অ্যাডভোকেট আনসার খান :রাশিয়ার নব্য ‘জার’খ্যাত প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন দোর্দন্ডপ্রতাপশালী স্বৈরশাসক হিসেবে ইতোমধ্যেই স্বীকৃত হয়েছেন তাঁর দেশ ও বাইরের জগতে।তাঁর শাসনে রাশিয়ায় গণতন্ত্রের নামগন্ধ মুছে ফেলা হয়েছে, তার পরিবর্তে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে পুতিনইজম।সেখানেপুতিনের ইচ্ছাই হলো শেষ কথা।
রাষ্ট্রের সকল বিভাগ,অর্থাৎ শাসন,আইন ও বিচার বিভাগের ওপর তাঁর একক কর্তৃত্ব সুপ্রতিষ্ঠিত।সেখানে সকল প্রকার মিডিয়ার ওপর পুতিনবাদের প্রভাব সুস্পষ্ট। মানুষের কথা বলার স্বাধীনতা,মিডিয়ার স্বাধীনতা ছিনতাই হয়ে গেছে অনেক আগেই। যেকারণে, বলা হয়ে থাকে, অনেকক্ষেত্রে পুতিনের ক্ষমতা রাশিয়ার তৎকালীন ‘জার’শাসকদের চেয়েও বেশি।
রাশিয়ার এমন শক্তিধর শাসকের বিরুদ্ধে রাজপথে প্রকাশ্যে রাজনৈতিক লড়াই করে যাওয়ার সাহস ক’জন দেখাতে পারেন। তবে, হ্যাঁ,একজন আছেন,সকল বাধা-বিপত্তি,জেল-জুলুম, অত্যাচার,নির্মম নির্যাতন,নিপীড়ন সহ্য করে,জীবনের ভয় এবং পুতিনবাদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে গত একদশকেরও অধিক সময় ধরে পুতিনের দুঃশাসনযুক্ত অগণতান্ত্রিক সর্বাত্মকবাদী শাসনের বিরুদ্ধে, পুতিনবাদের ওপর গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের জন্য, জনগণের মৌলিক অধিকার পূনরুজ্জীবনের জন্য,রাজনৈতিক লড়াই চালিয়ে আসছেন,তিনি হলেন মাত্র চুয়াল্লিশ বছর বয়স্ক অসমসাহসী একজন রাজনৈতিক যোদ্ধা,-“আলেক্সেই নাভালনী।”
দুর্দান্ত রাজনৈতিক যোদ্ধা নাভালনী এখন শুধু তাঁর দেশেই নয়,সারা বিশ্বের গণতান্ত্রিক মানুষের মনোযোগ ও দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন এবং মস্কোতে পুতিন বিরোধী আন্দোলনের,-‘কন্ঠস্বর’ ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের,-“প্রতীকে” পরিণত হয়েছেন।
নাভালনী তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যদিয়ে ইতোমধ্যেই তাঁর দেশে একজন ‘ক্যারিজম্যাটিক’নেতা হিসেবে যুব-তরুণদের ব্যাপক অংশের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছেন,বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর লাখ-লাখ সমর্থক রয়েছেন।এর মধ্যে ইউটিউবে প্রায় ছয় মিলিয়ন এবং টুইটারে দুই মিলিয়ন অনুসারী আছেন বলে জানা গেছে এবং এসংখ্যা প্রতিদিনই বেড়ে চলেছে।সর্বশেষ ৩-জানুয়ারী ২০২১ এর তথা অনুযায়ী তাঁর মোট ভিউয়ারস সংখ্যা-৮৯৯-মিলিয়ন।
মস্কোর এই ক্যারিজম্যাটিক নেতা রাশিয়ার বর্তমান স্বৈরশাসক পুতিনের একমাত্র চ্যালেন্জার হয়ে ওঠেছেন এবং দেশ-বিদেশের বিশ্লেষকদের মতে, নাভালনী জার শাসক পুতিনের রাতের ঘুম কেড়ে নিয়েছেন। নাভালনী মস্কোয় পুতিন বিরোধীদের,-ডি-ফ্যাক্টো’ নেতার আসনে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন এবং তিনিই একমাত্র নেতা,যার আহবানে রাশিয়ার সকল প্রান্তে লাখো মানুষ পুতিন বিরোধী আন্দোলনে রাস্তায় নেমে আসবেন বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা-যার প্রমাণ হিসেবে এটা তোলে ধরা হচ্ছে যে,গেল ১৭-জানুয়ারীতে জার্মানী থেকে দেশে ফিরে এলে মস্কোর এক বিমানবন্দরে আটক করে নাভালনীকে ত্রিশদিনের আটকাদেশ দিয়ে কারাগারে পাঠায় পুতিন সরকার। মস্কোর এই হঠকারিতা এবং অগণতান্ত্রিক আচরণের প্রতিবাদে ও নাভালনীর অবিলম্বে মুক্তির দাবিতে পরদিন রাশিয়ার একশোটা শহরে হাজার-হাজার মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন এবং সাম্প্রতিককালে পুতিনবিরোধী এতো বিরাটাকার বিক্ষোভ রাশিয়ায় হয়নি বলে মন্তব্য করেছেন পর্যবেক্ষকগণ।
