
নকশাল নেতা টিপু বিশ্বাসের চোখে জাসদ-বাসদের রাজনীতি ও মাহবুবুল হক
![]() |
জাতীয় গণফ্রন্টের সমন্বয়ক কমরেড টিপু বিশ্বাস । বাংলাদেশে নকশাল আন্দোলনের অগ্র পথিকদের একজন। ১৯৬০ এর দশক থেকেই সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত টিপু বিশ্বাস। সম- সমাজ ভিত্তিক রাজনৈতিক চিন্তা ও সক্রিয়তার কারণে বিভিন্ন সময়ে কারাগারে নিক্ষেপিত হয়েছেন তিনি। |
মাহবুবুল হক স্মরণিকায় টিপু বিশ্বাস নাতি- দীর্ঘ রাজনৈতিক লেখা লিখেছেন (পৃষ্টা ১২৪-১২৬)। লেখাটি এই স্মরণিকায় স্থান করে নেওয়া অনেক স্মৃতি কথার মত যথেচ্ছাবিহারী , প্রগলভ বা নিরুদ্দেশ পন্থী নয়। এই স্মৃতি চারণে রয়েছে দার্শনিক ও রাজনৈতিক ইঙ্গিতবাহী প্রশ্ন , ছোট গল্পের বৈশিষ্ট মন্ডিত -নাটকীয় আরম্ভ ও উপসংহার টিপু বিশ্বাসের লেখাকে আকর্ষণীয় করেছে।
সময়টা ১৯৬৭ সালের ২৪ই মে ভারতের ছোট একটা গ্রাম নকশাল বাড়ি। সেই গ্রামে হঠাৎ জ্বলে উঠলো এক সংগ্রামের আগুন। সেই, আগুন চারদিক ছড়িয়ে গেলো। দিকে, দিকে একটাই শ্লোগান তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, নকশাল বাড়ি নকশাল বাড়ি। ১৯৪৭ সালের ইয়ে আজাদী ঝুটা হ্যায়-লাখো ইনসান ভূখা হ্যায় শ্লোগানের পর আবার ভারতবর্ষ কেঁপে উঠেছিল। টিপু বিশ্বাস বাংলাদেশে নকশাল আন্দোলনের অগ্র পথিকদের একজন।
চারু মজুমদারের নেতৃতেব দার্জিলং এর নকশাল বাড়ী থেকে এই আন্দোলন সূচনা হয়েছিল বলেই এই আন্দোলন নকশাল আন্দোলন নাম পরিচিত। মাওসেতুং এর চীন এই আন্দোলনকে সূচনা লগ্নে ভারতের বুকে ‘ বসন্তের বজ্র নিঘোষ ‘ হিসেবে বর্ণনা করেছিল। পাবনা শহর – যেখানে শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের নকশাল আন্দোলন।
কাকতলীয়! জনশ্রুতি আছে পাবনা শহরে রাধানগর -মজুমদার পাড়ায় চারু মজুমদারের মাতুল কূলের বাস ছিল । তৎকালীন সময়ে অন্তঃসত্ত্বা মায়েরা সন্তান জন্ম দিতে মা-বাবার বাড়িতে আসতেন। সেই সুবাদে জনশ্রুতি বা মনে করা হয় চারু মজুমদারের জন্ম পাবনায়। তবে চারু মজুমদারের জীবনীতে জন্ম স্থান হিসেবে পাবনার উল্লেখ নেই। এই প্রচেষ্টা চারু মজুমদারকে ‘ ভারতীয় ‘ বানানের প্রকল্প কিনা তা ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। চারু মজুমদারের কলেজ জীবন কেটেছে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে -এ এ কথা সার্বজনীন ভাবে স্বীকৃত।
১৯৪৭ সালে ভারত – পাকিস্তান ভাগের সময় তৎকালীন পাবনা জেলায় হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ৪০ ভাগ। এখন কমতে কমতে এই সংখা ১০ ভাগে নেমে এসেছে। তৎকালীন পাবনা শহরের রাধানগর, শালগাড়ীয়া, দিলালপুর, গোপালপুর, কালাচাঁদ পাড়া প্রভৃতি এলাকায় হিন্দুদের বসবাস বেশী ছিল। এখন রাধানগর মজুমদার পাড়া মৌজা – চৌহদ্দিতে হিন্দু মজুমদারকে দেখা মেলা ভার। ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহার ও হিন্দুদের সম্পত্তি দখলের আইনী মারপ্যাচ হিন্দু জনগোষ্ঠীকে বাস্তুচ্যুত করেছে। প্রসঙ্গতঃ মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যেও মুজমদার পদবী রয়েছে। ফার্সী মৌজা – জমির মাপ থেকে মজুমদার এসেছে।
পাকিস্তানের সূচনা লগ্ন থেকে নানান নামে আইন করে হিন্দুদের সম্পত্তি লোপাটের সুযোগ রাখা হয়। ১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তানের যুদ্ধের সময় তৎকালীন পাকিস্তান সরকার জরুরি অবস্থা ঘোষণা করে। ওই বছরই জারি হয় ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’। এই আইন প্রয়োগ করে স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় রাজনৈতিক প্রতিপত্তিশালী লোকেরা হিন্দুদের বহু সম্পত্তি আত্মসাৎ করেছে। বাংলাদেশের লুটেরা পুঁজির বিকাশে নানান নামে জারী থাকা ‘শত্রু সম্পত্তি আইন’ বড় ভূমিকা পালন করে আসছে।
