১১ জানুয়ারি ১৯৮৩ : মোহন ও ইতিহাসের অংশ হয়ে ওঠা

বেঁচে থেকে ইতিহাসের অংশ হওয়া একটা বিশেষ ব্যাপার বৈকি! মোহনের বয়সের অর্ধশতাব্দী উপলক্ষে লিখতে গিয়ে যে কথাটা সবচেয়ে আগে আমার মনে হলো তা হচ্ছে মোহনের সাথে সাথে তার সাথি হিসেবে আমরাও আজ ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছি। বর্তমান প্রজন্ম এ ইতিহাসের অনেকখানিই জানে না। কারণ যে ইতিহাস আমরা সৃষ্টি করেছিলাম, তার ধারাবাহিকতা থাকেনি। ইতিহাস তার পুরোনো জায়গায় ফিরে গেছে। তাই পুরোনো ইতিহাস আবার নতুন করে যেনবা চক্রাকারে পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। হয়ত এবার নতুন ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে আমাদের কথা বর্তমান প্রজন্ম খুঁজে বার করবে। সে ভরসাতেই এ লেখা লিখতে বসা।
কবি মোহন রায়হান, সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়ের প্রবাদপুরুষ, বিদ্রোহী মোহন রায়হানে পরিণত হলো ১১ জানুয়ারি ১৯৮৩ তারিখে। লড়াইয়ের পরবর্তী দিনগুলোয় মোহন ও ১১ জানুয়ারির বিদ্রোহ একটা মডেল, একটা উদাহরণ হয়ে দাঁড়াল সবার সামনে। কীভাবে আমরা দাঁড়ালাম এ সমীকরণে? একটু পেছনে ফেরা যাক।
সময়টা ১৯৭২-৭৩ সময়ের অগ্নিগর্ভ দিনগুলোর কোনো একদিন। বাংলাদেশ ছাত্রলীগের কার্যালয় ৪২ বলাকা ভবনে কেন্দ্রীয় দফতরে আমি রেজাউল হক মুশতাক ভাইয়ের তত্ত্বাবধানে, শিক্ষানবিশ হিসেবে সংবাদ বিজ্ঞপ্তি, সভার প্রস্তাবাবলি ইত্যাদির খসড়া লিখি। পাশাপাশি ছাত্রলীগ ঢাকা মহানগর শাখার দফতর সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছি। ঐসময় আমি ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদেরও সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। একদিন বিকেলে আমার বয়সের কাছাকাছি পাঞ্জাবি পরা এক তরুণ দফতরে এলেন। ছাত্রলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক জনাব আ. ফ. ম. মাহবুবুল হক আমাকে তরুণটির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তরুণটি ছিলেন সিরাজগঞ্জের ছাত্রনেতা মোহন রায়হান। এরপর প্রতিটি কেন্দ্রীয় সভা, সম্মেলনে তরুণটির সাথে আমার দেখা হতো।
১৯৭৩-৭৬ সালের দিনগুলোতে এ দেশের তরুণ-যুবসমাজ কাটিয়েছে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়। স্বাধীন বাংলাদেশে লুটপাট, ট্রিগারমুখী সন্ত্রাসীদের মানুষ-খুনের নেশা, মানুষ-খুনের জন্য বিশেষ বাহিনী নিয়োগ, রাষ্ট্রীয় সম্পদ হাইজ্যাক, গুণ্ডামি, নারী অপহরণ, ব্যালট বাক্স ছিনতাই, প্রার্থী অপহরণ ইত্যাদি ঘটনার বিরুদ্ধে প্রচণ্ড বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল বাংলার মুক্তিযোদ্ধা প্রজন্মের তরুণ-যুবসমাজ। মোহন রায়হান ও আমরা সে-প্রজন্মের। কোনো রক্তচক্ষুকে পরোয়া করতে শিখিনি। অকাতরে প্রাণ দেবার জন্য উদ্বুদ্ধ হয়েছি প্রবাদপ্রতিম মুক্তিযোদ্ধা নেতৃত্বের ডাকে।
মোহনের কথায় ফিরে আসি। ১৯৭৫-৭৬ সালে সিরাজগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে বেসামরিক-সামরিক উভয় শাসনকালেই ফ্যাসিবাদী শাসনের বিরুদ্ধে মোহন কৃষক-ছাত্র-জনতাকে সংগঠিত করেছে। এ সংগঠিত করার কাজটি নির্বিবাদে নিরীহভাবে করার সুযোগ ছিল না। রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদকে মোকাবেলা করতে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ধারাবাহিকতায় বিপ্লবী গণবাহিনী গড়ে তোলেন মুক্তিযুদ্ধের আদর্শবান যোদ্ধাগণ। নিকট উদ্দেশ্য ছিল রাষ্ট্রীয় ফ্যাসিবাদ মোকাবেলা করা, সুদূর উদ্দেশ্য ছিল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের যোদ্ধা তৈরি করা। মোহন এবং আমরা সেই সদ্য-কৈশোর-পেরুনো তারুণ্যে এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পেরে বিপ্লবী হবার গর্ব অনুভব করেছি। মোহন সিরাজগঞ্জে, আর আমি ঢাকায়।
ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের পর্বটি পার হয় বীর মুক্তিযোদ্ধা ও ৭ নভেম্বরের সিপাহি বিপ্লবের নায়ক কর্নেল আবু তাহেরের ফাঁসির মঞ্চে বীরোচিত জীবনদানের মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে মোহন ও আমি দুজনই জেল খেটেছি। আমি অবশ্য সে-অর্থে জেল-বাসিন্দা ছিলাম না, সেনানিবাসের গোয়েন্দাদের অন্ধকূপে কাটিয়েছি ৩ মাস। (১৯৮৩-র ১১ জানুয়ারির পরে মোহনকেও ওখানে যেতে হয়েছিল, ১৪ ফেব্রুয়ারিতে আমাকে আবারও সেখানে যেতে হয়েছিল।)
এরপর মোহন প্রায়ই ঢাকা আসা-যাওয়া করত। ঢাকা মহানগরীতে আমরা তখন আবার নতুন করে বিপ্লবের সংগঠন গড়ে-তোলার জন্য ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ সময়ের সাথিদের সাথে যোগাযোগ রাখছি। একসঙ্গে ছাত্রলীগের কাজ করছি। আমি, বাবুল, দুলাল ভাই, বেলাল, সবুজ, বাদল, জাহাঙ্গীর (চে গু), মহীউদ্দীন শিকদার প্রমুখ। আমার ঢাকা কলেজের বন্ধু ও আমাদের সময় ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদের সহ-সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীরকে চে গু নাম দিয়েছিল খায়রুজ্জামান বাবুল। চে গুয়েভারার মতো জাহাঙ্গীর প্রায়ই অসুখে ভুগত, ওকে বাবুল ঐ নামে ডাকত। চে গু জাহাঙ্গীর এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী, ক্যান্সারের সাথে যুদ্ধ করছে, এর মাঝে সুযোগ পেলেই ঢাকা চলে আসে।
ঢাকাতে আমাদেরকে দলের কর্মীদের কেউ কেউ ‘র‌্যাডিক্যাল গ্রুপ’ বলে ডাকত। কিছুটা ব্যঙ্গ ছিল হয়ত এ ডাকার মধ্যে। তবে আমরা এতে খুব একটা অস্বস্তি বোধ করতাম না। কারণ জাসদ ও ছাত্রলীগের একশ্রেণীর নেতা তৎকালীন সামরিক শাসক জিয়াউর রহমানের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি নেয়ায় আমরা ছিলাম তাদের প্রতি চরম বিক্ষুব্ধ। মোহন আমাদের কাজের সাথে যুক্ত হলো। সে শুধু আমাদের সাথে সাহসী কাজেই যুক্ত হলো না, তাঁর তীক্ষ্মধার কবিতা, ছড়া আমাদেরকেই শুধু নয়, সাধারণ ছাত্রদেরকেও উদ্দীপ্ত করত।
সিরাজগঞ্জে পড়াশোনার পাট চুকিয়ে মোহন ঢাকা কলেজে ভর্তি হলো। ঢাকা কলেজ ছাত্র সংসদ নির্বাচনে সহ-সভাপতি পদে মোহন আমাদের প্রার্থী ছিল। তবে আমাদের ছাত্র সংগঠনের অভ্যন্তরে দলাদলি থাকায় (মুনীর-হাসিব গ্রুপ বনাম মান্না-আখতার গ্রুপ) মোহনের মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। আমি তখন কেন্দ্রীয় সংসদের সদস্য, মোহন সাহিত্য সম্পাদক। মোহনকে উভয় গ্রুপ নির্বিশেষে অপ্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী মেনে নিলেও দরকষাকষি করার জন্য অন্য গ্রুপ নানারকম সমস্যার সৃষ্টি করেছিল। পরে ‘গিভ অ্যান্ড টেক’ নীতি অনুসরণ করে মোহন-বাদশা প্যানেল ঘোষিত হয়। তবে এ অন্তর্দ্বন্দ্ব নির্বাচনের ফলাফলেও প্রভাব ফেলে। একে তো অভিযোগ ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী ছাত্রলীগ ছাত্রদের পরিচয়পত্র জাল করে ভুয়া ভোটারদেরকে দিয়ে ভোট দিয়েছে, তারপরে আমাদের মধ্যে সাংগঠনিক বিশৃঙ্খলা। ফলে মোহন সবচাইতে জনপ্রিয় প্রার্থী হবার পরেও দেখা গেল, ভোট গণনায় অল্প ভোটে হেরে গেছে সে।
এরপর মোহন এল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, বাসিন্দা হলো মুহসীন হলের। তখন মোহনের সাথে আরও ঘনিষ্ঠ হলাম। ছাত্রলীগের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটল আনুষ্ঠানিক বিভক্তির মধ্য দিয়ে। আমরা মুনীর-হাসিব নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগে ছিলাম। মোহন-ও তাই। মান্না-আখতার গ্রুপের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল তৎকালীন সামরিক শাসকদের প্রতি নমনীয় দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার। সামরিক শাসনবিরোধী ১০ দলীয় ঐক্যজোটে যোগদানের বিরোধিতা করেছিল মান্না-আখতার গ্রুপ এ-কারণ দেখিয়ে যে, পুরোনো স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ ওই জোটে আছে। আওয়ামী লীগ পুরোনো স্বৈরাচার, তাকে নিয়ে নব্য-স্বৈরাচার জিয়াউর রহমান সরকারের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে গণতন্ত্র অর্জন করা যাবে না।
