সাধারণের চোখে মুক্তিযুদ্ধ

আমি মোঃ গোলাম মোস্তাফা। জন্ম: ১৯৪১ সাল। পিতা: মূছা খন্দকার, মাতা: মরিয়ম বেগম, গ্রাম: বিলধলি, ইউনিয়ন: শিয়ালকোল, সদর উপজেলা, জেলা: সিরাজগঞ্জ। বাবা কৃষিকাজ করতেন। তিন ভাইবোনের মধ্যে আমি দ্বিতীয়। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আমি শিয়ালকোল পোষ্ট অফিসের পিয়ন ছিলাম, তবে সারাদিন পোষ্ট অফিসের থাকতে হতো বলে সেখানেই সাইকেল মেকারির কাজও করতাম। ১৯৭১ সালের ১ ডিসেম্বর পাক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিতের ঘোষণার প্রতিবাদে আন্দোলনে নামে বাঙালিরা। শিয়ালকোলসহ বিভিন্ন স্থানে বাঁশের লাঠি হাতে শুরু হয় বাংলাদেশ স্বাধীন করার প্রশিক্ষণ। অবাঙালিরা নিরাপত্ত¡াহীনতায় ভূগতে শুরু করে। আইডাবিøউটিএর কর্মকর্তার এক ছেলে আর এক মেয়ে আমাদের বাড়িতে এসে গোপনে আশ্রয় নেয়। কিন্তু তাদের আশ্রয় নেওয়ার খবর জানাজানি হলে গ্রামবাসী ও আশপাশের লোকজন এসে ঘিরে ফেলে আমাদের বাড়িতে। গ্রামবাসী তাদের হাতে ওই ছেলেমেয়েকে তুলে দেওয়ার দাবি জানায়। কিন্তু আশ্রিত ওই ছেলেমেয়েকে আমরা বাড়িতেই লুকিয়ে রাখি। নানা টালবাহানায় কোনও রকমে রক্ষা করা হয় তাদের। রাতে ওই ছেলেমেয়েকে তুলে দেওয়া হয় স্থানীয় সংগ্রাম পরিষদের নেতা জাহাঙ্গির হোসেন জিন্নাহর কাছে। সে ওই ছেলেমেয়ে নিয়ে সম্ভবত কামারখন্দ তার এক আত্বীয় বাড়িতে আশ্রয় দেয়। ২৭ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ শহর দখলে নেয় পাকসেনারা। সাধারণ মানুষ ভীত হয়ে শহর ছেড়ে গ্রামে পালাতে শুরু করে। যদিও আমাদের গ্রাম যোগাযোগ বিচ্ছিহ্ন তবুও আমরা গ্রাম ছেড়ে গিয়ে আশ্রয় নেই হামকুড়িয়া গ্রামে। আবার সে গ্রামেরও কেউ কেউ গ্রাম ছেড়ে আশ্রয় নেয় অন্যত্র। এক/দুই দিন পরেই পাকসেনা আসে এলাকায়, বিলধলী গ্রামে এসে আমাদের বাড়িসহ ১০/১২ টি বাড়ি পুড়িয়ে দেয়। এরপর ইউনিয়ন পরিষদের মেম্বার/চেয়ারম্যান এবং পাকিস্তানপন্থীদের নিয়ে শান্তি কমিটি গঠন করা হয়। আমাদের ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নালু খাঁ ও জামায়াত নেতা মজিবর রহমানের নেতৃত্বে গঠন করা হয় শান্তি কমিটি। তাতে যুক্ত হয় পাকিস্তানপন্থী মুসলিম লীগ জামায়াতের লোকজন। তারা আশাভরসা দিতে শুরু করে যে, যার যার বাড়িতে ফিরলে সাধারণ মানুষকে কিছু বলা হবে না। এ পরিস্থিতিতে আমরা গ্রামে ফিরে আসি। শিয়ালকোল হাটখোলায় যাতায়াত শুরু করি। এ সময় চিঠিপত্র তেমন আসতো না, তাই আরো বেশী মনোযোগ দেই সাইকেল মেকারির কাজে। ধীরে ধীরে লোকজন চলাচল শুরু করে, তবে তারা জরুরী কাজ থাকলে হাটখোলায় আসতো, প্রয়োজনীয় কাজ করেই আবার চলে যেত নিজ বাড়িতে। ফলে জনসমাগম খুব কম থাকতো। ১৭ মে পনের/ষোল জন পাকসেনা আসে শিয়ালকোল হাটখোলায়। আমি তখন স্কুলের বারান্দায় বসে একটি সাইকেল মেরামত করছিলাম। মিলিটারি এসে আমাকে জিজ্ঞেস করে-এ গ্রামে কোনও ‘হিন্দু’ বা ‘মুক্তি’ আছে কিনা? আমি জানাই যে, এখানে কোন হিন্দু আছে কিনা আমার জানা নেই। আর কোনও মুক্তিও দেখিনি। এমন সময় শিয়ালকোলের কোনাই বাড়ির হারাণ পাগলা ধুতি পড়ে এসে পাকসেনাদের কাছে এসে ভিক্ষে চায়। সে চোখে কম দেখতো এবং লোক সমাগম দেখলেই ভিক্ষে চাইতো। তাকে ধুতি পড়া দেখে পাকসেনাদের সন্দেহ হয় যে এ গ্রামে হিন্দু মানুষ আছে। কয়েক জন যায় পাড়ার মধ্যে। বেশ কয়েক জনকে ধরে ফেলে। মুচি বাড়ির কাছে গিয়েও কয়েক জনকে ধরে ফেলে। তাদের হাটখোলার পশ্চিম পাশে নিয়ে গরুর দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলে। এ সময় আমি সেখান