মুক্তিযুদ্ধ ও বিপ্লবের চেতনা:
আমরা স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম এই ভেবে যে এবারে সব শোষণ ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি ঘটবে। কিন্তু যুদ্ধের পর দেশের কি দশা হল? যে যুদ্ধের বেশির ভাগই হয়েছিল স্বদেশের মাটির বাইরে, যে যুদ্ধ আমাদের জনগণকে কী সুফল উপহার দিতে পারে। নিরস্ত্র, শান্তি প্রিয়, ভীত সশস্ত্র মানুষ সীমান্ত পাড়ি দিয়েছিল আশ্রয় আর খাবরের খোঁজে। বেঁচে যাওয়া সৈন্যদের মধ্যে বেশির ভাগ তাই-ই করেছিল। আওয়ামী লীগসহ অন্যান্য নেতৃত্বদানকারী গণসংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলোর ছিল ঐ একই উদ্দেশ্য। কিন্তু জনগণের ম্যান্ডেট লাভকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের ছিল এক বিরাট দায়িত্বও কর্তব্য। দুর্ভাগ্যবশত সম্পূর্ণ অস্ত্রবলহীন একটি নিরস্ত্র জাতির ভবিষ্যত নিয়ে আওয়ামী লীগ কোনো রকম চিন্তাই করেনি। সম্ভাব্য ভয়বহতা মোকাবেলা করার জন্য আগে থেকে তারা জনগণকে কোনোভাবেই প্রস্তুত করেনি। একটা আধুনিক সেনাবাহিনীর সশস্ত্র শক্তির বিরুদ্ধে বেসামরিক জনসাধারণের সংঘাতে যাওয়াটা নিঃসন্দেহে একটা চরম বোকামি। আমাদের ক্ষেত্রে ঠিক তাই ঘটেছিলো, আর সে জন্য আমাদের মূল্যও দিতে হয়েছে চড়াওভাবে।
দেশের অজস্র মানুষের ভাগ্যের কথা চিন্তা করে আওয়ামী নেতৃত্ব যদি আন্তরিক ও সাহসী ভূমিকা নিত তাহলে ঘটনা প্রবাহ অন্যরকম হতে পারতো। কিন্তু তা হয়নি। আমাদের সৈনদের ক্ষেত্রেও ঐ একই কথা খাটে। জাতীয় যুদ্ধ সম্বন্ধে তাদের কোনো ধারণাই ছিল না। পরিণামে বিশ্বের এক অন্যতম অনিয়মিত বাহিনীর মাধ্যমে এক দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ পরিচালনা করা যাবে তার কোনো পরিকল্পনাই ছিল না। ভারত খুব খুশি মনেই আমাদের আশ্রয় দেয়, তাদের সাধারণ প্রস্তুত ছিল। কারণ ভারত জানতো এতে করে আন্তর্জাতিক রাজনীতি আর কূটনীতির অঙ্গনে তাদের সম্মানও ভাবমূর্তি বেড়ে যাবে। আর উপমহাদেশে তার আধিপত্য বিস্তারের নীতিও আরো সুদৃঢ় হবে। আসলে বাংলাদেশের ঘটনায় ভৌগলিক, রাজনৈতিক, অর্থ ও সম্পদের দিক থেকে সবচাইতে বেশি লাভবান হয়েছিল ভারত। যুদ্ধের ব্যাপারে এতটুক বলতে পারি আমাদের অফিসার ও সৈনিকরা মূলত ভারতীয়দের ইচ্ছামাফিক পরিকল্পনা বাস্তবায়নের কাজ করে যাচ্ছিল।
আমি যখন যুদ্ধে যোগ দেই তখন মুক্তিবাহিনীর সর্বধিনায়ক কর্নেল ওসমানী আমাকে বিভিন্ন সেক্টর পরিদর্শনের নির্দেশ দেন। উদ্দেশ্য ছিল আমাদের খুঁতগুলো চিহ্নিত করে আরও সুষ্টুভাবে যুদ্ধ পরিচালনার উপায় খুঁজে বের করা। প্রথমেই আমি ১১ নং সেক্টরে যাই। ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল জেলা নিয়ে এই সেক্টরের সীমানা। বর্তমানে উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান এই এলাকায় প্রচলিত সামরিক কায়দায় একটা বিগ্রেড গঠনের চেষ্টা করছিলেন। তখন এই সেক্টরের নেতৃত্ব ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার সন্ত সিং। আমি অবাক হয়ে গেলাম, এমন একটা গুরুত্বপূর্ণ সেক্টরের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে একজন ভারতীয় অফিসারকে! রণকৌশলগত দিক দিয়ে ঢাকা আক্রমণ করার জন্য এই সেক্টরের গুরুত্ব অপরিসীম।
