সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ শহিদুল আলম মেম্বার, শিয়ালকোল

শহিদুল আলম শেখ আমার নাম। এলাকার মানুষ আলম মেম্বার বলে চেনেন। আমার জন্ম ১৯৫৮ সালে, মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে স্কুলের ছাত্র, বয়স তের সাড়ে তের। পিতার নাম: খোদাবক্স শেখ, ব্যবসার পাশাপাশি জমিজমা দেখাশোনা করতেন । মা মহারাণী বিবি। ৮ ভাইবোনের মধ্যে আমি ষষ্ঠ। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষনের পর শিয়ালকোল প্রাইমারি স্কুল মাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু হয়। সেখানে প্রশিক্ষণ দিতে এগিয়ে আসেন আড়িয়ামোহন গ্রামের আনসার সদস্য মোবারক হোসেন ও মুকুল ফৌজ সদস্য একই গ্রামের ইসমাইল হোসেন। প্রায় শত খানেক তরুণ সেখানে প্রশিক্ষণ নিতে শুরু করেন, আমরা কিশোল বলে আমাদের প্রশিক্ষণে নেওয়া হয় না। তবে আমরা মাঠের পাশে বসে সে প্রশিক্ষণ দেখতাম, লাঠি নিয়ে আমরা আমাদের মতো প্রশিক্ষণ দিতাম। প্রশিক্ষণ ছিল মূলত বাঁশের লাঠি নিয়ে শরীর চর্চায় সীমাবদ্ধ। যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে আমার বড় ভাই রৌমারী থানা শিক্ষা অফিসার ছিলেন। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে তিনি চলে আসেন বাড়িতে। যুদ্ধের শুরু হলে আরেক বড় ভাই হাবিবুর রহমান চলে যান বড় ভাইয়ের কোয়ার্টার দেখতে, সেখান থেকে যোগ দেন মুক্তিযুদ্ধে। এদিকে, শহর থেকে লোকজন গ্রামে আশ্রয় নিতে শুরু করে। ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নেয় পাকসেনারা, পরের দিন তারা এসে আমাদের এলাকার বিভিন্ন গ্রামে আগুন দেয়। পাকসেনারা সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নিয়ে কয়েকদিন অত্যাচার করে চেয়ারম্যান মেম্বার আর মুসলিম লীগ জামায়াত নেতাকর্মীদের দায়িত্ব দেয় ইউনিয়ন শান্তি কমিটি গঠনের। শিয়ালকোল ইউপি চেয়ারম্যান মোহাবর রহমান খান ওরফে নালু খাঁ শান্তি কমিটির আহŸায়ক হন। ইউনিয়ন জামায়াত নেতা মজিবর রহমান রাজাকার বাহিনীতে যুক্ত হন। তারা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান পদ নিয়ে চির প্রতিদ্ব›দ্বী। যাইহোক, চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে গঠন করা হয় শান্তি কমিটি। সে কমিটির আশ্বাস পেয়ে এলাকাবাসী নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে আসতে শুরু করে। বিভিন্ন গ্রামে শান্তি কমিটির শান্তি সভা শুরু হয়। ১৮ মে ছিল পাইকশা গ্রামে শান্তি কমিটির সভা। সভা শেষ করে শান্তি কমিটি ও চৌকিদারকে নিয়ে পাকসেনাদের একটি দল চলে আসে শিয়ালকোলে। তখন আমি বাড়িতে ছিলাম। আমার বড় ভাই ওসমান আমাকে ধরে নিয়ে চরার মধ্যে চলে যায়। সেখানে থেকে আমরা গুলির শব্দ পাই। তখন শিবচরণের স্ত্রী চিৎকার করতে করতে গ্রামের ভিতরে দৌড়ে আসে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সড়ক ধরে শহরের ফিরে যায় পাকসেনারা। পাকসেনাদের চলে যেতে দেখে আমরা দৌড়ে চলে আসি হাটখোলায়। সেখানে সাতজন হাতপা বাধা অবস্থায় গুলি খেয়ে পড়ে আছেন, এদের মধ্যে আহত ফনি দাস তখনও গুলিবিদ্ধ হয়ে বেঁচে আছেন। তখন চিৎকার করে লোকজন ডাকছিলেন আব্দুল মোমিন মÐলের [মুক্তিযোদ্ধা] মা আয়েশা খাতুন। আর হাটখোলার দোকানদার জামাল ও পাশ্ববর্তী গ্রামের আজমত সর্দার গুলিবিদ্ধ ফণি দাসের হাতের বাঁধন খুলে দেওয়ার চেষ্টা করছেন। কিন্তু পাকসেনার ভয়ে সাধারণ মানুষ পলাতক। আহত ফণি দাসের বাঁধন খুলে নিয়ে যাওয়া হয় তার বাড়িতে। আপ্রাণ চেষ্টা করা হয় বাঁচিয়ে রাখার জন্য, কিন্তু চিকিৎসার অভাবে তা সম্ভব হয় না। রাতে ফণিদাসও মারা যান। এরা যেহেতু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ, তাই এদের মরদেহ সরাইচÐি গ্রামের স্মশানে অর্ধদাহ করা হয়। পুরো দাহ করা সম্ভব হয় না, কারণ যে কোনও সময় পাকসেনা ও তার দোসরেরা চলে আসতে পারে। পরে সেখানেই শহিদদের পুঁতে রাখা হয়। আর শহিদ শিবচরণের মরদেহ রাস্তার পাশে তার বাড়ির