বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের বড় আপনজন ছিলেন সায়মন ড্রিং। একাত্তরে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নিধনযজ্ঞের খবর যিনি বিশ্বের কাছে পৌঁছে দিয়েছিলেন। বাংলাদেশের সেই অকৃত্রিম বন্ধু ব্রিটিশ সাংবাদিক সাইমন ড্রিং। দীর্ঘদিন কাজ করেছেন বৈদেশিক সংবাদদাতা, টেলিভিশন উপস্থাপক এবং তথ্যচিত্র নির্মাতা হিসেবে রয়টার্স, টেলিগ্রাফ ও বিবিসির হয়ে। বাংলাদেশের গণহত্যার প্রত্যক্ষদর্শী প্রথম বিদেশি সাংবাদিক যিনি নিজের জীবন বিপন্ন করে সরেজমিন প্রতিবেদন তৈরি করে সারা বিশ্বকে জানিয়েছিলেন পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর লোমহর্ষক নির্যাতন ও গণহত্যার কথা।
১৯৭১ সালের ৬ মার্চ ইংল্যান্ডের ডেইলি টেলিগ্রাফের প্রতিবেদক সায়মন ড্রিং ঢাকায় আসেন। ২৬ বছর বয়সী সায়মনই প্রথম ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর ভয়াবহ গণহত্যার তথ্য ও প্রতিবেদন ১৯৭১ সালের ৩০ মার্চ লন্ডনের টেলিগ্রাফ পত্রিকায় তুলে ধরেন। তার ‘ট্যাংকস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’ শিরোনামে প্রতিবেদন বিশ্বে আলোড়ন সৃষ্টি করে। বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে পৃথিবীজুড়ে বিশাল জনমত সৃষ্টিতে সহায়তা করে।
সাইমন ড্রিং ১৯৪৫ সালের ১১ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের ছোট্ট শহর নরফোকের ফাকেনহ্যামে জš§গ্রহণ করেন। ১৮ বছর বয়স থেকে তিনি সংবাদপত্র ও টেলিভিশনের সাংবাদিক হিসেবে কাজ করেছেন। দেখেছেন ২২টি যুদ্ধ, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব। তিনি ডেইলি টেলিগ্রাফ এবং বিবিসি টেলিভিশন নিউজের বৈদেশিক সংবাদদাতা হিসেবে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে দীর্ঘসময় কর্মরত ছিলেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর প্রতিবেদন করে তিনি খ্যাতি ও সুনাম অর্জন করেন। ১৯৬২ সালে তিনি বহির্বিশ্ব ভ্রমণের অংশ হিসেবে ভারত ভ্রমণ করেন। ১৯৭১-এ আন্তর্জাতিক চাপের মুখে পাকিস্তানি সামরিক সরকার ৪০ জন বিদেশি সাংবাদিককে ঢাকা আসার অনুমতি দেয়। টেলিগ্রাফ পত্রিকার সাংবাদিক সায়মন ড্রিং মার্চের ৬ তারিখে তখন আসেন।
পরদিন ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণের সময় তিনিও উপস্থিত হন। ২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরু হলে আগত ৪০ সাংবাদিকের অনেকেই হোটেল থেকে সরাসরি বিমানে তুলে ঢাকা ছাড়তে বাধ্য করা হয়, যাতে করে বিশ্ব গণমাধ্যমের জন্য গণহত্যার কোনো সংবাদ সংগ্রহ করতে না পারে। কিন্তু পাকিস্তানি সামরিক আইন অমান্য করে সাইমন ড্রিং হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে লুকিয়ে থাকেন। সে সময় প্রায় ৩২ ঘণ্টা সময় কাটে হোটেলের লবি, ছাদ, বার, কিচেন প্রভৃতি স্থানে। পরে তিনি ঘুরে ঘুরে স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করেন গণহত্যার বাস্তব চিত্র।
২৭ মার্চ কারফিউ উঠে গেলে সাইমন ড্রিং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল, রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকাসহ ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বঙ্গবন্ধুর বাড়িসহ বিভিন্ন জায়গা ঘুরে দেখেন। পরে অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের খবর সংগ্রহ করে ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় ব্যাংককে পালিয়ে গিয়ে সেসব গণহত্যার ছবি দিয়ে প্রকাশ করেন ‘ট্যাংকস ক্রাশ রিভল্ট ইন পাকিস্তান’, যা সে সময় বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করে। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার তাকে জোরপূর্বক দেশ থেকে বের করে দেয়।