রাধানগর – মুজমদার পাড়ায় রাধানগর মুজুমদার একাডেমি – শিক্ষা প্রতিষ্টান সুনামের সাথে জন শিক্ষা বিস্তারে একশত বছর ধরে চলে আসছে। হাল আমলে রাধানগর মুজুমদার একাডেমি – আর, এম, একাডেমী নামে পরিচিত হতে শুরু করেছে। নাম পরিবর্তন ইতিহাস পুনর্লিখনের অংশ। এই প্রবণতা শুধু পাবনাতেই নয় সারা দেশেই। ররিশালের ব্রজমোহন কলেজ – বি এম কলেজ , খুলনার ব্রজলাল কলেজ -বিএল কলেজ , সিরাজগঞ্জের বনওয়ারী লাল স্কুল – বি এল স্কুল নামে পরিচিতি ঘটনার শুরুটা পাকিস্থান আমলে শুরু হয়েছিল এখনো চলছে। সারাদেশেই এই জাতীয় ভুরিভুরি উদাহরণ রয়েছে। যারা এই প্রতিষ্টান গড়েছিলেন তারা কিন্তু বিএল, বিএম , আর এম নাম রেখে যান নি । এই সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এর প্রতিষ্টাতা গণ ইংরেজী শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন। তাদের কাছে ইংরেজী ও নামের সংক্ষিপ্ত করণ অপরিচিত ছিল না। ‘ লাঠি ভাঙলো না, সাপ ও মরলো ‘ এই জাতীয় পরিকল্পিত উদ্যোগ ব্যবহার করে হিন্দু সম্প্রদায়ের নাম ইতিহাস থেকে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে ।
পরিকল্পিত এই জন্য বলা যায় কারণ এই ঘটনা কোন একটি বিশেষ এলাকায় সীমাবদ্ধ নয়। প্রসঙ্গত পাবনা শহরে বাংলা ছবির কিংবদন্তির নায়িকা সুচিত্রা সেনের পত্রিক নিবাস এখন ইমাম গাজ্জালী একাডেমি – স্কুল, জামায়েত ইসলামীর ছত্রছায়া পরিচালিত হচ্ছে। চূড়ান্ত অর্থে ইমাম গাজ্জালী এর নাম দখল ও বাণিজ্যিক কারণে ব্যাবহৃত হয়েছে, যার সাথে ইমাম গাজ্জালীর চিন্তা, মেধা মননের ছিটে ফোটা সংযোগ নেই।
এই অঞ্চল গুলো এখন প্রায় হিন্দু শূন্য। কেন এমন হলো তা আলোচনা করার দায় নেওয়ার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশ নেই। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত ‘লড়কে লেঙ্গে পাকিস্তানের ‘ ঝাপটায় পূর্ববঙ্গের অনেক হিন্দুদের বস্তু ত্যাগ করতে হয়েছিল। আদমশুমারী রিপোর্টে সংখ্যালঘুর ধারাবাহিক হারিয়ে যাওয়ার স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলে। ১৯৪১ জনগণনার হিসেবে পূর্ব বাংলায় হিন্দুু ছিল ২৮%। ১৯৫১ সালে ছিল ২২%, ১৯৬১ সালে ১৮.৫%, স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭৪ সালে ১৩.৫% (মুক্তিযুদ্ধের কারণে ১৯৭১ সালে জনগণনা হয়নি), ১৯৮১ সালে ১২.৫%, ১৯৯১ সালে ১০.৫% আর ২০১১ সালে ৯.৬%।
বাংলাদেশে সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের বঞ্চনা: অর্পিত সম্পত্তির সাথে বসবাস গ্রন্থের ভূমিকায় ড. আবুল বারকাত লিখেছেন, ‘এ আইন সম্পূর্ণভাবে সংবিধানপরিপন্থী, মানবতা এবং সভ্যতাবিরোধী। এ আইন সাম্প্রদায়িকতাকে ইন্ধন জুগিয়েছে এবং মানবতাবিরোধী এ আইনের কারণে হিন্দু সম্প্রদায় তাদের জমি থেকে অধিকার হারিয়েছে, বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ হয়েছে, তাদের পারিবারিক বাঁধন ভেঙে গেছে, অন্তর্নিহিত মানবিক সম্ভাবনাগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং একটি স্বার্থান্বেষী মহলের উদ্ভব ঘটেছে।’ (প্রকাশক: পাঠক সমাবেশ ২০০৯)
হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি দখলকারী মহলের পরিচয়ও খুঁজে বের করেছে বইটি: ‘অতীতে অর্পিত সম্পত্তি দখলের সময় সর্বোচ্চসংখ্যক ৩৭ শতাংশ সুবিধাভোগী মুসলিম লিগের সঙ্গে জড়িত ছিল। আর বর্তমানে (২০০৬) ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে ৪৫ শতাংশ, আওয়ামী লীগের সঙ্গে ৩১ শতাংশ, জামায়াতের সঙ্গে ৮ শতাংশ ও জাতীয় পার্টির সঙ্গে ৬ শতাংশ সুবিধাভোগী সংশ্লিষ্ট। এখানে উল্লেখ্য, ১৯৯৫ সালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন বিএনপির সঙ্গে সুবিধাভোগীদের ৭২ শতাংশ সংশ্লিষ্ট ছিল। ওই সময়ে বিরোধী দল আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিল মাত্র ১১ শতাংশ। ১৯৯৫ সালে সুবিধাভোগীদের বেশির ভাগই দলবদল করে ১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। আবার ১৯৯৭ সালে সুবিধাভোগীদের বেশির ভাগই ২০০৩ সালে ক্ষমতাসীন দলে যোগ দেয়।’ (পৃষ্ঠা ৯৪)
টিপু বিশ্বাস যে প্রশ্ন গুলো করেছেন সে গুলোকে প্রধানত তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যুদ্ধত্তোর বাংলাদেশে কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ, জাসদ- বাসদ ও ভারতের SUCI সংযোগ এবং বামপন্থী দলগুলোতে নারী কমরেড দের পতি আচরণ ও দৃষ্টিভঙ্গি।
আখলাকুর রহমানের ‘বাংলাদেশের কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ’ বইকে জাসদের সমাজ সমাজ বিশ্লেষণ গ্রহণ করায় উম্মা প্রকাশ করে , টিপু বিশ্বাস লিখছেন – ” অর্থনীতিবিদ আখলাকুর রহমানের কৃষিতে পুঁজিবাদ এবং সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ব জাসদ গ্রহণ করে। যদিও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ধারার অনুসারীরা ( আমরা) সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের স্তরকে বেঠিক মনে করি। ”
টিপু বিশ্বাসের বাক্যের প্রথমাংশ সঠিক আখলাকুর রহমান কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশ নিয়ে কথা বলেছেন তবে বিপ্লবের স্তর সমাজতন্ত্র নিয়ে কোন আলোচনা এই বইয়ে নেই। টিপু বিশ্বাস – ‘ বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ধারার অনুসারীরা ‘ কেন কৃষিতে ধনতন্ত্রের বিকাশকে সঠিক মনে করেন না তা না বলেই এই বিষয়ে আলোচনর ইতি টেনেছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় তৎকালীন সময়ে এবং বর্তমান সময়ে টিপু বিশ্বাসরা বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি প্রকৃতি কি তা স্পষ্ট করেননি।
অর্থনীতির বিরস পাঠে সাধারণ মানুষের আগ্রহ ও অংশ গ্রহণ সব সময় শূন্যের কোঠায় ছিল। তৎকালীন সময়ের বাংলাদেশের অর্থনীতির গতি-প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা পর্যালোচনা বামপন্থী মহলে খুব বেশি দূর এগুতে পারেনি। তৎকালীণ সময়ের উত্তাল রাজনৈতিক অবস্থা ও মাঠ পর্যায় থেকে সংগঠনিক অভিজ্ঞতা সম্পন্ন মানুষের অভাব বামপন্থী মহলকে ‘ভাড়াটে’ বুদ্ধিজীবিতদের দলে ভিড়িয়ে তত্ব লিখিয়ে নিতে হয়েছে বা হচ্ছে।
টিপু বিশ্বাস যে সত্যকে বেমালুম চেপে গেছেন যা হচ্ছে পূর্ব বাংলার কৃষি অর্থনীতি ধনতান্ত্রিক এই চিন্তার ভিত্তিতে ‘ জাতীয় অর্থনীতির চরিত্র – ধনবাদী ‘ এই শিরোনামে আব্দুল মতিন , আলাউদ্দিন এই দুই নকশাল ১৯৬৭ সনে বই লিখেছিলেন। ষাটের দশকের শেষভাগে মতিন-আলাউদ্দিন তুলে ধরা আর্থ সামাজিক কাঠামো সম্পর্কিত তত্ত্বের বিরুদ্ধে আব্দুল হক লেখেন ‘পূর্ব বাংলা আধা উপনিবেশিক আধা সামন্তবাদী ‘। সত্তরের দশকে আখলাকুর রহমানের বাংলাদেশের আর্থ সামাজিক কাঠামো সম্পর্কে লেখা তত্ত্বের জবাবে আব্দুল হক লেখেন ‘কৃষি ব্যবস্থা আধা সামন্ততান্ত্রিক’ ।
পূর্ব বাংলা আধা সামন্ততান্ত্রিক বোঝা -পড়ার ভিত্তি টিপু বিশ্বাস সহ চীনপন্থী কমিউনিস্টদের নানান কিছিমের ‘ গ্রাম থেকে শহর ঘেরাও ‘ ও শ্রেণী শত্রূ খতমের দিকে নিয়ে যায়। এই পথেই টিপু বিশ্বাস – মতিন – আলাউদ্দিনরা পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করে শ্রেণী শত্রূ খতমে লাইনে যান।
