দ্বিতীয় পর্ব
অনেকের কাছে মনে হতে পারে এ আমার বাল্য কালের বালখিল্যতা, না বালখিল্যতা নয়। ৫৮ বছর পর স্মৃতির পলিমাটি সরিয়ে আমি ইতিহাস খুড়ে বের করছি।
আজিমপুর কলোনি ভেঙে , নতুন স্থাপনা করার সিদ্ধান্ত হলে, কাগজে,কালি কলমে এর অনেক প্রতিবাদ দেখেছিলাম –ঐতিহ্যে রক্ষার ক্রন্দন দেখেছিলাম। তাই হয়তো সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, ৭৫ নম্বর বিল্ডিং টি ঐতিহ্যে হিসাবে রেখে দেয়ার ।কিন্তু এর নাম করণ এর ইতিহাস থাকবে না – তা কি হয়? তাই সত্য ,হয়তো আমার, বালখিল্যতার মধ্যে দিয়েই প্রকাশিত হতে চাইছে।
বর্তমানে বিশাল এলাকা জুড়ে আজিমপুর এস্টেট থাকলেও সর্ব প্রথম হাতে নেয়া প্রকল্পটি ছিল আজিমপুর রোডের দক্ষিনাংশ আজিমপুর চৌরাস্তার ইডেন কলেজ মোড় পর্যন্ত ।
পশ্চিম দক্ষিন এলাকা জুড়ে এর অবস্থান ।
পরবর্তী কালে ১৯৫০ এর দশকে আজিমপুর রোডের উওর পাশ থেকে নিউ মার্কেট পর্যন্ত সম্পূর্ণ এলাকা এই সরকারি আবাসনের বিস্তার ঘটে।১৯৪৯ এর সাইট প্ল্যানে উল্লেখিত”ঢাকা কলেজে “এর জন্য নির্ধারিত স্থানটি দিয়ে দেয়া হয় আজিমপুর স্কুল এবং মেটারনিটি ( মাতৃ সদন) স্থাপনের জন্য ।পরবর্তী কালে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যাল সম্প্রসারণ করা হয় ।
পুরনো স্থাপনার ১ থেকে ৪৭ টি বিল্ডিং কে আমরা পুরনো বিল্ডিং এবং নতুন স্থাপনা ৪৮ থেকে ৭২ পর্যন্ত বিল্ডিং কে আমরা নিউ বিল্ডিং বলতাম।

৬৩ সালের দিকে ৭৫ নম্বর বিল্ডিং টি তৈরি হয়। এটি ছিল প্রথম ডুপ্লেক্স বিল্ডিং । ডুপলেক্স সম্পর্কে আমাদের তখন ধারণা ছিল না। নুতন স্থাপনা হচ্ছে দেখে আজিমপুর ১০ নম্বর বিল্ডিং এর বুলুভাই , টুলুভাই এবং ৫ নম্বর বিল্ডিং এর লম্বা বাবু ভাই দেখতে গেছেন সেখানে কি হচ্ছে ? ফ্লাটের নিচ তলায় রান্না ঘর , উপর তলায় শোবার ঘর দেখে টুলু ভাই বললেন “আযব” বিল্ডিং তো। তার পর থেকে তাঁরা বন্ধুরা একত্রিত হলে বলতো আযব বিল্ডিং এর সামনে চলে আসতে,তখন থেকেই এটা আযব বিল্ডিং হিসাবে পরিচিতি লাভ করে।নাম করণ এর ইতিহাস আমি জেনেছি , আমার “মেয়ে বিচ্ছু আজিমপুরের মুক্তি যোদ্ধা কাহিনী “লিখতে যেয়ে।
কালের সাক্ষী ,ঐতিহ্য, হিসাবে ” আযব” বিল্ডিং টি রেখে দেয়ার চিন্তা ভাবনা হয়েছে।
