দীনতা হতে অক্ষয় ধনে ,
সংশয় হতে সত্য সদনে ,
জড়তা হতে নবীন জীবনে ,
নূতন জীবন দাও হে ।
প্রকৃতির নিয়মে গতিশীলতা ও পরিবর্তনের ফলেই মানুষের মনোজগতে ঘটে চলেছে ভাব থেকে ভাবান্তর, বিচার বুদ্ধির পরিবর্তন ও বিকাশ । বুদ্ধিবৃত্তির বিভিন্ন স্তরে মানুষ তৈরি করেছে বিভিন্ন বিধিবিধান জীবন ব্যবস্থার অনুকূলে, যা মানব সমাজের শৃঙ্খলাবোধ সৃষ্টি করতে সহায়ক হয়েছিল । মানবজাতির চিন্তা চেতনার বিকাশের এই স্তরেই তৈরি করা হয়েছিল ধর্ম বা Religion । সুশৃঙ্খল জীবন যাত্রার প্রয়োজনে মানুষ যে সকল বিধিবিধান তৈরি করেছে , সেটাই ধর্মের অন্তঃসার ।
প্রশ্ন দাঁড়ায়, বর্তমানে ধর্ম মানবজাতির কতটুকু কল্যাণ সাধন করতে সক্ষম হয়েছে ? ধর্ম মানবজাতির ঐক্য বিনষ্ট করে পারষ্পরিক শত্রুতে পরিণত করেছে । বিভেদ , বিদ্বেষ, হিংস্রতা এবং রক্তপাত ঘটিয়ে মানবজাতিকে সৃষ্টি জগতের সর্ব নিকৃষ্ট প্রাণীতে রূপান্তরিত করেছে । পৃথিবীতে আজ পর্যন্ত যত অনাচার অনিষ্ট সংঘটিত হয়েছে , তার অনেকগুলির কারণ ধর্ম । ধর্ম আছে বলেই ধর্মীয় বিদ্বেষ ও ঘৃণা মানুষের অন্তরকে কলুষিত করেছে ।
সম্প্রতি সভ্য ইউরোপের দেশ ফ্রান্সে সংঘটিত কলঙ্কজনক ঘটনা প্রবাহের কারণও সেই অভিশপ্ত ধর্ম । যে ব্যক্তি মুহাম্মদের ব্যাঙ্গ চিত্র বা কার্টুন এঁকেছে এবং যে শিক্ষক ছাত্রদের ক্লাসে সেই কার্টুন নিয়ে ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে বর্ণনা করেছে , তারা উভয়ই কোন না কোন ধর্মের ধার্মিক । তারা ধার্মিক বলেই নিজের ধর্মকে উৎকৃষ্ট প্রমাণ করতে গিয়ে পরধর্মের কুৎসা রটনা করেছে । বিশেষ ধর্মের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ বশতঃই ঐ অপকর্মটি তারা করেছে । কোন ধর্মহীন ব্যক্তি বা নিরীশ্বরবাদী যেহেতু কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি বিশ্বাসী হয় না, সেহেতু তিনি পরধর্মের প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষও পোষণ করতে পারেন না । কোন বিশেষ ধর্মের প্রতি তাঁর কোন অন্ধ আবেগ থাকে না বলেই পরধর্মের প্রতি বিরাগ সৃষ্টি হওয়ারও কারণ থাকে না। ধার্মিকদের একপক্ষ অপর পক্ষের ধার্মিকদের প্রতি হিংসা বিদ্বেষই প্রতিপক্ষের ধার্মিকগণকে হিংস্র ও বিদ্বেষী হতে উদ্বুদ্ধ করে থাকে । তেমনটিই ঘটেছে সুসভ্য দেশ ফ্রান্সে । যে ব্যক্তি প্রতিপক্ষ শিক্ষকের গলায় ছুরি বসিয়ে হত্যা করেছে, সে ব্যক্তিও ধার্মিক বলেই হিংস্রতায় উন্মত্ত হয়ে গলা কেটে হত্যা করতে পেরেছে, যে অপরাধ কোন ধর্মহীন ব্যক্তি আদৌ করতে পারেন না । ধার্মিক অপরাধীর ধর্মীয় অশুভ চেতনাই তাকে প্রতিপক্ষ ধার্মিক ” শত্রু ” কে হত্যা করতে উদ্বুদ্ধ করেছে ।
সম্প্রতি বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের পূজনীয় দেবদেবীর মূর্তি ভেঙ্গে ফেলার মত অঘটন ঘটেছে । দেবদেবীর মূর্তি ভাঙ্গার মত জঘন্য অপরাধ কে করেছে ? কোন ধর্মহীন নিরীশ্বরবাদী কি ঐ জঘন্য অপরাধ করেছে ? কখনোই না। মূর্তি ভাঙ্গার অপরাধটা যে করেছে , সে ব্যক্তিও ধার্মিক । সে তার নিজের ধর্মকে উৎকৃষ্ট প্রমাণ করতেই পরধর্মের প্রতি হিংস্র ও বিদ্বেষী হয়েই মূর্তি ভাঙ্গার অপরাধ করেছে । এইরূপ উদাহরণ বিশ্বের অনেক দেশেই পাওয়া যাবে ।
ভারতে মুসলমানদের বাবরি মসজিদ কারা ভেঙ্গে ধূলায় মিশিয়ে দিয়েছে ? কোন ধর্মহীন বা নিরীশ্বরবাদী জনগোষ্ঠী কি ঐ অপকর্মটি করেছে ? না , কখনোই তাঁরা ঐ অপকর্মটি করেননি । গো-মাংস খাওয়ার অপরাধে ( ? ) যারা মানুষ হত্যা করেছে, ” জয় শ্রীরাম ” শ্লোগান না দেয়ার কারণে মানুষ হত্যা করেছে, দলিত নারীকে ধর্ষণ এবং হত্যা করে যারা স্বধর্মের ধ্বজা উড্ডীন করেছে, তারা কারা ? তারাও ধার্মিক । তারাও ধর্মে বিশ্বাসী । ধর্মীয় অশুভ চেতনা থেকেই একটার পর একটা অপরাধ করেই যাচ্ছে ।
তাই , এই লেখার শুরুতে বলেছিলাম, ধর্ম মানবজাতির কোন কল্যাণ করতে সক্ষম না হলেও, অকল্যাণের জন্য দায়ী ষোল আনাই । ধর্মের অশুভ চেতনাই যত অনিষ্টের মূল কারণ ।

লেখক – বজলার রহমান খান