ইংল্যান্ডে ফিরে গিয়ে তিনি পুনরায় ১৯৭১ সালের নভেম্বরে কলকাতায় আসেন। সেখান থেকে তিনি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের যাবতীয় খবরাখবর নিরপেক্ষভাবে ওই দৈনিকে প্রেরণ করেন। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বিজয়ের দিনে যৌথবাহিনীর সঙ্গে তিনি ঢাকায় আসেন। ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু দেশে ফিরে আসার পর তিনি বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন।
সায়মন ড্রিং ১৯৯৭ সালে বিবিসি ছেড়ে বাংলাদেশের প্রথম বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল একুশে টেলিভিশনে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যুক্ত হন। তার হাত ধরেই টেলিভিশন সাংবাদিকতা নতুন মাত্রা পায়। তাকে বলা হয় বাংলাদেশে ব্রডকাস্ট সাংবাদিকতার জনক। ২০০২ সালে তৎকালীন সরকার একুশে টেলিভিশন সম্প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করলে সায়মন ড্রিং বাংলাদেশ ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হন। অবশ্য এরপরও বেশ কয়েকবার তিনি এদেশে এসেছেন।
সাইমন ড্রিং কেবল সাংবাদিকতার মধ্যেই আবদ্ধ থাকেননি। বিশ্বের সর্ববৃহৎ দাতব্য তহবিল ‘দ্য রেস এসেইন্ট টাইম’ তার হাতেই গড়া। যেখানে ১৬০টি দেশের সাড়ে ৫ কোটিরও বেশি লোক স্বেচ্ছায় অর্থ দিয়েছেন। ‘স্পোর্ট এইড’ নামের আরেকটি তহবিল ছিল। বিশ্বব্যাপী ১২০টি দেশের প্রায় ২ কোটি মানুষ এ তহবিলে দান করেছিলেন, যা ব্যয় করা হয়েছিল আফ্রিকার দুর্ভিক্ষপীড়িত মানুষের জন্য।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ বাংলাদেশে পাকিস্তানি সেনাদের নির্যাতনের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে অর্জন করেন ‘ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার’, ইরিত্রিয়া যুদ্ধের ওপর ‘ভ্যালিয়ান্ট ফর ট্রুথ’, কুর্দিদের বিরুদ্ধে তুরস্কের যুদ্ধের প্রতিবেদনের জন্য সনি এবং হাইতিতে আমেরিকান আগ্রাসনের ওপর প্রতিবেদন তৈরি করে নিউইয়র্ক ফেস্টিভ্যাল গ্রান্ড প্রাইজ পুরস্কার অর্জন করেন। ২০১২ সালের মার্চে বাংলাদেশ সরকার তাকে ‘মুক্তিযুদ্ধের সম্মাননা ও মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’য় ভূষিত করে।
সাইমন ড্রিং আশির দশকের শুরুর দিকে বিবিসি ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রের লস অ্যাঞ্জেলেস সিনেমা প্রযোজনার জন্য কোম্পানি করেন। সেখান থেকে বিবিসি ও পাবলিক ব্রডকাস্ট সার্ভিসের জন্য নির্মাণ করেন বিভিন্ন প্রামাণ্যচিত্র। এছাড়া সোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন ও লাতিন আমেরিকার ওপর সাইমন ড্রিং বহু অনুষ্ঠান নির্মাণ করেন। এসব প্রামাণ্যচিত্র বা অনুষ্ঠানের উপস্থাপক, পরিচালক ও প্রযোজনায় ছিলেন নিজেই।
গত ১৬ জুলাই তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তার চিরবিদায়ে এটুকুই বলি এই বাংলাদেশ যতদিন থাকবে ততদিন আমাদের মনে, বাংলাদেশের ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা তোমার নাম। বাংলাদেশের মানুষের অন্তরে শ্রদ্ধার আসনে থাকবে তুমি ।সায়মন ড্রিং তোমায় ভুলবে না বাংলাদেশ ।

কাজী সালমা সুলতানা , লেখক এবং গণমাধ্যম কর্মী

