আমেরিকা ও তার মিত্রদের আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার ও তালিবানদের ক্ষমতা দখল নিয়ে দুনিয়াব্যাপী সংবাদ মাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে বিস্তর লেখা ও আলোচনা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধম আলোচন থেকে পিছিয়ে নেই। মুসলিম প্রধান দেশ গুলিতে ভিন্নমত প্রকাশের স্বাধীনতা অপেক্ষাকৃত কম থাকায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আলোচনার প্রধান মাধ্যম হিসেবে দেখা দিয়েছে। অধিকাংশ আলোচনায় তালেবানের উত্থানে স্বাভাবিক হতাশার প্রতিফলন ঘটেছে। ধর্মীয় রাজনৈতিক শক্তির উত্থান নিঃসন্দেহে বিপদজনক ও হতাশার কথা। নানা মাধ্যমে আলোচিত বিষয় গুলি হচ্ছে তালিবানরা আমেরিকাকে জনসমথনের যুদ্ধে পরাজিত করেছে। আমেরিকার সেনা প্রতাহারকে কেউ কেউ সাইগন – ভিয়েতনামে মার্কিন সেনা বাহিনীর পরাজয়ের সাথে তুলনা করছেন। অধিকাংশ মানুষ আফগানিস্তানের নারীদের ভবিষৎ নিয়ে চরম ভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। তালিবান এর আগে ক্ষমতায় ছিল ২০০০ সাল পর্যন্ত। সেই শাসন আমলের বর্বরতা ও অমানবিক আচরণ বর্তমান সময়ের উৎকণ্ঠার উৎস।
২০১৮ সালের ক্তরাষ্ট্রের সাথে তালিবানে সমঝোতার আলোচনা শুরু হয়। এর পরবর্তী দেড় বছর দফায় দফায় দুই পক্ষের সন্তোষজনক আলোচনার সমাপ্তি ঘটে আমিরিকা ও তালিবানের সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ সাল। এই চুক্তিই তালিবানকে দ্বিতীয় দফা ক্ষমতায় আনে ১৯ অগাস্ট ২০২১। ১৯৯৬ সালে প্রথমবার তালেবান আফগানিস্তান দখল নিয়েছিল মুজাহিদদের কাছ থেকে । তালেবান নেতৃত্ব মুজাহিদদের অংশ ছিল। ১৯৮৯ সালে নাজিবুল্লাহর সরকারকে হটিয়ে দিয়ে মুজাহিদরা ক্ষমতা দখল করে। মুজাহিদদের শাসনকাল ছিল ধর্মীয় শাসন, দুর্নীতিগ্রস্থ ও আত্মকলহের সরকার। মুজাহিদদের অপেক্ষাকৃত যুবক নেতৃবৃন্দ মাদ্রাসার ছাত্রদেরকে নিয়ে সশস্র সংগঠন গড়ে তোলে। এই সংগঠন গড়ে তোলার পিছনে পাকিস্তানের সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর সক্রিয়তা বহুল আলোচিত। এই মাদ্রাসা গুলি ভারতের দেওবন্দ ভিত্তিক মাদ্রাসার শিক্ষা কার্যক্রম অনুসরণ করে। বাংলাদেশে এই ধারার মাদ্রাসা সাধারণ ভাবে কওমী মাদ্রাসা হিসেবে পরিচিত। সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘জিহাদে’ সমর্থনের নামেই প্রথমে মুজাহিদিন ও পরে তালেবানের সর্বাত্মক পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র, সঙ্গে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী।
ব্যাতিক্রম ১৯ অগাস্ট পতাকা বদল
আফগানিস্তানের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালিত হয়ে আসছে ১৯১৯ সাল থেকে। যদিও আফগানিস্তান কখনো ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অংশ ছিল না। ১৯১৯ সালে অ্যাংলো-আফগান চুক্তি স্বাক্ষর করে। এই চুক্তি আফগানিস্তান এবং ব্রিটেন নিরপেক্ষ সম্পর্ক স্থাপন করে। সেই থেকে ১৯ অগাস্ট স্বাধীনতা দিবস পালনের রেওয়াজ আফগানিস্তানে। ১৯ অগাস্ট ২০২১ তালেবান কাবুলের ক্ষমতা দখল করে ইসলামী আমিরাত ঘোষণা করে। আফগানিস্তানের প্রথাগত পতাকা সরিয়ে তালিবান পতাকা উড়ানের সংবাদ আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমে এসেছে।
