জন্মলগ্ন থেকেই মানুষ ভালোবাসার কাঙ্গাল। স্থান কাল পাত্র ভেদে ভিন্নতা হয় কেবল। সবাই নিজ নিজ আকাশে মুক্ত বিহঙ্গ। তবে এই মুক্তততা ছেড়েও মানুষ ভালোবাসার শেকলে বাঁধা পড়ে। মুক্তততাও সবসময় মুক্তি নয় তাই যুক্ত হওয়ার আকাঙ্খা আজন্মকালের। ভালোবাসা একটি হৃদয় তাড়িত অনুভুতি, একটি আবেগ, একটি অভিজ্ঞতা। বিশেষ কোন মানুষের জন্য হৎদ্দতর, স্নেহতর ও স্পর্শতর শক্তিশালী বহিঃপ্রকাশ বা টানই হচ্ছে ভালোবাসা। রোমান্টিক গল্প-উপন্যাস পড়ার অভ্যাস থাকলে যেকোন বিষয়ে “ভালোবাসা” খুজে পাওয়া যায়। স্কুলে বন্ধুরা যখন অংকের সূত্র, বিজ্ঞানের বিক্রিয়া আর ইংরেজী গ্রামার মুখস্তে ব্যাস্ত, তখন আমি হুমায়ুর আহমেদ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় সহ জগৎ বিখ্যাত লেখকদের প্রেমের উপন্যাস পড়ে রাত পার করে দিতাম। বন্ধুরা কোন বন্ধু প্রেমে পড়লে আমার দায়িত্ব ছিল তাদের জন্য প্রেমপত্র লিখে দেয়া। কত জনের জন্য যে প্রেমপত্র লিখে দিয়েছি তার কোন হিসাব নাই এবং সেই প্রেমপত্র পৌছে দেবার দায়িত্বও মাঝে মাঝে আমার ই ছিল। প্রত্যেকটা প্রেমপত্রই আমি আমার মত করে লিখতাম, যেন বন্ধুর প্রেমিকাই আমার প্রেমিকা! হুমায়ুন আহমেদের “শ্রাবন মেঘের দিন” বইটা পড়ে আমি অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। পরবর্তীতে এই উপন্যাসে নির্মিত সিনেমা দেখে আমি মেহের আফরোজ শাওনের প্রেমে পরে যাই। গুলিস্তান থেকে সে সময়ে ৩০ টাকা দিয়ে তার একটা পোষ্টারও কিনেছিলাম। দেয়ালে টাঙ্গানো সেই পোষ্টারের সাথে কত কথা বলেছি । মেট্রিক পরীক্ষা দেওয়ার পর পাশের বাসার এক পরিচিত মেয়েকে দেখে হঠাৎ আমার হৃদয় সমুদ্রে শক্তিশালি সুনামী আঘাত হানলো। আরেএএএএ … এই মেয়ে দেখতে তো হুবুহু শাওনের মত!!! এতোদিন কেন খেয়াল করি নাই!!!! তার পর থেকে তাকে দেখার, তার সাথে কথা বলার জন্য সে কি অপেক্ষ। সেদিন থেকে হৃদয়ের মাঝে তোমার ছবি আঁকি। কি অপরূপ তুমি। তোমার দুটি আঁখি, অপলক নয়নে শুধুই চেয়ে থাকি। চাহনি ভরা হাসি তোমার মায়া ভরা মুখ, একবার দেখিলে যেন পাই স্বর্গের সুখ । আমার মনের “হ-য-ব-র-ল” কথাগুলো তাকে জানানোর জন্য সুদীর্ঘ সময় ব্যায় করে একটা পত্র দিখলাম। নিজের ভালোলাগা মানুষের জন্য লেখা প্রথম প্রেমপত্র। সেই প্রেমপত্র পকেটে নিয়ে ঘুড়ি। তার সাথে দেখা হয়, কথা হয়। তার চাহনিতে আমি আমার ছায়াও দেখতে পাই। আমি আনন্দে কেঁপে উঠি। কিন্তু সরাসরি কেউ কাউকে কিছু বলিনি। হয়তো সে চেয়েছিল, আমি বলি বা আমি চেয়েছিলাম, সে বলুক। এভাবে সময় চলে যায়। পকেটে থাকা প্রেমপত্রে কালসী ময়লা জমে। এক সময় আমাদের বাসা ঢাকা থেকে সিলেট শিপ্ট করা হয়। চলে আসার আগের দিন রাতে আমাদের দেখা হয়। সে মুচকি হেসে আমাকে জিজ্ঞাস করে “আপনি কি কিছু বলতে চান?” আমিও মৃদু হেসে পকেটে হাত ঢুকিয়ে তার দিকে তাকাই। ইচ্ছে করছিলো, ৬ মাস আগে লেখা প্রেমপত্রটা পকেট থেকে বের করে তার হাতে দিয়ে বলি- “হুমম…. বলতে চাই”। কিন্তু বলা হয়নি কিছুই। পকেটে থাকা প্রেমপত্র পকেটেই থেকে যায়। এতো জনের জন্য প্রেমপত্র লিখলাম, সেই প্রেমপত্র আবার নিজেই পৌছে দিয়েছি কত। অথচ প্রথম বারের মত নিজের প্রেমপত্রটাই পৌছানো হয়নি যার জন্য লিখেছিলাম, তার কাছে! পরের দিন আমরা সিলেটে চলে আসি। আর কোন দিনই আমাদের দেখা হয়নি। এক শ্রাবন দিনের প্রেম পত্র, তার কাছে আর পৌছায়নি।

আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)