১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ জেনারেল এরশাদের নেতৃত্বে বাংলাদেশ পুনরায় সামরিক শাসনে আবদ্ধ হয়। ছাত্রলীগ প্রথম থেকেই সামরিক শাসকদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। ২৪ মার্চ সকালেই ছাত্রলীগের কর্মীরা মোহন রায়হান, খায়রুজ্জামান বাবুল, মসিউর রহমান দুলাল, জাফর আহমেদ দুলাল প্রমুখের নেতৃত্বে সামরিক শাসনের বিরোধিতা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করে। ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে দুর্বার আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করতে থাকে। মোহন ছিল সে সংগঠকদের একজন। আমরা হলে হলে গোপনে বৈঠক করতাম। ঢাকা মহানগরীর বিভিন্ন অঞ্চলে, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হোস্টেলে, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হলে, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় হলে, নারায়ণগঞ্জ শহরের বিভিন্ন এলাকায় গোপনে আমরা ছাত্র বৈঠক করতাম। এসব বৈঠকের প্রত্যেকটিতে আমি ও ছাত্রলীগের তৎকালীন দফতর সম্পাদক বজলু ভাই উপস্থিত থেকে কর্মীদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছি। দীর্ঘ ৮ মাসব্যাপী প্রস্তুতির পরে ৮ নভেম্বর ১৯৮২ সামরিক শাসনকে চ্যালেঞ্জ করে প্রকাশ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিন থেকে মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। ১৯৭৫-এর ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থান স্মরণে প্রতি বছর ৭ নভেম্বর ছাত্রলীগ কর্মসূচি গ্রহণ করে। ৭ নভেম্বর ছুটি থাকায় ক্যাম্পাস বন্ধ থাকত, তাই এর পরদিন সভা-সমাবেশ করা হতো। ১৯৮২ সালে সামরিক শাসন থাকায় প্রকাশ্যে আইনানুগভাবে কোনো কর্মসূচি পালন করার সুযোগ ছিল না। তাই গোপন প্রস্তুতি নিয়ে ঝটিকা মিছিল ও লিফলেট বিতরণের সিদ্ধান্ত হয়েছিল।
তবে ৮ নভেম্বরের আগেও ঢাকার রাজপথে মিছিল হয়েছিল। আমার তারিখটা ঠিক মনে নেই, দিনটি ছিল শুক্রবার। প্যালেস্টাইন মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ও মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে একটি বিক্ষোভ মিছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মধুর ক্যান্টিন থেকে মার্কিন দূতাবাস পর্যন্ত যায়। মিছিলে ছাত্রলীগের কর্মী ছাড়াও বাংলাদেশে অধ্যয়নরত প্যালেস্টাইনি ছাত্ররা এতে অংশ নেয়। একটি স্মারকলিপি মার্কিন দূতাবাসে দেয়া হয়। একজন যুবক বয়সের মার্কিন কর্মকর্তা সেটি গ্রহণ করেন রাস্তায় নেমে এসে। ঐ মিছিলটির অন্যতম উদ্যোক্তা ছিলেন সলিমুল্লাহ খান এবং মোহন রায়হান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখার পাট চুকিয়ে সলিমুল্লাহ তখন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের ডক্টরস ক্লাবের (এখন যার নাম শহীদ ডা. মিলন হোস্টেল) ২০৩ নং কক্ষে আমার অতিথি হিসেবে থাকতেন। স্মারকলিপি দেয়া-নেয়ার ফাঁকে প্যালেস্টাইনি ছাত্ররা আদমজি কোর্টের নিচ তলায় মার্কিন দূতাবাসের নামফলক খুলে নিয়ে আসে এবং ফিরতি মিছিলে ঐ ফলকের গায়ে জুতা পরানো হয়। মিছিলটি যখন ফিরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আসছিল তখন দোয়েল চত্বরের কাছে পুলিশ হঠাৎ করেই হামলা চালায়। তারা আমাকে গ্রেফতার করার চেষ্টা করে। প্যালেস্টাইনি ছাত্ররা ঝাঁপিয়ে পড়ে পুলিশের কাছ থেকে আমাকে উদ্ধার করে। বিনিময়ে তাদেরকে পুলিশের লাঠিপেটা খাওয়া ও এক রাত হাজতবাস করতে হয়। আমার পরনের জামা ছিঁড়ে গিয়েছিল। মোহনের সহযোগিতায়, বাংলা একাডেমীর দেয়াল টপকিয়ে, ফুলার রোডে লুত্ফা হাসীন রোজীর বাসায় গিয়ে জামা বদলিয়ে মধুর ক্যান্টিনে ফিরে আসি।
