কারিশমা আমজাদ :বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের সামনে এখন বিরাট চ্যালেঞ্জ৷ জলবায়ু পরিবর্তনের নানা ইস্যুগুলির মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতাবৃদ্ধি অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন ও উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে যাচ্ছে। জলভাগ প্রসারিত হয়ে ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে স্থলভাগ।
প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণ- উভয়ই এর জন্য দায়ী। তবে সমুদ্রে এই উচ্চতা বৃদ্ধি প্রত্যক্ষভাবে দৃশ্যমান নয়। এটি একটি ধীর প্রক্রিয়া। দীর্ঘ সময়ের ভূ-উপগ্রহ চিত্র ও বৈজ্ঞানিক তথ্য প্রমাণের মাধ্যমে এর সত্যতা আজ প্রমাণিত।
বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়ায় জলবায়ু পরিবর্তনের সমূহ বিপদ দেখা দিয়েছে। ইতিমধ্যে হিমালয়ের চূড়ার বরফ এবং উত্তর ও দক্ষিণ মেরু অঞ্চলের জমাটবাঁধা বরফ বা হিমশৈলী গলতে শুরু করেছে। এ কারনে বিজ্ঞানীদের বলছেন, এই বরফগলা পানিতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা (সি লেভেল) বেড়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়তই।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বলতে আসলে আমরা কী বুঝি? এই উচ্চতা কি সব সমুদ্রের জন্য একই সমান না কি সমান নয়? আসলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা পৃথিবী পৃষ্ঠের সবখানে সমান নয়। বিশ্বের সব মহাসাগর একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। তাই সাগরের পানির উপরিতলের উচ্চতা সবখানে সমান হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু এখানে কাজ করে অন্য কিছু উপাদান। যেমন মহাসাগর যত বড় হবে, তার পানির ওপর চাঁদের আকর্ষণশক্তি তত বেশি প্রযুক্ত হবে। ফলে সেখানে জোয়ারের সময় ঢেউয়ের আকারও বেশি হবে। আবার যে সাগরের গভীরতা বেশি, তার পানি পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণশক্তির টানে বেশি নিচে নেমে যাবে, ফলে সেই সাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা কিছুটা কম হবে। আবার আবহাওয়ার ধরনও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতায় প্রভাব ফেলে। যদি কোনো মহাসাগরের ওপরের বায়ুর চাপ কমে যায়, তাহলে সেখানে সাগরপৃষ্ঠের পানি কিছুটা ফুলে উঠতে পারে। আবার পশ্চিমা বায়ুপ্রবাহ সমুদ্রের পানিকে ঠেলে উঁচু করে পূর্ব দিকে নিয়ে যেতে পারে। এমন নানা কারণে বিশ্বের বিভিন্ন সাগর-মহাসাগরপৃষ্ঠের উচ্চতা সমান থাকে না, সামান্য হেরফের হয়। কিন্তু যখন বলা হয়, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়বে, তখন আসলে গড় উচ্চতাকে বোঝানো হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে জোয়ার-ভাটার বিভিন্ন পরিমাপ ও অন্যান্য উপাদান হিসেবে নিয়ে ১৯ বছরের গড় উচ্চতাকেই সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বলে ধরা হয়।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধিতে মানুষের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। আধুনিক জীবনযাত্রা অনুসারে চলতে গিয়ে মানুষের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধিতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভূমিকা রাখছে। বিজ্ঞানের সূত্র মেনে তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে পানির আয়তনও বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া মেরু অঞ্চল ও পর্বতচূড়ায় অবস্থিত বরফ গলে যাওয়ার ফলে পানির উচ্চতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী অনুসারে, তাপমাত্রা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে ২১০০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১১ থেকে ৩৮ ইঞ্চি পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে সারা বিশ্বের নিম্নাঞ্চলের দেশগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে, যার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। জলবায়ু পরিবর্তন-বিষয়ক আন্তসরকার সংস্থা ইন্টারগভর্নমেন্টাল প্যানেল ফর ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) একটা গবেষণা বলছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ১ মিটার (৩৯.