদ কয়েম করেছে, এর পেছনে রয়েছে জাসদ সহ ওই সকল বামপন্থীদের সরব কিংবা নীরব ভূমিকা। সত্যকার অর্থেই যদি এই ফ্যাসিস্ট সরকারকে বিদায় জানানোর দরকার হয়, তার আগের শর্ত হলো, উপরের এসব কাজের আত্ম-সমালোচনা দাঁড় করানো।

রাজনৈতিক সংগ্রাম প্রসঙ্গে : রাজনৈতিক সংগ্রাম হলো ক্ষমতা দখল বিষয়ক সংগ্রাম। নির্বাচন, সংসদ, সংবিধান ও সরকার পদ্ধতিÑএসব হলো রাজনৈতিক সংগ্রামের অনুষঙ্গ। অপরদিকে অর্থনৈতিক সংগ্রাম হলো রুটি রুজি জমি ও কাজের অধিকার এবং ট্রেড ইউনিয়ন বিষয়ক আন্দোলন। এমনকি তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর ও খনিজসম্পদ রক্ষার আন্দোলনও অর্থনৈতিক সংগ্রাম, একই সঙ্গে এটা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সংগ্রামের অংশও বটে। অর্থাৎ অর্থনৈতিক সংগ্রাম অনেক সময় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের রূপেও আবির্ভূত হতে পারে।
এছাড়া রয়েছে সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম। যেমন নারী-পুরুষের সমধিকারের আন্দোলন, ধর্মীয় সংখ্যালঘু নিপীড়ন ও জঙ্গিবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে লড়াই এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবির আন্দোলন। সুন্দরবন রক্ষার আন্দোলন পরিবেশ রক্ষার আন্দোলনের উদাহরণ হতে পারে। এসব আন্দোলনের একটা রাজনৈতিক চরিত্র থাকে।