৮ নভেম্বরের মিছিল ও সর্বদলীয়ভাবে পুলিশি হামলা প্রতিরোধের পর দ্রুতগতিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হয়। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে ছাত্র মিছিলের অধিকার পাওয়া যায়। এর আগে এসব নিষিদ্ধ ছিল। ক্যাম্পাসের অভ্যন্তরে বিভিন্ন কর্মসূচি পালনের পর একপর্যায়ে ১১ জানুয়ারি ১৯৮৩ ক্যাম্পাসের বাইরে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে যাওয়ার কর্মসূচি (শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি পেশ) গ্রহণ করা হয়। এ কর্মসূচি ঘোষণার পর সামরিক সরকারের পক্ষ থেকে নানা ধরনের প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য হুমকি আসা শুরু করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রোক্টর প্রমুখের মাধ্যমে সামরিক সরকার ছাত্রনেতৃবৃন্দের কাছে হুমকির বার্তাগুলো পৌঁছানোর চেষ্টা করে। নেতৃবৃন্দ আমাদেরকে সেগুলো বলতেন না। তবে বিভিন্ন মাধ্যম ঘুরে যতটুকু আমাদের কাছে পৌঁছেছিল তাতেই আমরা দারুণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছিলাম। ১০ জানুয়ারি সরকার ছাত্রদেরকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে এক প্রেসনোট জারি করে। সেটি বেতার ও টেলিভিশনে মুহুর্মুহু প্রচার হতে থাকে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের কর্মীরা এতে ভয় তো পেলই না, উল্টো পণ করেছিলাম যে, সামরিক জান্তার বেরিকেড আমরা ভাঙবই।
১০ জানুয়ারি রাতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ সবদিক বিবেচনা করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি পেশের কর্মসূচি একমাস পিছিয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি নির্ধারণ করেন। তবে ১১ জানুয়ারির বটতলার সমাবেশ বহাল রেখে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার পর্যন্ত মিছিল করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। ছাত্র আন্দোলনের সাথে তাল রেখে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলসমূহের প্রস্তুতি না-থাকাটাই প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হয় (যদিও ১৪ ফেব্রুয়ারিতেও দেখা গেছে যে, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ প্রস্তুত নন)। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের রাতের বেলার এ সিদ্ধান্ত প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের মতো মাঝারি পর্যায়ের নেতৃত্বের কাছে পৌঁছে যায়। আমাদের মাধ্যমে সে-খবর পৌঁছে যায় কর্মীদের কাছে। কর্মীরা বজ্র-শপথ গ্রহণ করে সামরিক আইনকে চ্যালেঞ্জ করার, এতে নেতৃবৃন্দ সাথে থাকুক বা নাই থাকুক।
কর্মীদের এ মনোভাব সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মাঝে জানানোর উদ্দেশ্যে রাতেই মিছিল বের করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সে মিছিলে আমি, খায়রুজ্জামান বাবুল, মসিউর রহমান দুলাল, শফী আহমেদ, লাভলুসহ মাঝারি পর্যায়ের আরো কয়েকজন নেতাসহ প্রায় অর্ধশতাধিক কর্মী ছিল। মিছিলটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) হলসমূহ, মেডিক্যাল হোস্টেল ঘুরে জগন্নাথ হলে প্রবেশ করে। বুয়েট ও মেডিক্যাল ক্যাম্পাসে মিছিল করার উদ্দেশ্য ছিল ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃত্বের কানে আমাদের বার্তা পৌঁছে দেয়া। সন্ধ্যার পরে অধিকাংশ বৈঠক ঐ দু-জায়গাতেই অনুষ্ঠিত হতো। কিন্তু জগন্নাথ হলে পৌঁছে আমরা খবর পাই যে, ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাসভবনে বৈঠক করছেন। তখন আমরা জগন্নাথ হল থেকে মিছিল নিয়ে সরাসরি ভিসির বাংলোতে ঢুকলাম। ইতোপূর্বে মোহন রায়হানের নেতৃত্বে মহসীন হল থেকে ছাত্রলীগের একটি মিছিল এসে ভিসি’র বাড়ি ঘেরাও করে রেখেছিল যাতে নেতারা এরশাদের সঙ্গে বৈঠক করতে যেতে না পারে। আমরা সেই বিক্ষোভের সঙ্গে যুক্ত হলাম। আমাদের স্লোগান ছিল : ’আপস না সংগ্রাম : সংগ্রাম সংগ্রাম’, ’প্রেসনোটে লাথি মারো : আন্দোলনে ঝাঁপিয়ে পড়ো’, ’সামরিক আইনে লাথি মারো : শিক্ষা ভবন ঘেরাও করো’, ’গণবিরোধী শিক্ষানীতি : জ্বালিয়ে দাও পুড়িয়ে দাও’, ‘এরশাদের ঘোষণা : মানি না মানি না’ ইত্যাদি। এক পর্যায়ে দু-একজন ছাত্রনেতা বেরিয়ে এসে আমাদের উদ্দেশে কিছু বলতে চেয়েছিলেন বোধ হয়, তবে মিছিলের স্লোগান ও জঙ্গিরূপ দেখে তারা সে-পরিকল্পনা ত্যাগ করেন। মিছিলটি এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাবভন এলাকার ছেলেদের সবক’টি হল প্রদক্ষিণ করে। প্রথমে কেবল ছাত্রলীগের কর্মীরা মিছিল করলেও ক্রমান্বয়ে বাকশাল ছাত্রলীগ, ছাত্রমৈত্রী, ছাত্রঐক্য ফোরাম, আওয়ামী ছাত্রলীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের কর্মীগণ মিছিলে যোগদান করে।