বাংলাদেশের কোন খতমের মধ্যেই দিয়ে টিপু বিশ্বাসদের যাত্রা শুরু হয়েছিল তা জানা যায় নাই। অনুমান করা হয় পাবনায় ১৯৭০ সালের নির্বাচিত আমি আহমদ রফিক হত্যার মধ্যে দিয়েই টিপু বিশ্বাসদের ‘ শ্রেণী শত্রূ ‘ খতমের যাত্রা শুরু। নির্বাচিত হওয়া মাত্র পাঁচ দিন পরে আহমদ রফিক খুন হন। এই হত্যা কাণ্ডের তিন মাস আগেও নকশাল পন্থীদের হাতে আহমেদ রফিক ছুরিকাঘাত হয়েছিল। এই খুনের জন্য কোন রাখ-ঢাক ছাড়াই টিপু বিশ্বাসের দিকে আঙুল তোলা হয়। (এনপি নিউজ, -আমিরুল ইসলাম রাঙা, ৮ ডিসেম্বর ২০১৮) ।
নকশাল আন্দোলন ছাত্র বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে প্রবাল সাড়া ফেলেছিল। এই আন্দোলনে অনুপ্রাণিত হয়ে কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্ররা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সামাজিক অবহেলাকে উপেক্ষা কৃষকদের মধ্যে কাজ করতে গিয়েছিল। অনেক সময় আব্দুল হক – টিপু বিশ্বাসদের রাজনৈতিক গোল্লাছুটের সমালোচনা করার সময় আত্মত্যাগী যুবকরা উপেক্ষিত থেকে যায়। এই যুবকরা ছিল সেদিনের সমাজের দর্পন। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘ ঝর ঝর করি রক্ত-আলোক গগনে গগনে ঝরিছে; কেহ বা জাগিয়া উঠিছে কাঁপিয়া, কেহ বা স্বপনে ডরিছে।’
পাকিস্থান রাষ্ট্রের জাতিগত নিপীড়ন ও গ্রাম অঞ্চলের ‘ জোতদার ‘ খতম নকশাল পন্থীদেরকে রাজনীতিতে নিরুদ্দেশ পন্থী করে তোলে। এই সময় কালে ছাত্রলীগের স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের উত্থান ও বিকাশ শুরু হয়। এই ধারার বড় অংশ পরবর্তী কালে জাসদ গঠন করে । আ ফ ম মাহবুবুল হক এই ধারার প্রথম কাতারে যুক্ত ছিলেন। নকশাল পন্থীদের হাতে পাবনায় আহমেদ রফিক হত্যার মধ্যে দিয়ে যে রাজনৈতিক খুনাখুনির সূচনা শুরু হয়েছিল সেই ধারা কয়েক দশক স্থায়ী ছিল।
১৯৭১ সালে যুদ্ধ পূর্ব কালে টিপু বিশ্বাসদের হাতে অস্র ছিল খুন হয়েছে প্রধানত তৎকালীন ছাত্রলীগ পন্থীরা কিংবা তাদের আত্মীয় স্বজনরা। এদের কেউ কেউ গ্রাম অঞ্চলে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান – মেম্বার ছিলেন। ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের পর যখন ছাত্রলীগ – আওয়ামীলীগ ভারতে ট্রেনিং শেষে অস্র হাতে ফিরে আসে তখন নকশাল পন্থীদের নিধনের কাজ শুরু হয়। যুদ্ধকালীন সময়ে আধা ডজন নকশাল পন্থী নেতা খুন হয় বৃহত্তর পাবনা জেলায়। এই রকম হত্যাকান্ড গুলো পরবর্তীকালে চীনপন্থীদের মুক্তিযোদ্ধারা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার মদদে কমিউনিস্ট নিধন করেছে , এমন তত্ব বিনির্মানে জ্বালানি হিসেবে ব্যাবহৃত হয়ে আসছে।
মক্তিযুদ্ধ কালীন সময় ভারতীয় ও পাকিস্থানের গোয়েন্দা সংস্থা তাদের ‘কাজ’ করানোর জন্য বিভিন্ন মহলের উপর ভর করেছে , অনেকেই নিজেদের অজান্তেই ব্যাবহৃত হয়েছেন। কোন পক্ষের হত্যায় সমর্থন যোগ্য নয়। তবে এই হানাহানি গুলোকে স্থানীয় পর্যায়ের রাজনৈতিক রেষারেষির ইতিহাস থেকে বাদ দিয়ে দেখা বিমূর্ততা চিন্তার প্রতিফলন। দুরাভিসন্ধী আর হত্যা, বাংলাদেশের জন্মলগ্ন থেকেই চলে আসছে। এক হত্যা আরেক হত্যাকে তরান্বিত করেছে ।
১৯৭১ সালে টিপু বিশ্বাসদের ভূমিকা জটিল, অঞ্চল ভেদে নানান ভূমিকা নিয়েছে পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (এম -এল). যুদ্ধ কালীন সময়ে পাবনা শহরে ছিলেন টিপু বিশ্বাস। যুদ্ধের শুরুতে প্রতিরোধ সংগ্রামে অংশ নিয়েছিল ।