মজুর শ্রেণির অর্থনৈতিক সংগ্রাম, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম ও পরিবেশ রক্ষার সংগ্রাম কখনোই নিজে থেকে সেই শ্রেণির রাজনৈতিক সংগ্রামে, অর্থাৎ ক্ষমতা দখল বিষয়ক সংগ্রামে রূপ নিতে পারে না। আলাদাভাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম জারি থাকতে হয়। তবে অন্যান্য সংগ্রাম সমাজে জারি থাকা রাজনৈতিক সংগ্রামকে পুষ্টি জোগায়। যে কোনো অর্থনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক এবং পরিবেশ রক্ষার সংগ্রামের অনুপূরক রাজনৈতিক সংগ্রাম যদি সমাজে অনুপস্থিত থাকে, সেক্ষেত্রে দেশে জারি থাকা যে কোনো রাজনৈতিক সংগ্রামকেই তা পরিপুষ্ট করবে, এমনকি তা বিপরীত পক্ষের হলেও। সমাজে অর্থনৈতিক সংগ্রাম যদি মজুর শ্রেণির রাজনৈতিক দল করে, আর রাজনৈতিক সংগ্রাম যদি জারি থাকে বুর্জোয়া শ্রেণির, সে ক্ষেত্রে কোনো না কোনোভাবে মজুরদের অর্থনৈতিক সংগ্রামের সকল অর্জন গ্রাস করবে বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক সংগ্রাম। একই কথা বিভিন্ন শ্রেণির সামাজিক সাংস্কৃতিক ও পরিবেশ রক্ষার লড়াইয়ের ক্ষেত্রেও খাটে। অনেকটা নদীর পানি যেমন সাগরে যায়, তেমনি অন্যান্য সকল সংগ্রামের অর্জন যাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের আধারে। কোনোভাবেই নিজে থেকে অর্থনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক ও পরিবেশ রক্ষার লড়াই রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপ নেয় না, নিতে পারে না। এই কথাটি নিয়ে একটা ভুল বুঝ আছে। সেই ভুল বুঝের কারণে বলা হয়, ‘আন্দোলন গড়ে তুলি আমরা আর ফসল গোলায় তোলে বুর্জোয়ারা।’ কিন্তু তারা এটা বুঝতে সক্ষম হন না যে, ফসলের গোলা মানে রাজনৈতিক সংগ্রাম, সেটা তো একমাত্র বুর্জোয়াদের রয়েছে। সুতরাং কমিউনিস্টদের অর্থনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ফসল তো সেই গোলাতেই যাবে। কারণ বামপন্থী কমিউনিস্টদের তো কোনো গোলাই (রাজনৈতিক সংগ্রাম) নাই, আগেও ছিল না, এখনো নাই, কোনোদিনই ছিল না। এসব কমিউনিস্ট মনে করেন, তারা যে  লড়াই করে যাচ্ছেন, একদিন সেই লড়াই আপনা আপনিই সমাজ বদলের লড়াইয়ে রূপ নেবে। অর্থাৎ তাদের অর্থনৈতিক সংগ্রাম, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রাম নিজে থেকেই রাজনৈতিক সংগ্রামে রূপ নেবে। কিংবা তারা অর্থনৈতিক সংগ্রামকেই রাজনৈতিক সংগ্রাম মনে করে বোকার স্বর্গে বসবাস করছেন।
আমাদের উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাসে অর্থনৈতিক, সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগ্রামে কমিউনিস্টরা যেভাবে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছেন, অনবদ্য ভূমিকা রেখে চলেছেন, সেটা সোনার অক্ষরে লেখা থাকার মতো ঘটনা। অতিশয় কষ্টের ব্যাপার হলো, রাজনৈতিক সংগ্রামে তারা ভূমিকা রাখতে সক্ষম হননি। বরং বরাবরই রাজনৈতিক সংগ্রামের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়েছেন বুর্জোয়াদের হাতে। চূড়ান্ত মুহূর্তে নিঃশর্তভাবে বুর্জোয়াদেরই সমর্থন দিয়ে গেছেন। উদাহরণ হিসেবে, ১৯৬৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি প্রথমে লাহোরে, ২০ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগের ওয়ার্কিং কমিটির সভায় পরে ১৮ মার্চ দলের কাউন্সিল অধিবেশনে শেখ মুজিবুর রহমান ৬ দফা পেশ করেন এবং তা গৃহীত হয়, যেটা রাজনৈতিক সংগ্রাম। এর বিপরীতে কমিউনিস্টদের আলাদা কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি ছিল না। মওলানা ভাসানী একই বছরে জুন মাসে কর্মীদের চাপের মুখে ন্যাপের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ১৪ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। ১৪ দফা ছিল ৬ দফাকে কাউন্টার দেওয়ার জন্য, জনগণের আন্দোলন বিকশিত করার জন্য নয়। সেটা ছিল দেওয়া অর্থে দেওয়া। কর্মীদের চাপে আর তাদের বুঝ দেওয়ার জন্য। যে ১৪ দফা কখনো জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়নি। কাপ্তান বাজারে ন্যাপ অফিসে বস্তাবন্দি ১৪ দফার কাগজ উই পোকায় কেটেছে। শেষে ‘জেলের তালা ভাঙব শেখ মুজিবকে আনব’ বলে আওয়ামী লীগকেই নিঃশর্ত সমর্থন দিতে হয়েছে তাকে। ততদিনে (’৭০ এর নির্বাচনের পর) শেখ মুজিবের পক্ষে ব্যাপক গণজোয়ার তৈরি হয়ে যায়। এমন নিঃশর্ত সমর্থনের উদাহরণ মণি সিংহ গ্রুপেরও পাওয়া যাবে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনেও দুই নেত্রীকে (আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকে) নিঃশর্ত সমর্থন দেওয়ার অসংখ্যা উদাহরণ পাওয়া যাবে। এর মধ্যে মোহাম্মাদ ফরহাদের হাসিনা ও খালেদার ফিফটি ফিফটি তত্ত্ব প্রকৃষ্ট উদাহরণ। ব্রিটিশ আমলেও কংগ্রেস ও মুসলিম লীগকে ঐক্যবদ্ধ করে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী লড়াই করতে চেয়েছে কমিউনিস্টরা। শেষে পাকিস্তান আন্দোলনকে সমর্থন প্রদান করলেও আলাদা কর্মসূচি হাজির করতে পারেনি।

দেখা গেছে, অর্থনৈতিক সংগ্রামে বাংলাদেশের কমিউনিস্টগণ কমবেশি তাদের স্বতন্ত্র সত্তা ধরে রাখতে পারলেও রাজনৈতিক সংগ্রামের বেলায় তা পারেননি। সেক্ষেত্রে তারা বড় বুর্জোয়া দলের দিকে হেলে পড়েন, অনেকক্ষেত্রে তাদের লেজুড়ে পরিণত হন। এভাবে হেলতে হেলতে একাংশ এখন ‘সরকারি বামপন্থী’ পরিচয় লাভ করেছেন। একইভাবে এদেশের কমিউনিস্টদের একদল আওয়ামীপন্থী কমিউনিস্ট, আরেক দল বিএনপিপন্থী কমিউনিস্ট হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে চিহ্নিত হয়ে ছিলেন। সত্যকার অর্থেই কমিউনিস্টদের একাংশ বিএনপি গড়ে তুলেছেন, আরেকাংশ আওয়ামী লীগকে ক্ষমতায় নিয়ে এসেছেন। কেউ সরাসরি যোগ দিয়ে, কেউবা সরাসরি যোগ না দিয়ে। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থেকে শোষণ লুটতরাজ করলেও এদের কেউ কেউ বিএনপির সমালোচনা করেন। অপরদিকে, বিএনপি ক্ষমতায় থাকলেও এদের অনেকে আওয়ামী লীগের সমালোচনাতেই বেশি আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এভাবে কমিউনিস্টদের ওপর বুর্জোয়া দলের প্রভাবের মূল কারণ কোনো আন্দোলনে মজুর শ্রেণির পক্ষে স্বতন্ত্র রাজনীতি না থাকা।