তালিবান ১৯৯৬ –২০২০ সাল
তালিবানদের ইসলামী শরিয়া আইনের প্রয়োগ আন্তর্জাতিক ভাবে নিন্দা ও সমালোচনার ঝড় তুলেছিল। এই সময়কালে তালিবানরা , চিত্রকলা, ফটোগ্রাফি, মানুষ বা অন্যান্য জীবিত জিনিসের চিত্র দেখানো কর্মকাণ্ড এবং সংবাদ মাধ্যম ও প্রকাশনা নিষিদ্ধ করেছিল। বামিয়ানের ১৫০০ বছরের পুরনো বুদ্ধসহ অসংখ্য স্মৃতিস্তম্ভ ধ্বংস করে নিজেদের উপস্থিতির জানান দিয়েছিল বিশ্ববাসীকে। নারী শিক্ষা , চলাচল , ও পেশায় নিয়োজিত হওয়ার সুযোগকে নির্মম ভাবে দমন করেছিল। তালেবান শাসনামলে ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘুদের উপর ব্যাপক ভাবে নির্যাতন নেমে এসেছিল। সংখ্যালঘু হাজরা শিয়া মুসলিমরা নানা ভাবে তালেবান শাসনামলে নিগৃহীত হয়েছিল ১৯৯৬ থেকে ২০২০ সময় কালে।
তালিবান ২০২১ সাল
২০ বছর আগে তালেবানরা ক্ষমতাচ্যুত হয়েছিল। এই যাত্রা ক্ষমতা দখলের পর গত কিস্তি ক্ষমতা দখলের মত দৃশ্যতঃ নির্মমতা নিয়ে হাজির হয় নাই তালিবান। বিশ বছরের যুদ্ধ ও রাজনৈতিক সংকট তালিবানদের উপরি কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে । আগের তালিবান ছিল প্রধানতঃ পশতুন জাতি গোষ্ঠীর সশ্রস্র সংগঠন। বর্তমান তালিবান অন্য জাতি গোষ্ঠীকে কিছুটা আত্তীকরণ করার মধ্যে দিয়ে আফগানিস্তানের প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন হিসেবে উপস্থাপন করতে পেরেছে। উল্লেখ্য বহু জাতির দেশ আফগানিস্তান । দেশটিতে প্রায় পশতুন-৪২%, তাজিক ২৭% , হাজরা-৯%,উজবেক-৯%,আইমাক-৪%,তুর্কমেন-৩%,বেলুচ-২% ও অন্যান্য-৪% জনগোষ্ঠীর বাস । এই জাতি সুমুহকে একত্রে আফগান বলা হয়।
নতুন তালিবান এই যাত্রা সংবাদ মাধ্যমকে ব্যবহার করে নিজেদের বার্তাকে সারা বিশ্বে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করছে। ইংরেজী ভাষায় সংবাদ সম্মেলন করার মধ্যে দিয়ে বার্তা পৌঁছানোর কাজটি বেশ সহজ হয়ে পড়েছে। তালিবানের কম মারমূখী আচরণে অনেকেই কিছুটা হলেও স্বস্তি ভোগ করছেন। কিন্তু ভবিষ্যৎ তালিবান কি হবে সে সম্পর্কে তালিবান নিজেদের অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে। তালিবান স্পষ্ট করছে বহুদলীয় গণতন্ত্রের পথে হাটবে না। দেশটি হবে ইসলামিক আমিরাত ও ইসলামী আইনের চৌহদ্দির মধ্যে নারী অধিকার স্বীকৃতি থাকবে। বহু দলীয় গণতন্ত্র না থাকলে মানুষের কথা বলার অধিকার থাকে না। বহুদলীয় গণতন্ত্র ব্যবস্থার বিভিন্ন যথার্থ সমালোচনা রয়েছে , সীমাবদ্ধতার উর্দ্ধে নয় বহুদলীয় গণতন্ত্র। তবে ব্যাক্তিগত মালিকানাধীন সমাজে বিভিন্ন ব্যবস্থার প্রয়োগ ও পরীক্ষার মধ্য দিয়ে বহুদলীয় গণতন্ত্র তুলনামূলক ভাবে গ্রহণ যোগ্যতা পেয়েছে। ইসলামিক আমিরাত কি হবে এর খুব একটা প্রমান বা নজির মানব ইতিহাসে নেই। তালিবানের গত শাসনামল ইসলামিক আমিরাত এর উদাহরণ ও স্বাদ মানুষ পেয়েছে। ইসলামিক চৌহদ্দিতে নারী স্বাধীনতা গত শাসনামলে তালিবান যা করেছে সেই নীতির পরিশীলিত বাচন মাত্র।
পরাজয় ও প্রত্যাহার
