

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী – একজন অধ্যাপকের কাঠগড়ায়: মাহবুবুল হক ও জাসদ – বাসদের রাজনীতি
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী (জন্মঃ ২৩শে জুন, ১৯৩৬) লেখক, প্রাবন্ধিক ও শিক্ষক। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজী ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে দীর্ঘকাল অধ্যাপনা করেছেন। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলা প্রবন্ধ সাহিত্য যাদের নিরলস অবদানে সমৃদ্ধ তিনি তাদের অন্যতম।
তিনি মার্কসবাদী চিন্তা-চেতনায় উদ্বুদ্ধ। নতুন দিগন্ত পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ১৯৮০-এর দশকে “গাছপাথর” ছদ্মনামে তিনি দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় সামাজিক ও রাজনৈতিক বিষয়ে সাপ্তাহিক প্রতিবেদন লিখে খ্যাতি অর্জন করেন।
আ ফ ম মাহবুবুল হক ও তার সময়ের রাজনীতি শিরোনামে স্মরক গ্রন্থের সবচেয়ে বড় ও ‘ গুরুত্ব ‘ পূর্ণ লেখা লিখেছেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। প্রায় বার হাজার শব্দের সুখ পাঠ্য লেখা ।
মাহবুবুল হককে উপলক্ষ করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাসদ রাজনীতির এক ধরণের বিচারমূলক সমালোচনা করছেন। বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মীদেরকে চিন্তার খোরাক যোগাবে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী জাসদ এর উত্থানকে ‘ তরুণদেরকে কমিউনিস্ট হওয়া থেকে বিরত রাখার’ প্রকল্প হিসেবে দেখে আসছেন প্রথম থেকেই। তবে এই লেখায় সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী তার পূর্বের অবস্থান পরিবর্তন না করেই মাহবুবুল হককে কমিউনিস্ট বিরোধী প্রকল্পের ‘ চিন্তার দৈন্য এবং পেটিবুর্জোয়া অস্থিরতা ‘ থেকে মুক্ত মানুষ হিসাবে দেখেছেন ! একদল ‘ প্রতি বিপ্লবী ‘ [ জাসদ ] এর মধ্যে একজন ‘ বিপ্লবী [ মাহবুবুল হক ] কিভাবে টিকে থাকলেন কিংবা বিকশিত হতে পারলেন সেই বিষয়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী কোন যুক্তি দেখানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করনি।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বাম রাজনীতিতে চীন পন্থী ঘরনার মানুষ হিসেবে পরিচিত। চীনপন্থী করা? এর সাধারণ সংগা দাড় করানো কঠিন। এদের মধ্যে ছিলেন পূর্ব পাকিস্থান পন্থী, পূর্ব বাংলা পন্থী, নকশাল আন্দোলনের প্রতক্ষ্য ও পরোক্ষ প্রভাবাধীন আধা ডজন উপরে দল বা গ্রূপ। সাধারণ ভাবে বামপন্থী হওয়ার মধ্যে দিয়ে বিপ্লবী ভাব ঘ্রান বজায় রাখার সুযোগ থাকে। দেশে দেশে শিক্ষক, বুদ্ধিজীবীদের একাংশের মধ্যে এই প্রবণতা সহজেই চোখে পড়ে। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী রাজনৈতিক কর্মকান্ডে যুক্ত নন,তবে তাঁর লেখার বড় অংশ সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতি নিয়ে লেখা।
আইয়ুবের সামরিক শাসনামলে কিশোর মাহাবুবুল হক যখন স্কুল ছাত্র অবস্থায় প্রতিবাদে রাস্তায় নেমেছিলেন সেই সময়ে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর অবস্থা ছিল লেজে গোবরে কিংবা লেজে গোবর নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর মত। এ প্রসঙ্গে আহমেদ ছফা লিখছেন ” আইয়ুব খান সাহেব ক্ষমতায় আসার পরে লেখক – সাহিত্যিকদের কিনে নেওয়ার জন্য ‘ পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড ‘ নামে একটি প্রতিষ্টান গঠন করে ছিলেন। ……….. তখন রাইটার্স গিল্ডের পূর্বাঞ্চলীয় শাখার সভাপতি সিলেন স্বর্গত ড. এনামুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক ছিলেন ড. সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ” (১)