রাজনৈতিক সংগ্রামে তাদের অনিহার কারণে ব্রিটিশ আমল থেকেই মানুষ ক্ষমতার জন্য চিন্তা করত বুর্জোয়াদের আর তৎক্ষণিক প্রাপ্তির সংগ্রামের জন্য যেত কমিউনিস্টদের কাছে। তারা বলতেন, ‘রোটিকে লিয়ে কমিউনিস্ট, ভোটকে লিয়ে/স্বরাজকে লিয়ে কংগ্রেস।’ অর্থাৎ রুটি রুজির জন্য যাব কমিউনিস্টদের কাছে আর ভোট দিয়ে ক্ষমতায় পাঠাব কংগ্রেসকে কিংবা কংগ্রেসের নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত করব স্বরাজ।

কমিউনিস্টগণ কীভাবে রাজনৈতিক সংগ্রাম গড়ে তোলেন ?
সাধারণভাবে একটি দেশে নির্দিষ্ট সময়ে একটা নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সংগ্রাম অবশ্যই জারি থাকে। আমাদের দেশে রাজনৈতিক সংগ্রাম সাধারণত জারি রাখেন বুর্জোয়া দলগুলো। তাদের রাজনৈতিক সংগ্রাম শতকরা পাঁচভাগ মানুষের স্বার্থে। কমিউনিস্টগণ তাদের রাজনৈতিক সংগ্রামের লাইন এবং কর্মসূচি নির্ধারণ করেন বিশুদ্ধ তত্ত্বের জায়গা থেকে নয়। বরং সমাজে জারি থাকা বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক সংগ্রামের গুণগত বিপরীত এবং শতকরা ৯৫ ভাগ মানুষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে। ইতোপূর্বে বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের মধ্যে এভাবে রাজনৈতিক সংগ্রামের লাইন এবং কর্মসূচি নির্ধারণের উদাহরণ নাই। তবে ক্রমান্বয়ে বিষয়টি কমিউনিস্ট মহলে আলোচনায় আসতে শুরু করেছে এবং অগ্রসর অংশ বিষয়টি জীবন্তভাবে উপলব্ধি করতে সক্ষম হচ্ছেন।

বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার কেন?
সামরিক স্বৈরাচার এরশাদের পতন আন্দোলনের সময় থেকেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রসঙ্গটি রাজনীতিতে আলোচনায় চলে আসে। নব্বইয়ের পর প্রথম ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে আওয়ামী লীগ। পরে ফখরুদ্দীন-মঈনুদ্দীন সরকার আসার আগে তখনকার ক্ষমতাসীন বিএনপি চাইছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থাই বহাল রাখতে, আর আওয়ামী লীগ চাইছিল সেই ব্যবস্থার সংস্কার সাধন করতে। এক/এগারোর পরে ক্ষমতায় এসে পুরো তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি আদালতের পুরো রায় প্রকাশের আগেই প্রথম দফাতেই বাতিল করে দেয় টানা তিন দফায় ক্ষমতায় থাকা আওয়ামী লীগ সরকার। আর বুর্জোয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানালেও কার্যকর আন্দোলনই গড়ে তুলতে পারেনি কোমরভাঙা বিএনপি। তারা ক্ষমতায় থাকাকালে এত শোষণ নির্যাতন অন্যায় আর অপরাধ করেছে যে, তাদের কোনো কথাতেই মানুষের আস্থা নাই, জনতা আর বিশ্বাস তাদের করে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা বুর্জোয়াদের আন্দোলন নিয়ে কমিউনিস্টদের মধ্যে দুই ধরনের মত ও প্রবণতা রয়েছে। একাংশের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে চরম অনীহা রয়েছে। তারা মনে করেন, এটা বুর্জোয়াদের অভ্যন্তরীন দ্বন্দ্বের ফলাফল, সেখানে শ্রমিকশ্রেণির কোনো স্বার্থ নাই। তারা বিশুদ্ধ তত্ত্বের জায়গা থেকে কিছু ভালো ভালো কর্মসূচি উপস্থাপন করেন মাত্র। শোষণ লুণ্ঠনের ব্যবস্থা জারি রেখে ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য দুর্বৃত্তদের সংঘাত কখনো তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়।