আমি ঘুরে ঘুরে সেক্টরের পর সেক্টর পরিদর্শন করতে থাকলাম। মুক্তিযোদ্ধাদের সাথে আমি মিশে গেলাম; তাদের সাথে আমার চিন্তা-ভাবনা ও পরিকল্পনা নিয়ে খোলামেলা আলাপ করলাম। আমার কাছে এটা দিনের আলোর মতো স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে যাদের ওপর আমাদের রাজনৈতিক ও সামরিক নেতৃত্বের দায়িত্ব অর্পিত হয়েছিল তাদের কেউই সেই দায়িত্ব উপলব্ধি করতে পারেন নি। সোজা কথায় তারা ব্যর্থ হয়েছেন। আমাদের জাতীয় যুদ্ধ হয়ে উঠেছিল প্রায় হেরে প্রায় হেরে যাওয়া একটা ব্যাপার। অথচ আমরা যুদ্ধ করছিলাম একটা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল নিয়মিত বাহিনীর বিরুদ্ধে। আমাদের শত্রুরা সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত সুশিক্ষিত। তারা কঠোরভাবি প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত। অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রে সজ্জিত। অন্যদিকে আমাদের এমন কোনো সুসংহত নেতৃত্বেই ছিল না যা এই কিংকর্তব্যবিমূঢ় হতাশাগ্রস্ত সৈন্যদের ঐক্যবদ্ধ করতে পারে। আমাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, সুযোগ সুবিধা কিংবা অস্ত্রশস্ত্রের কিছুই ছিল না। অথচ আমাদের নেতৃত্ব তখন বিদেশের মাটিতে একটি প্রচলিত ধরনের সেনাবাহিনী গঠনের জন্য উঠে পড়ে লেগেছিলেন। আমাদের ছেলেদের কখনও সাহস কিংবা দেশপ্রেমের অভাব ছিল না। কিন্তু তারা ছিল অসংগঠিত, বিভিন্ন দলে বিভক্ত স্বাধীনতা পাগল দামাল ছেলে-যারা কখনও পাক বাহিনীর সামরিক আক্রমণের কথা চিন্তাও করেনি। অসতর্কাবস্থায় এরা তাই পাকিস্তানিদের জঘন্য গণহত্যার শিকার হয়। আমাদের যুদ্ধকৌশলের দুর্বলতাগুলো খুব সহজেই চিহ্নিত করা সম্ভব ছিল।
প্রথমত আমরা সমস্ত জাতি এক যুদ্ধে জড়িত হয়ে পড়েছিলাম। অথচ আমাদের সামনে কোনো রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছিল না। রাজনৈতিক নেতৃত্ব ছাড়া গেরিলা যুদ্ধ কখনো বিকাশ পেতে পারে না। আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব এই সশস্ত্র জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের রাজনৈতিক দিক-নির্দেশনা দিতে ব্যর্থ হয়েছিল। দ্বিতীয়ত গেরিলা যুদ্ধের তাত্ত্বিক কাঠামো সম্বন্ধে নেতৃত্বের কোনো ধারণাই ছিল না। কর্নেল ওসমানী, মেজর জিয়া, মেজর খালেদ ও মেজর শফিউল্লাহ্র মতো অন্যান্যরা যারা নিয়মিত সামরিক কাঠামোর লোক তাদের মধ্যে এমন লোক খুব কমই ছিলেন যারা গেরিলা যুদ্ধ কীভাবে সংগঠন করতে হয় সে