থেকে সরে পড়ি। দূর থেকে দেখতে পাই, এক লাইলে দাঁড় করিয়ে অস্ত্র দিয়ে তাদের গুলি করে হত্যা করে পাকসেনারা। সেদিন শিয়ালকোল হাটখোলার পাশে মোট সাত জনকে হত্যা করা হয়। এ ঘটনার কয়েকদিন পরের ঘটনা। তখন পাকিস্তানি প্রশাসন মোটামুটি চালু হয়েছে। কিছু স্বাধীনতা বিরোধী লোকজন বিভিন্ন গ্রামের মানুষকে সভা করে আস্বস্থ করার চেষ্ঠা করছে যে, পাকিস্তানকে ভেঙ্গে ফেলা অতো সহজে সম্ভব নয়। হাটখোলায় বিশেষ করে হাটের দিনে হাটবাজার করতে আসছে লোকজন, যদিও প্রয়োজনীয় কাজ করেই ফিরে যাচ্ছে। কারণ, সাধারণ মানুষকে দেওয়া আশ্বাসবাণী বিশ্বাস করতে পারছে না তারাও। সেদিনও ছিল হাটের দিন। পোষ্ট অফিসের বারান্দায় বসে আমি একটি সাইকেল মেরামত করছি। একটু দূরে বেঞ্চ পেতে বসে আছেন ইউনিয়ন চেয়ারম্যান নালু খাঁ। তার সঙ্গে গল্প করছেন সিলন্দার মুসলিম, দিয়ারবৈদ্যনাথের মোয়াজ্জেল ও চেয়ারম্যানের বাড়ির কাছের হবিবর। এ সময় ৩/৪ জন যুবক এসে চেয়ারম্যানকে ঘিরে ধরে দেশিয় অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায়। চেয়ারম্যানের সঙ্গে থাকা লোকজন এ হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করে। তখন হামলাকারীদের সঙ্গে থাকা কয়েক জন যুবক পাটশোলার আটি খুলে রাইফেল বের করে গুলি করে। হাট ভেঙ্গে যায়। এ সুযোগে মুক্তিযোদ্ধারা পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়। আশপাশে থাকা আমরা কয়েক জন নালু খাঁর কাছে গিয়ে তাকে পানি খাওয়াই। গুরুতর আহত নালু খাঁ মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। আর এভাবেই মুক্তিযোদ্ধাদের কথা আলোচনায় চলে আসে। এর কয়েকদিন পরে বেতনালী ব্রিজের কাছে পাকসেনা আর রাজাকারদের একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হয়। ফলে সাধারণ মানুষের চলাচল আরো সীমিত হয়ে পড়ে। এর কয়েকদিন পরের ঘটনা। সারটিয়া গ্রামে আগুন দেখতে পাই। আমি দ্রæত হাটখোলা থেকে সরে যাই। এদিন সারটিয়া গ্রামের দুই ভাই তোজাম-মেঞ্জেরকে ধরে নিয়ে আসে শিয়ালকোল হাটখোলার কাছে। ওই দুই ভাইকে নিয়ে শ্রীদামদের বাড়ির সামনে হত্যা করা হয়। সারটিয়া মোড়ের ওপর বিশাল দোকান ছিল তাদের। সে দোকানই আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দেয় পাকসেনা ও তার সহযোগিরা। তারপর তাদের ধরে এনে হত্যা করে। সাধারণ মানুষের মুখে মুখে প্রচার হয়, বিভিন্ন গ্রামের যুবক বয়সের ছেলের পালিয়ে ভারত চলে যাচ্ছে। এর কিছুদিন পরেই শোনা যায়, মুক্তিযোদ্ধারা এলাকায় এসে গেছে। তারা রাতে রাতে গোপনে এ গ্রাম সে গ্রামে আশ্রয় নিচ্ছে। কিন্তু আমার সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের কখনো দেখা হয়নি। যাইহোক, স্বাধীনতা বিরোধীদের চলাচল সীমিত হয়ে পড়ে। আসে বিজয়ের মাস ডিসেম্বর। বিভিন্ন এলাকা থেকে যুদ্ধের খবর আসতে থাকে। আসতে থাকে পাকসেনা ক্যাম্প তুলে নেওয়ার খবরও। আমাদের বেতনালী থেকেও পাকসেনাদের ক্যাম্প তুলে নেওয়া হয়। এর কিছুদিনের মধ্যেই ১৩ ডিসেম্বর পাকসেনারা পালিয়ে যায় সিরাজগঞ্জ শহর থেকে। মুক্ত হয় সিরাজগঞ্জ। শিয়ালকোল হাটখোলায় স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্প স্থাপনের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে শুরু করে স্বাধীন বাংলাদেশ। গোলাম মোস্তাফা। বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। ৩ সন্তানের জনক। সাক্ষাৎকার গ্রহণ ৫ সেপ্টেম্বর ২০২১ সাল, বিকেলে, বিলধলী গ্রামে।

অনুলিখন: সাইফুল ইসলাম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.