কর্ণেল তাহেরের জবানবন্দি- (২য় পর্ব)

সময়টা ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। শীতের প্রকোপ তখনো যায়নি। আমি জানতাম বাঙালিরা কোনো অন্যায়কেই বিনা প্রতিবাদে মেনে নেবে না, তারা প্রতিরোধ করবেই। আমার মনে হচ্ছিল দেশের মানুষকে স্বাধীন করার দিন এগিয়ে আসছে। জানি না কয়জন এভাবে ভাবতেন। যতই দিন যাচ্ছিল, আমাদের মনমানসিকতার ও দ্রুত পরিবর্তন হচ্ছিল। আস্তে আস্তে আমরা অনিবার্য ঘটনাবলীর জন্য প্রস্তুত হয়ে উঠলাম। ২৫শে মার্চ আমি কোয়েটায় স্কুল অফ ইনফ্যন্ট্রি অ্যান্ড ট্যাকংটিকস্‌-এ উচ্চতর কারিগরী প্রশিক্ষণে অংশ নিচ্ছিলাম। সন্ধ্যা নেমে আসার সাথে সাথেই জানতে পারলাম সেদিন রাতে বাংলাদেশে কড়া ব্যবস্থা নেয়া হবে। সারা রাত আমি কোয়েটার খালি রাস্তায় হেঁটে আমার জাতির ওপর কি সীমাহীন দুর্যোগ নেমে এসেছিল তা আমি এখনো কল্পনা করতে পারি না। বাংলাদেশের বুকে যেন এক নারকীয় গণহত্যা সংঘটিত হয়েছিল।
পরদিন ২৬শে মার্চ ভোরেই রেডিওতে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের ভাষণ শুনলাম। সে এক ভয়ংকর মুহূর্ত। এক নতুন দেশের জন্মযন্ত্রণা যেন আমি অনুভব করছিলাম। বাংলাদেশে তাদের কর্মকাণ্ডের জন্য পাকহানাদার বাহিনীর প্রতি আমার বিদ্বেষ কোনো গোপনীয় ব্যাপার ছিল না। তাই অচিরেই আমি উপরওয়ালাদের অসন্তোষের কারণ হয়ে দাঁড়ালাম। হঠাৎ করে ২৮শে মার্চ স্কুল অফ ইনফ্যান্ট্রি অ্যান্ড ট্যাক্‌টিক্‌সের কোর্স বন্ধ করে দেয়া হল, আমাদের সবাইকে যার যার ইউনিটে যোগ দিতে আদেশ দেয়া হল। সে সময় অনেক বাঙালি জুনিয়র অফিসার আমার কাছে এসে পরামর্শ চায়। আমি তাদের স্পষ্ট ভাষায় বলে দেই মাতৃভূমির প্রতিই হচ্ছে তাদের একমাত্র কর্তব্য। তাদের একমাত্র চিন্তা হবে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে পালিয়ে যুদ্ধে যোগ দেয়া।
এরা আমাকে আরো জানায় যে তারা কোয়াটায় অবস্থানরত অন্য আরো সিনিয়র অফিসারদের কাছে গেলে তারা এদের উপদেশ দেয়া তো দূরের কথা সৌজন্য করে আপ্যায়ন কিংবা কথাটা পর্যন্ত বলেনি; শেষে আবার পাকিস্তানি প্রভুরা তাদের আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ করে। আমার মনোভাব জানার পরে এ সমস্ত সিনিয়র অফিসাররা আমাকে শুধু এড়িয়েই চলেনি, এমনকি কথা পর্যন্ত বন্ধ করে দিয়েছিল। আজকে সেই একই অফিসারদের অনেকেই এদেশের জাতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে বেশ উচ্চপদে রয়েছেন। আর তাদের কয়েকজন আবার আমার বিচার করার জন্য এখানে উপস্থিত রয়েছেন। ২৫শে মার্চের আগে এই অফিসাররা শেখ মুজিবের সাথে তাদের পরিচয় ও সম্পর্কের কথা জাহির করতে বেশ উৎসাহ পেতেন, ২৫শে মার্চের পর এরাই আবার তাকে দেশদ্রোহী বলে আখ্যা দেন।
– ভাষণের এই পর্যায়ে ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান তাহেরকে বাধা দেন। এখানে এই ধরনের কথা বলা যাবে না বলে তাঁকে জানানো হয়। কোর্টের মধ্যে প্রচণ্ড বাকবিতণ্ড শুরু হয়ে যায়। কর্নেল তাহের ট্রাইবুনালের চেয়ারম্যান কর্নেল ইউসুফ হায়দারকে বলেন, “আমার বক্তব্য রাখার সুযোগ না দিলে আমি বরং চুপ থাকাটাই ভালো মনে করব। এমন নিম্নমানের ট্রাইবুনালের সামনে আত্বপক্ষ সমর্থন করছি। নিজের ওপরই ঘৃণা লাগে।” আরো বাকবিতণ্ডার পরে তাহেরের আইনজীবীদের হস্তক্ষেপের ফলে শেষে তাহেরকে বক্তব্য রাখার অনুমতি দেয়া হয়।
পরে আমি জেনে খুব খুশী হই যে যাদের আমি পালিয়ে আসতে উৎসাহ দিয়েছিলাম, তাদের মধ্যে সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট নুর ও সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট এনাম পালিয়ে যেতে পেরেছে ও স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। কয়দিন পরই পূর্ব পাকিস্তানে সংঘটিত নৃশংসতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে অসন্তোষ প্রকাশ করার অভিযোগ আমাকে কোয়েটায় নজরবন্দি করা হয়।