পরদিন সকাল ৯টার মধ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কলাবভন হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর বিক্ষোভ-স্লোগানে সরগরম হয়ে উঠল। আমরা কয়েকটি ছাত্র সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক একমত হলাম যে, নেতৃবৃন্দ শিক্ষা ভবন অভিমুখে মিছিল নিয়ে যেতে না চাইলে আমরা সাংগঠনিক সম্পাদকবৃন্দ ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে যাব। আমি, মুকুল বোস, জাহাঙ্গীর কবির নানক একসাথে বটতলায় ও অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে ঘুরে-ঘুরে কর্মীদের সাথে কুশল বিনিময় করছিলাম। কর্মীরা ইঙ্গিতটা ঠিকই ধরতে পারল। এ সময় মোহন ছাত্রলীগের জঙ্গী কর্মীদের নিয়ে চারদিকে ঘুরে ঘুরে, ‘দালালী না রাজপথ, রাজপথ, রাজপথ’ স্লোগানে প্রকম্পিত করে তুলছিল বিশ্ববিদ্যালয়।
আমাদের সংগঠনের সভাপতি জনাব মুনীরউদ্দিন আহমেদকে সভাপতি করে বিশাল ছাত্রসভা শুরু হলো। আমাদের সংগঠনের কর্মীরা একটু হকচকিয়ে গেল। কারণ নেতৃবৃন্দের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ডাক আমাদেরকেই দিতে হবে। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃবৃন্দ ভেবেছিলেন যে, আমাদের সংগঠনের কর্মীরা যেহেতু তুলনামূলকভাবে একটু বেশি বিদ্রোহী মনোভাবাপন্ন, তাই আমাদের সংগঠনের জনপ্রিয় সভাপতি তা সামাল দিতে পারবেন। কিন্তু ইতোমধ্যে বিদ্রোহে সব সংগঠনের (ছাত্র ইউনিয়নের কর্মীরা ছাড়া) ছাত্রছাত্রীদের অদৃশ্য একাত্মতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে মুনীর ভাই কতটুকু সামাল দিতে পারবেন? মুনীর ভাই সভাপতির দায়িত্ব নিয়ে মাইক ধরলেন, খুবই জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুরু করলেন। কিন্তু যখন তিনি ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বললেন মিছিল শহীদ মিনারে যাবে, তখন সবকিছু তাঁর আয়ত্তের বাইরে চলে গেল। মোহন এবং আমাদের সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানাল, না আমরা এ সিদ্ধান্ত মানি না। আমাদেরই সংগঠনের সহ-দফতর সম্পাদক ইকবাল (তখন জসীমউদ্দীন হলে থাকত) সভাপতির মাইকটি খুলে মাটিতে নামিয়ে দিল এবং চিৎকার করে বলতে লাগল, ‘মুনীর ভাই আপনার সিদ্ধান্ত মানি না, মিছিল শিক্ষা ভবনে যাবে।’ হাজার হাজার ছাত্র উঠে দাঁড়িয়ে গেল। সবাই বলতে লাগল ‘চলো চলো শিক্ষা ভবন’। কে দেবে নেতৃত্ব? আমরা বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের মাঝারি সারির নেতারা প্রকাশ্য বিদ্রোহের দায় নিতে চাইছি না, আবার ছাত্ররাও সম্ভাব্য পুলিশি হামলার মুখে নিজেরা এলোমেলোভাবে যেতে চাচ্ছে না। কারও কাছ থেকে প্রকাশ্য ঘোষণা চাচ্ছে অর্থাৎ নেতৃত্ব দেখতে চাচ্ছে। জমায়েতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরাও এসেছে। তারাও সামরিক সরকারের ব্যারিকেড ভঙ্গ করবে। জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের নেতৃত্বের একটা অংশ সামরিক সরকারের পক্ষে চলে যাওয়ায় তাদের নেতৃত্ব অগোছালো এবং আরও কেউ কেউ সামরিক সরকারের সাথে যোগাযোগ রাখছে। এজন্যে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদে তখন তাদের নেয়া হয়নি। তবে তাদের মাঝারি সারির নেতা ও সাধারণ কর্মীরা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের সভা-মিছিলে আসত।