আইউব শাসন কালে মাহবুবুল হক স্কুল ছাত্র ছিলেন । ” ৬২ সালের আইউব বিরোধী শিক্ষা আন্দোলন চলাকালে মিছিলে গিয়ে পুলিশী নির্যাতনের শিকার হবার মধ্যে দিয়ে ছাত্র রাজনীতিতে যুক্ত হন তিনি [ মাহবুবুল হক ] ” (২)
মুক্তিযুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তান প্রশাসনের অধীনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। সবাইকে অস্র হাতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে হবে এমন নয়। যে যার সামর্থ অনুযায়ী কাজ করার নৈতিক দায়িত্ব থেকে যায়। যুদ্ধে অংশ না নিয়ে অনেক মানুষ শহর থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। যুদ্ধে অংশ না নেওয়া আর পাকিস্তান প্রশাসনকে সচল রাখা, টিকিয়ে রাখতে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক ‘ কাজ’ করার মৌলিক পার্থক্য অনেক।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মাহবুববুল হকের রাজনীতি যুক্ত হওয়া সম্পর্কে লিখছেন –“সে [মাহবুবুল হক ] যে ছাত্রলীগে গিয়েছিল তার প্রধান কারণ সম্ভবত ছাত্র ইউনিয়নকে সে কাছে পায়নি। মস্কোপন্থীদের সঙ্গে তো যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। পিকিংপন্থীও তার সময়ে ছিল দ্বিখণ্ডিত অবস্থায়।“(৩) পন্ডিত মানুষেরা জানেন কি করে তথ্য – পরিসংখান সামান্য একটু দুমড়ে মুচড়ে নিজেদের প্রয়োজনে ব্যবহার করতে হয়। এখানে সিইচৌ এই কাজটি করেছেন। ছাত্র ইউনিয়ন বিভক্তি হয় ১৯৬৫ সনের এপ্রিল মাসের প্রথম সপ্তাহে ।(৪) মাহবুবুল হক ১৯৬০ সাল থেকে মাহবুবুল হক চট্টগ্ৰামে বসবাস করতেন। চট্টগ্রাম মুসলিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ১৯৬৪ সনে কুমিল্লা বোর্ডে চতুর্থ স্থান লাভ করেন। ১৯৬৪-১৯৬৬ এ চট্টগ্রাম কলেজের ছাত্র থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় ষোলতম স্থান লাভ করেন।(৫) ১৯৬৪-১৯৬৬ সনে ছাত্র আন্দোলনে জড়িয়ে গিয়ে মাহবুল হক ক্লাসে গড় হাজিরার কারণে কলেজ কর্তৃপক্ষ মাহবুবুল হককে বোর্ডের পরীক্ষা দেওয়া অনুমতি দিতে প্রাথমিক ভাবে অস্বীকৃতি জানিয়েছিল। এ বিষয়ে ডা. মাহফুজুর রহমান লিখছেন ” মাহবুব আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, চট্টগ্রাম কলেজে একই সঙ্গে পড়তাম, সে মানবিক শাখায়, আমি বিজ্ঞানে। চট্টগ্রাম কলেজে দু’জনই ছাত্রলীগের সংগঠন ‘যাত্রিক’ করতাম। চট্টগ্রাম কলেজে আন্দোলনের কারণে ক্লাসের উপস্থিতির হার কম থাকায় বিভাগ থেকে তাকে এইচ এস সি পরীক্ষার অনুমতি দেওয়া হচ্ছিল না। ছাত্র নেতারা মাহবুবকে নিয়ে কলেজ অধ্যক্ষের সঙ্গে দেখা করলে তিনি রাজি হন। এ পরীক্ষায় মাহবুব কুমিল্লা বোর্ডে দশম স্থান অধিকার করেছিল। এছাড়া এস এস সি পরীক্ষায়ও সে একই বোর্ডে ৪র্থ স্থান অধিকার করেছিল। তখন তো বলা হত মেধাবী ছাত্ররা সব ছাত্র ইউনিয়ন করে। মাহবুব সেটা মিথ্যা প্রমাণ করেছিল। এটা ১৯৬৪–৬৬ সালের কথা। “ (৬)
১৯৪৭ থেকেই চট্টগ্রাম ভূখণ্ডের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর। এই শহরে ছাত্র ইউনিয়ন ও কমিউনিস্ট পার্টির পদচারণা ছিল। মাহবুবুল হকের আশে -পাশে ছাত্র ইউনিয়ন সক্রিয় না থাকার সম্ভবনা শূন্যের কোঠায়। পঙ্কজ ভট্টাচার্য ছাত্র ইউনিয়নের সাথে চট্টগামে যুক্ত ছিলেন ১৯৫৮ থেকে। ১৯৬৪-১৯৬৫ সালে পঙ্কজ ভট্টাচার্য ছাত্র ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ছিলেন।এর পরেও কি শুধু মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লিখেছেন বিধায় মেনে নিতে হবে ১৯৬২-১৯৬৪ সনে চট্টগামে মাহবুবুল হকদের পদচারণার সময় ধারে কাছে ছাত্র ইউনিয়ন ছিল না!
