তখন দেখেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, তিনি বীনা বাজানো শিখতেন ছায়ানটে

আজিমপুরের ইতিকথা :             ( চতুর্থ পর্ব )
আমি গর্বিত আমার কৈশোর, যৌবন –ষাট সওর দশকের ।যে দশক বাঙলাদেশের সৃষ্টির দশক ।আমাদের প্রজন্ম প্রায় নিঃশেষ এর পথে –এ প্রজন্মের কাছে এ এক অজ্ঞাত ইতিহাস ।বর্তমান প্রজন্ম কে ইতিহাস অবশ্যই জানতে , হবে ।কারণ বর্তমান এর সৃষ্টির চালাক তারাই।বর্তমান তাদের–বর্তমান এর সামাজিক , রাজনৈতিক শক্তি তাদের হাতে।
হেলাল হাফিজ ” এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাওয়ার তার শ্রেষ্ঠ সময় ।”
বান্দরবন সাঙ্গু নদী পারাপারের সময়, নৌকায় ছিলাম- আমি , আমার জীবন সঙ্গী হামিদ আমার কন্যা ঈশিতা।মেজর শাহীন, মেজর মনির , মেজর ,বেগ এবং মেজর ফারুক ।তাঁরা সবাই সাঁতার জানতেন।আমি আর আমার তিন বছরের কন্যা সাতার জানতাম না।তাই তাঁরা আমাকে ভয় দেখাবার চেষ্টা করছিলো, মজা কোরছিল , বলছিলো , ভাবী এখন যদি নৌকা ডোবে , আমরা সবাই বেঁচে উঠবো।হামিদ স্যার ঈশিতাকে বাঁচাবে আপনার কি হবে?
আমার ছোট বেলা জীবনের অধিকাংশ বেলা কেটেছে আজিমপুর কলোনিতে সাঁতার শিখবো কি করে? তবে সাতার শেখার সুযোগ ছিল।আজিমপুর নিউ বিল্ডিং এলাকায় তিনটি পুকুর ছিল।একটি লেডিস ক্লাব এবং পুরনো কবরস্থানের  এর পাশে। (পরবর্তীতে
ঐ পুকুর টি ভরাট করা হয়েছিল) আরেকটি অগ্রনী
স্কুল,৬৬ এবং ৬৯ বিল্ডিং এর মাঝে,অপরটি পার্টি হাউজের পাশে। আজিমপুরের ছেলেরা সবাই সাঁতার জানতো– তারা ঐ পুকুরে লাফ ঝাপ দিয়ে সাতার শিখেতো।সকাল হলে পুরনো বিল্ডিং এর ছেলেরা টায়ার হাতে নতুন বিল্ডিং এলাকার পানে ছুটতো সাঁতার শিখতে।কিন্তু তখনকার সামাজিক অবস্থান মেয়েদের অনুমতি ছিল না, পুকুরে নামার।
নিউ বিল্ডিং গ্যারেজ মাঠে “ইয়ং প্যাগাসাস নামে একটি ক্রিকেট দল “খেলাধুলা করতো।তত্ত্বাবধানে ছিলেন – পাসপোর্ট অফিসের বড় কর্তা বাহাউদ্দিন সাহেব । সে সময় কার নাম করা ক্রিকেট খেলোয়াড় সে ক্লাবের মধ্যে দিয়ে আত্ম প্রকাশ করেন ।তাদের মধ্যে লিন্টু ভাই, হেলাল ভাই,মন্টু ভাই উল্লখ্য
পুরনো বিল্ডিং একটি , ক্রিকেট টিম ছিল যার নাম ছিল “স্টার বয়েজ ক্লাব।”আজিমপুর কলোনির প্রতি তিনটি বিল্ডিং ঘিরে একটা খেলার মাঠ ছিল,যেখানে সব ধরের খেলাধুলা চলতো।
