ওসি প্রদীপ দাস : এক ঘৃনিত গালি

মোনায়েম খান :প্রদীপ কুমার। প্রদীপ কুমার দাস, কুখ্যাত ওসি, বর্তমানে বাংলাদেশে সবচেয়ে নিন্দিত এক গালি হিসেবে সমধিক পরিচিত। একটু বাড়িয়ে বললে, কেবল মাত্র মীরজাফরের ঘৃনিত নামের সাথেই দাস বাবুর তুলনা করা সমীচিন। অপর দিকে মেজর সিংহা মোহাম্মদ রাশেদ খান, এক অকুতভয় দেশপ্রেমিক, লাখো জনতার আদর্শ হিসেবে নন্দিত। উভয় লোক দেশের নিরাপত্তা বিভাগে সেবা দান করেছেন । একজন পুলিশ অপর জন সৈনিক। একজন নিহত, অপরজন পুলিশ হেফাজতে অবরুদ্ধ, অভিযোগ খুনের।

এই দুই ব্যক্তিকে নিয়ে বাংলাদেশ উত্তপ্ত। আলোচনা সমালোচনার তীব্র ঝড় বয়ে যাচ্ছে পুরো দেশজুড়ে । মানুষের মনে কৌতুহলের সীমা নেই। প্রায় প্রতিদিন বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে উভয়ের ঘটনাবহুল জীবন নিয়ে সিরিয়েলের মত প্রকাশিত হচ্ছে বর্নাট্য সব কিচ্ছা কাহিনী । মেজর সিংহাকে নিয়ে প্রকাশিত বিরত্বের জয়গাঁথা মানুষের মনে সমবেদনা সহানুভূতি যেমন দেখা দিয়েছে ,ঠিক তেমনি খুনি প্রদীপ দাসের বহুবিধ কুকর্মের ফিরিস্তি জনসম্মুখে উম্মোচিত হলে সাধারন মানুষ প্রচন্ড ঘৃনায় মারমুখি হয়ে উঠেছে। যা তর্কাতীতভাবে স্বাভাবিক , বিস্ময়ের কিছু নেই। একজন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে এমন পাশাবিক ডাকুসুলভ আচরন ,বিস্তৃত সভ্য সামাজিক পরিমন্ডলে কোন অংকে গ্রহনযোগ্য নয় । তাই বিস্ফোরণমুখ জনতা প্রদীপ দাসের সর্বোচ্চ ফাঁসির দাবী জানিয়ে আসছেন। এবং এ দাবীর প্রতিধ্বনি বাংলাদেশ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে শুনা যাচ্ছে।

মেজর সিংহা মোহাম্মদ রাশেদ খানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে যে গুন্জন ছড়িয়েছে, সময়ের সাথে সেই সত্যতা ক্রমান্নয়ে ফরিস্ফুটিত হচ্ছে । যা বিভিন্ন সংবাদ কর্মিদের তথ্যবহুল লেখার মাধ্যমে পাওয়া যাচ্ছে।উল্লেখ, চোরাচালানের অভিযোগ এনে ওসি প্রদীপ দাস টেকনাফ-বাহারছড়া চেকপোস্টে মেজর সিংহাকে অত্যন্ত নিষ্ঠুর ও নির্মম ভাবে গুলি করে হত্যা করে।

প্রকাশ, সীমাহীন অপকর্মের সাথে জড়িত, খুনের অভিযোগে অভিযুক্ত ওসি প্রদীপ কুমার দাস ক্রশফায়ারের ভয় দেখিয়ে পার্বত্য অন্চলে এক ত্রাসের রাজত্ব গঠন করতে সক্ষম হয়েছিল । ধারনা করা হয়, সংশ্লিষ্ট কতৃপক্ষের কিছু অসৎ লোক প্রত্যক্ষ অথবা পরোক্ষ ভাবে ঐ লুটেরা ওসিকে মদদ জুগিয়ে আসছিল । নতুবা দেশের আইন শৃঙ্খলা রক্ষায় কর্মরত একজন দায়ীত্বশীল লোক এতো বেপরোয়া বে-লাগাম হয়ে উঠে কিভাবে ? কর্তব্য কাজে অবহেলা দন্ডনীয় অপরাধ জেনেও একজন শিক্ষিত পুলিশ কর্মকর্তা এমন লাম্পট্য অার দুস্পর্ধা দেখায় কি করে, আল্লাহ মালুম !