রাজধানী ও বড় শহরের মধ্যবিত্ত মানুষের ছোট শহর বা গ্রাম অঞ্চল থেকে উঠে আসা মানুষদের নিচু চোখে দেখে থাকেন। সম্ভবত জনাব চৌধুরী অধ্যাপক ভেবে ছিলেন নোয়াখালীর চাটখিল থানার মাহবুব সে আর কি করে ছাত্র ইউনিয়ন সম্পর্কে জানবে। এই জাতীয় প্রবণতা থেকেই সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী মাহবুবুল হকের রাজনৈতিক কর্মকান্ড সম্পর্কে ভাল ভাবে খোঁজ না নিয়েই ছাত্রলীগে ‘ গড়াল’ শ্রেণীর ছাত্ররা করেন এমন পূর্ব ধারণা থেকে যা লেখার তা লিখেছেন জনাব চৌধুরী অধ্যাপক।
মাহবুবুল হক কেন ছাত্র ইউনিয়নে যোগ দেননি এমন একটি ব্যাখ্যা সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী একই লেখায় দিয়েছেন ” ছাত্র ইউনিয়নই তখন ছিল কিছুটা এলিটিস্ট, যে জন্য অবস্থাপন্ন ঘরের সন্তানরা সংগঠনিকভাবে ছাত্র ইউনিয়নকেই পছন্দ করতো। আর মাহবুব তো এসেছে একেবারেই নিম্ন–মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে।“ – এই ব্যাখ্যার সাথে অনেকেই এক মত হওয়ার সম্ভবনা রয়েছে। এই মন্তব্যের দিকে তাকালে অনেক গুলো ঐতিহাসিক সত্য সামনে আসে। প্রথমতঃ কৃষি প্রধান গ্রাম অঞ্চল থেকে আসা ছাত্ররা ‘ভদ্র’ লোকদের সংগঠন ছাত্র ইউনিয়নের সাথে একাত্মা হতে পাড়ছিলেন না। যেমনটি ঘটেছে মাহবুবুল হকের ক্ষেত্রে। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবার থেকে উঠে আসা ছাত্ররা ছাত্র ইউনিয়নের সাথে একাত্মা হতে না পারার কারণেই ছাত্রলীগের উত্থান কে সহজ করে তুলেছিল। ছাত্রলীগের এই উত্থানে মাহবুবুল হকের ভূমিকা অবিস্মরণীয়।
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মাহবুবুল হক সম্পর্কে যে মূল্যায়ণ করেছেন তা কিন্তু নতুন লেখা নয়। ‘আ ফ ম মাহবুবুল হক ও তার সময়ের রাজনীতি’ বিষয়ে এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজক সমাজ উন্নয়ন রূপান্তর কেন্দ্র নামে একটি সংগঠন। এই বই প্রকাশের মাস ছয়েক আগে আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ সপ্তদশ স্মারক বক্তৃতায় অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী যে প্রবন্ধ পাঠ করেন সেই প্রবন্ধ ‘ যে জীবন জনতার কমরেড মাহবুবুল হক স্মারক গ্রন্থে পুনঃমুদ্রিত হয়েছে। ইতিপূর্বে এই লেখা অন্যত্র প্রকাশিত হয়েছিল। ‘আ ফ ম মাহবুবুল হক ও তার সময়ের রাজনীতি’ বিষয়ে এই স্মারক বক্তৃতার আয়োজক সমাজ উন্নয়ন রূপান্তর কেন্দ্র নামে একটি সংগঠন। স্মরণিকা প্রকাশনার সাথে জড়িতরা সামান্য উদ্যোগী হলে অধ্যাপকের ‘ মামুলী ‘ ভুল গুলো প্রমান সহ সংশোধনের জন্য অনুরোধ করতে পারতেন।
জাসদ সম্পর্কে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর – সিইচৌ এর এই ধারণা নতুন কিছু নয়। সিইচৌ মাহবুবুল হক মূল্যায়নকে এক কথায় বলা যেতে পারে জাসদীয় বিষ বৃক্ষের ঔষধি ফল হচ্ছেন মাহবুবুল হক! পাঁচ বছর আগে সিইচৌ জাসদ রাজনীতি নিয়ে ভাবনা ভিন্ন ছিল, সেই ভাবনায় জাসদ পুরোটাই ছিল বিষ বৃক্ষ। সাম্প্রতিক সময়ে পূর্বের অবস্থান থেকে সামান্য হেলে গিয়ে জাসদের মধ্যে মাহবুবুল হক কে ব্যাতিক্রম হিসেবে ‘ খুঁজে’ ফিরেছেন।