পার্টি হাউজে আমরা যাকে বলতাম, তা ছিল সংসদ সদস্যদের বাসস্থান । ২৪ টি করে মোট ৪৮ টি , বাসস্থান ছিল। সেখানে কমিউনিটি রুম এ প্রায় নাচ গানের অনুষ্ঠান হতো।নাট্যকার আতাউর ভাই, নাট্যশিল্পী দিলু ভাইদের বাস ছিল , নিউ বিল্ডিং এ।
লেডিস ক্লাবটিতে ছিল , মেয়েদের সুচী শিল্প, হস্ত শিল্প শেখার সুযোগ ।
কমিউনিটি সেন্টার গড়ে ওঠার আগে , আজিমপুরের মাঠে প্যান্ডেল টানিয়ে বিয়ে সাদী হতো।
কমিউনিটি সেন্টার মাঠে টেনিস খেলার মাঠ ছিল –টেনিস খেলার ব্যবস্থা ছিল ।
একটা কো আপারেটিফ ছিল সেখান থেকে সল্প মুল্য প্রয়োজনীয় রন্ধন সামগ্রী কেনার সুযোগ ছিল।
আমার মনে পড়ে কোন, কোন ,বিকেল , ভাইয়া আমি আব্বার সাথে, পুরনো কলোনি থেকে হেঁটে নিউবিল্ডিং এর মধ্যে দিয়ে নিউমার্কেট যেতাম ,লাইট আর অলেম্পিয়া থেকে পাউরুটি, মাখন আনতে।তখন আজিপুরের সাথে নিউ মার্কেট এর মধ্যে কোন সীমানা প্রাচীর ছিল না ।আব্বা হাত নাচিয়ে , জোরে জোরে হাটতেন , ব্যায়াম এর ছলে।তাই দেখে অমি আব্বার হাত দুটো চেপে ধরতাম। আমার লজ্জা হতো , বন্ধুরা কি ভাববে আমার আব্বা ,ঐ ভাবে হেঁটে চলছে? আব্বা বুঝতে পেরে মুচকি ,মুচকি ,হাসতেন।
কলোনির পয় পরিস্কার এর জন্য, জমাদার আসতো , ইডেন কলেজে পেছনে মেথর পট্টি তে তাঁদের বাস ছিল।ওদের সবার হাতে উল্কি করা থাকতো।ওরা সঙ্গে করে খাবার নিয়ে আসতো , লুচি বুন্দিয়া, কাজের ফাঁকে তাঁরা কলোনির গেটে বসে সকালের নাস্তা সারতো।আমার ভাবী ডিনা ছিল , নিউ বিল্ডিং এর বাসিন্দা , ওর খুব লোভ হতো তাঁদের খাবারের প্রতি।
অগ্রণী স্কুলে ছুটির দিনে ক্লাস হতো ছায়ানটের।আমি ছায়ানটের শিশু শ্রেনীর ছাত্রী ছিলাম।আমাদের রবীন্দ্রসঙ্গীত শেখাতেন , জাহিদুর রহিম।নজরুল সঙ্গীত লুৎফুর রহমান।আমাদের তিনি প্রথম রবীন্দ্র সঙ্গীত শিখিয়েছিলেন , ” বিশ্ব জোড়া ফাঁদ পেতেছো কেমনে দেই ফাঁকি।আমি যখন বাসায় গানের অনুশীলন করতাম , ভাইয়া, দাদাভাই; আমাকে রাগাতো ” বিশ্ব জোড়া ফত ফতিয়েছো বলে।আমার অবশ্য ছায়ানটের গান শেখার দৌড় প্রারম্ভিক পর্যন্ত ।
তখন দেখেছি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে।তিনি বীনা বাজানো শিখতেন ছায়ানটে। এ ছাড়া দেখেছি, আজিমপুর স্কুলে ।তিনি আমার বড় বোনের সহপাঠী ছিলেন।আমার ছুটি হতো আগে, আমার বাড়ি ফিরতে হতো বড় বোনের সঙ্গে ।অপেক্ষার সময় তাঁদের হাসি, গল্প,আনন্দে, কর্ম কান্ডের সারথী হয়ে আছি আমি।
লেখক : লিনু হক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.