সায়গন : দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর ভিয়েতনামের উত্তর অংশ হোচিমিন এর নেত্তৃধীন কমিউনিস্টদের শাসনে চলে যায়। দক্ষিণ অংশ ফরাসী উপনিবেশবাদীদের সমর্থিত সরকার স্থাপিত হয়। দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে ফরাসীদের উচ্ছেদ ও ভিয়েতনাম একত্রীকরণের জন্য উত্তর ভিয়েতনামের প্রচেষ্টা সবাত্মক ভিয়েতনাম যুদ্ধের সৃষ্টি করে। এক পর্যায়ের আমেরিকা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে। ভিয়েতনাম যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আমেরিকা সহ ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী দেশ গুলি আশংকা করেছিল ভিয়েতনামে কমিউনিস্টদের বিজয় দক্ষিণ এশিয়াতে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ঢেউ ছড়িয়ে পড়বে। এই যুদ্ধ ছিল একদিকে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার সংরক্ষণ অপরদিকে উপনিবেশবাদ কে পরাস্ত করে সমাজতন্ত্র অভিমুখী অর্থনীতি চালু করা। এই অর্থে এই যুদ্ধ ছিল দুইটি বিপরীত মুখী অর্থিনীত ব্যবস্থার যুদ্ধ। এই যুদ্ধের আমেরিকা সরাসরি যুক্ত ছিল। অপর দিকে তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া উত্তর ভিয়েতনামকে সবাত্মক সামরিক সহযোগিতা করে আসছিল।
১৯৬৪ / ৬৫ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন গড়ে উঠে। সমাজের সকল স্তরে মানুষ বিভিন্ন মাত্রায় যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলনের সামিল হয়েছিল। যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভ দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল। আমেরিকার পাশাপাশি ইউরোপ, অস্ট্রেলিয়াতে যুদ্ধ বিরোধী প্রতিবাদ সমাজে ও রাজনীতিতে প্রভাব ফেলেছিল। যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন আমেরিকার ভিয়েতনাম যুদ্ধে অবসানে গুরুত্ব পূর্ন প্রভাবকের ভূমিকা পালন করেছিল।
১৯৭৩ সালে আমেরিকা দক্ষিণ ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণা দেয়। ২৭শে জানুয়ারীতে স্বাক্ষরিত প্যারিস সমঝোতা চুক্তির মাধ্যমে এই ঘোষণা আসে। এই সমঝোতা চুক্তির প্রধান দুই পক্ষ ছিল আমেরিকা ও কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনাম। তবে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল আমেরিকা , আমেরিকা-সমর্থিত দক্ষিণ ভিয়েতনাম সরকার, দক্ষিণ ভিয়েতনামের কমিউনিস্ট এবং কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনাম – এই চার পক্ষ। ১৯৭৫ সালে আমেরিকা সেনা প্রত্যাহারের সাথে সাথে কমিউনিস্ট উত্তর ভিয়েতনাম দক্ষিণ ভিয়েতনাম দখল করে নেয়। এই হল সাইগনের পতন।
কাবুল : ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তালেবানের সঙ্গে আমেরিকার চুক্তি হয়েছিল। উল্লেখ্য এই চুক্তিতে কাবুলে আমেরিকান সর্মথিত সরকারের কোন অংশ গ্রহণ ছিল না। এখানেই সাইগনের পতন ও কাবুলের পতনের পার্থক্য। বিনা প্রতিরোধে কাবুলের পতনের কারণ এই চুক্তির মধ্যেই লুকায়িত । গত দশ বছর ধরেই তালিবান কাবুলের দিকে ক্রমে ক্রমে এগিয়ে আসছিল। তালিবানের ক্ষমতা দখল কি জন সর্মথন ছাড়া সম্ভব হয়েছে ?