এই প্রবণতা নতুন কিছু নয়। এর আগে জাসদ রাজনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন করে কর্নেল তাহেরকে উপস্থাপন করে বাজারজাত করার সফল উদাহরণ রয়েছে। মাহবুবুল হক এই স্রোতধারার নতুন সংযোজন। সিইচৌ এই ঝুঁকে পড়ার পিছনের সঠিক কারণ হয়তো কখনোই জানা সম্ভব হবে না। সাধারণ ভাবে ধারণা করা যেতে পারে ,বামপন্থী আন্দোলনের ক্ষয়ে যাওয়া স্রোতের অবশিষ্ট অংশকে শ্রোতা হিসেবে পাওয়ার প্রত্যাশা সিইচৌ এর নতুন উপলব্ধির পিছনে কাজ করে থাকবে।
বামপন্থার ভাঙ্গনী কুল – ক্ষয়ে যাওয়ার কালে সিইচৌ জাসদীয় ধারার শ্ৰোতা ও ভক্ত কুলকে কাছে টানতে চেষ্টা করছেন তা স্পষ্ট। ২০১৭ সালের নভেম্বর মাসে ঢাকায় মাহবুব স্মরণ সভায় এই যাত্রার শুরু। এই ধারাবাহিকতায় যে জীবন জনতার বইয়ে প্রকাশিত মাহবুব সম্পর্কিত প্রবন্ধ। এই প্রবন্দ্বটি আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ স্মরাক বক্তিতায় পাঠ করেন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। একজন সাহিত্যিকের কর্ম ও অর্জনের সভায় কেন এই প্রবন্ধ পাঠ নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস অনেকেই জুগিয়ে উঠতে পারবেন না সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের উচ্চাসনের কারণে। তবে সিইচৌ এই জাতীয় উদ্যোগ ‘ ধান বানাতে শীবের গীত ‘ ।
মুক্তমনা – অনলাইন, জানুয়ারী ২০১৭ সালের জাসদ সম্পর্কিত সিইচৌ এর সাক্ষাৎকারে বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠে। ” জাসদ ছিল শেখ মুজিবের ওপরে নির্ভরশীল, তাই শেখ মুজিবের মৃত্যুর সাথে সাথে জাসদের রাজনীতিও শেষ হয়ে যায়। জাসদ কি? জাসদ মুজিব বাহিনীরই একটা উত্তরাধিকারী, অনুসারী একটা অংশ। মনে রাখা দরকার, মুজিব বাহিনী কেন গঠন করা হয়েছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য নয়, মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল বামপন্থীদের দমন করার জন্য। ‘র’ই ওটা করেছিল, ঐ উদ্দেশ্যেই। ওরা কোথায়ও যুদ্ধ করে নি। ওরা হত্যা করেছে, হত্যা করেছে বামপন্থীদের। বামপন্থী নিধনের প্রস্তুতি তারা নেয় একটা আতঙ্ক থেকে, একটা আশঙ্কা থেকে। তা হলো, শেখ মুজিব নাও ফিরতে পারেন। যদি না ফেরেন, বা যদি বিলম্বে ফেরেন, তাহলে কি হবে। তা হলে নেতৃত্ব চলে যাবে বামের হাতে। ”
এই বক্তব্যের প্রায় প্রতি অংশই প্রশ্নের মুখোমুখী। সাক্ষাৎকার ২০১৭ এর জানুয়ারীতে প্রকাশিত হলেও মুক্তমনা পাদটীকায় লিখছে , সাক্ষাৎকার টি ফেব্রুয়ারি ২০১৫ নেওয়া। ২০১৫ সালে ধারনকৃত এই সাক্ষাৎকারে মাহবুবুল হককে ‘ ব্যতিক্রম’ সনদ দেওয়ার দিকে তখনও ঝুকে পড়েন নি অধ্যাপক সিইচৌ।

” ওরা [ মুজিব বাহিনী ] কোথায়ও যুদ্ধ করে নি। “ –
১৯৭১ সালের যুদ্ধকালীন সময়ে পূর্ণ বেতনে কলেজ- বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশাসনে যারা কাজ কর্ম করছেন তাঁরা পরোক্ষভাবে পাকিস্তান প্রশাসনকে টিকেয়ে রাখতে অনুঘটকের ভূমিকা পালন করেছেন। জনাব চৌধরীর যুদ্ধকালীন ভূমিকা ছিল ” দাদা, আমি সাতে-পাঁচে থাকি না ” ধাঁচের। যুদ্ধকালীন সময়ে তিনি ঢাকা বিশ্ব বিদ্যালয় ক্যাম্পাসেই অবস্থান করতেন । মুজিব বাহিনী সম্পর্কে এই তথ্য কোথায় পেলেন জনাব অধ্যাপক কোন তথ্য সূত্র উল্লেখ করার প্রয়জোনীয়তা তিনি দেখেনি। বিএলএফ [ মুজিব বাহিনী ] এর কাঠামো সম্পর্কে খুব স্পষ্ট ধারণা নেই অধ্যাপক সিইচৌ এর । হয়তো বা অবজ্ঞা বশতঃ জানা বোঝার চেষ্টা – উৎসাহকে