চলতি বছরের প্রথম ৯ মাসে ধর্ষিত হয়েছেন ৯৭৫ জন। এর মধ্যে দলবদ্ধ ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ২০৮ জন। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৪৩ জনকে আর ধর্ষণের পর আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ১২ জন। একটা বিষয় নিশ্চয়ই সবাই লক্ষ করেছেন ধর্ষিতদের বয়স, পেশা, সামাজিক অবস্থান, পোশাক কোনোটাই তাকে সুরক্ষা দিতে পারছে না। কারণ বয়সের বিবেচনায় ৪ বছর থেকে ৬৫ বছর পর্যন্ত সব বয়সের, সব ধর্মের, সমতল বা পাহাড়ের, স্বাভাবিক বা প্রতিবন্ধী, শিক্ষিত বা নিরক্ষর, কর্মজীবী বা গৃহবধূ, চুল খোলা বা হিজাব পরা, শাড়ি পড়া বা বোরকা পরা কেউই বাদ যাচ্ছেন না। তারা ঘরে থাকুন বা কর্মক্ষেত্রে থাকুন, যানবাহনে বা রাস্তায়, থানা হেফাজতে কিংবা নিজের ঘরে, মসজিদ, মাদ্রাসায়, গির্জায় বা মন্দিরে, বেড়াতে গিয়ে বা বাজারে গিয়ে; এমন কোনো জায়গা কি আছে যেখানে তারা লাঞ্ছিত ও ধর্ষিত হননি? তাহলে তো বিষয়টা এমনই দাঁড়ায় যে স্বাধীন দেশেও মেয়েরা স্বাধীনভাবে পথ চলতে পারেন না। রাতে বা দিনে, সামাজিক উৎসবে বা ভোটের উৎসবে কোনো সময়েই নয়। এমনকি স্বামী, ভাই, সন্তান, বাবা সঙ্গে থাকলেও মেয়েরা রেহাই পাবে না। বন্ধু, প্রেমিক, স্বামী যে কোনো পরিচয়েই ধর্ষকের আক্রমণ ঘটছে। ধর্ষকের অনেক ধরনের পরিচিতি থাকলেও আক্রান্তদের একটাই পরিচয় তারা নারী। আতঙ্কিত হয়ে অনেকেই প্রশ্ন করছেন, এ কোন দেশে এবং কোন সমাজে আমরা এখন? ধর্ষকের উল্লাস মঞ্চে কাঁপছে বিপন্ন নারী?
একটা বিষয় অনেকেই সযত্নে আড়াল করতে চাইলেও কোনোভাবেই তা লুকানো যাচ্ছে না। তা হলো ধর্ষকদের সঙ্গে ক্ষমতার সম্পর্ক। নারীকে অধীনস্ত রাখার মানসিকতা এবং শিক্ষা তো ছড়িয়ে আছে সমাজের পরতে পরতে। কখনো ধর্মের নামে, কখনো কুসংস্কারের নামে পুরুষ আধিপত্যকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। সমাজ বিকাশের একটা পর্যায়ে নারীকে যে পুরুষের অধীন করে ফেলা হয়েছিল সে ইতিহাস কমবেশি আমরা সবাই জানি। কিন্তু এই অধীনতার যুক্তি যে অবৈজ্ঞানিক এবং অন্যায় ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত আধুনিক মানুষের তো তা না জানার কথা নয়। পুরুষের শারীরিক ক্ষমতা বেশি, আর্থিক ক্ষমতার সে মালিক, রাজনৈতিক কর্র্তৃত্ব তার হাতে, আইন ও বিধি পুরুষরা তৈরি করেছে নিজেদের অনুকূলে এসব মিলে জন্মসূত্রেই ‘পুরুষ শ্রেষ্ঠ’ বলে একটা ধারণা সমাজে তৈরি করা হয়েছে হাজার বছর ধরে। ‘সুপার ম্যান’ এর ধারণার পাশাপাশি ‘আলফা ম্যান’ অর্থাৎ সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতাশালী পুরুষ এই ধারণা তৈরি করা হয়েছে। ফলে দক্ষতা-যোগ্যতা থাকুক বা না থাকুক পুরুষদের কর্র্তৃত্বশালী ভাবার মানসিকতা সমাজের সর্বত্র। যে কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর সঙ্গে অশালীন আচরণ করতে একজন ভবঘুরেরও বাধে না। এই মানসিকতার সঙ্গে রাজনৈতিক ক্ষমতা যুক্ত হলে তা এক ভয়াবহ রূপ নেয় যা আমরা প্রত্যক্ষ করছি প্রতিদিন। সিলেটের এমসি কলেজের ঘটনাতে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সবাই। কী হচ্ছে এসব? এও কি সম্ভব! এই বিস্ময় কাটতে না কাটতেই নোয়াখালীর বেগমগঞ্জের নারকীয় ঘটনায় মানুষ স্তম্ভিত। তারপরে কি আর ঘটনা ঘটেনি? ঘটছে প্রতিদিন এবং ভয়াবহতায় যেন একটা আর একটাকে অতিক্রম করে যাওয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছে। ধর্ষকরা যে কত ক্ষমতাশালী তা বোঝা যায়, ধর্ষণের ঘটনাকে ধর্ষকদেরই প্রচার করার ব্যাপকতা দেখে। তারা এখন আর নিজেকে আড়াল করার চেষ্টাও করছে না। নির্যাতন-ধর্ষণের ভিডিও করে তা আবার সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার পেছনে উদ্দেশ্য কী? বিভিন্ন বাহিনী তৈরি করে এলাকায় কর্র্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা ও মানুষের মনে ভীতি ছড়িয়ে জমি দখল, ব্যবসা, ঠিকাদারি করার পাশাপাশি ধর্ষণ আতঙ্ক সৃষ্টি করছে এরা। এদের সামনে নারীরা