টিপু বিশ্বাস সহ চীন পন্থী কমিউনিস্টদের ভূমিকা সম্পর্কে বদরুদ্দীন উমর ‘ একাত্তরের স্বাধীনতা যুদ্ধে বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের রাজনৈতিক ভূমিকা ‘ বইয়ে লিখছেন – ” ১৯৭১ সালে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছিল যে তখনকার দিনে কমিউনিস্ট পার্টি নাম যে পার্টি গুলি বিপ্লব , সমাজতন্ত্র , মার্ক্সবাদ , লেনিনবাদ ও মাও চিন্তাধারার নামে রাজনীতি করতো সেগুলো কোনোটিরই বিপ্লবী সংগ্রামের নেতৃত্ব দেওয়া ও সে সংগ্রাম পরিচলানোর যোগ্যতা ছিল না। উপরন্তু মুক্তিযুদ্ধে আদর্শগত , নীতি ও কৌশলগত এবং কর্মসূচিগতভাবদ সেগুলি ছিল সম্পূর্ন অক্ষম,প্রায় সম্পূর্নভাবে দেউলিয়া ” (পৃষ্টা ৮ ) । ” আমরা ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পূর্ব পাকিস্থান সামরিক বাহিনীর সাথে যোগাযোগ স্থাপন করে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে তাদের সাহায্য সহযোগিতাতেই মুক্তি বাহিনীর বিরোধিতা করি। আমাদের এই কাজের ফলে জনগণ থেকে আমরা ভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ি। ” ( পৃষ্ঠা ৬০) । .
সিপিবি ও অন্য ধারার বাম রাজনীতিও সঠিক নয় এই বিবেচনায় স্বাধীনতা পরবর্তীতে একটি বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে জাসদ রাজনীতির উত্থান ঘটে। আ ফ ম মাহবুবুল হক এই রাজনৈতিক ধারায় একজন নেতা ছিলেন
মাহবুবুল হককে নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনায় টিপু বিশ্বাস জাসদ- বাসদ এর সাথে ভারতের SUCI এর সম্পর্কের কারণে উম্মা প্রকাশ করেছেন। SUCI এর রাজনীতিকে বাংলাদেশ ও ভারতের নকশাল পন্থীরা সঠিক মনে করেন না। এই মনে না করার পিছনে বামপন্থী রাজনীতির চুলচেরা বিশ্লেষণ ও চুল টানাটানি রয়েছে। যাদের জন্য এই রাজনীতি, সেই সাধারণ মানুষদের কাছে এই বাক-বিতন্ডা চিরকালই অধরা থেকে গেছে। অনেক ক্ষেত্রে এই কথামালার চুলাচুলি দেখে আম – জনতা বামপন্থা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
বামপন্থীরা আন্তর্জাতিকতায় বিশ্বাসী দেশ দেশে বামপন্থী দল গুলোর মধ্যে যোগাযোগের ইতিহাস কমিউনিস্ট ইস্তেহার এর সময়কাল থেকেই। তবেই দেশে দেশে বামপন্থীদের ‘ ভ্রাতৃপ্রতিম ‘ সম্পর্ক সব সময় ক্ষণস্থায়ী, বড় পার্টির সাথে ছোট পার্টির সমতা সম- মর্যদার সম্পর্ক খুব বেশি দিন টিকে থাকেনি। অনেক সময় এই সম্পর্ক ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টিগুলোর পররাষ্ট্রনীতির বাহক বা প্রচারক হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের পার্টিগুলো কাজ করে আসতে বাধ্য হয়েছিল। ‘ মস্কোতে বৃষ্টি হলে ঢাকায় ছাতা ধরা’ এই প্রবচন ‘ ভ্রাতৃপ্রতিম ‘ সম্পর্কের অন্ধ আনুগত্যের কারণেই জন্ম নিয়েছিল। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় তৎকালীন সোভিয়েত রাশিয়া ও স্টালিনের ভুল নীতি গ্রহণ করায় ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলন ‘ ভারত ছাড় ‘ আন্দোলন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে যুদ্ধকালীন সময়ে ব্রিটিশের সাথে সহযোগিতার পথ বেছে নেয়। ভারত স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে ভারতীয় কমিউনিস্ট পার্টি ছিটকে পড়ে।