অবদমিত করে থাকবে। বিএলএফ এর রণনীতি ও কৌশল এর সীমাবদ্ধতা ছিল , সেটা পৃথক আলোচনার দাবী রাখে। বিএলএফ সারাদেশেই যুদ্ধ করেছে। এই বিষয়ে বেশ কিছু প্রকাশনা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর – আবু সাঈদ খান (৭)এর বইয়ে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে বিএলএফ এর সক্রিয়তার কথা লেখা রয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে আমি ও আমার বাহিনী – আকবর হোসেন (৮), শ্রীপুরের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা বইয়ে যুদ্ধে বিএলএফ এর অংশ গ্রহণের কথা উল্লেখ করেছেন লেখক। উল্লেখ্য লেখক মুক্তিযোদ্ধা আকবর হোসন বিএলএফ প্রশিক্ষিত মুক্তি যোদ্ধা ছিলেন না।,যুদ্ধ দিনের গেরিলা – ইকতিয়ার চৌধুরী (৯), রক্তে জেগে ওঠে – মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস : সিরাজগঞ্জ লেখক ইমতিয়ার শামীম (১০)
প্রথম তিনটি বইয়ের লেখকগণ রণাঙ্গণের যোদ্ধা ছিলেন, যুদ্ধ স্মৃতি ও যুদ্ধ কালীন সাংগঠনিক বিষয়াদি নিয়ে লিখেছেন। চতুর্থ বইয়ের লেখক ইমতিয়ার শামীমের তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন। এই বইগুলি নিয়ে নানা জনের নানা মত থাকতে পারে, কেউ কেউ কোন একটা বইয়ে অতি কথন কিংবা ব্যাক্তিগত বীরত্বকে ফুটিয়ে তোলার চিহ্ন রেখা খুঁজে পেলেও পেতে পারেন। ভিন্ন মত ও সমালোচনার দরজা উন্মুক্ত থাকুক। তবে এই বই গুলো থেকে শুধু মাত্র একটি বক্তব্যকে সামনে আনতে চাই । বিএলএফ মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিল এই বই গুলো বিএলএফ প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধা ও যুদ্ধাঞ্চলের নাম গুলো তুলো ধরেছে । ” ওরা [ মুজিব বাহিনী ] কোথায়ও যুদ্ধ করে নি ” – এই বক্তব্য যারা বয়ে বেড়ান তারা ইচ্ছা প্রনোদিত অন্ধত্ব আঁকড়ে ধরেছেন। সারা দেশের যুদ্ধের জন ইতিহাস লিখিত ও সংগৃহিত হলে বিএলএফ সহ সকলের সঠিক ইতিহাস বাইরে আসবে।
বি এলএফ অপরাপর মুক্তিযোদ্ধা গ্রূপের সাথে মিলে কাজ করতে না পারার যে অভিযোগ রয়েছে, আকবর হোসেন ও ইমতিয়ার শামীমের বইয়ে এই অভিযোগ কে খণ্ডন করার মত যথেষ্ট তথ্য রয়েছে। আকবর হোসেন তার বইয়ে বিএলএফ হাইকমান্ডের একটি চিঠি উদৃত্তি করেছেন – ৬৩পৃষ্ঠা। অতি অল্প কথার চিঠিতে উঠে এসেছে অন্য গ্রূপের সাথে একীভূত প্রতিরোধ যুদ্ধকে এগিয়ে নেওয়ার কথা ।
সিরাজগঞ্জের মুক্তি যুদ্ধে বিএলএফ এর ভূমিকা অনন্য, তৎকালীন সিরাজগঞ্জ মহকুমার ৯টি থানার বড় অংশ দেশের মধ্যে থেকেই যুদ্ধ করেছে। পলাশ ডাঙ্গা যুব শিবির সিরাজগঞ্জের মুক্তি যুদ্ধ পরিচালনা করে। ভারত থেকে প্রশিক্ষত বিএলএফ যোদ্ধা ও স্থানীয় ভাবে প্রশিক্ষত যুদ্ধরা একই কমান্ডের অধীনে যুদ্ধ করেছেন। ইমতিয়ার শামীম লিখছেন ” তাত্বিক ভাবে এটি প্রতিষ্টিত সত্য যে , বিএলএফ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছিল বিশেষ রাজনৈতিকলক্ষ্য থেকে এবং তা প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে ছিল না। কিন্তু প্রশিক্ষণ গ্রহণকারী মুক্তিযোদ্ধারা রণাঙ্গনে ফিরে এসে কি ভূমিকা রেখেছেন কিংবা প্রশিক্ষণ গ্রহণের ক্ষেত্রে তাদের প্রকৃত মনোভাব কী ছিল , তা নিয়ে কখনোই বিশদ অনুসন্ধান ও আলোচনা করা হয় নি। সিরাজগঞ্জের রণাঙ্গণের ক্ষেত্রে দেখা যায়, বিএলএফ প্রশিক্ষণ নিয়ে যারা সিরাজগঞ্জে ফিরে এসেছিলেন , তাদের সবাই এখানে মুক্তিবাহিনী ও বিভিন্ন স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা দলের সাথে একীভূত হয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেন। ” – পৃষ্ঠা ২৩৪
