দুর্নীতি একটি জাতীয় সমস্যা: প্রতিকার করা সকলের দায়িত্ব

মোনায়েম খান :লোকটির নাম মালেক, হাজী মালেক। স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক জনাব আবুল কালাম আজাদের গাড়ির ড্রাইভার। এ লোকটি বাংলাদেশে এখন বেশ আলোচিত ব্যাক্তি। অতি সামান্য বেতনের ড্রাইভারের চাকুরি করে শত কোটি টাকার মালিক হয়ে ,এযাবৎ কালের সবছেয়ে নন্দিত অথবা নিন্দিত ব্যক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছেন। তাঁর এই অবিশ্বাস্য অভুদ্যয় সারা দেশে রীতিমত হৈচৈ পড়ে গেছে। একজন ড্রাইভার কি করে এত টাকার মালিক হলেন, এ নিয়ে মিডিয়া দুনিয়ায় আলোচনা সমালোচনার এক দুর্নিবার ঝড় বয়ে নিয়ে এসেছে।

কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, হাজী সাহেবের বাহ্যিক আকৃতির সাথে অন্তরে লুকিয়ে থাকা কর্দয কালিমার সাথে কোন সাদৃশ্য নেই । লম্বা সফেদ দাড়ি,পড়নে পান্জ্ঞাবী, কপালে দাগ , যা একজন নামাজী লোকের প্রতিচ্ছবি বহন করে । এমন আপাদমস্তক ইসলামী লেবাসধারী লোক, কি করে এত নিকৃষ্ট কাজে আকন্ঠ ডুবে গেল, সে টাই বিস্ময় । অন্তত: নিজের বেশভূষার প্রতি কিছুটা খেয়াল করা উচিত ছিল। যা তিনি করেননি।
ইতিমধ্যেই মালেক সাহেব দুর্নীতির দায়ে গ্রেফতার হয়েছেন । তাঁর বিরুদ্ধে অানীত অভিযোগ প্রমানিত হলে ,হয়তো সাজাও হবে। এই পযর্ন্ত ! তারপর তিনি বিপুল পরিমান উৎকোচের বিনিময়ে রেহাই পেয়ে যাবেন অতি দ্রুত। ইহা নিশ্চিত, সত্যিও বটে। আমরা সবাই জানি, দেশের প্রধানমন্ত্রীর অফিস থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত গ্রামাণ্চলের ইউনিয়ন অফিস পর্যন্ত দুর্নীতি এখন সুনীতি হিসেবে বিস্তর পরিসরে গ্রহনীয়। কাজেই পয়সার বিনিময়ে বিচার কার্য উলট-পালট করা কোন ব্যাপারই নয়।যেহেতু বিত্ত অার ক্ষমতার কাছে দেশের বিচারব্যবস্হা নিদারুন অসহায়। অতএব, মালেক সাহেবের মামলাও ব্যতিক্রম হবে না। আমরা ইতিপুর্বে এমন অনেক লোক দেখানো মামলা, মামলার রায় ও বেকসুর খালাস পাওয়ার হাস্যপ্রদ বিচার প্রক্রিয়া প্রত্যক্ষ করেছি। উদাহরণে প্রয়োজন নেই।