জটলার মধ্যে আমাদের সংগঠনের দফতর সম্পাদক বজলু ভাই একটা উঁচু বেদির ওপর দাঁড়িয়ে একবার তার ক্ষীণ গলায় চিৎকার করে সবাইকে শিক্ষা ভবনের দিকে রওনা হবার আহ্বান জানালেন। যারা তাকে চিনত না তারা তাকে বলল : আপনি কে, আপনার কথা শুনব না, আপনি নামেন। একেবারে বিশৃঙ্খল অবস্থা। এ সময় মোহন রায়হান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পতাকা উত্তোলনবেদীর উপরে ওঠে ছাত্রদের উদ্দেশে ঐক্যবদ্ধভাবে শিক্ষা ভবন ঘেরাও কর্মসূচি সফল করার আহ্বান জানায়। চারদিকে স্লোগান ওঠে-মোহন তুমি এগিয়ে যাও, আমরা আছি তোমার সাথে।
বাঁধভাঙা জোয়ারের মতো হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী রওনা হলো। টিএসসি পার হয়ে দোয়েল-চত্বর হয়ে শিক্ষা ভবন অভিমুখে চলল মিছিল। মোহনের সাথে আমি ও সলিমুল্লাহ খান। প্রথমে আমরা মিছিলের সামনে থাকলেও মিছিলের জোয়ারের ধাক্কায় খানিকটা পিছিয়ে পড়েছি। মিছিলের প্রথমভাগ পুলিশি ব্যারিকেডের সামনে গিয়েই ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা করছিল। আমরা কিছুক্ষণ পর সেখানে পৌঁছেই সংঘর্ষ থামিয়ে দিই, আর পুলিশও তখন ইট-পাটকেল খেয়েও ছাত্রছাত্রীদের ওপর লাঠিচার্জ বা ধাওয়া করেনি। সেখানে আবদুল গনি রোডের সিমেন্টের নাম-ফলকের ওপর দাঁড়িয়ে মোহন আবারও জ্বালাময়ী ভাষণ দিয়ে সবাইকে বৃহত্তর আন্দোলনের প্রস্তুতি নেবার জন্যে সেখানকার কর্মসূচি শেষ করে শান্তিপূর্ণভাবে কলাভবনে ফিরে যাবার আহ্বান জানায়। সমবেত ছাত্ররা মোহনকে কাঁধে তুলে মিছিল করে কলাভবনে ফিরে আসে এবং স্লোগান দিয়ে বলে যে, ‘আজ থেকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা মোহন ভাই, নেতৃবৃন্দ বাতিল হয়ে গেছে’ ইত্যাদি। কলাবভন চত্বরে বিদ্রোহী ছাত্রদের সাথে আমাদেরকে কয়েক দফা বৈঠক করে তাদেরকে শান্ত করতে হয়েছে, এবং কয়েকদিন পরে অবশেষে তাদেরকে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের ১৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির কাজে সম্পৃক্ত করি। ১৪ ফেব্রুয়ারিতে শিক্ষা ভবন অভিমুখী মিছিলে আরও অনেক ছাত্রছাত্রী শামিল হয়। ১১ জানুয়ারিতে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দের ওপর সাধারণ কর্মী ও ছাত্রছাত্রীদের যে ক্ষোভ ছিল তার কোনো চিহ্নই এক সপ্তাহ পরে আর ছিল না। এর মাঝে জানুয়ারির মধ্যভাগে মোহন রায়হানকে সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের বিশেষ টিম ধরে নিয়ে যায়। মোহন এবং সলিমুল্লাহ খান ঐ সময় জাসদের প্রতিষ্ঠাতা জনাব সিরাজুল আলম খানের নিউ ইস্কাটনস্থ বাসা থেকে ফিরছিলেন। বড় রাস্তায় আসতেই মোহনকে ধরা হয়। সলিমুল্লাহ খান পালিয়ে এসে মুহসীন হলে সবাইকে মোহনের ধরা পড়ার খবর দেন। মোহনকে জঘন্য শারীরিক ও মানসিক অত্যাচার করে সামরিক গোয়েন্দাবাহিনী। ১৪ ফেব্রুয়ারির কিছুদিন আগে মোহন ছাড়া পায়। অত্যাচারিত অসুস্থ শরীরে মিছিলে না আসার জন্যে তাকে অনুরোধ করা হলেও মোহন ১৪ ফেব্রুয়ারি মিছিলে এসেছিল।
১১ জানুয়ারি শুধু মোহনের রাজনৈতিক জীবনের মোড় পরিবর্তন নয়, এটা স্বৈরাচার-বিরোধী ছাত্র আন্দোলনের জন্যও মোড় পরিবর্তনের দিন। এদিনের পর নেতা-কর্মী কারও মধ্যে সামরিক জান্তাকে চ্যালেঞ্জ করার ব্যাপারে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। ১১ জানুয়ারির মধ্য দিয়ে সামরিক শাসন-বিরোধী লড়াইয়ে এক নতুন প্রজন্মের লড়াকু সৈনিকদের আবির্ভাব ঘটে।
১৪ ফেব্রুয়ারি ১৯৮৩। এরশাদের সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলনের এক রক্তাক্ত অথচ গৌরবময় দিন। ১৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র-অভ্যুত্থানের মহড়া বা ড্রেস রিহার্সাল হয়ে গিয়েছিল ১১ জানুয়ারি। ১১ জানুয়ারির স্বতঃস্ফূর্ততা ১৪ ফেব্রুয়ারিতে পরিপক্ব হয়। যে নেতৃবৃন্দ এক মাস আগে লড়াকু ছাত্রছাত্রীদের কাছে ছিলেন সমালোচিত ও নিন্দিত, তারাই ছিলেন ১৪ ফেব্রুয়ারির ছাত্র-অভ্যুত্থানের বীর নায়ক। এটা একটা আশ্চর্য ব্যাপার! নেতৃত্ব যদি সত্যিই আপসকামী হতেন তাহলে তারা ১৪ ফেব্রুয়ারির আগেও আবার তালবাহানা করতেন। এবার নেতৃত্বের সামনে কোনো দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ছিল না। ১১ জানুয়ারিতে সম্ভবত রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরামর্শে ছাত্রনেতৃবৃন্দ শিক্ষা ভবন অভিমুখে মিছিলের কর্মসূচি স্থগিত করেছিলেন।