আফগান জনগনের সামনে দুটি বিকল্প ছিল , একদিকে আমেরিকা ও আমেরিকা সমর্থন পুস্ট হামিদ কারজাই – ঘানী সরকার। এই সরকার গুলি চরম দুর্নীতিবাজ হিসেবে দেশে বিদেশে পরিচিত ছিল। অপর দিকে বিদেশী সেনা ও ক্ষমতাসীন দুর্নীতিবাজ সরকার উৎখাতের বদ্ধ পরিকর তালিবান। অধিক সংখ্যক মানুষ তালেবানকে বেছে নিয়েছে তার মানে এই নয় যে, অধিকাংশ আফগানরা অবশ্যই তালেবানকে সমর্থন করে। আমেরিকান দখলদারীর বিরুদ্ধে একমাত্র ও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক সংগঠন তালেবান। অধিকাংশ আফগান দখলদার ও দখলদার পুষ্ট সরকারকে ঘৃণা করে। এই ঘৃণা তালিবানের পক্ষে সমর্থন হিসেবে কাজ করেছে। দুর্নীতি, বৈষম্য এবং উপনিবেশিকবাদ বিরোধী ঘৃণা একসঙ্গে মিশে তালেবান বিজয় নিশ্চিত করেছে।
আমেরিকার আফগান ত্যাগ একটি সামরিক ও রাজনৈতিক পরাজয়। পরাজয়ের পরে তালিবান কাবুল সহ পুরো আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ দখল করেছে। এদিক -সেদিক অতি ক্ষুদ্র তালিবান বিরোধী প্রতিবাদের কথা কিংবা ছবি সংবাদ মাধ্যম গুলিতে দেখা গেলেও অতি দ্রুত মিলিয়ে গেছে। এই ক্ষমতা দখল তালিবানের জন্য সামরিক ও রাজনৈতিক বিজয়। তালিবানের এই বিজয় ইসলামী শাসন কায়েমের জন্য দেশে দেশে কাজ করছে থাকে জন্য রাজনৈতিক জয়। বিশেষ করে ভারত পাকিস্তান-বাংলাদেশে মুসলিম ধর্মীয় শাসন আন্দোলনে বিপুল শক্তি যোগাবে।
সেনা প্রত্যাহারের প্রভাব
ভিয়েতনাম থেকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহারের দুই বছর পর সাইগনের পতন ঘটে। এদিকে থেকে আমেরিকার উচ্ছেদ ঘটছে, যখন আমেরিকার আফগানিস্তান ছাড়ার প্রস্তুতি কালেই কাবুলের পতন ঘটে। ১৯৭৫ সালে ভিয়েতনাম থেকে সেনা প্রত্যাহারের পক্ষে জনমত ছিল। তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডকে সায়গন থেকে সেনা প্রত্যাহারের কারণে অতি সীমিত প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখী হতে হয়েছিল। আফগান যুদ্ধের পক্ষে জনমত কমতে থাকায় আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তালিবানদের সাথে সমঝোতা শুরু করেছিলেন। এর সমাপ্তি ঘটলো বাইডেন জামানায়। যুদ্ধের পক্ষে জনমত কম থাকায় প্রেসিডেন্ট বাইডেনকে তেমন কোন অভ্যান্তরীন রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখী হওয়ার সম্ভবনা খুব কম।
২০০১ সালে আফগান দখল – আক্রমণ – দখলের যুক্তি হিসেবে আমেরিকার নিরাপত্তার কথা প্রচার করে জনসাধারণকে যুদ্ধ প্রচেষ্টার পিছনে নিয়ে এসেছিল। ২০২১ সালে বর্তমান সময়ে সেনা প্রত্যাহারের যুক্তি হিসেবে আমেরিকার সেনাদের জীবনের নিরাপত্তারার বিষয়কে প্রচারে নিয়ে আসছেন বাইডেন প্রশাসন। বাইডেন প্রশাসন স্পষ্ট করেই বলছে আমেরিকা আফগানিস্তানে রাষ্ট্র উন্নয়ন বা জাতি গঠনে যায় নাই। আফগানিস্তানের আমিরিকার অবস্থান আমিরিকার নিরাপত্তার স্বার্থে।
ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী বিক্ষোভ ও বাংলাদেশ
ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতিতে ভিয়েতনাম যুদ্ধ বিরোধী আন্দোলন তেমন কোন সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারেনি। এখানে সেখানে যুদ্ধ বিরোধী প্রতিবাদ বিক্ষোভ হয়েছিল। প্রভাবের দিক থেকে সেই গুলি ছিল অনুল্লেখযোগ্য। এই সময় কালে ভারতে নকশাল আন্দোলন চলছিল। নকশাল আন্দোলন ছিল চীন পন্থী কমিউনিস্টদের গ্রাম থেকে শহর ঘেরাও ও শ্রেণী শত্রু খতমের রাজনীতি। নকশাল আন্দোলন গণআন্দোলন ও বিক্ষোভ সংগঠনকে কখনোই প্রাধান্য দেয় নাই।
১৯৬৮-১৯৬৯ পাকিস্তান- বাংলাদেশ গণ আন্দোলন উত্তাল ছিল। এর পরে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের যুদ্ধ ১৯৭১। বাংলাদেশ যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্স – বিএলএফ এর নামকরণে ভিয়েতনাম মুক্তিযোদ্ধা ন্যাশনাল লিবারেশন ফোর্স – এনএলএফ এর স্পষ্ট প্রভাব দেখা যায়। ১৯৭৩ সালে মস্কো পন্থী কমিউনিস্ট পার্টি ও ছাত্র ইউনিয়ন ভিয়েতনাম যুদ্ধের প্রতিবাদে ঢাকায় মিছিল করেছিল। সদ্য স্বাধীন দেশে তখন শেখ মুজিবর রহমানের সরকার। এই বিক্ষোভ মিছিলে বিনা প্রচারণায় পুলিশ গুলি করে মতিউল ও কাদের নামে দুই জনকে খুন করেছিল।
শঙ্কা ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা
তালিবানদের ক্ষমতা দখল বিভিন্ন মহলে শঙ্কা ও হতাশা ছড়িয়ে দিয়েছে। এই শঙ্কা ও হতাশা পিছনে ১৯৯৬-২০০০ সালে আফগানিস্তানের তালিবানদের বর্বরতা ও ১৯৯০ এর দশকে আফগান ফেরত বাংলাদেশের নাগরিকদের এক ডজনের বেশি হামলা। আফগান ফেরত বাংলাদেশীরা নিজেদেরকে আফগান মুজাহিদ হিসেবে পরিচয় দিয়ে থাকে। হরকাতুল জিহাদ হচ্ছে এই গ্রূপের প্রথম রাজনৈতিক সংগঠন। এই ধারায় একাধিক সংগঠন গড়ে উঠেছে বাংলাদেশে। ২১ আগষ্ট, রমনা বটমূলসহ দেশে প্রায় ২০টি গ্রেনেড ও বোমা হামলার সাথে হরকাতুল জিহাদের নাম জড়িত। এই সব মামলার কোন একটির বিচার হয়নি।
সাম্রাজ্যবাদ যখন কোনও উপনিবেশ ধরে রাখতে অসমর্থ হয়, তখন নানারকম বোঝাপড়া করেও উপনিবেশের প্রত্যক্ষ দখলদারিত্ব ছাড়তে বাধ্য হয় ৷ আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার সাম্রাজ্যবাদে পরাজয়। তালিবান বর্বর কিন্তু তালিবানের বর্বরতার ভয়কে স্মরণ করে মার্কিন দখলদারিকে সমর্থন করা অনৈতিক। কোন অধিকারে সাম্রাজ্যবাদী সেনারা আফগানিস্তান দখল করে রাখবে? প্রতিক্রিয়াশীল বর্বর তালিবানদের বিরুদ্ধে লড়াই গড়ে গড়ে তুলতে পারে একমাত্র আফগান মেহনতী মানুষ ৷ আর সেই লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য প্রথমেই প্রয়োজন, আফগানিস্তানের স্বাধীনতা ৷ বিদেশী সেনা হটানো। দেশে দেশে উপনিবেশবাদ বিরোধী জাতীয় মুক্তি আন্দোলন গুলি প্রধানতঃ পেটি বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া নেতৃত্বেই পরিচালিত হয়েছে । বুর্জোয়া বা বুর্জোয়া নেতৃত্ব বা প্রতিক্রিয়াশীল মতাদর্শগুলির প্রাধান্যের অজুহাত স্বাধীনতা সংগ্রাম থেকে নিজেদের দূরে সরে থাকা উপনিবেশিক শাসন টিকিয়ে রাখার সাফাই মাত্র।
পাঞ্জশির উপত্যকায় তালেবান বিরোধী প্রতিরোধ ?
