স্বর্ণালী এক অধ্যায়– গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার

 ‘শোন একটি মজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মজিবরের কণ্ঠে সুরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি, আকাশে বাতাসে ওঠে রণি; বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ….. গানের রচয়িতা প্রখ্যাত গীতিকার ও সংগীত সাধক গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার। ১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল মুজিবনগরে বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারের মন্ত্রী পরিষদের শপথ অনুষ্ঠানে বাজানো হয় তাঁরই লেখা এই বিখ্যাত গান।‘ এই গানটি ইংরেজিতে অনুবাদ বরা হয়- ‘মিলিয়ন মুজিবরস সিংগিং’। বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁরই লেখা ‘ বাংলার বৌদ্ধ, বাংলার খ্রিস্টান, বাংলার মুসলমান, আমরা সবাই বাঙাল ‘, ‘ মাগো ভাবনা কেন’ গানগুলো বাংলার মুক্তিকামী মানুষদের অনুপ্রেরণা যুগায় । মুক্তিযুদ্ধে তার অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাকে ২০১২ সালে “মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা” জানানো হয়। বাংলাভাষার কবি ও গীতিকার, বাংলা সংগীত ভুবনের এই অসাধারণ স্রষ্টা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার ১৯২৫ সালে ৫ ডিসেম্বর পাবনার ফরিদপুর উপজেলার গোপালনগর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার ডাক নাম বাচ্চু’ । তাঁর পিতা বিখ্যাত উদ্ভিদবিদ, গিরিজাপ্রসন্ন মজুমদার ছিলেন প্রেসিডেন্সি কলেজের অধ্যাপক ছিলেন । মা সুধা মজুমদার ছিলেন স্নাতক । গৌরীপ্রসন্ন মজুমদার শৈশবেই পরিবারের সাথে কলকাতায় চলে যান । পরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ফিরে আসেন পাবনা শহরের মজুমদার পাড়ায়। এ সময় সরকারি এডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হন । ১৯৫১ সালে পুনরায় কলকাতা চলে যান। সেখানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে এমএ পাস করেন। তিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
শৈশবেই কবিতা ও প্রবন্ধ লেখার প্রতি গৌরীপ্রসন্নের আগ্রহ প্রকাশ পায়। ছাত্র জীবনেই গণ্ডি পেরোনোর আগেই তিনি ইংরেজিতে অনুবাদ করেন কালীদাসের ‘মেঘদূতম’। এরপর তিনি বাংলা কবিতা লেখা শুরু করেন । পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে পড়ার সময় শুরু করেন গান রচনার রচনার । তার লেখা প্রথম গান হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কণ্ঠে শোনা যায় ‘ আকাশ মাটি ঐ ঘুমালো, ঘুমায় মেঘ তারা…। এর পর রচনা করেন ‘বঁধু গো এই মধুমাস’, শচিন দেব বর্মন তাতে সুরারোপ করে প্রথম রেকর্ড করেন। রেকর্ডে এই গান প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে তিনি চলচ্চিত্রের জন্য গান লেখা শুরু করেন। অগ্নিপরীক্ষা, পথে হল দেরী, হারানো সুর, সপ্তপদী, দেয়া নেয়া, মরুতীর্থ হিংলাজ এবং আরও বহু সিনেমায় তাঁর লেখা গানগুলো ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। শচীন দেববর্মণের সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়ে ওঠে গৌরীপ্রসন্নের। ‘মেঘ কালো আঁধার কালো’, ‘প্রেম একবারই এসেছিল নীরবে,’ ‘বাঁশি শুনে আর কাজ নাই’… গৌরীপ্রসন্নের