হাসপাতালের বিছানায় মৃত্যুর সঙ্গে টানা প্রায় ৪০ দিন দীর্ঘ লড়াইয়ের পর অবশেষে হার মানলেন। শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মধ্য দিয়ে মহাজীবনের পথে যাত্রা করলেন ফেলুদা’খ্যাত বাংলা চলচ্চিত্রের কিংবদন্তি অভিনেতা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়।
রবিবার (১৫ নভেম্বর) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে কলকাতার বেলভিউ হাসপাতালে লাইফ সাপোর্টে থাকাবস্থায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৮৬ বছর। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, কোভিড-১৯ আক্রান্ত হওয়ার কারণেই সব রকম চিকিৎসার উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।
অভিনয় দিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও একাধারে অভিনেতা, আবৃত্তিকার ও কবি সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের কবিতাচর্চা, রবীন্দ্রপাঠ, সম্পাদনা, নাট্যসংগঠন ছিল তার বৈচিত্র্যের নানা দিক। সত্যজিত রায়ের ‘অপু’ অভিনেতা সৌমিত্রের সময় আজ চিরতরে থেমে গেলো।
হঠাৎ গেল ১ অক্টোবর বাড়িতে থাকাকালীন জ্বরে আক্রান্ত হন সৌমিত্র। তবে করোনা ভাইরাসের কোনও উপসর্গ ছিল না। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে নমুনা পরীক্ষা করা হলে ৫ অক্টোবর তাঁর কোভিড-১৯ পজিটিভ রিপোর্ট আসে। ৬ অক্টোবর তাকে ভর্তি করা হয় কলকাতার বেলভিউ নার্সিং হোমে। সেখানে সবশেষ ১৪ অক্টোবর তার করোনার নমুনা পরীক্ষায় ফলাফল নেগেটিভ আসে। এরপরই ধীরে ধীরে সুস্থ হতে থাকেন এই অভিনেতা। গত ৪০ দিনেরও বেশি সময় ধরে সেখানেই তার চিকিৎসা চলছিল।
এরইমধ্যে গেল ২৪ অক্টোবর রাত থেকে তার শারীরিক অবস্থার বিশেষ অবনতি হতে থাকে। ধীরে ধীরে তিনি চেতনা হারাতে শুরু করেন। চিকিৎসকরা গেল বৃহস্পতিবার (১২ নভেম্বর) তাকে প্লাজমা থেরাপি দেন। আগের দিন বুধবার তার কিডনির ডায়ালাইসিস করা হয়। দুদিন পর গেল শুক্রবার বিকেলে হঠাৎ তার হৃদস্পন্দন বেড়ে যায়। রাতে চেতনা স্তর ৫-এ নেমে আসে। এ অবস্থায় আশা হারাতে থাকেন সৌমিত্রের চিকিৎসায় গঠিত ১৬ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড।
গতকাল শনিবার ফুসফুসে আরও বেশি করে অক্সিজেন সরবরাহের জন্য অক্সিজেনের মাত্রা বাড়ানো হয়েছিল। তখনই চিকিৎসা দলের প্রধান ক্রিটিক্যাল বিশেষজ্ঞ অরিন্দম কর বলেছিলেন, ‘চেতনা স্তর ৩-এ নেমে গেলে চিকিৎসাশাস্ত্রে ‘ব্রেন ডেথ’ হিসেবে বিবেচনা কর হয়। আপাতত আমাদের বলার কিছু নেই। তার সুস্থতার জন্য সবাইকে প্রার্থনা করতে হবে।’
শনিবার রাত থেকে অবস্থার আরও অবনতি হতে শুরু করে। রবিবার সকালে তাকে নেয়া হয় শতভাগ ভেন্টিলেশন সাপোর্টে। রক্তচাপ, হার্টবিট, হার্ট রেট স্বাভাবিক করার জন্য যা যা ওষুধ দরকার , সবই দেয়া হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কিছুতেই কিছু হলো না। পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে মহাপৃথিবীর পথে যাত্রা শুরু করলেন গুণী এই অভিনেতা।
১৯৩৫ সালের ১৯ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলার কৃষ্ণনগরে সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম। কলকাতার আমহার্স্ট স্ট্রিট সিটি কলেজে সাহিত্য নিয়ে পড়ালেখা করা সৌমিত্র ১৯৫৯ সালে প্রথম সত্যজিৎ রায়ের পরিচালনায় ‘অপুর সংসার’ ছবিতে অভিনয় করেন।
সত্যজিত রায়ের ৩৪টি চলচ্চিত্রের মধ্যে ১৪টিতেই অভিনয় করেছেন সৌমিত্র। সিনেমা ছাড়াও নাটক ও যাত্রায় অভিনয় এবং লেখালেখি ও আবৃত্তিতেও খ্যাতি রয়েছে গুণী এই শিল্পীর।