প্রচন্ড ক্ষোভ আর দুর্মর ঘৃনায় দেশের মানুষ ফূঁসে উঠেছে । অভিযুক্ত আসামি প্রদীপ দাসের ফাঁসি চাই, দিতে হবে শ্লোগানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম গুলো ছেয়ে গেছে। ইতিমধ্যে কিছু সংগঠন ন্যায্য বিচারের দাবীতে রাজপথে আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছেন । কিছু সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আবার মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে বিচার প্রার্থনা করছেন। যা অতিমাত্রায় তোষামোদী ও হাস্যকরই প্রতিয়মান হচ্ছে । সুশিল সমাজের দাবীদার কিছু স্বগর্বিত বুদ্ধিজীবিও একই মনমানষিকতা নিয়ে তোষামোদীর ট্রেনে সহযাত্রী সেজেছেন কিভাবে গুনকীর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর কৃপাদৃষ্টি লাভ করা যায়। এদের চিন্তা চেতনা কিছুটা হলেও বিকারগ্র্রস্ত । সঙ্গত কারনে প্রশ্নবিদ্ধ।

যেকোন খুনের অভিযুক্ত আসামির বিচার হয় দেশের প্রচলিত আইনে, আদালতের মাধ্যমে। দোষী সাব্যস্ত হলে সর্বোচ্চ আদালত দোষী ব্যক্তির ভাগ্য নির্ধারণ করবে । গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্হায় আইনের শাসন এভাবেই পরিচালিত হয় । কোন প্রেসিডন্ট, প্রধানমন্ত্রী বা তাঁর অধিনস্ত নেতা পাতি নেতা আদালতের উপর কোন প্রকার প্রভাব খাটানো আইনের পরিপন্তি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ইহাই আমাদেরকে শিক্ষা দেয়। পশ্চিম ইউরোপের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর পানে তাকালে আমরা এই একই শিক্ষাই লাভ করি। এবং ইহা অনস্বীকার্য যে, পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে আইনের শাসন ও জবাবদিহিতা বিদ্যমান আছে বলেই দুনিয়ায় জনকল্যাণকামী রাষ্ট্র হিসেবে তাদের অবস্হান সবার উপরে।

বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল গুলোতে টকশোর অভাব নেই। ইহা একটি ভাল অভিপ্রায় হিসেবে বিবেচ্য। এবং এই অনুষ্ঠান গুলোতে অতিথীর আসনে যাঁরা বসেন তাঁদের মধ্যে অনেক প্রথিতযশা লোক আছেন , সত্যিকার অর্থে প্রচন্ড জ্ঞান রাখেন, বুদ্ধিভিত্তিক কথা বলেন, গণতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিক রুপদানের উপর নসিহত দিয়ে থাকেন। কিন্তু দু:খের বিষয়, তাঁরা নিজেরাই ব্যবহারিক অর্থে গণতন্ত্র চর্চা করছেন না, বরং জ্ঞাতসারে গণতন্ত্রের লেবাসে স্বৈরতন্ত্রকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। বরেন্য লোকদের কাছ থেকে এমন স্ববিরোধী স্বভাব কাম্য নয়।

টকশোর ঐ সুশীল সমাজের অনেক লোক মেজর সিংহা হত্যার সুষ্ঠ বিচারের দাবীতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন। আমার প্রশ্ন হল, কিন্তু কেন ? তাহলে কি দেশের বিচার ব্যবস্হা একেবারে ধ্বংস হয়ে গিয়েছে ? অথবা, তল্পিবাহক হিসেবে জনগনের পরিবর্তে ক’জন নেতা-নেত্রীর আদেশ নির্দেশ পালন করাই কি একমাত্র কাজ বিচার বিভাগের হাতে অবশিষ্ট রয়েছে ? এই সঙ্গিন প্রশ্নের সঠিক উত্তর কি ? আদৌ কি বিচার বিভাগের স্বাধীনতা বলতে কিছু আছে ? একটি গনতান্ত্রিক দেশে যা অত্যন্ত জরুরী ।