আজিমপুরের কজন ছেলে লুকিয়ে সিগারেট খেতে আযব বিল্ডিং এ যেতেন। তখন তারা তাকে দর্জি বাড়ি বলতো, কারন দর্জি দোকানে উপর তলায়, মেশিন থাকতো , নিচের তলায় কাপড় অর্ডার নেয়া এবং কাটার কাজ চলতো। গতকালই আমি দর্জি বাড়ির গল্প জেনেছি।আমেরিকা থেকে ১১ নম্বর বিল্ডিং এর মাহবুব ভাই আমার পোস্ট দেখে ফোন দিয়ে অনেক স্মৃতি শেয়ার করলেন । তিনি গল্প শোনালেন।কিন্তু সবার কাছে গ্রহণ যোগ্য ছিল আযব বিল্ডিং নামটি।এবং এই নামটি প্রতিষ্ঠা পায় ।
৭৪ নম্বর বিল্ডিং টিকে আমাদের ছোট ভাইরা, ট্রানজিস্টার বিল্ডিং বলতো ।ঐ বিল্ডিংটির সামনের অংশ ট্রানজিস্টার এর মত দেখতে তাই ।
আমার বাবা বরাদ্দ পান প্রথম অবস্থায় তৈরি ৪৭ টি বিল্ডিং এর ৬/ বি আজিমপুর ফ্ল্যাটটি।আমার জন্ম বেড়ে ওঠা সেখানেই। বুদ্ধি হবার পর আমরা সকাল বেলা , ছাপড়া মসজিদ যেতাম দল বেঁধে আরবী পড়তে। ছোট ছোট মেয়েরা ফ্রকের উপর ওড়না পেঁচিয়ে আরবী পড়তে যেতাম।তখন কার মানুষ ধর্মীয় কুসংস্কার আচ্ছন্ন ছিল না। আমরা ধর্ম শিক্ষা গ্রহণ করেছি আনন্দের সাথে।বর্তমানে দেখি ,ছোট ,ছোট মেয়েরা হিজাব পড়ে মসজিদে আরবী পড়তে প্রবেশ করে। সাম্প্রতি এক নতুন ধরনের ইসলাম ,শক্ত ঘাটি গেড়ে বসেছে। আমার বাড়ির আশপাশে , অনেক মাদ্রাসা ।একদিন ভোরে দেখলাম , আমার ঐ বয়সী একটা শিশু মাদ্রাসায় প্রবেশ করতে চাচ্ছে না।চিৎকার করে কান্দছে ।তার মা তাকে রাস্তায় ফেলে মার ধর করছে– এই করুণ চিত্র দেখে আমি ঠিক থাকতে না পেরে , ডেকে বললাম , আপনার কন্যা কেন ভেতরে প্রবেশ করতে চাচ্ছে না ,তার কারণ অনুসন্ধান করুন।মহিলা আমার দিকে রাগত দৃষ্টিতে তাকিয়ে, কন্যা কে মারতে, মারতে বাড়ির দিকে নিয়ে ছুটলেন।আমাদের আরবী শিক্ষা গুরু ছিলেন বড় হুজুর ছোট হুজুর ।বড় হুজুর পায়জামা পাঞ্জাবী পড়তেন, ছোট হুজুর কে দেখতাম কাবুলি ওয়ালাদের মত পোশাক পড়তে।
ছাপড়া মসজিদ আমাদের আকর্ষণ এর কারণ ছিল পাশে দুটো দোকান।এক “নায়রার “পরোটার দোকান , আর ,তার পাশে “সাইকেল” এর দোকান ।
নায়রার হাতের পরোটা খুব স্বাদ ছিল।তাকে নায়ড়া বলতো , সে সব সময় মাথা ন্যাড়া করে রাখতো বলে। পরোটা বানাতে বেলুন পিড়ি ব্যবহার করতো না । বিশাল একটা তক্তার মধ্যে হাত দিয়েই পরোটা বানাতো।আর সাইকেলের দোকান থেকে ,দুই আনা , চার আনায় ঘন্টা হিসাবে সাইকেল ভাড়া করে সাইকেল চড়া যেতো।