‘ ভ্রাতৃপ্রতিম ‘ সম্পর্কের মোহ বাংলাদেশের চীনপন্থী কমিউনিস্ট পার্টি বাংলাদশের জন্মের লড়াইকে ‘ দুই কুকুরের ‘ কামড়াকামড়ি হিসেবে দেখেছে। চীন ও মাওসেতুং এর পাকিস্থান প্রীতিকে এই চীনা ধারার বামপন্থীরা তত্ব কথার চরকা কেটে জনগণকে গেলানোর কসরৎ করেছিলেন। টিপু বিশ্বাস এই ধারার প্রধান সারির একজন ছিলেন। ” আমজাদ হোসেন ও ওয়াজেদ আলীর নেতৃত্বে যশোরে, আবদুল মতিন, টিপু বিশ্বাস ও আলাউদ্দীনের নেতৃত্বে পাবনায়, ওহিদুর রহমানের নেতৃত্বে রাজশাহীতে, কামালের নেতৃত্বে চট্টগ্রামে পার্টির সাংগঠনিক এলাকা বিস্তৃত হয়। পার্টি এই পর্যায়ে ‘শ্রেণিশত্রু খতম’ এর নীতি অনুসরণ করে এবং গ্রামের জোতদার, মহাজন, মাতব্বর ও দুস্কৃতিকারীদের হত্যা করে। এসময় পার্টি [ পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি (মা-লে) ] দুই শ্রেণিশত্রুর বিরুদ্ধে অর্থাৎ পাকবাহিনী ও মুক্তিবাহিনী উভয়ের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে। ” (১)
টিপু বিশ্বাস যে SUCI কে বামপন্থী হিসেবে মেনে নিতে দ্বিধান্বিত সেই SUCI নেতা শিবদাস ঘোষ পূর্ববাংলায় পাকিস্তানের গণহত্যায় চীনের নীরবতাকে ‘ অর্থ পূর্ণ নিরাবতা’ হিসেবে বাজারে চালানোর চেষ্টা করে লিখছেন ” চীনের এই ধরণের কাজ মূলতঃ পরিচালিত হচ্ছে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদী- পুঁজিবাদী শিবিরের অভ্যন্তরীণ contradiction (দ্বন্দ্ব)-কে বিপ্লবের স্বার্থে ব্যবহার করার কৌশল হিসাবে এবং শেষ পর্যন্ত সাম্রাজ্যবাদী শিবিরকে দুর্বল করার উদ্দেশ্য।“ (২)
কমুনিস্ট ‘ ভ্রাতৃপ্রতিম ‘ সম্পর্কের মোহ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রশ্নে টিপু বিশ্বাস ও শিবদাস ঘোষকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাবে একই সমান্তরালে দাঁড় করিয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে শিবদাস ঘোষের পর্যেবেক্ষন গুলো বে-পথে ঘুরপাক খেয়েছে , যেমন ” বাংলাদেশের এই জাতীয়বোধ পাকিস্তান জাতীয়তাবোধের একটি ধারা। ” (প্রাগুপ্ত পৃষ্টা ৪)
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে যে সমস্ত বামপন্থী দল ছিল তাদের সাথে খুব ভালভাবেই কোলকাতা কেন্দ্রিক একই ধারার বামপন্থী দল গুলোর যোগাযোগ ছিল। সিপিবি এর সাথে সিপিআই , সিপিএম এর সাথে আজকের দিনের ওয়ার্কার্স পার্টির ধারার, শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দলের সাথে আর এসপি এর নিবিড় যোগাযোগ ছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে ভারতের এই দলগুলো তাদের সাধ্যমত বাংলাদেশের জনগণের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
পূর্ব পাকিস্থান কমিউনিস্ট পার্টি (এম -এল ) ও পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টির (এম এল) এর সাথে সিপিএ (এম -এল )- নক্সালবাদীদের যোগাযোগ গড়ে উঠে ছিল। চারু মজুমদার পূর্ব পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টি (এম -এল )কে স্বীকৃতি দিয়ে ৭ নভেম্বর ১৯৭০ সালে দেশব্রতী পত্রিকায় লিখেছিলেন। সেই সময় ভারতের নকশাল নেতা সুব্রত বল টিপু বিশ্বাসের নেত্বাধীন পূর্ববাংলার কমিউনিস্ট পার্টির সাথে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে সক্রিয় ছিলেন। ১৯৭৪ সালের প্রথম দিকে টিপু বিশ্বাস ও সুব্রত বল ঢাকায় গ্রেফতরা হন। (৩)
ঢাকা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে সুব্রত বল ত্রিপুরা চলে যান ১৯৭৬-১৯৭৭ সনে । এই সময়ে প্রথমে সিপিআইএমএল (ইউনিটি সেন্টার) গঠনে অন্যতম প্রধান ভূমিকা পালন করেন সুব্রত বল। এর পর এই দলের সাথে অপর নক্সালনেতা সত্যনারায়ণ সিং এর সিপিআইএমএল একীভূত হয় ৷ সুব্রত বল এই সংগঠনের ত্রিপুরা রাজ্য সম্পাদক হন। কয়েক বছর পরই তিনি রাজনৈতিক জীবন থেকে সরে যান। ২০১৮ সালে প্রয়াত হন।