অসহায় শিকার, কিন্তু এদের পেছনে আছে ক্ষমতাসীনদের পৃষ্ঠপোষকতা এবং রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তা। তা না হলে হঠাৎ করে এই সব দুর্বৃত্ত তো আকাশ থেকে পড়েনি। দেলোয়ার নামের তো অসংখ্য যুবক আছে বাংলাদেশে, তাহলে বেগমগঞ্জের দেলোয়ার এ রকম হয়ে গেল বা হতে পারল কেমন করে? একদিন হঠাৎ করে সে এরকম একটি জঘন্য ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পেরেছে কি? যে সব ঘটনা পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাই সব নয়। একটি সাধারণ হিসাবেও দেখা যাচ্ছে নির্লজ্জতা ও নির্মমতার দিক থেকে ভয়াবহ সব ধর্ষণ ঘটনার সঙ্গে এখন যারা যুক্ত তারা সবাই যুবলীগ-ছাত্রলীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। রাষ্ট্রক্ষমতার স্থানীয় পর্যায়ের সঙ্গে যুক্ত থেকে এরা যখন বেপরোয়া হয়ে উঠেছে, যখন আর কোনোভাবেই ঢেকে রাখা বা নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না তখন কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। যার ফলাফল দেখা না গেলেও নতুন নতুন মুখের আবির্ভাব যে ঘটছে তা দেখা যাচ্ছে। তাহলে কি ধর্ষক আর ধর্ষকের প্রশ্রয়দাতারা একসঙ্গে মিলে দেশটাকে ধর্ষকদের অভয়ারণ্য বানিয়ে তুলছে?
সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? নোয়াখালীর ঘটনা প্রমাণ করে নির্যাতিতরা কোথাও আস্থা পাচ্ছে না। যদিও পুলিশ ছাড়া রক্ষা করার কোনো আইনগত ব্যবস্থা নেই তারপরও মানুষের সংশয় পুলিশকে জানালে কি কাজ হবে? আদালত ছাড়া আশ্রয় নেই এ কথা বহুল প্রচারিত কিন্তু আদালতে গেলে প্রমাণ করা, বিচার পাওয়া কি সম্ভব হবে? বিচার পাওয়া অনিশ্চিত কিন্তু মামলা করলে হেনস্তা যে বাড়বে তা তো নিশ্চিত। ‘পৃথিবীর এমন কোনো দেশ কি আছে যেখানে ধর্ষণ নেই’ এই ধরনের কথা শুনলে মানুষের অসহায়ত্ব শুধু বাড়ে তা নয়, ধর্ষকদের শক্তিও যে বাড়ে তা বুঝবার মনটাও কি নেই ক্ষমতাসীনদের? ক্ষমতার রাজনীতির মধুচক্রে সামাজিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ অনেক নামিদামি ব্যক্তির কণ্ঠস্বরও নিশ্চুপ হয়ে গেছে। ‘কোথাও কোনো একটা ষড়যন্ত্র আছে’ এমন কথা বলে অনেকেই দায় এড়িয়ে, গা বাঁচিয়ে চলতে চাইছেন। তাদের মুখে প্রতিবাদের ধ্বনি না শুনে মানুষ ভাবছে তাহলে কি পয়সা, প্লট, পদক আর পদ-পদবির কাছে পরাস্ত হচ্ছে বিবেক?
মানুষের সামনে তাহলে পথ কী এবং পরিণতি কোথায়? অসহায় আত্মসমর্পণ নাকি প্রতিবাদের পথে নেমে আসা? বেগমগঞ্জের নির্যাতিতা ‘আব্বা গো!’ বলেও তো রেহাই পাননি। ফেনীর নুসরাত মৃত্যুর আগে বলে গিয়েছিল, ‘আমি যতক্ষণ বেঁচে থাকব, এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেই যাব।’ এটাই হলো মাথা উঁচু করে মরা বা বাঁচার পথ। কিশোরী কন্যার মুখের দিকে তাকিয়ে গভীর আবেগে বাবা-মা যখন কন্যাকে মা বলে ডাকে, তখন কি তনু, নুসরাতের কথা ভেবে চোখে জল আসে না? যখন শিশু কন্যাকে বুকে জড়িয়ে ধরেন তখন কি তার ভবিষ্যৎ বিপদের আশঙ্কায় বুক কেঁপে ওঠে না? যে অমানুষরা মানুষের মর্যাদার অবমাননা ঘটিয়ে ধর্ষণের মতো কাজ করতে পারে সেও তো কোনো বাবা-মার সন্তান। কোন সমাজ-মানসিকতা এবং কাদের সহযোগিতা তাকে যৌন সন্ত্রাসী বানালো তা কি খুঁজে দেখবেন না। এসব চিহ্নিত না করে আর প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের শক্তি না বাড়িয়ে কেউ কি নিরাপদে থাকতে পারব? বর্তমান পরিস্থিতি চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে যে, সরকারে বা বিরোধী দলে ক্ষমতার শীর্ষে নারীরা থাকলেই কিংবা স্বাধীনতার আবেগের কথা উচ্চকণ্ঠে বললেই যে নারী নিরাপদ তা ভাবার কোনো কারণ নেই। প্রতিবাদ-প্রতিরোধের মধ্য দিয়েই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি যেমন গড়ে ওঠে তেমনি সমাজকে নিরাপদ ও বাসযোগ্য করা সম্ভব। যারা সমাজ নিয়ে ভাবছেন এই দায়িত্ব আজ তাদেরই পালন করতে হবে।
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামনিস্ট
rratan.spb@gmail.com