অপরদিকে, কমিউনিস্টদের আরেকাংশ তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রশ্নে বুর্জোয়াদের থেকে আলাদা কোনো মত ও কর্মসূচি হাজির করতে পারেন না। তাদের দাবি ক্ষমতার বাইরের বুর্জোয়াদের দাবির সঙ্গে প্রভেদ নাই। আর বুর্জোয়া কর্মসূচিকে একটু পরিশীলিত আকারে উপস্থাপন করে সঙ্গে কিছু ভালো ভালো জনপ্রিয় কর্মসূচি জুড়ে দেওয়া হয় মাত্র। অর্থাৎ এখানেও বাম কমিউনিস্ট বলে পরিচিত এসব গ্রুপ অতীতের মতোই একই বৃত্তে ঘূর্ণায়মান। সেখান থেকে বের হতে পারছে না।

এবার বাহাত্তরের সংবিধান সম্পর্কে কিছু কথা
কিছু কিছু সমালোচনাসহ বাহাত্তরের সংবিধানের মূলনীতি, ঘোষণা ও প্রস্তাবনার দিকটি ইতিবাচক, সেখানে ভালো ভালো কথা লেখা আছে, কারণ এসব অংশে মুক্তিযুদ্ধের আলোকোজ্জ্বল দিকের প্রতিফলন রয়েছে। কিন্তু অনুচ্ছেদের অধ্যায়ে তার প্রতিফলন নাই। সেখানে প্রধানমন্ত্রীর হাতে রয়েছে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা। রাষ্ট্রের অর্থ আত্মসাৎ ও লুণ্ঠনে বৈধতা দেওয়া হয়েছে, ‘ক্রসফায়ার’ এর মতো বর্বর ব্যবস্থাটিও সংবিধানসম্মত। সংবিধানে অন্যান্য জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি নাই। এসব বিষয় নিয়ে আগেই আলোচনা করা হয়েছে।

প্রথম থেকেই বিরোধিতার মুখে পড়ে বাহাত্তরের সংবিধান

১৯৭২ সালের ১১ জানুয়ারি প্রণীত হয় বাংলাদেশ অস্থায়ী গণপরিষদ আদেশ। নতুন সংবিধান প্রণয়নে ১৯৭২ সালের ২২ মার্চ জারি করা হয় ওই বাংলাদেশ গণপরিষদ আদেশ।  সেটিই বাংলাদেশে সংবিধান সভা হিসেবে দায়িত্ব পালন করে। ১৯৭২ সালের ২১ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ন্যাপ সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ সর্বদলীয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠন এবং অন্তর্বর্তীকালীন সংবিধান গ্রহণের আহবান জানান। তিনি বলেন, ‘আরেকটি সাধারণ নির্বাচন না করে দেশের জন্য স্থায়ী সংবিধান গ্রহণ করা যেতে পারে না।’

১৯৭২ সালের ১৪ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রথম সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘মাত্র একবছর পূর্বে আমাদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। কেহ কেহ এখনও নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিতে চাহিলে, আমরা তাহাদের ইচ্ছামতো যেকোনো নির্বাচনি এলাকাতেই তাহাদের সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রস্তুত আছি। শীঘ্রই কতকগুলো উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে এবং তাহারা উক্ত সকল নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়া দেখিতে পারেন। আমি নিশ্চিত, তাহাদের জামানত বাজেয়াপ্ত হইবে (ইত্তেফাক ও বাংলাদেশ অবজারভাব ১৫ জানুয়ারি ১৯৭২)। যদিও, পরবর্তীতে কখনো ওই উপ-নির্বাচনগুলোর একটাও অনুষ্ঠিত হয়নি।

এর প্রতিক্রিয়ায় ১৯৭২ সালের ২৬ মে প্রকাশিত একটি বিবৃতিতে ন্যাপ প্রধানের বক্তব্যেরই অনুরূপ বক্তব্য রাখেন ছাত্রলীগের তিন নেতা আ.স.ম আবদুর রব (তৎকালীন ডাকসু ভিপি), শাহজাহান সিরাজ (তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক ছাত্রলীগ) ও শরীফ নুরুল আম্বিয়া। তাঁরা দাবি জানান, দেশে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে গণপরিষদ ও মন্ত্রিসভা বাতিল করা হোক এবং বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে গঠন করা হোক জাতীয় সরকার।