৩৭ ইঞ্চি) বাড়লে বাংলাদেশের ১৭-২০ শতাংশ স্থলভূমি পানিতে তলিয়ে যাবে।
মেলবোর্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও জার্মানির পটসডাম ইনস্টিটিউট অব ক্লাইমেট ইমপ্যাক্ট রিসার্চের এক গবেষণার বলা হচ্ছে, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ২৩০০ সালের মধ্যে শূন্য দশমিক ৭ থেকে ১ দশমিক ২ মিটার বেড়ে যাবে৷
পরিবেশবিষয়ক বিখ্যাত জার্নাল নেচার কমিউনিকেশন্সে প্রকাশিত এই গবেষণায় আরো বলা হচ্ছে, এমনকি যদি ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ঠেকিয়েও রাখা যায়, সিস্টেমের জড়তার কারণে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি আটকে রাখা যাবে না৷ শুধু তাই নয়, কার্বন ডাইঅক্সাইডের উদগীরণের মাত্রা শূন্যে নামিয়ে আনতে যদি দেরি হয়, তা হলে ২০২০ সালের পর থেকে প্রতি পাঁচ বছরের জন্য ২০ সেন্টিমিটার করে পানির উচ্চতা বাড়বে৷
ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অব ক্লাইমেট চেঞ্জের (আইপিসিসি) হিসাব অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা মাত্র ৪৫ সেন্টিমিটার বাড়লে বাংলাদেশের উপকূলবর্তী ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ভূমি সমুদ্রের নিচে চলে যাবে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যেসব নেতিবাচক প্রভাব সারা বিশ্বে পড়বে, তার সবকিছুই বাংলাদেশের জন্য বিশেষভাবে প্রযোজ্য। জলবায়ু পরিবর্তনের ওপর বাংলাদেশের জাতীয় কৌশলনীতি অনুসারে এর ফলে আড়াই কোটি মানুষ জলবায়ু-উদ্বাস্তুতে পরিণত হবে। অবশ্য স্বতন্ত্র গবেষণা বলছে, এ সংখ্যা ৩ থেকে সাড়ে ৩ কোটি পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
বাংলাদেশের অন্যতম বৃহৎ ভোলা দ্বীপও গত চার দশকে প্রায় ৩ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা হারিয়ে বর্তমানে ১৯৬৫ সালের তুলনায় অর্ধেকে এসে দাঁড়িয়েছে৷
একই সঙ্গে বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ২০৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বর্তমানের তুলনায় যথাক্রমে ১৪ ও ৩২ সেন্টিমিটার এবং ২১০০ সাল নাগাদ ৮৮ সেন্টিমিটার পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে৷ ফলে বাংলাদেশের কমপক্ষে ১০ শতাংশ এলাকা সমুদ্রের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে৷ ফলে উপকূলীয় অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষ উদ্বাস্তু হবেন বলে অনুমান করা হচ্ছে৷ সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ৬৭ সেন্টিমিটার বাড়লে গোটা সুন্দরবনই পানিতে তলিয়ে যাবে৷
শুধু নিম্নাঞ্চলই নয়, রাজধানী ঢাকাও আশঙ্কামুক্ত নয়। ঢাকা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র ১ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। ওয়ার্ল্ড ওয়াইল্ড লাইফ ফান্ডের মতে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ঢাকাও আক্রান্ত হতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ঝুঁকিপূর্ণ ১২টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম।