সুশীল সমাজকে বলা হয় জাতির বিবেক। তাঁরাই যখন দেশের আদালতের উপর আস্তাশীল হতে পারছেন না, যৌক্তিকভাবে প্রশ্ন উঠা স্বাভাবিক, আদৌ কি দেশে একটি কার্যকর বিচার ব্যবস্হা বিদ্যমান রয়েছে ? যা সত্যনিষ্ঠার উপর প্রতিষ্ঠিত জনকল্যাণকামী একটি স্বাধীন সত্ত্বার প্রতিচ্ছবি। যদি তাই হয়, তবে আদালত কর্তৃক সুষ্ঠ বিচারের জন্য প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ বা শুভদৃষ্টির প্রয়োজন কেন ?

গনতন্ত্রকে প্রতিষ্ঠানিক রুপদান করার অন্যতম একটি স্তম্ভ হল আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা । নেতা-নেত্রি কর্তৃক বিচার ব্যবস্হা প্রভাবিত হলে দেশে গনতন্ত্র ফরিস্ফুটিত হয় না, বরং গনতন্ত্রের আড়ালে বর্বর স্বৈরতন্ত্র জগদ্দল পাথরের মত অসহায় জনতার বুকে ছেপে বসে। বলতে দ্বিধা নেই, মেজর সিংহার হত্যা মামলা বিচার ব্যবস্হার অসহায়ত্বের প্রতি ইঙ্গিত বহন করছে।

ওসি প্রদীপ দাস গ্রেফতারের পর হতে কিছু মিডিয়া তাকে ভারতীয় নাগরিক বলে অপপ্রচার বা বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করছে । এই অলিক প্রচেষ্টার নেপথ্যে কি রহস্য লুকিয়ে রয়েছে বোধগম্য নয় । অথবা, এই গর্হিত অপপ্রচার সম্প্রচারনের মধ্য দিয়ে কারা কি অর্জন করতে চাচ্ছেন স্পষ্ট নয় ,দুর্ভেদ্যও বটে।

নিন্দিত প্রদীপ দাস বি.এন.পির শাসনামলে পুলিশ বিভাগে নিয়োগ প্রাপ্ত হন।এমন একটি সংবাদ ফলাও করে প্রকাশিত হচ্ছে । তা’তে দোষের কি? এত হৈচৈ কি জন্য ! তবে হ্যাঁ, যদি তাঁর নিয়োগের ব্যাপারে কোন অনিয়ম বা অবৈধ প্রভাব কেউ খাটিয়ে থাকেন, নিশ্চয় তাদেরকে খুঁজে বের করে আদালতে দাঁড় করানো উচিত।

ইতিমধ্যে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম ও মুখরোচক জনশ্রুতির মাধ্যমে জানা যায়, অভিযুক্ত ওসি নামে বে-নামে শতকোটি টাকার মালিক। এই অভিযোগের কিয়দাংশ সত্য হলেও বলা যায় প্রদীপ দাস এযাবৎ কালের সবছেয়ে দুর্নীতিবাজ পুলিশ কর্মকর্তা। দেশের পুলিশ বিভাগের ভাবমূর্তি ম্রিয়মান করার জন্য এরকম একজন লোকই যথেষ্ট ।

প্রদীপ দাসের এত পয়সার উৎস কোথায় ? একজন অন্ধলোকও তা জানেন।প্রশাসন কি তা জানেন না ? স্পর্শকাতর এই প্রশ্নটি সারা দেশবাসীর। তার পাপার্জিত পয়সার পরিমান যদি বাস্তবিক অর্থে শতকোটি ছাড়িয়ে যায়, তবে ইহা হলফ বলা যায়, তার পাপ কর্মের সাথে একটি সুসংগঠিত ও ভয়ংকর জালিযাতী চক্র জড়িত রয়েছে।এবং তা হচ্ছে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় । কারন, কোন একব্যক্তির পক্ষে এমন শক্ত দুর্নীতির দুর্গ গড়ে তুলা অস্বাভাবিকই নয় অচিন্তনীয়ও বটে। অতএব, তাঁর পিছনের ঐ লোক গুলো কারা তাও দেশবাসী জানতে চায়, পক্ষপাতহীন ভাবে।

লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক ও কলামিস্ট।

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.