পরবর্তীতে রব-সিরাজ আরো একটি প্রশ্ন তোলেন, প্রায় ৬০ জনের অধিক গণপরিষদ সদস্যের (যাদের মধ্যে ৫ জন মুক্তিযুদ্ধে শহীদ, ১০ জন ইতোমধ্যে মারা গেছেন এবং কেউ কেউ দুর্নীতির দায়ে ও মুক্তিযুদ্ধের সময় পদত্যাগের দায়ে বহিষ্কৃত, কেউ কেউ অনুপস্থিত ও পদত্যাগী) অবর্তমানে অর্থাৎ বাংলাদেশের এক কোটির বেশি লোকের প্রতিনিধিত্ব ছাড়াই গণপরিষদের অধিবেশন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এছাড়া তাঁরা আরো প্রশ্ন তোলেন যে, জাতীয় পরিষদ সদস্যের শতকরা নব্বইজনই যেখানে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলাকালে সম্পূর্ণ সময়টুকু ভারতে নির্লিপ্ত জীবনযাপন করেছেন, সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে অর্জিত একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশের শাসনতন্ত্র প্রণয়নের অধিকার সেইসব গণপরিষদ সদস্যের আদৌ আছে বলে দেশবাসী মনে করে না।

মওলানা ভাসানীর ন্যাপ ও দলের মুখপত্র ‘হক কথা’র ১৪ জুলাই ১৯৭২ সংখ্যায় বলেন, এই গণপরিষদ সদস্যরা সেদিন জে. ইয়াহিয়ার পাঁচ দফা শর্ত মেনে নিয়ে পাকিস্তানের সংবিধান রচনার জন্যই নির্বাচিত হয়েছিলেন। তাঁদের নির্বাচনি সময়কাল থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সময়কালের ব্যবধান প্রায় ১৪/১৫ মাস হলেও রাজনৈতিক সচেতনতা, আশা-আকাক্সক্ষা ও মূল্যবোধের দিক দিয়ে জনগণ অনেক এগিয়ে গেছেন। এই সবকিছুর মধ্য দিয়ে পরিস্থিতির যে বিকাশ ও পরির্বতন ঘটেছে সেটিকে ১৯৭০ সালে পাকিস্তানের সাংবিধানিক কাঠামোয় নির্বাচিত গণপরিষদ সদস্যগণ ধারণ করতে পারেন না।

১২ অক্টোবর খসড়া সংবিধান উত্থাপিত হওয়ার পর রাজনৈতিক দলগুলো নিজ নিজ অবস্থান থেকে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। লেনিনবাদী কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক অমল সেন। তিনি সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘.. .. বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকদের যে ধরনের সংবিধানিক অধিকার থাকে এখানে তাও নেই।’ শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের শাসনতন্ত্রকে ‘পরিত্যক্ত সম্পত্তির শাসনতন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলা হয়, ‘এই শাসনতন্ত্র হওয়ার পর পাকিস্তানি নাগরিকদের ফেলে যাওয়া যে সমস্ত সম্পত্তির মালিক সরকার হয়েছে, খসড়া সংবিধানে সে সম্পত্তিকে একটা সমাজতান্ত্রিক লেবেল লাগিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। এমনকি পাকিস্তানি আমলের কতিপয় শিল্প আইন কার্যকর থাকবে বলে ঘোষণা করে বিদেশি মূলধন জাতীয়করণ না করার সরকারি সিদ্ধান্ত অনির্দিষ্টকালের জন্য পাকাপোক্ত করা হয়েছে।’