বাংলাদেশ একটি বিপুল জনসংখ্যার দেশ। দক্ষিণে এটি সাগরবিধৌত। নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হলে এখানকার অধিবাসীরা উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে। ভূমিহীন ও জলবায়ু উদ্বাস্তু হয়ে পড়বে বিপুল সংখ্যক মানুষ। ফলে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়ে যাবে। মাথাপিছু সম্পদ ও কৃষিজমির পরিমাণও কমে যাবে। উদ্বাস্তু সমস্যা তখন দেশীয় সীমা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক রূপ নিতে পারে। ফলে জলবায়ু সমস্যা তখন রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক রূপ নেবে। নিরাপত্তার সংকট দেখা দেবে। প্রশ্ন উঠতে পারে জলসীমা নিয়েও।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে মানুষের জীবিকার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। গবেষণা বলছে, সমুদ্রের তাপমাত্রা বৃদ্ধি, গভীরতার পরিবর্তন এবং পানির রাসায়নিক গুণগত মানের পরিবর্তনের ফলে মৎস চাষ ও বিভিন্ন ধরনের শস্য উৎপাদন ব্যাহত হবে। খাদ্যনিরাপত্তা চরমভাবে ব্যাহত হবে। প্রধানত যেহেতু প্রচুর কৃষিজমি পানিতে তলিয়ে যাবে আর বিপুল জায়গা যদি তলিয়ে না–ও যায়, লবণাক্ত পানি প্রবেশের ফলে উৎপাদনক্ষমতা কমে যাবে। লবণ সংক্রমণের কারণে সেচকাজ কষ্টসাধ্য হবে এবং তার ফলে ফসল উৎপাদন প্রত্যাশার তুলনায় অনেক কমে যাবে। এক পর্যায়ে মানুষ বাধ্য হয়েই নিজের আদি জীবিকার পরিবর্তন ঘটাবে।
গ্রিফিথ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর এমিরেটাস ইয়ান লোয়ি বলেন, প্রাকৃতিক কারণে প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানুষদের উচ্ছেদ ও জলবায়ু শরণার্থী হয়ে যাওয়া অস্ট্রেলিয়াসহ এসব দেশের জন্য সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা তৈরি করবে।
নাসার সাম্প্রতিক একটি গবেষণা বলছে, আগামী ১০০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশের বন্দরনগরী চট্টগ্রাম সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। বাংলাদেশের বিপুল জনসংখ্যার ঘনত্ব ও সীমিত সম্পদের কারণে পরিবেশ-উদ্বাস্তুদের অন্য জায়গায় স্থানান্তর করা কষ্টসাধ্য হবে। বাংলাদেশ তিন দিক দিয়ে ভারত কর্তৃক কাঁটাতারে ঘেরা। বিপুলসংখ্যক উদ্বাস্তু যদি এই কাঁটাতার অতিক্রম করতে চেষ্টা করে, তখন কী পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে, সেটা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে।
সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির প্রক্রিয়া পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব নয়। বরং বৃদ্ধির হার কতটা কমিয়ে রাখা যায়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত। পাশাপাশি সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে যেসব নিরাপত্তাঝুঁকির সৃষ্টি হবে, সেগুলো মোকাবিলা করার জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের যে যৌথ ব্যবস্থাপনা থাকা দরকার, সেদিকে আমাদের বিশেষ নজর দিতে হবে।
কার্বন নিঃসরণ কমিয়ে আনার যে আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার তা পূরণে শিল্পোন্নত দেশগুলোকে এগিয়ে আসতে হবে। আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে, জলবায়ু সংকট মোকাবিলা করার সক্ষমতা ও অভিযোজনের ওপর।
এই অভিযোজন যাতে পরিবেশ, প্রকৃতি ও জীবনযাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। নদী, পলি ও পানি ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিতে হবে। সবুজ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু পরিকল্পনা নয়, বাস্তবায়নের দিকেও জোর দিতে হবে। তাহলেই ভবিষ্যৎকে নিরাপদ রাখা সম্ভব হবে।
লেখক: কারিশমা আমজাদ
কলাম লেখক, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও পি এইচ ডি ফেলো, সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
Email: sristy70@gmail.com