কলোনীর সময়কালে আমাদের উৎসব ছিল , সবেবরাত, মহরম , দুই ঈদ।সবে বরাতের আনন্দ ছিল, বাড়ি বাড়ি হালুয়া রুটি বিলি ,গরিব মানুষের মধ্যে হালুয়া রুটি বিতরণ, সন্ধ্যায় আতস বাজি ফুটিয়ে আনন্দ উল্লাস । আজিমপুরের বড় ভাইরা সবে বরাত এর রাতে , শাড়ি পড়ে , ফকির সেজে , মেয়েলি গলায় , হালুয়া রুটি , চাইতো বাড়ি বাড়ি ।মা খালারা তাদের দুষ্টুমিতে সঙ্গ দিতেন ।তারা ঠিকই বুঝতেন- কিন্তু না বোঝার ভান করে হালুয়া রুটি দিতেন।প্রতি সবেবরাত এ তারা এই খেলা খেলতো।রাতে মসজিদে বড়দের সাথে সারা রাত কাটাতো ইবাদত বন্দেগীতে ।
মহরম এর বিশেষ আকর্ষণ ছিল – শিয়া সম্প্রদায়ের তাজিয়া মিছিল , মহরমের মেলা। হোসনি দালান থেকে সুসজ্জিত তাজিয়া মিছিল আজিমপুর হয়ে মোহম্মদপুর শিয়া মসজিদ ঘুরে হোসনি দালানে গিয়ে শেষ হতো।রং বেরং এর তাজিয়া সাজিয়ে, মিছিল , হাসান হোসেনের জন্য হাহাকার করে ,কেউ, চাবুক দিয়ে, পিঠ চাপড়াতেন, কেউ ছুড়ির আঘাতে , পিঠ ক্ষত বিক্ষত করতেন, কেউ বুক চাপড়িয়ে হাহাকার করতেন।কন্ঠে থাকতো করুণ সুর।মিছিল থেকে বড় বড় মটকায়, মাটির পাত্রে সরবত , বিলি করতেন ।
— আহা কি অমৃত পানিয় ।
কোরবানির মাংস শুকিয়ে রেখে ঐ মাংস দিয়ে, মহরমের দিন , বাড়ি, বাড়ি খিচুড়ি রান্নার ধুম পড়তো। তখন মানুষ বিশ্বাস করতো , কোরবানির মাংস মহরমের দিন খাওয়া সুন্নত।
মহরমের তিনদিন মেলা বসতো আজিমপুর থেকে ই পি আর গেট পর্যন্ত ( বর্তমানে বি জি বি দুই নম্বর গেট),রাস্তার দুই ধারে দোকানিরা পসরা সাজিয়ে বসতেন। নাগর দোল চড়ে ,মেলা থেকে খেলাধুলার সামগ্রী কেনা, ছিল, কি যে মজার ব্যাপার । একবার বাবার সাথে , একবার , বড় ভাই, একবার মেজ ভাই কে সঙ্গে করে , তিন চারবার মেলায় যাওয়া চাইই, চাই।
পহেলা রোজা থেকে একদল লোক সেহেরির সময় হ্যাজাক হাতে লালবাগ থেকে ছাপরা মসজিদ এর রাস্তা ধরে আজিমপুর কলোনিতে প্রবেশ করতেন গান গাইতে, গাইতে ।তাদের ক্বাসিদা বলতো তারা উর্দুতে গান গাইতো ” উঠঠো রোজাদারো ,সেহেরি , খালো, রাত গুজরনে ওয়ালি হ্যায়, সেহেরিকি ওয়াক্ত বাহতি হ্যায়।” “এর বাঙলা” রোজাদারা সবাই উঠে পড়ো , সেহেরি খেয়ে নাও , রাত প্রায় শেষের পথে, সেহেরির সময় বয়ে যাচ্ছে ।”
বাঙলাদেশ স্বাধীন হবার পর পুরান ঢাকার লোকজন ঢাকার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে সক্রিয় হলে কিছু প্রক্রিয়া শুরু হয়।তাদের উদ্যোগে এখন রোজার মাসে রাতের বেলায় ক্বাসিদার সুর শোনা যায় আদি ঢাকার কোন কোন মহল্লায় ।
লেখক : লিনু হক ।