ন্যাপ (মোজাফফর)-এর একমাত্র সংসদ সদস্য সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত সংসদে তাঁর আলোচনায় খসড়া শাসনতন্ত্র নিয়ে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব দিয়ে বলেন, আওয়ামী লীগের সকল শীর্ষনেতাও ১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের সংবিধানের ওপর জনরায় নেওয়ার জন্য গণভোটের প্রস্তাব দিয়েছিলেন এবং যেসব ধারার নিন্দা সেদিন আওয়ামী লীগ করেছিল, হুবহু সে ধারাগুলোই তারা স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধানে প্রবিষ্ট করাইয়াছেন। তিনি আরও বলেন, ৫৬ সালের শাসনতন্ত্র রচনা করা হয়েছিল রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খানকে সামনে রেখে। আর বর্তমান শাসনতন্ত্র বিলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে তার চেয়েও বেশি ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের সংবিধান রচনা বিষয়ে মতামতের জন্য ভারত, যুক্তরাজ্য সফরের নিন্দা করে, মওলানা ভাসানীর ‘হক কথা’য় ‘সংবিধানের ভারত যাত্রা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশ করা হয়। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র লারমা সংসদে তাঁর আলোচনায় বলেন, শাসনতন্ত্র বিলের প্রতিটা ধারাই প্রমাণ দেয় যে, এক হাতে জনগণকে অধিকার দেওয়া হয়েছে, অন্যহাতে আবার সে অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে। ক্ষুদ্র জাতিসত্তার স্বীকৃতি দাবি করে তিনি বলেন, আমি সেই নির্যাতিত নিপীড়িত জাতিসত্তার একজন। আমরা বাংলাদেশের জনগণের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে বাঁচতে চাই। কিন্তু আমাদের দাবি আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের। খসড়া সংবিধানে আমাদের জাতিসত্তার কথা নেই। একথা আমি শুধু আজ বলছি না, ইয়াহিয়া আর আইয়ুবের আমলেও বলেছি। ‘৫৬ ও ‘৬২ সালের সংবিধানে জনগণের অধিকার স্বীকৃত হয়নি। তাই জনগণ তা প্রত্যাখান করেছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান তৈরি করার সময় আমাদের তা মনে রাখতে হবে। সংবিধান এমন হতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ বংশধরেরা তা গ্রহণ করে।
এ প্রসঙ্গে ১৯৭২ সালের ২৯ অক্টোবর প্রকাশিত বদরুদ্দীন উমরের ‘চিরস্থায়ী জরুরি অবস্থার সংবিধান’ নামক নিবন্ধনে বলা হয়েছে : ‘শাসক শ্রেণী যে রাষ্ট্রের মৌলিক সবগুলো প্রতিষ্ঠানকেই বিপুল পরিমাণে অবিশ্বাস করে এই সংবিধান তারই ইঙ্গিতবহ এবং সংবিধানটি সংসদীয় সংখ্যাধিক্যের সাহায্যে সেগুলোকে নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় রসদ জোগান দেয়। সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ এই ইঙ্গিত দেয় যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে এমনকি সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতাকেও নির্ভরযোগ্য শর্ত হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে না। ফলে এটাকে স্রেফ প্রধানমন্ত্রীর নিজস্ব একটা হাতিয়ার বানিয়ে ফেলা হয়েছে, যাকে শাসকগোষ্ঠীর একমাত্র প্রতিনিধি হিসাবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অসীম ক্ষমতা চর্চা করার অধিকার দেওয়া হয়েছে, এই সংবিধান পরিষ্কারভাবেই অসংখ্য অভ্যন্তরীণ সংকটে জর্জরিত নয়, মোটা দাগে তারা অসংহত। এরকম একটি পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী দৃশ্যমান রয়েছেন সম্পূর্ণ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় শর্ত হিসাবে। এবং এ কারণেই অন্যদের নানা রকম আপত্তি সত্ত্বেও চূড়ান্ত বিশ্লেষণে তারা তাদের আস্থা অন্য কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের ওপর অর্পণ না করে তাঁর ওপর স্থাপন করতেই বাধ্য। এবং এ কারণেই শাসকশ্রেণীর একনায়কত্ব একজন প্রধানমন্ত্রীর সংসদীয় স্বৈরতন্ত্রে পর্যবসিত হওয়ার দিকে যাচ্ছে, এক্ষেত্রে তা শেখ মুজিবুর রহমানের স্বৈরতন্ত্র। সুনির্দিষ্টভাবে শেখ মুজিব একজন বেসামরিক ব্যক্তি বলেই প্রাথমিক পর্বেই এই স্বৈরতন্ত্র একটা সংসদীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে। আগামীকাল যদি পরিস্থিতি বেসামরিক কর্তৃত্বের বাইরে চলে যায় এবং শাসকশ্রেণীর জন্য আরও খারাপ হয়ে ওঠে সংসদীয় ধরনটি রাষ্ট্রপতি ধরনের শাসন দিয়ে কিংবা আরও খারাপ কিছু দিয়ে প্রতিস্থাপিত হতে পারে। এইসব জরুরি কারণবশতই এখানে একটা চিরস্থায়ী জরুরি অবস্থার পূর্বানুমান করা হয়েছে এবং সেই অনুমানের ভিত্তিতে শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে সকল ধরনের জরুরি ক্ষমতা অনুশীলনের বন্দোবস্ত করারই একটা প্রয়াস নেওয়া হয়েছে।’

১৯৭২ সালের অক্টোবরে পূর্ব বাংলার সর্বহারা পার্টির সভাপতি কমরেড সিরাজ সিকদারও এই সংবিধানের এবং সংবিধান প্রণয়নের অথরিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং এর কঠোর সমালোচনা করেন। এভাবে যারা কঠোর সমালোচনা করেছেন, সংবিধান প্রত্যাখ্যান করেছেন, তারা গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের দাবিতে আন্দোলন গড়ে তোলার পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি।
এবার আমাদের কথা