যুক্তরাষ্ট্রের ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ষ্ট্রীট জার্ণালের’ প্রতিবেদন মতে,রাশিয়ায় নাভালনী হলেন একমাত্র ব্যক্তি,যাকে পুতিন ভয় পান।নাভালনীকে ভয় পাওয়ার অনেকগুলো কারণের মধ্যে এটা অন্যতম যে,নাভালনীর অসমসাহসীকতা।পুতিনের অগণতান্ত্রিক শাসনের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক লড়াইয়ে নামার পর থেকে তাঁকে পুতিনের রক্তচক্ষু ও ভয়ভীতি উপেক্ষা করেই সংগ্রাম করতে হচ্ছে। কিন্তু তিনি কোনো শক্তির নিকট মাথা নত না করে বিগত দশকধরে পুতিন বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন এবং রাশিয়ার জনগণকে পুতিন বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত করতে সক্ষম হয়েছেন।
নাভালনী পুতিনের ক্ষমতার ভিত্তি টেনে ধরেছেন,তাঁর শাসনের মসনদ নড়বড়ে হয়ে পড়েছে নাভালনীর আন্দোলনের মূখে,রাশিয়ার মানুষ জেগে ওঠেছে নব্য জারের বিরুদ্ধে। কাজেই, নাভালনীর ভয়ে ভীত পুতিন।তাই, নাভালনী পুতিনের প্রধান লক্ষ্যে পরিণত হয়েছেন এবং তাঁকে রাজনীতির মাঠ থেকে সরিয়ে দেবার জন্য নির্যাতনের বহুমাত্রিক পথে হাটঁতে শুরু করেন পুতিন।এক পরিসংখ্যানে পাওয়া তথ্য থেকে দেখা গেছে,গত২০১১-সাল থেকে এপর্যন্ত মোট এগারো বার নানা মিথ্যা ও সাজানো রাজনৈতিক মামলা ও অভিযোগে নাভালনীকে কারাগারে পাঠিয়ে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে পুতিন সরকার এবং এমনকি, তাঁকে মিথ্যা অভিযোগে শাস্তি দিয়ে ২০১৮-সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রার্থী হতে অযোগ্য ঘোষণা করে দেওয়া হয়েছিলো।
এতোসব নিপীড়ন করেও যখন নাভালনীকে দমন করা ও রাজনীতির মাঠ থেকে সরাতে ব্যর্থ হয় পুতিন সরকার, তখন তাঁর জীবননাশের পথে পা বাড়ায় পুতিন সরকার। নাভালনীকে প্রাণে হত্যা করার জন্য তাঁর ওপর’নভিচক,নামক বিষ প্রয়োগ করা হয়।বিষের প্রভাবে নাভালনী কোমায় চলে যান,তাঁর জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে জার্মানীতে নিয়ে যাওয়া হয়।সেখানে চিকিৎসায় এযাত্রায় তিনি বেঁচে যান এবং স্বদেশে ফিরে এসে পুতিনবিরোধী আন্দোলন জোরদার করার অঙ্গীকার করেন।কিন্তু দেশে ফিরে না আসতে বহুমূখী চাপ ও ভয়ভীতি দেখায় পুতিন সরকার। তবে সব হুমকি উপেক্ষা করে নাভালনী জার্মান থেকে ফিরে আসেন রাশিয়ার মাটিতে গত ১৭-জানুয়ারীতে। কিন্তু তাঁকে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি দেশের ভেতরে।মস্কোর এক বিমানবন্দরে নামার পরেই তাঁকে প্যারোলের শর্ত না মানার অভিযোগে আটক করে পুতিন সরকার এবং বিমানবন্দরেই সরকারের তাবেদার আদালত বসিয়ে নাভালনীকে ত্রিশদিনের আটকাদেশ দিয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয় কারাগারে। তবে দেখার বিষয় হলো,রাশিয়ার জনগণ সহজভাবে পুতিনের ক্ষমতার অপব্যবহার ও নাভালনীর ওপর অন্যায়-অবিচারের বিষয় মেনে নেয়নি, বরং পরের দিন দেশের একশো শহরের রাজপথে নেমে আসে হাজার -হাজার নাভালনীর ভক্ত মানুষেরা,তারা পুতিন শাসনের অবসান, নাভালনীর মুক্তি ও গণতান্ত্রিক শাসন কায়েমের দাবিতে পুতিনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে।