১৯৪৭ সালের কোলকাতা ছিল বাংলার প্রাণ কেন্দ্র। শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির প্রাণ কেন্দ্র। বাংলা গল্প কবিতা উপন্যাস এর জন্য কোলকাতার উপর নির্ভরশীলতা এখন কাটিয়ে উঠেনি বাংলাদেশ। মার্ক্সবাদী সাহিত্যের প্রধান সরবরাহ আসতো মস্কোর প্রগতি প্রকাশনা ও কোলকাতার বিভিন্ন প্রকাশনা থেকে। প্রগতি প্রকাশনার চেয়ে কোলকাতার মার্ক্সবাদী সাহিত্যের অনুবাদ ছিল হাজার গুন্ ভাল। পাকিস্থান আমল থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মানুষেরা কোলকাতা আসা -যাওয়াকে বিদেশ যাওয়ার চেয়ে আরেকটি বড় শহরে হিসেবে দেখে থাকে। যদিও সীমান্তে কাটা তারের বেড়া ও ভারতীয় বাহিনীর সীমান্ত হত্যা আশংকা জনক ভাবে বেড়ে গেছে।
আজকের বাংলাদেশ ছিল পিছিয়ে পড়া অংশ, নগরায়ণ বলতে তেমন কিছু গড়ে উঠেনি এই অঞ্চলে। পূর্ব বঙ্গ ও আসামকে নিয়ে আলাদা প্রদেশ তৈরির উদ্যোগ মূলত কোলকাতা কেন্দ্রিক ডাক্তার, উকিল , ব্যাবসায়ীদের শ্রেণী স্বার্থের বিরোধিতার কারণে সফল হয়নি। ১৯৪৭ এর পরেও দুই -তিন দশক লেগেছে বাংলাদেশ অঞ্চলের শিল্প সাহিত্য – বুদ্ধিকতার আলাদা ধারা গড়ে উঠতে। পুরো পাকিস্থান আমলে রাজনৈতিক সংগ্রামের উত্তালতায় বাংলাদেশের সমাজ ও দর্শনের নানান শাখা বিকশিত হতে থাকে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে কোলকাতার শিল্প সাহিত্য রাজনীতি পূর্ববাংলার সমাজ ও রাজনীতিকে প্রভাবান্বিত করেছিল।
SUCI এর সাথে জাসদ- বাসদের সম্পর্ক কে পূর্ববাংলার সাথে কোলকাতার যোগাযোগ ও সম্পর্ক এর আলোকে বিবেচনায় আনলে সম্পর্ক গড়ে উঠার অন্য দিকটা সামনে আসতে পারে। এই ধারাতেই জাসদ – বাসদের সাথে SUCI এর সম্পর্ক গড়ে উঠে। ১৯৭২ -১৯৮০ সাল পর্যন্ত জাসদের দ্বিতীয় ও বড় ধরণের ভাঙ্গন ও বাসদ গঠন কাল পর্যন্ত প্রান্তিক ছিল। জাসদের দলিল দস্তাবেজে SUCI এর প্রভাব আছে ঢালাও ভাবে এমন দাবী করার হলেও আসলে কোন দলিলে কি প্রভাব আছে তা সুস্পষ্ট করে কেউ দেখানোর উদ্যোগ নেয়নি।” এসইউসিআইয়ের সাথে রাজনৈতিক সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রশ্নে জাসদের অনেকের আপত্তি ছিল। তেহাত্তরের অগাস্ট মাসে সিরাজুল আলম ভারতে যান এবং এসইউসিআইয়ের প্রধান নেতা শিবদাস ঘোষের সঙ্গে কথাবার্তা বলেন। ” (৪)
১৯৮৩ সালকে টিপু বিশ্বাস বাসদের প্রতিষ্টা কাল হিসাবে উল্লেখ করেছেন। ১৯৮০ সালের ৭ নভেম্বর বাসদের প্রতিষ্টা। ১৯৮৩ সালে SUCI এর সাথে সম্পর্ক ও শিবদাস ঘোষ এর ব্যাখ্যা গ্রহণ করাকে কেন্দ্র করে বাসদ বিভক্ত হয়। আ ফ ম মাহবুবুল হকের নেত্বাধীন অংশ SUCI এর সাথে সম্পর্ক ও শিবদাস ঘোষের গুরুবাদিতাকে গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নতুন করে পথ চলতে শুরু করে। বাসদ ব্রাকেট বন্দী হয়ে দুই দল হয়ে পড়ে। এই বিভক্তির মধ্যদিয়ে জাসদের জাসদের উত্থান পর্বে ভিন্ন রাজনৈতিক ধারা থেকে এসে যারা জাসদীয় ধারায় যুক্ত হয়েছিলেন বা অনুপ্রবেশ করেছিলেন তাঁরা আপাতঃ অর্থে সফল হয় । স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদের শ্রমে গড়ে উঠা সংগঠনের একটা দৃশ্যমান অংশকে কব্জা করতে সমর্থ হয়।
প্রসঙ্গতঃ জাসদের প্রথম ভাঙ্গন ১৯৭৭ সালে। জেনারেল জিয়াউর রহমানের মদদে তৎকালীন জাসদের সহ- সভাপতি এম এ আউয়াল সামরিক শাসনের রাজনৈতিক দল বিধির অধীনে জাসদ নামে দল নিবন্ধিত করেছিল। (৩) এই উদ্যোগের সাথে উল্লেখযোগ্যদের মধ্যে ছিলেন খান মজলিস, কুমিল্লার রশিদ ইঞ্জিনিয়ার প্রমুখ। খান মজলিস ছাত্রলীগ ( বৈ : স ) এর কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। ১৯৭২ সালে ডাকসু নির্বাচেনে জিনাত – মজলিস পরিষদের ছাত্রলীগ ( বৈ : স ) এর প্রার্থী ছিলেন। এই ভাঙ্গন