আমরাও মনে করি, পাক সামরিক দস্যু ইয়াহিয়ার অধীনে পাকিস্তানের ঐক্য ও সংহতির ৫ দফায় মুচলেকা দিয়ে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের দিয়ে গঠিত পরিষদের দ্বারা স্বাধীন দেশে সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে যে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল, সে প্রশ্ন এখনো তোলা যায়। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করা সম্ভব হলে, এখনো বাহাত্তরের সংবিধান বাতিল করে একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের রাজনীতি হাজির করা যায়।

আমরা মনে করি, শোষণমূলক ও লুণ্ঠনমূলক উপনিবেশিক পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কাঠামো বজায় রাখার মূল দলিল বাহাত্তরের সংবিধানের বিপরীতে মেহনতি নরনারী ও ক্ষুদ্র জাতিসমূহের স্বার্থরক্ষক একটি গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়নের জন্য সংবিধান সভার নির্বাচন জরুরি হয়ে পড়েছে।
বর্তমানের রাজনৈতিক সংকটকালে আমরা বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে একটি সংবিধান পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবি উত্থাপন করেছি। দাবি অনুযায়ী, বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাংলাদেশে দেশীয় শাসকশ্রেণি, সাম্রাজ্যবাদ, ভারতীয় আধিপত্যবাদ ও ধর্মীয় ফ্যাসিবাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি ধ্বংস করেই নির্বাচনের ব্যবস্থা করবে। নিন্মোক্ত কর্মসূচি সফল করবে। বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে আন্দোলনকারী সংস্থার প্রতিনিধিদের নিয়ে।

যে কোনো গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক আন্দোলনে অনেকগুলো সংস্থা গড়ে ওঠে। যেমন স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনকালে গড়ে উঠেছিল শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদ বা স্কপ, সর্বদলীয় ছাত্র ঐক্য, ১৭টি কৃষক সংগঠন, জাতীয় কবিতা পরিষদ, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোট। (যদিও এসব সংস্থার নেতারা পরবর্তীতে জনগণের বিপরীত শিবিরে অবস্থান নিয়েছেন।) একইভাবে বর্তমানে রাজনৈতিক আন্দোলনহীন দেশে এখনো আন্দোলনকারী সংস্থা হিসেবে তেল-গ্যাস-বিদ্যুৎ-বন্দর খনিজসম্পদ রক্ষা আন্দোলন, সুন্দরবন রক্ষা আন্দোলন চলমান ছিল। আমরা আশাবাদী রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু হলে জনগণের ভেতর থেকে আরো গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সংস্থা গড়ে উঠবে, বাংলাদেশের আন্দোলনের ইতিহাস তাই বলে।
আমাদের দাবি অনুযায়ী, তার আগে বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি গণতান্ত্রিক নির্বাচন কমিশন গঠন করবে। আন্দোলনের সমর্থক বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনদের নিয়ে গণতান্ত্রিক নির্বাচন কশিমন গঠন করতে হবে। যে কমিশন শ্রমজীবী মানুষের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার সুযোগ তৈরি করে দেবে। ব্যক্তিগত ব্যয়ে প্রচারণা নিষিদ্ধ করে সকলের জন্য রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সমান প্রচারণার ব্যবস্থা করবে। একজন মজুরের আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জামানতের অর্থের পরিমাণ ঠিক করবে।

যে বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দাবিসমূহ বাস্তবায়নের আইনি স্বীকৃতি দেবে। যে বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার নতুন গণতান্ত্রিক সংবিধান পরিষদের নির্বাচনের ভিত্তিতে মেহনতি জনগণের, নিপীড়িত নারী সমাজ ও ক্ষুদ্র জাতিসমূহের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক সাংস্কৃতিক কর্মসূচির ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রতিষ্ঠা করবে। নির্বাচিত পরিষদ একটি গণসংসদ গঠন করবে। সেই গণসংসদে নানা পেশার শ্রমজীবী মানুষ এবং বিদেশে কর্মরত শ্রমিকদের প্রতিনিধিত্ব রাখার বিধান রাখবে। বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিম্নোক্ত কর্মসূচিসমূহ বাস্তবায়ন করবে।