দুঃসাহসী নেতা নাভালনী কিন্তু একদিনে সৃষ্টি হননি,অনেক কষ্টের পথ পাড়ি দিয়েই আজ তিনি রাশিয়ার গণতন্ত্র সচেতন মানুষের নয়নের মণিতে পরিণত হয়েছেন এবং জার পুতিনের ভয়ের কারণ ও চ্যালেন্জার রূপে রাশিয়ার রাজনীতিতে আবির্ভূত হয়েছেন। রাশিয়ার জনগণসহ গোটা বিশ্বের গণতন্ত্রকামী মানুষ আজ বিশ্বাস করছে নাভালনীর হাত ধরে তাঁর নেতৃত্বেই রাশিয়ায় গণতন্ত্র ফিরে আসবে,আবারও উদারনৈতিক মুক্তমতের শাসন কায়েম হবে রাশিয়ায় এবং নব্য জারের কর্তৃত্ববাদী পুতিন শাসনের অবসান ঘটবে।
নাভালনীর রাজনৈতিক অভিযাত্রার শুরু মূলত ২০০৮-সালে এবং যুব আন্দোলনের মধ্যদিয়েই তাঁর রাজনৈতিক অঙ্গণে অভিষেক ঘটেছিলো। পরবর্তীতে তিনি নিজের রাজনৈতিক সংগঠন’ফিউচার পার্টি ‘প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তবে তিনি অনলাইনে রাজনৈতিক ব্লগ লেখার ওপর মনোনিবেশ করেন,যা তাঁকে জনপ্রিয়তা এনে দেয়।
তিনি পুতিন ও তাঁর সরকারের ব্যাপক দূর্নীতির ঘটনা উদঘাটনের দিকে মনোযোগ দেন এবং এজন্য গড়ে তোলেন দূর্নীতি বিরোধী সংগঠন,-‘এন্টি-করাপশন ফাউন্ডেশন।”এ সংগঠনের মাধ্যমে তিনি পুতিন ও তাঁর সরকারের নেতাদের দূর্নীতি নিয়ে তদন্ত শুরু করেন এবং প্রাপ্ত তথ্যগুলো ইউটিউবসহ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দিতে থাকেন।এধরনের সর্বশেষ তথ্য সমৃদ্ধ ইউটিউব বার্তা প্রচারিত হয়েছে অতি সম্প্রতি।এর শিরোনাম হলো,”পুতিন প্যালেস;হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ড’স লার্জেস্ট ব্রাইব।” এটি পুতিনের রাজপ্রাসাদ তৈরীর দূর্নীতি সংক্রান্ত তথ্য নিয়ে নির্মিত। পুতিন কৃষ্ণ সাগর পাড়ে তাঁর নিজের জন্য বিশ্বের সর্ববৃৎ ব্যক্তিগত রাজপ্রাসাদ তৈরী করেছেন সরকারি অর্থে, যা মোনাকো রাজপ্রাসাদের চেয়ে ৩৯-গুণ বৃহৎ পরিসরের এবং এর নির্মাণ খরচ প্রায় ১.৫-বিলিয়ন বলে দেখানো হয়েছে। প্রায় ১০০-মিলিয়ন মানুষ ইউটিউবটা দেখেছেন,যা পুতিন শাসনের ভিত্তি নাড়িয়ে দিয়েছে।এটা রাশিয়ায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
নাভালনী মূলত অনলাইন ভিত্তিক রাজনীতির প্রতি ঝোঁকে আছেন এবং এর মধ্যদিয়ে জনগণকে পুতিন শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত করছেন। অনেকগুলো দাবির মধ্যে প্রধান দাবি হিসেবে ‘ফ্রি-ফেয়ার নির্বাচন’ আদায়ের জন্য জোর দিয়েছেন, যা জনগণের নিকট গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছে এবং জনগণ নাভালনীর প্রতি সমর্থন দিয়ে দাবি আদায়ে তাঁর পেছনে দাঁড়িয়েছেন।ফলে ক্রমেই পুতিনের পায়ের তলার মাটি সরে যাচ্ছে, পুতিনের মসনদ হারানোর ভয় থেকে নাভালনী ও তাঁর সমর্থকদের ওপর অত্যাচার-নির্যাতনের মাত্রাও বাড়িয়ে দিয়েছেন পুতিন।
শেষমেশ, প্রশ্ন দাঁড়াচ্ছে, নাভালনী কী পারবেন পুতিন শাসনের অবসান ঘটাতে,অথবা পুতিন কী পরাজয় স্বীকার করে নেবেন নাভালনীর নিকট।
লেখক: আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষক।