যাঁরা বলে থাকেন মুজিব বাহিনী – বিএলএফ সদস্যরা কোথায় যুদ্ধ করেনি তাঁরা অনেকেই অতি সাধারণ অংকের ধারে কাছে যেতে চান না। বিএলএফ এর সদস্য সংখা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে, রক্ষণশীল ভাবে বলা হয় এই সংখ্যা ৭ হাজার। এই সাত হাজার সদস্য ভারতে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত। বিএলএফ সদস্যদের থাকা – খাওয়া ও ট্রেনিং বাবদ ভারত সরকারকে বিপুল পরিমান অর্থ গুনতে হয়েছে। বিএলএফ সদস্যের প্রশিক্ষণের পর নিষ্ক্রিয় রেখে ‘পালন’ করতে ভারতীয় রাষ্ট্র যন্ত্রের কত অপচয় হত সে বিষয়টি বিবেচনায় আনলে অনেকেই অমূলক দাবী থেকে সরে দাঁড়াবেন। ভারতীয় রাষ্ট্র – আমলাতন্ত্র বিএলএফ এর সদস্যদের ট্র্রেনিং ও উন্নত অস্র হাতে দেওয়ার পর নিষ্ক্রিয় রেখে বসে খাওনোর মত নির্বোধ ছিল না। এক সাথে সাত হাজার বিএলএফ সদস্য ক্যাম্পে থাকার কোন সুযোগ ছিল না। এই কারণে ধাপে ধাপে বিএলএফ সদস্যরা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত হয়েছে। ইচ্ছায় – অনিচ্ছায় ভারতে প্রশিক্ষণ শেষে বিএলএফ সহ অপরাপর মুক্তিযোদ্ধাদের বাংলাদেশে পাঠানো হত কিংবা আসতে বাধ্য করা হত। ট্রেনিং শেষে বাংলাদেশের মধ্যে পাঠানো ভারত সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক লাভ ছিল। প্রশিক্ষণ ক্যাম্প ছাড়ার সাথে সাথেই একটি নির্দিষ্ট ব্যাচের জন্য যে খরচ হত তা কমে আসতো , যা পরে নতুনদের প্রশিক্ষণ এর জন্য ব্যবহার এর জন্য বরাদ্দ হত। অর্থনীতির পরিভাষায় এই প্রক্রিয়ার নাম বাজেট ম্যানেজমেন্ট।
বিএলএফ সহ অপরাপর মুক্তিযোদ্ধাদের দেশের মধ্যে পাঠানোর মধ্য দিয়ে ভারত সরকার বাংলাদেশের অভ্যান্তরে পাকিস্তান বাহিনীকে ব্যাস্ত রাখার মধ্যে দিয়ে ভারত- বাংলাদেশ সীমান্ত ও ভারত – পাকিস্তান সীমান্ত অপেক্ষাকৃত ঝামেলা মুক্ত রাখতো। আর যুদ্ধ দিনে বাংলাদেশের মধ্যে যুবক শ্রেণীর স্বাভাবিক চলাফেরা যে কোন ভাবেই নিরাপদ ছিল না তা সকলের জানা। অস্র হাতে নিয়ে ফেরা যুবকদের কোন না কোন ভাবে যুদ্ধে জড়িয়ে যাওয়ার বিকল্প ছিল না। যুদ্ধে অংশ নেওয়া যুবকদের বড় অংশ গ্রাম ও মফস্বল শহর থেকে আসা, এই যুবকদের যুদ্ধ কিংবা আত্ম সমর্পনের কোন বিকল্প ছিল না। বাড়ী ফিরলে পাকিস্তান প্রশাসন কিংবা রাজাকারদের হাতে মারা পড়ার সূমহ সম্ভবনা ছিল। এই ক্ষুদ্র – ক্ষুদ্র সাধারণ বিষয় গুলো আমলে নিলে বিএলএফ দেশে ফিরে যুদ্ধ করেনি এমন তত্ব প্রচারের প্রবণতা কমে আসবে।
“মুজিব বাহিনী গঠন করা হয়েছিল বামপন্থীদের দমন করার জন্য। ‘র’ই ওটা করেছিল, ঐ উদ্দেশ্যেই।” –
বাংলদেশের অভ্যুদ্বয়ের লড়াইয়ে ভারতীয় রাষ্ট্র সর্বাত্মক ভাবে যুক্ত। ভারতীয় রাষ্ট্র যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ প্রতিরোধ সংগ্রাম, উদ্বাস্তু পুনর্বাসন, সরকার গঠন, ইউরোপ – আমেরিকার দেশগুলোতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রচার চালানোর কাজ করেছে। বাইরে থেকে এই বিভিন্ন সংস্থার কাজ গুলো পৃথক পৃথক মনে হলেও সব কাজ ছিল পরিকল্পিত।