মধ্যে মাটি চাপা দেওয়া হয়। শিয়ালকোল হাটখোলায় সেদিনের গণহত্যায় হিন্দু সম্প্রদায়ের সাতজন শহিদ হন। শান্তি কমিটির আশ্বাস অথবা নিজ প্রযোজনে এ পরিস্থিতিতে মানুষ বের হতে শুরু করে। ধীরে ধীরে আসে বর্ষাকাল। সেদিন ছিল হাটবার। আমি বাবার সাথে হাটে এসেছি বাড়ির লেবু বিক্রি করতে। হঠাৎ গুলির শব্দে হাট ভেঙ্গে যায়। দৌড়ে এসে দেখি, স্কুল ঘরের কাছে রাস্তার পাশে কুদ্দুসের দোকানের সামনে কৃষ্ণচূড়া তলায় মরে পড়ে আছে চেয়ারম্যান মোহবর রহমান খান ওরফে নালু খা। তাকে বিভিন্ন জন পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করছেন। খবর পেয়ে মিলিটারির গাড়ি এবং থানা পুলিশ আসে। পুলিশ লাশ নিয়ে যায় পোস্টমর্টেম করার জন্য। এ সময়ে লাশের সঙ্গে ছিল চেয়ারম্যানের ছেলে মোকলেসুর রহমান রনো। এ ঘটনার পর পরই বেতনালী নদীতে পাকসেনা ও রাজাকার ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। তারও কয়েকদিন পর দিনের বেলায় সারটিয়া গ্রাম থেকে পাকসেনা ও রাজাকারেরা তোজাম্মেল হোসেন ও মেঞ্জের আলী নামের দুই ভাইকে তুলে এনে হত্যা করে হিন্দু পাড়ায়। সেদিন আমি হিন্দু পাড়ার আড়ার মধ্যে গিয়েছিলাম গাব পেড়ে আনতে। দুই ভাইয়ের লাশ দেখতে আসে অনেকেই। তাদের মধ্যে আব্দুল হামিদ সরকার [মুক্তিযোদ্ধা] সে-ই লাশের বাধন খুলে দেয়। সে রাতেই আমার আরেক ভাই সোহরাব আলী শেখ, আব্দুল হামিদ সরকার সহ আরো কয়েক যুবক এলাকা থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যায়। মুক্তিযুদ্ধের শেষ পর্যায়ে এসে এলাকায় মুক্তিযোদ্ধাদের আনাগোনা বাড়তে থাকে। একদিন আমাদের বাড়িতে এসে আশ্রয় নেয় পাশ্ববর্তী মোলভীপাড়ার বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহিম। সে একদিন থেকে আমাদের বাড়িতে ছেড়ে চলে যায়। মাঝেমধ্যেই তিনি আসতেন আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিতে। আসতেন আরেক বীর মুক্তিযোদ্ধা দিয়ারবৈদ্যনাথের মতিয়ার রহমান খান। তার কাছেই আমরা খবর পাই আমার দুই মুক্তিযোদ্ধা ভাই হাবিবুর রহমান ও সোহরাব আলী ভালো আছেন। বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল মোমিন মÐলও বাড়িতে এলে তার সঙ্গেও দেখা হয়। শৈলাবাড়ি যুদ্ধের কয়েকদিন আগে হত্যা করা হয় ক্ষুদ্র শিয়ালকোল গ্রামের রুস্তম আমিন। তার মরদেহ দেখতে যাই আমি। সেখানে শুনতে পাই, রুস্তম আমিন ব্যবসা করতেন অবাঙালি ব্যবসায়ী আলী ইমামের সঙ্গে। আলী ইমাম ওই বাড়িতে মাঝেমধ্যে আসতেন, দাওয়াত খেতেন। এই অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধারা রুস্তম আমিনকে হত্যা করে। এর পর পরই সম্ভবত বেতনালী নদীর পাড় থেকে পাকবাহিনীর ক্যাম্প প্রত্যাহার করা হয়। ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধাদের তৎপরতা বাড়তে থাকে। গ্রাম থেকে বিভিন্ন ক্যাম্প নিয়ে যাওয়া হতে থাকে শহরে। গ্রামে কমে যায় স্বাধীনতা বিরোধী তৎপরতা। প্রকাশ্যে আলোচনা হতে থাকে স্বাধীনতার কথা। স্বাধীনতা যেন সময়ের ব্যপার হয়ে দাঁড়ায়। সিরাজগঞ্জ ও তার আশপাশে ভারতীয় বিমান বাহিনী এসে হামলা চালাতে শুরু করে পাকবাহিনীর সম্ভাব্য ঘাঁটিতে। শৈলাবাড়ি যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে যাওয়ার সময় এগিয়ে আসে পাকসেনার। তারা পালিয়ে যাওয়ার পর ১৪ ডিসেম্বর ঢুকে পড়ে শহরে মুক্তিযোদ্ধারা। ১৬ ডিসেম্বর মুক্ত হয় পুরো বাংলাদেশ। এর কয়েকদিনের মধ্যেই শিয়ালকোলে ক্যাম্প স্থাপন করা হয় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের প্রশাসনে শুরু হয় স্বাধীন বাংলাদেশের পথচলা। শহিদুল আলম ওরফে আলম মেম্বার। ক্ষুদ্র ব্যাবসায়ী ও সমাজসেবি। দুই সন্তানের জনক। শিয়ালকোল ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ছিলেন দীর্ঘদিন। সাক্ষাৎকার গ্রহণ: শিয়ালকোল হাটখোলা চায়ের দোকান। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১ সাল। দুপুরে।

 

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.