কথায় ও শচীন দেববর্মণের সুরে সৃষ্টি হয়েছিল এমন অসংখ্য কিংবদন্তি গান! তার লেখা গানে ‘সুর দিয়েছেন সত্য চৌধুরী, ভক্তিময় দাসগুপ্ত, অপরেশ লাহেড়ী, সুধীর লাল চক্রবর্তী, নচিকেতা ঘোষ, অনুপম ঘটক, রবীন চট্টপাধ্যায় ও হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। মান্নাদের কন্ঠে কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই’ মান্না দের গাওয়া গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের লেখা এই গান ২০০৪ সালে বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০টি বাংলা গানে ঠাঁই পায়। বাংলা সংগীত ভুবনে গৌরি প্রসন্ন মজুমদার এক অসাধারণ স্রষ্টা হয়ে ওঠেন । তাঁর অসংখ্য অমর সৃষ্টি সংগীতকে করেছে সমৃদ্ধ। তিনি একদিকে চলচ্চিত্রের গান, অন্যদিকে মাঠ-ময়দানে গণ আন্দোলনের গানও রচনা করেন ।
তার গান আলোড়ন ও অনুপ্রেরণা যোগায় মুক্তিযোদ্ধাসহ মুক্তিপাগল বাঙালির মনে। একই সম লয় তার লেখা রোমান্টিক গানগুলো বাংলা চলচ্চিত্রে যোগ করে এক নতুন মাত্রা। ‘এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো’- উত্তম কুমার সুচিত্রা সেনের ঠোঁটে এই গান তখন দর্শকদের প্রিয় হয়ে ওঠে। বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধ জুড়ে বাংলা ছায়াছবি ও আধুনিক গানের জগতকে যাঁরা মাতিয়ে রেখেছিলেন গৌরি প্রসন্ন । এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “আমি চেষ্টা করি এক এক সুরকার ও গায়কের জন্য এক এক রকম গান লিখতে। তার সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠেছিল পাবনার আরেক কৃতিমান সাহিত্যিক, গীতিকবি ড. আবু হেনা মোস্তফা কামালের । মানিক বন্দোপাধ্যায়ের ‘পদ্মানদীর মাঝি’র গীতিনাট্যের সুর ঠিক রেখে তার ইংরেজি অনুবাদ করেন তিনি । বরেণ্য এই গীতিকার ১৯৮৬ সালের ২০ আগস্ট না ফেরার দেশে পাড়ি দেন। যাবার আগে আগেই বুঝতে পেরে লিখেন ‘যেতে দাও আমায় ডেকো না, কবে কি আমি বলেছি মনে রেখ না’। গানটি তার মৃত্যুর পর শিল্পী আশা ভোঁসলের কণ্ঠে রেকর্ড করা হয়। মৃত্যুর আগে হাসপাতালে লিখেন শেষ গান, ‘এবার তাহলে আমি যাই, সুখে থাক ভালো থাক, মন থেকে এই চাই।’ বিখ্যাত সব কালজয়ী গানের অমর স্রষ্টা গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের গান গুলো হলো- আমার গানের স্বরলিপি গানে মোর ইন্দ্রধনু মাগো, ভাবনা কেন, আমরা তোমার শান্তিপ্রিয় শান্ত ছেলে বাঁশি শুনে আর কাজ নাই সে যে ডাকাতিয়া বাঁশি ও নদীরে একটি কথা শুধাই শুধু তোমারে এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায় এ কী বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন কেন দূরে থাকো শুধু আড়াল রাখো কে তুমি কে তুমি আমায় ডাকো এই পথ যদি না শেষ হয় আমার স্বপ্নে দেখা রাজকন্যা থাকে কফি হাউসের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই শোন একটি মজিবরের কণ্ঠ থেকে লক্ষ মজিবরের কণ্ঠে সুরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি, আকাশে বাতাসে ওঠে রণি; বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ প্রেম একবার এসেছিল নীরবে এই পথ যদি না শেষ হয়, তবে কেমন হতো তুমি বলো তো কত দূরে আর এমন দিন আসতে পারে।
কাজী সালমা সুলতানা , লেখক এবং গণমাধ্যম কর্মী ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.