তালিবানের জন্ম ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে। গত বিশ্ব বছর তালিবান ছিল ক্ষমতাচ্যুত বুর্জোয়া শ্রেণী। সাম্প্রতিক ক্ষমতা দখল ক্ষমতাসীন বুর্জোয়া শক্তি হিসেবে তালিবানকে প্রতিস্থাপন করেছে। রাজনৈতিক ভাবে তালিবান সবসময় প্রতিক্রিয়াশীল, পুঁজিবাদী সম্পত্তি সম্পর্ক রক্ষা এবং স্বৈরতান্ত্রিক একনায়কত্বের পক্ষে। ক্ষমতা দখলের সাথে সাথে তালিবান প্রতিক্রিশীল কার্যকর করতে তৎপর। ব্যাক্তি স্বাধীনতা, নারী শিক্ষা, সংখ্যা লঘুদের নিরাপত্তা অনিশ্চতার মধ্যে পড়েছে। যে কোন যুদ্ধের ডামাডোলে প্রত্যেকটির ছোট ছোট বিক্ষোভের বিচারমূলক পর্যলোচনার জন্য পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এই মুহূর্তে আফগান জনগণের প্রাথমিক ও প্রধান সংগ্রাম হচ্ছে গণতান্ত্রিক অধিকার, নারীর অধিকার, মুক্ত সংবাদপত্র , শিক্ষার অধিকারের সংগ্রাম। সকল ধরণের জাতিতগত নিপীড়ন, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের (যেমন শিয়া হাজারা) সমানাধিকারের দাবী প্রধান সংগ্রামের অংশ।
তালিবান ক্ষমতা দখলের পর পঞ্জশির উপত্যকায় সশস্ত্র বিদ্রোহ কিছু সংবাদ গণমাধ্যমে এসেছে। এই এলাকা কখনই তালিবানের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। পঞ্জশির উপত্যকায় কি ঘটছে তার সঠিক বিবরণ জানা দুরহ হয়ে পড়েছে। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে জানা গেছে ক্ষমতাচ্যুত ঘানি সরকারের একাংশ এই বিদ্রোহের নেতৃত্বে আছে। ঘানির সরকারের সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট আমরুল্লাহ সালেহ, সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী বিসমিল্লাহ খান মোহাম্মদী এবং ২০২০ মার্কিন আগ্রাসনের সময় “নর্দান অ্যালায়েন্স” নেতা আহমদ শাহ মাসুদ এর ছেলে আহমদ মাসুদ।
প্রাক্তন ঘানী শাসনের সমর্থকদের দ্বারা সংগঠিত তালেবান বিরুদ্ধে যেকোনো প্রতিবাদের মধ্যে কোন প্রগতিশীলতা বা গণতান্ত্রিক উপাদান নেই। গত ২০ বছরের শাসনামলে আফগান জনগণের মৌলিক অধিকারের কোন উন্নযন কারজাই- -ঘানী সরকারের মাধ্যমে হয়নি। তালিবান ও ঘানী সরকার বা দল ছুট আমেরিকার সমর্থন সরকারের কোন অংশের মধ্যে যুদ্ধ অভ্যনতারিন বিরোধ মাত্র। ক্ষমতাসীনদের সাথে সদ্য ক্ষমতাহীনদের বিবাদ মাত্র। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার সাথে সাথে গণতন্ত্র, নারীর অধিকারের দাবী তুলে বিশ্ববাসীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা মাত্র।
তালেবান বিজয় : চীন ও রাশিয়া