অস্থায়ী বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্তৃব্য হলঃ-
১.     আন্দোলনকারী সংস্থার প্রতিনিধিদের দ্বারা গঠিত বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সংবিধান সভার নির্বাচনের আয়োজন।
২.   বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার বর্তমান নির্বাচন কমিশন ভেঙে দিয়ে গণআন্দোলনের সমর্থক বুদ্ধিজীবী ও বিশিষ্টজনদের নিয়ে একটি নতুন নির্বাচন কমিশন গঠন করবে, যে কমিশন একজন মজুরের আয়ের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে জামানতের পরিমাণ নির্ধারণ করবে। সকল প্রার্থীকে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে প্রচারের সুযোগ দেবে। ব্যক্তিগত ও দলীয় প্রচার অতিশয় সীমিত করে দেওয়া হবে।
৩.  বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকার একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করবে। যেখানে জনগণের সম্পদ আত্মসাৎকারী, দুর্নীতিবাজ দখলবাজ এবং অর্থ পাচারকারীদের বিচারকাজ শুরু করবে। একই সঙ্গে এদের দেশে-বিদেশের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত, ভোটাধিকার বাতিল ও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করবে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের ক্ষেত্রেও অনুরূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
৪  বিপ্লবী তত্ত্বাবধায়ক সরকারের কর্তব্য হলোÑ(ক) পরিবেশবান্ধব শিল্প কারখানা গড়ে তোলা, বন্ধ শিল্প কারখানার আধুনিকায়ন ও চালু করা, সকল বৃহৎ শিল্প কারখানা ব্যাংক বীমা জাতীয়করণ করা, ভূমি জাতীয়করণ করা, সমবায়ী কৃষি খামারীদের কাছে জমি লিজ প্রদান করা, সহজ শর্তে ঋণ ও আনুসঙ্গিক সুবিধা প্রদান করা; গণপরিবহন, খাদ্য ব্যবসা, বৃহৎ ব্যবসা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা জাতীয়করণ করা। (খ) যুক্তরাষ্ট্র, ভারত ও চীনের সঙ্গে সম্পাদিত সকল গোপন চুক্তি প্রকাশ করা। অমর্যাদাকর চুক্তি বাতিল করা, অভিন্ন নদীর পানির হিস্যার জন্য আন্তর্জাতিক আদালতের শরণাপন্ন হওয়া, সীমান্ত হত্যা ও চোরাচালান বন্ধে সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ গ্রহণ, সৌদি যুদ্ধ জোট থেকে বেরিয়ে আসার ঘোষণা দেওয়া। (গ) ধর্মীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ, নারী-পুরুষের সমধিকার, সকল জাতি ও ভাষার সমধিকার, অবাধ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের দাবিগুলোকে আইনি রূপ প্রদানের পদক্ষেপ গ্রহণ, ধর্মীয় অনুদানের অর্থ দিয়ে বিশেষ রাষ্ট্রীয় তহবিল গঠন। সেই অর্থ সমাজের মূলস্রোত থেকে বিচ্যুত ও পশ্চাৎপদ অংশের হিতার্থে ব্যয়। (ঘ) বিচারবহির্ভূত হত্যাকান্ড ও গুমের ঘটনায় শ্বেতপত্র প্রকাশ করা। বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করে ওই সব হত্যাকাণ্ডের বিচারকাজ সম্পন্ন করা এবং নিখোঁজদের যারা জীবিত আছেন, তাদের স্বজনদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া। সামরিক বাহিনীতে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য হত্যা গুমের বিচার শুরু। কর্ণেল তাহেরের চিন্তা অনুযায়ী একটি উৎপাদনমুখী, গণবান্ধব ও আত্মমর্যাদাশীল চরিত্রের সশস্ত্রবাহিনী, বিজিবি ও পুলিশ বাহিনী গঠন।
৫  তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচিত পরিষদ একটি গণসংসদ গঠন করবে, যে গণসংসদ মেহনতি নরনারী, নিপীড়িত নারীসমাজ, ক্ষুদ্র জাতিসমূহের অর্থনৈতিক রাজনৈতিক ও সামাজিক কর্মসূচির ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক সংবিধান প্রণয়ন করবে। ওই গণসংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পদক্ষেপ সমূহ এগিয়ে নেবে। ওই গণসংসদের একটি কক্ষে প্রবাসী সহ বিভিন্ন পেশাজীবীদের প্রতিনিধিত্ব করার বিধান রাখবে। মেহনতিদের গণসংসদ সকল নাগরিকের জন্য বিনামূল্যে কিংবা নামমাত্র মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, খাদ্য, বাসস্থান, কাজের অধিকার ও বিনোদনের ব্যবস্থা নিশ্চিত করবে। জনবান্ধব ও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের নতুন ধারা সূচনা করবে। সারাবিশ্বের মেহনতি নরনারী ও নিপীড়িত জাতিসমূহের লড়াইয়ের সঙ্গে ঐক্য সংহতি প্রতিষ্ঠা করবে। আত্মমর্যাদাশীল জাতিসমূহের আত্মনিয়ন্ত্রণের সহযোদ্ধা হিসেবে বাংলাদেশের উত্থানে নেতৃত্ব দেবে। সুখী সমৃদ্ধিশালী একটি নতুন বাংলাদেশ মাথা তুলে দাঁড়াবে।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.