ভারতীয় রাষ্ট্রের যে অংশ তাজউদ্দীন আহমদ এর সাথে যোগাযোগ রেখেছে আর যে অংশ বিএলএফ এর সাথে যোগাযোগ – পৃষ্ঠপোষকতা করতো তাদের মধ্যে কে কতটুকু মানবিক বা কমিউনিস্ট বিরোধী তা খুজে সান্ত্বনা পাওয়া চেষ্টাতে কোন লাভ নেই। ভারতীয় সকল অঙ্গ সমান ভাবে প্রতিক্রিয়াশীল ছিল ও সমন্বিত ভাবে কাজ করেছে।
ভারতীয় রাষ্ট্রের পৃথক কিংবা আপাততঃ দৃশ্যমান পরস্পর বিরোধী কাজ গুলো ছিল একই সূত্রে গাঁথা , ভারতীয় রাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করা।১৯৭১ সালের যুদ্ধ কালীন সময় ভারত ছিল একচেটিয়া পুঁজিবাদী চরিত্রের সরকার। বাংলাদেশের অভুদ্বয়ের লড়াইয়ের ভারতীয় সমর্থন , তাজউদ্দিন সরকার থেকে বিএলএফ কোনটাই অপরিকল্পিত, মানবিক কিংবা স্বার্থহীন ছিল না। ভারতীয় পুঁজির বিকাশের স্বার্থে নানা মুখী পরিকল্পনার অংশ ছিল । ভারতীয় রাষ্ট্র যন্ত্রের স্বার্থ রক্ষায় পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডার জেনারেল অরোরা আর RAW এর দায়িত্ব পর্যাপ্ত জেনেরাল উবানের মধ্যে পার্থক্য নেই। যারা এই পার্থক্যকে সামনে আনতে চেষ্টা করে থাকেন তারা নানা ভাবে ভারতীয় পুঁজির আধিপত্যবাদী চরিত্রকে আড়াল করে থাকেন।
মুজিব বাহিনীর আনুষ্ঠানিক নাম ছিলো বেঙ্গল লিবারেশন ফ্রণ্ট – বিএলএফ। আফম মাহবুবুল হকও এই বিএলফের সদস্য ছিলেন, প্রশিক্ষক ছিলেন। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অভিযোগ করেছেন যে, ১৯৭১ সালে মুজিব বাহিনী তৈরি করা হয় বামপন্থীদের মারার জন্যে।
বিএলএফের মধ্যেও ছাত্রলীগের মতোই ডানপন্থী-বামপন্থী বিভক্তি ছিলো। যুদ্ধকালীন সময়ে বিভিন্ন গ্রূপের মধ্যে হানাহানির ঘটনা দুঃখজনক কিন্তু বিরল নয়। আত্মঘাতী খুনাখুনি হয়েছে বিএলএফ এর নিজেদের মধ্যেই। স্বপন চৌধুরীর নিখোঁজ হয়ে হওয়ার ঘটনা বহুল আলোচিত। স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশের প্রস্তাবক স্বপন কুমার চৌধুরীকে ১৯৭১ সালের ১৮ই ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের এক হাসপাতালে আহত অবস্থায় হত্যা করা হয় এবং এর জন্যে শেখ ফজলুল হক মণিকে দায়ী করা হয়। খুনাখুনি হয়েছে বিএলএফ – মুক্তিযোদ্ধা , মুক্তিযোদ্ধা নিজেদের মধ্যে, চীনপন্থী বামপন্থী ও স্বাধীনতা পন্থীদের মধ্যে। কত জন চীনপন্থী মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে খুন হয়েছেন তার পরিসংখান নেই। তবে এই খুনাখুনির ইতিহাস অধিকাংশ সময়েই পুরোনো ঘটনার জের। যেমন পাবনায় ১৯৭০ সালে তৎকালীন এমপি রফিক আহমদ খুন হয় নকশাল পন্থীদের হাতে। যুদ্ধকালীন সময়ে আরো তিন চারজন ছাত্রলীগ কর্মী খুন হন নকশাল পন্থীদের হাতে। এই ঘটনার দুঃখজনক জের হিসেবে যুদ্ধত্তোর কালে নকশাল পন্থীদের ৪/৫ জন খুন হন।
“বামপন্থী নিধনের প্রস্তুতি তারা নেয় একটা আতঙ্ক থেকে, একটা আশঙ্কা থেকে। ”