স্কুল অফ ইনফ্যন্ট্রি অ্যান্ড ট্যাক্‌টিকস্‌ এর কমান্ডান্ট বি. এম. মোস্তফার সাথে আমার ভালো সম্পর্ক ছিল। কিছুদিন পর তাঁর হস্তক্ষেপে আমার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলো তুলে নেয়া হয়। খারিয়া সেনানিবাসে একটা মাঝারি রেজিমেন্টের সাথে আমাকে যুক্ত করা হয়। আমাকে আমার আগের কমান্ডো ইউনিটে ফিরে যেতে দেয়া হয় নি। এই ইউনিটকে ইতিমধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানো হয়েছিল আমার ভাইদের হত্যা করার জন্য। এরাই শেখ মুজিবুর রহমানেকে গ্রেফতার করে।
খারিয়া সেনানিবাসে আমি ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী ও ক্যাপ্টেন দেলোয়ারকে আমার সাথে পালিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেয়ার জন্য উদ্বুদ্ধ করি। পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরের মীরপুর শহরে কর্মরত এক বাঙালি প্রকৌশলীর সাথে আমরা যোগাযোগ করি। তিনি আামদের থাকার ব্যবস্থা করে দেয়ার আর সীমান্ত পর্যন্ত যাবার ব্যবস্থা করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু নির্ধারিত দিনে মীরপুর পৌঁছে দেখি, ইঞ্জিনিয়ার সাহেব বাসায় তালা মেরে পরিজন সহ সটকে পড়েছেন। এই প্রথম দেখলাম বাঙালি অভিজাত শ্রেণীর দেশপ্রেমের নমুনা। বিকেলটা আমরা তার লনে বসেই কাটিয়ে দিলাম। রাত নেমে আসার সাথে সাথেই আমরা পাহাড়ী পথে রওয়না দিলাম। আমার দুই সহযাত্রী ক্যাপ্টেন পাটোয়ারী ও ক্যাপ্টেন দেলোয়ারের পাহাড়ী পথে হেঁটে অভ্যাস নেই। কয়েক ঘণ্টা পর তারা আর এগোতে পারল না। আমাদের আবার ফিরে আসতে হল খারিয়াতে। তখন পশ্চিম পাকিস্তানে প্রায় এক হাজার বাঙালি অফিসার ছিলেন। তাদের অনেককেই বললাম পালিয়ে যেতে স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দিতে। বোঝাতে চেষ্টা করলাম। কিন্তু আাসলে এদের দেশপ্রেম ড্রইংরুমের তর্ক বিতর্কের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, এর বেশি না। পরে যখন আমি এবোটাবাদে বালুচ রেজিমেন্টাল সেন্টারে বদলি হয়ে যাই সেখানেও আমি বাঙালি অফিসারদের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করতাম। সৌভাগ্যবশত এদের মধ্যে রওয়ালপিন্ডির জেনারেল হেড কোয়ার্টাসে কর্মরত মেজর জিয়াউদ্দিন আমার সাথে পালাতে রাজি হয়ে যান। আমাদের পরিকল্পনা গ্রহণ করতে দেরি হল না। আমার যা সঞ্চয় ছিল তা দিয়ে একটা পুরনো গাড়ি কিনলাম। গাড়ি দিয়ে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছানো যাবে। পিন্ডি থেকে আমরা দুজন রওয়ানা দিলাম। পথে ঝিলাম ক্যান্টনমেন্ট থেকে ক্যাপ্টেন পাটোয়ারীকে সঙ্গে নিলাম। দিনের আলো তখনো কিছু বাকি ছিল। তাই শিয়ালকোর্ট ক্যান্টনমেন্টে মেজর মঞ্জুরের বাসায় উঠলাম। আমাদের পরিকল্পনা শুনে মেজর মঞ্জুর চুপ হয়ে গেলেন। তার মধ্যে কোন উৎসাহ দেখলাম না। কিন্তু তার স্ত্রী জেদ ধরলেন। শেষ পর্যন্ত মেজর মঞ্জুর আমাদের সাথে পালিয়ে যেতে রাজি হলেন। তার বাঙালি ব্যাটম্যানসহ মেজর মঞ্জুর সপরিবারে আমাদের সাথে যোগ দিলেন। সন্ধ্যার পর গাড়ি করে সীমান্ত পর্যন্ত পৌঁছলাম। তারপর গাড়ি ফেলে রেখে হাঁটতে হাঁটতে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে আমারা ভারতে পৌঁছি।(৩য় পর্বে লিপিবদ্ধ-)
রণি চৌধুরীর ওয়াল থেকে নেয়া

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.