১৪ ফেব্রুয়ারির আগে সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বের পক্ষে পুনরায় কর্মসূচি স্থগিত রাখার পরামর্শ দেবার প্রকাশ্য যুক্তি ছিল না। তবে তাদের একাংশ যে ১৪ ফেব্রুয়ারির কর্মসূচির পক্ষে ছিল না, তা বোঝা যায় ১৪-১৫ ফেব্রুয়ারির ছাত্র-হত্যার পরে তাদের প্রতিক্রিয়ায়, যার কুপ্রভাব ছাত্র আন্দোলনেও পড়েছিল। ১৪ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে আমি পুলিশ-বিডিআর-সেনাবাহিনীর হাতে গ্রেফতার হই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুহসীন হল থেকে। ঐদিন বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অপরাজেয় বাংলার পাদদেশে জমায়েত হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর ওপর পুলিশ-বিডিআর-সেনাবাহিনী বর্বর হামলা চালায়। নির্মমভাবে পিটিয়ে ট্রাকে তুলতে থাকে শত শত ছাত্রছাত্রীকে। আমি শহীদ জয়নালের লাশের সাথে মুহসীন হলে আশ্রয় নেই। ছাত্র ইউনিয়নের তৎকালীন সভাপতি খন্দকার ফারুক ভাই দীর্ঘদেহী মানুষ। তিনি জয়নালের লাশের খাটিয়া কাঁধে নেয়ায় আমার মতো মাঝারি উচ্চতার মানুষের পক্ষে তার সাথে তাল মিলিয়ে খাটিয়ায় কাঁধ লাগানো খুবই কষ্টকর ছিল বৈকি! রেজিস্ট্রার ভবনের দেয়াল টপকে লাশসহ আমরা মুহসীন হলে ঢুকে পড়েছিলাম। পুলিশ-বিডিআর-সেনাবাহিনী জয়নালের লাশ খুঁজে পায় কলা-ভবনের সমস্ত হল খুঁজতে খুঁজতে। বিকেলে লাশ মুহসীন হলে ঢোকানো হয়েছিল, আর পুলিশ-বিডিআর-সেনাবাহিনী তা খুঁজে পায় মধ্যরাতেরও পরে। কোনো ছাত্র-শিক্ষক-কর্মচারী এ তথ্য বাহিনীগুলোকে দেয়নি। এমনি সংগ্রামী ঐক্য ছিল সবার মাঝে! আমাকে গ্রেফতার করার পর পুলিশ-বিডিআর-সেনাবাহিনী যে অত্যাচার চালায় তার ছিল খুবই পৈশাচিক। এ কারণে গুজব ওঠে যে আমি বন্দি অবস্থায় মারা গেছি।
জয়নাল-মোজাম্মেল কাঞ্চন-মোজাম্মেল আইউব-দীপালি সাহা হত্যাকাণ্ড, আমিসহ হাজার হাজার ছাত্র-ছাত্রী গ্রেফতার, বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিয়ে এরশাদের সামরিক জান্তা ছাত্র আন্দোলনকে ব্যর্থ করে দিতে চেষ্টা করে। একে উপেক্ষা করে আমাদের ছাত্রসংগঠন মুনীর-হাসিবের নেতৃত্বাধীন ছাত্রলীগ সারাদেশে আন্দোলনের চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার কাজ অব্যাহত রাখে। সে-সময় ছাত্রলীগ-নেতাদের মধ্যে মোহন রায়হানকে সবচেয়ে বেশি জেলা সফর করতে হয়েছিল, কারণ মোহনের কথা শুনতে সবাই উদ্গ্রীব ছিল। শুধু ছাত্রলীগের কর্মী সমর্থকরাই নয়, অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের নেতা-কর্মী এমনকি সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা ভিড় করে মোহনের বক্তৃতা শুনত।
২৬ মার্চ ১৯৮৩ স্বাধীনতা দিবসের আগেই আমাকে মুক্তি দেয়া হয়। সামরিক গোয়েন্দা দফতরের বন্দিশালা থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের অফিসে এনে খাতায় স্বাক্ষর করিয়ে আমাকে মুক্তি দেয়া হয়। আমার পরনে ছিল লুঙ্গী, কারণ যখন আমি মুহসীন হলে গ্রেফতার হই তখন লুঙ্গী-গেঞ্জি পরে ঘুমুচ্ছিলাম। সেনা হেফাজতে কাউকে আমার সাথে দেখা করতে না দেয়ায় অতিরিক্ত কোনো পোশাক পাইনি। তাই মুক্তি পাবার আগ পর্যন্ত লুঙ্গী-গেঞ্জি পরেই ছিলাম। জেলগেট থেকে বেরিয়েই দেখলাম জাহাঙ্গীর কবির নানক ভাই, আওয়ামী ছাত্রলীগের তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক। জিজ্ঞেস করলেন, পয়সা-কড়ি আছে কিছু? ’না’ বোধক মাথা নাড়লে আমাকে কিছু টাকা দিলেন। আমি একটা রিকশা নিয়ে কাছেই বখশীবাজারস্থ মেডিক্যাল হোস্টেলে পৌঁছলাম।
আমি মুক্তি পাবার পর আমাদের সাহসী তৎপরতার ’অপারেশন টিম’ চাঙ্গা করলাম। মোহন ছিল এ ’অপারেশন টিম’-এর প্রধান আকর্ষণ। হরতাল সফল করার জন্যে বিশেষ বিশেষ অ্যাকশন, সামরিক জান্তার দালালদের প্রতিরোধ সব কাজেই মোহন ছিল অপরিহার্য নায়ক।