সম্বন্ধে কোনো ধারণা রাখতেন। গেরিলা যুদ্ধের স্বাভাবিক বিকাশের পথে বড় বাধা ছিল এই সব প্রচলিত অফিসার আর তাদের প্রচলিত কায়দার সামরিক চিন্তা-ভাবনা। তৃতীয়ত স্বাধীনতা যুদ্ধের সামরিক নেতাদের সংখ্যা ছিল অপ্রতুল। আমাদের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সৈন্যও অফিসারদের কতগুলো নিয়মিত ব্রিগেডের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। স্বাধীনভাবে গড়ে ওঠা মুক্তিবাহিনীর ছেলেরা তাই প্রয়োজনীয় সামরিক নেতৃত্বে ও কলাকৌশল অর্জন করা থেকে বঞ্চিত হচ্ছিল। এর আসল কারণ হচ্ছে মুক্তিবাহিনীর নেতাদের মুক্তি সংগ্রাম সম্বন্ধে প্রয়োজনীয় ধারণার অভাব। তাদের একমাত্র চিন্তা ছিল কীভাবে একটা নিয়মিত বাহিনী গড়ে তুলে নিজেদের ক্ষমতার আসন পাকাপোক্ত করা যায়।
তখন বলা হচ্ছিল যথা সময়ে ২০ ডিভিশন সৈন্যের এক বাহিনী গড়ে তোলা হবে। আর ঠিক এভাবেই তখন বিকাশমান একটি জাতীয় গণযুদ্ধের স্বাভাবিক গতি রুদ্ধ করা হচ্ছিল। দেশের ভেতর মুক্তিসেনারা বীরের মতো যুদ্ধে করে যাচ্ছিল, কিন্তু তাদের অনুপ্রেরণা দেয়ার মতো কেউই ছিল না। বাইরে থেকে বাধা না আসলে হয়তো দেশের ভেতরেই স্বাভাবিকভাবে যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্ব গড়ে উঠতে পারত। আগরতলা আর মেঘালয়ে মেজর খালেদ মোশাররফ আর জিয়ার নেতৃত্বে যে দুই ব্রিগেড সুশিক্ষিত সৈন্য গড়ে উঠেছিল তাদের যদি মুক্তিযুদ্ধে সঠিকভাবে নিয়োজিত করা হত তাহলে ৭/৮ মাসের মধ্যেই দেশের মাটিতে ক্ষেতমজুর-কৃষকদের নিয়ে ২০ ডিভিশনের এক বিশাল গেরিলা বাহিনী প্রস্তুত হয়ে যেত।
আমার কথায় কর্নেল ওসমানী যথেষ্ট বিরক্ত হয়েছিল। তখন তাঁর কাজকর্ম খুব সহজই ছিল। ঘুমানোর জন্য তাঁর একটা নিশ্চিত আশ্রয় ছিল আর ঘুরে ঘুরে সেক্টর সদরগুলো দেখার জন্য তাঁর হাতে থাকত অনেক সময়। আসলে এটা ছিল মুক্তিযুদ্ধের নামে এক প্রহসন। নেতৃত্ব ছিল পাগলামীর নামান্তর। একটা গেরিলা যুদ্ধ আর একটা নিয়মিত যুদ্ধের মধ্যে আসলে অনেক তফাৎ। কিন্তু কর্নেল ওসমানী কখনোই তা বুঝতে চাননি। গেরিলা যুদ্ধের প্রথম দিকেই একটা নিয়মিত বাহিনী গঠনের চিন্তা করা একদম ঠিক নয়। ঠিক সময় এলে একটা গেরিলা বাহিনী নিজেদের নিয়মিত বাহিনীতে পরিণত হয়। ১১ নং সেক্টরের কৌশলগত গুরুত্ব দেখে সেখানেই থেকে যাবার সিদ্ধান্ত নেই! বিভিন্ন সেক্টরে ঘুরে বেড়ানোতে শুধু সময়ের অপচয় হত মাত্র। ওসমানী অসস্তুষ্ট মনেই আমাকে সেক্টর প্রধান নিয়োগ করলেন।
– এতটুকু বলার পর তাহেরকে আবার বাধা দেয়া হয়। আবার বাক বিতণ্ডা শুরু হয়। তাহেরকে তাড়াতাড়ি শেষ করতে বলা হয়। কর্নেল তাহের তখন বলেন, “এভাবে আমাকে বাধা দিতে থাকলে জবানবন্দি বলে যাওয়াটা অসম্ভব হয়ে পড়বে। আমর জীবনে অনেক নিচ মনের লোকই চোখ পড়েছে, কিন্তু আপনার মতো নিচ মনের লোক আমি একজনও দেখিনি।(৪র্থ পর্বে লিপিবদ্ধ)
রণি চৌধুরীর ওয়াল থেকে নেয়া