বলতে দ্বিধা নেই, দেশের প্রত্যেকটি অফিস আদালত শুধু দুর্নীতির আঁখড়াই নয়, বরং সংশ্লিষ্টরা সম্মিলিতভাবে দুর্নীতির লালন পালনও করে আসছেন। যাঁরা অফিস আদালতে কাজ করছেন তাঁরা সবাই পরিপূর্নভাবে অবগত আছেন, কিভাবে কাজের আড়ালে নীতিগর্হিত কাজ সংঘটিত হচ্ছে, কারা অবৈধ পয়সা উপার্জন করছেন। কিন্তু এক অদৃশ্য ক্ষমতার ভয়ে কেউ কোন প্রতিবাদ করছেন না। এযেন সত্যকে না দেখার এক সুচিন্তিত অন্ধ অস্বীকৃতি। এনিয়ে অনেকের সাথে আলাপ হয় , তাঁদের উত্তর প্রায় সাদৃশ্য । অর্থাৎ অফিস পাড়ায় কে কি করছে , দেখা বা তদারকির কোন প্রয়োজন নেই। নিজের চাকুরী বাঁচিয়ে রাখাই প্রথম ও প্রধান কাজ। এজন্য সবার ক্ষেত্রে অফিসের কাজকর্মের ছেয়ে উর্ধতন কর্মকর্তার নির্লজ্জ তোষামোদীই মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। এবং বড় সাহেবের তুষ্টি ও কৃপাদৃষ্টি অর্জনই অধিনস্তদের যোগ্যতার মাফকাঠি হিসেবে বিবেচ্য। সাথে পদলেহন অার রাজনৈতিক পরিচয় চাকুরীর মেয়াদ পরিপূর্ণ করতে সহায়ক ভুমিকা পালন করছে। এখানে জনতার সেবাদান বা দেশের স্বার্থে কেউ কিছু করছেনা। অবশ্য দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া।

হাজী মালেক সাহেব কি ,একদিনে এতো পয়সার মালিক হযেছেন। আলাদিনের চেরাগের ঘষায়ও এত দ্রুত ভাগ্য পরিবর্তন করা দুরূহ । কর্ম জীবনের এই দীর্ঘ রাস্তায় হাজী সাহেব ,কর্তাব্যক্তিদের ছত্রচ্ছায় তাঁর হিসেবী কুর্কম চালিয়ে আসছেন, ইহা সন্দেহাতীত সত্য।

স্বাস্হ্য অধিদপ্তরের যিনি মহাপরিচালক হওয়ার যোগ্যতা রাখেন, তিনি কি মুর্খ ? এ কথা কি বিশ্বাস করা যায় ? একজন উচ্চশিক্ষিত কর্মকর্তা জনাব আবুল কালাম আজাদ ঘুর্নাক্ষরেও কি টের পাননি যে তাঁর ড্রাইভার বিভৎস দুর্নীতির মাধ্যমে সম্পদের পাহাড় গড়ে তুলছেন। স্বাস্হ্য অধিদপ্তরকে কেন্দ্র করে অসংখ্য লোক কাজ করছেন, জিজ্ঞাসা করে দেখেন ,কমবেশী সবাই , এই দেদীপ্যমান কুকর্মের খবর জানেন। ইহা হলফ বলা যায় , স্বয়ং মহাপরিচালকের পুর্ন অবগতি রয়েছে। অধিকিন্তু তিনি নিজেও জড়িত, এমন ধারনা অমুলক নয় । এজন্য একজন ড্রাইভার এমন অপকর্ম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে বলে বিশ্লেষকদের অভিমত।

বাংলাদেশে দুর্নীতি মহামারির মত বিস্তৃতি লাভ করছে। প্রায় প্রতিটি প্রতিষ্ঠান ভয়ংকরভাবে এ রোগে আক্রান্ত। নি:সন্দেহে ইহা একটি মারাত্মক জাতীয় সমস্যা হিসেবে আবির্ভাব হয়েছে । কাজেই কোন একব্যক্তির পক্ষে দেশ থেকে দুর্নীতির মুলউৎপাটন করা অচিন্তনীয় । দেশ আমাদের সকলের, তাই সবাই মিলে সকল অন্যায় অবিচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। নাগরিক দায়ীত্ব পালন করা সময়ের দাবী।
দৃশ্যত পুরো সমাজ পঁচে গেছে, আমুল পরিবর্তন ছাড়া দেশ ও জাতীর উন্নতির পথ সুদুর পরাহত।
Please, please do not make any excuses for a blind refusal to see sense.

লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক ও কলামিস্ট।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.