এরশাদের দালাল একশ্রেণীর কবি নামধারীদের আয়োজিত এশীয় কবিতা উৎসবের প্রতিবাদে মোহনের উদ্যোগে আয়োজিত হয় জাতীয় কবিতা উৎসব। সে কবিতা উৎসব আজও চলছে নিরবচ্ছিন্নভাবে। কবিতা উৎসবের মধ্য দিয়ে মোহন স্বৈরাচার প্রতিরোধের এক নতুন ফ্রন্ট খোলে। অসংখ্য তরুণ প্রতিবাদী কবির জন্ম দিয়েছে এ কবিতা উৎসব। স্বৈরাচার-বিরোধী প্রতিবাদের ধারায় শামিল করেছে কবি শামসুর রাহমানকে এ কবিতা উৎসব, ব্যাংকার লুৎফর রহমান সরকারকে সাহস যুগিয়েছে এ কবিতা উৎসব, এরশাদকে ’বিশ্ব বেহায়া’ অভিধায় চিত্রিত করেছে এ উৎসব পটুয়া কামরুল হাসানের হাত ধরে।
প্রতিবাদী সাহিত্য সাংস্কৃতিক জগতের সাথে নিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে প্রয়োজনের তাগিদেই মোহন প্রতিষ্ঠা করল বিকল্প প্রিন্টিং প্রেস। পুরোনো ঢাকার আলুবাজারে বিকল্প প্রেসে স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের অনেক গোপন মিটিং করেছি, পুলিশের নজর এড়িয়ে সেখানে থেকেছিও মাঝে মাঝে। কিছুদিন একটা সাপ্তাহিক পত্রিকাও বের করেছে মোহন, আমিও কয়েক সংখ্যায় লেখা দিয়েছি।
সক্রিয় রাজনীতি থেকে মোহনের ধীরে ধীরে সরে গিয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতি জগতে পুরোপুরি মনোযোগ দেয়াটা স্বাভাবিক ছিল না। মোহনের মতো সাহসী অথচ মেধাবী তরুণের সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরে যাওয়ার এ গতিধারা যেন-বা স্বৈরাচার-বিরোধী আন্দোলনের গতিধারার সাথে সম্পর্কিত ছিল। সামরিক শাসন-বিরোধী আন্দোলনের প্রথম দিকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক শক্তির যে প্রাধান্য ছিল, শেষ দিকে তা ক্ষীয়মাণ হয়ে যায়। এর জন্য দায়ী কে তা এক বিস্তারিত আলোচনার বিষয়। তবে মোহনের মতো তেজোদীপ্ত মেধাবী নেতা-কর্মীদের জায়গা দখল করতে থাকে ভাড়াটে রোবট সন্ত্রাসীরা। বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন বিশেষ করে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াকু সংগঠনগুলোতে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীর এসব চর ঢুকে পড়ে। তারা আন্দোলনের মাঠে জঙ্গিত্ব দেখানোর চাইতে এক সংগঠনের সাথে আরেক সংগঠনের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ বাধানোতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছে। এর পাশাপাশি স্বৈরাচার-বিরোধী গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সবচাইতে আপসহীন সংগঠন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)-কে টুকরো টুকরো করার জন্য স্বৈরতন্ত্রের চেষ্টা সফল হয়। জাসদের একশ্রেণীর লোভী ও দুর্নীতিবাজ নেতাদেরকে স্বৈরশাসক গোষ্ঠী তাদের পক্ষে নিতে সমর্থ হয়। অন্যান্য প্রগতিশীল নেতারা মেহনতী মানুষের মাঝে সংগঠন গড়ে তোলার চাইতে গণমাধ্যমের প্রচারণা ও বুর্জোয়া দলগুলোকে পরামর্শ দেয়াটাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। প্রগতিশীল ছাত্র নেতৃত্বও এর ব্যতিক্রম ছিল না। আমি নিজেও এ আত্মসমালোচনার ঊর্ধ্বে ছিলাম না। আরও একটি কারণ ছিল, আন্তর্জাতিক পরিসরে বৃহত্তম সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েত ইউনিয়ন ও পূর্ব ইউরোপের সমাজতান্ত্রিক দেশসমূহে পুঁজিবাদের প্রত্যাবর্তন ঘটে এ সময়েই। আদর্শবাদী রাজনীতির জায়গা দখল করে নিচ্ছিল সুবিধাবাদী ও ভোগবাদী রাজনীতি। একদা বিপ্লবী রাজনীতিক এমন অনেকেই হঠাৎ বিপুল বিত্তের মালিক বনে যান, অবলীলাক্রমে যোগ দেন বুর্জোয়া রাজনীতির শিবিরে। কিন্তু ভারতের বাম রাজনীতি আরও ঐক্যবদ্ধ হয় সোভিয়েত ইউনিয়নের এ বিপর্যয়ের পরে। বাংলাদেশের বাম মহলের মতো এত ব্যাপক দলত্যাগ ও আদর্শত্যাগ ভারতে হয়নি বলেই আমার ধারণা।
তবুও মোহনের মতো ধূপ হয়ে জ্বলা বিপ্লবী মানুষেরা আদর্শ ত্যাগ করেনি। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে আদর্শ হয়ে থেকে আগামী বিপ্লবের জন্যে জমি তৈরি করার কাজ চালিয়ে যাওয়াটাই হোক মোহনদের ব্রত। নিপাত যাক প্রলোভন, ভীতি আর আত্মপ্রতিষ্ঠার মোহ।
লেখক : চিকিৎসক, সাবেক ডাকসু জিএস এবং উপদেষ্টা- আইইডিসিআর।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.