বিগত বছরগুলোতে রাশিয়ান ও চীনা শাসকদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল তালিবান । তালেবানরা কাবুলে হামলা চালানোর সামান্য আগে, তালেবানের ডেপুটি লিডার মোল্লা আবদুল গনি বারাদার [ Mullah Abdul Ghani Baradar ] চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে চীনকে “আফগান জনগণের নির্ভরযোগ্য বন্ধু” বলে অভিহিত করেছেন । একইভাবে, চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং কাবুলে জয়লাভের পর তালেবানদের সঙ্গে “বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক” সম্পর্ক আরও গভীর করার অঙ্গীকার করেছেন । রাশিয়া তালেবানদের সঙ্গে ইতিবাচক সম্পর্ক স্থাপনের ইচ্ছার ইঙ্গিতও দিয়েছে। আফগানিস্তানে রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত দিমিত্রি জিরনভ কাবুলের নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতির জন্য তালেবানদের প্রশংসা করেছেন। আফগানিস্তানে পুতিনের দূত জমির কাবুলভ তালেবানকে আফগান সরকারের চেয়ে বেশি বিশ্বস্ত অংশীদার হিসেবে প্রশংসা করেছেন।
গত ২০ বছরে আফগান যুদ্ধ বা মার্কিনী আগ্রাসনের সাথে চীন – রাশিয়ার কোন সম্পর্ক নেই। এই কারণে আফগানিস্তানের ক্ষমতাসীন ও জনগণের কাছে আমেরিকা ও তার মিত্রদের চেয়ে তুলুনামূলক ভাবে গ্রহণীয় চীন-রাশিয়া । অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী চীন আফগানিস্তানের বিশাল খনিজ মজুদ (বক্সাইট, তামা, লোহা আকরিক, লিথিয়াম ) হাতে পেতে সচেষ্ট। এই খনিজ উপাদান গুলি মোবাইল ফোন, কম্পিউটার, বৈদ্যুতিক গাড়ি, বিদ্যুতের তার, সৌর বিদ্যুত উৎপাদক প্যানেল , এবং অন্যান্য অনেক উচ্চ প্রযুক্তির অপরিহার্য উপাদান। বর্তমান সময়ে চীন এই খনিজ উপাদান গুলি আমেরিকা ও তার মিত্র দেশগুলি থেকে সংগ্রহ করে থাকে । আমেরিকার সাথে চীনের যুদ্ধ বা বড় ধরণের রেষারেষি চীনের খনিজ কাঁচামালের সরবরাহ হুমকির মুখে ফেলে দিবে। ফলশ্রুতিতে চীনের অর্থিনীতিতে মন্দাভাব দেখা দিবে। আফগানিস্তানের লিথিয়ামের এর রিজার্ভের আনুমানিক মূল্য প্রায় ১ ট্রিলিয়ন মার্কিন ডলার ধরা হয়ে থাকে । এর সাথে আফগানিস্তানের ভৌগোলিক ভাবে মধ্য এশিয়া, পশ্চিম এশিয়া এবং দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সংযোগস্থল । আফগানিস্তানের ভৌগলিক অবস্থান চীনের Belt & Road Initiative এর জন্য বিশেষ প্রয়োজন। চীনের আগ্রহ এই কারণেই প্রবল।
তালিবানের পররাষ্ট্র নীতি কি হবে তা নিয়ে নানা জল্পনা কল্পনা রয়েছে। তালেবানদের নেতৃত্ব ধনবাদী হওয়ার কারণে কোন না কোন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে গাঁটছাড়া বেঁধেই চলতে হবে। তালিবান ও সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলির দরকষাকষির মধ্যে চীন- রাশিয়া কতটুকু সুবিধা করতে পারবে তা স্পষ্ট হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। আর , প্রশ্ন হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে গাঁটছাড়া আফগান জনগণ কিভাবে নিবেন এবং জনগণের জন্য কতটুকু সুখকর হবে ?

অপু সারোয়ার