যুদ্ধকালীন সময়ে শেখ মুজিব পাকিস্তানিদের হাতে খুন হয়েছেন এমন আশংকা ছিল বিএলএফের মধ্যে। যদি শেখ মুজিব ফিরে না আসতেন তবে বিএলএফ তেমন কোন ভূমিকা রাখতে পারত না। যুদ্ধের ও রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ তাজউদ্দীন আহমদের হাতে ছিল। . তিনি নিয়ন্ত্রণ করতেন মুজিব নগর প্রশাসন, পরবর্তীতে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রশাসন। যুদ্ধের মধ্যদিয়ে দেশের নানান জায়গায় মুকিযোদ্ধা প্রশাসনকে হটিয়ে দিয়ে তাজউদ্দিন আহমেদ পুরানো পাকিস্তনী প্রশাসনকে সামান্য অদল -বদল করে শাসন ব্যাবস্থার নিয়ন্ত্রণ নেন। মুজিব ফিরে না আসলে প্রশাসনের পালাবদল কিছুটা গোলমেলে হওয়ার সম্ভবনা ছিল। ঢাকা প্রশাসন ও ভারতীয় বাহিনী যেহেতু তাজউদ্দিন আহমদের সরকারের সাথে ছিল বিএলএফ খুব সুবিধা করে উঠার সম্ভবনা ছিল শূন্যের কোঠায়।
বামপন্থীদের ক্ষমতা দখলের সম্ভবনা কতটুক ছিল? লেখক – গবেষক আফসান চৌধুরী এ সম্পর্কে বলেন ” দেশের ভেতরে চীনা বামরা একাধিক স্থানে সক্রিয় ছিল; যেমন, সিরাজ সিকদার পেয়ারা বাগানে, মান্নান ভুঁইয়া নংসিংদীর লৌহজং এলাকায়, মতিন, টিপু বিশ্বাস পাবনায় ইত্যাদি। তবে কোনো জাতীয় বামযুদ্ধ হওয়া অসম্ভব ছিল, যেহেতু বামরা ছিল বহুভাগে বিভক্ত।”
“চীনারা কোনো দিনই মূল শক্তির জায়গায় যেতে পারেনি। তাছাড়া তাদেরও বড় সময় ১৯৬৯ এর গণআন্দোলন, যেটার নেতৃত্বে ছিল আওয়ামী লীগ। পরবর্তীতে তারা জিয়াউর রহমানের দলের ভেতর প্রবেশ করে মিলিয়ে যায়, ঠিক যেভাবে বাকশালের ভেতরে সোভিয়েত বাম মিলিয়ে গিয়েছিল।” ( opinion.bdnews24.com- ২৩ নভেম্বর, ২০১৪ )
তথ্য সূত্র:
(১) একাত্তরের মহাসিন্ধুর কল্লোল – আহমেদ ছফা, পৃষ্টা -৭৭, বেহাত বিপ্লব ১৯৭১- সলিমুল্লাহ খান সম্পাদিত। আগামী প্রকাশন। ফেব্রুয়ারী ২০০৭। ঢাকা
(২) আ ফ ম মাহবুবুল হক সাক্ষাৎকার – সাপ্তাহিক রোববার, ১৬ জুলাই ২০০৪। ঢাকা। এই সাক্ষাৎকার মাহবুব স্মরণিকায় মাহবুব রচনা শিরোনামে পুনঃপ্রকাশ হয়েছে। পৃষ্টা -৪৬৬
(৩) যে জীবন জনতার’ কমরেড আ ফ ম মাহবুবুল হক স্মারক গ্রন্থ, পৃষ্ঠা ১৫-১৬।
(৪) বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস – নিতাই দাস, পৃষ্টা -৩৩ প্রকাশক- বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন, ঢাকা।
(৫) আ ফ ম মাহবুবুল হক সাক্ষাৎকার – সাপ্তাহিক রোববার, ১৬ জুলাই ২০০৪। ঢাকা।
(৬) আমার বন্ধুকে যেমন দেখেছি- ডা. মাহফুজুর রহমান- যে জীবন জনতার’ কমরেড আ ফ ম মাহবুবুল হক স্মারক গ্রন্থ, পৃষ্ঠা-
(৭) মুক্তিযুদ্ধে ফরিদপুর – আবু সাঈদ খান –
(৮) মুক্তিযুদ্ধে আমি ও আমার বাহিনী – আকবর হোসেন, শ্রীপুরের
(৯) যুদ্ধ দিনের গেরিলা – ইকতিয়ার চৌধুরী
(১০) রক্তে জেগে ওঠে – মুক্তিযুদ্ধের আঞ্চলিক ইতিহাস: সিরাজগঞ্জ- লেখক ইমতিয়ার শামীম

অপু সারোয়ার
লেখক পরিচিতি :১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল – বাসদ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন অপু সারোয়ার । ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বাসদ সর্মথিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য , দপ্তর সম্পাদক ও সহ – সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান এর ছাত্র ছিলেন। জেনেরাল এরশাদ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন দফায় আড়াই বছর কারাগারে ছিলেন। ১৯৯০ এর দশককে জাপান থেকে প্রকাশিত বাংলা মাসিক বাংলার মুখ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখালেখির সাথে যুক্ত। প্রকাশিত বই মার্কসবাদীরা যে উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করবে।