জাসদে কোন প্রভাব ফেলতে পারেনি। পরে জিয়াউর রহমান জাসদ [ আউয়াল ] এর রেজিস্ট্রেশন বাতিল করে জাসদের মূল ধারাকে নিবন্ধিত করে। উল্লেখ্য প্রথম দফায় জাসদের মূলধারা ও জাসদ [ আউয়াল ] উভয়েই আবেদন করলে জাসদ [ আউয়াল ] কে নিবন্ধন পায়। ১৯৮০ সনে বাসদ এর ভাঙ্গনের সময়ে তৃতীয় ধারা হিসেবে লক্ষীপুর গ্রুপ নামে জাসদ – বাসদের ভ্রান্তনীতি – লক্ষীপুর গ্রূপের খোলাচিঠি লিখে একটি আঞ্চলিক গ্রূপের সৃষ্টি হয়েছিল। এই গ্রুপ মূলত পুরানো বামপন্থীদের ধাঁচে সমাজ- বিশ্লেষণ করার উদ্যোগ নিয়েছিল। এই উদ্যোগ দেশি দিন টিকে টেকেনি। ১৯৮২ এর সামরিক শাসনের পর এই গ্রূপের নেতারা সামরিক শাসনকে বৈধতা দানকারী উপজেলা নির্বাচনে অংশ গ্রহণের মধ্যদিয়ে যথেচ্ছা বিহারী রাজনৈতিক পথ গ্রহণ করে।
পথে নামলেই নতুন পথের দেখা পাওয়া যাবে অনেকটা এমন ভাবনা থেকেই জাসদ আন্দোলন শুরু হয়ে গিয়েছিল। রুশ -পিকিং পন্থীদের কাইজার মধ্যে না গিয়ে সমাজতান্ত্রিক ধাঁচের দল গড়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। তবে জাসদ নিজেকে কমিউনিস্ট পার্টি হিসেবে দাবী করে নাই। জাসদ অভ্যান্তরে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের উদ্যোগ ছিল। এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে জাসদের মধ্যে লাল ইশতেহার গ্রুপ , সিওসি – কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক কমিটি গঠিত হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টির ভ্রূণ হিসেবে । সিওসি এর ২১ জনের এই কমিটিতে আ ফ ম মাহবুবুল হক ছিলেন , ছিলেন আব্দুল্লাহ সরকার। বিকল্প সদস্য হিসেবে ছিলেন মবিনুল হায়দার চৌধুরী।(৬) উল্লেখ্য মবিনুল হায়দার চৌধুরী ১৯৭২ সাল পর্যন্ত ভারতে SUCI এর সাথে যুক্ত ছিলেন। এর পর স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে বসবাস করতে শুরু করেন ও জাসদীয় ধারার সাথে যুক্ত হন।
জাসদ জন্মলগ্ন থেকেই চরম রাষ্ট্রীয় নিপীড়ণের মধ্য দিয়ে যাচ্ছিল। এই নিপীড়ন প্রতিকূল অবস্থায় জাসদ নিজেদের তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে তুলতে চেষ্টা করে। এই প্রচেষ্টাতে জাসদ ও SUCI এর কাকতলীয় কিছু মিল উভয়ের উপর পর্যায়ে কাজের পথকে সহজ করেছিল। এই মিলের প্রধান ছিল জাসদ ও SUCI উভয়ই নিজ নিজ দেশে বিপ্লবের স্তরকে সমাজতন্ত্রিক মনে করত। বিপরীত পক্ষে চীন ও মস্কো পন্থীরা দুই স্তর বিশিষ্ট বিপ্লবের কথা বলত , জনগণতান্ত্রিক বা অধনবাদী পথে সমাজতন্ত্রে উত্তরণ।
জাসদের আনুষ্টানিক শুরু ১৯৭২ সালের অক্টোবর মাসে। ১৯৭৩ সালের জাতীয় সংসদ নিবাচনে জাসদ ২৭৩ জন প্রার্থী দিয়েছিল। ছয় মাস বয়সী দলের পক্ষে কি করে সম্ভব হল সারাদেশে প্রার্থী দেওয়া। জাসদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল ১৯৬২ – ১৯৭২ সাল পর্যন্ত তৎকালীন ছাত্রলীগের মধ্যে স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ এর মধ্যে। এই স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ নিউক্লিয়াস হিসেবে পরিচিত ছিল। বাংলদেশ ভূখণ্ডে আর কোন দল এত দীর্ঘ সময় প্রস্তুতি নিয়ে দল হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে নাই। এই পথ পরিক্রমায় ২১ অগাস্ট ১৯৭০ সালে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সভায় ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশে’ এর প্রস্তাব গৃহীত হয়েছিল। এই প্রস্তাবকে ঘিরেই জাসদ রাজনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি গড়ে উঠেছিল। একথা সত্য যখন ‘স্বাধীন সমাজতান্ত্রিক বাংলাদেশে’ এর প্রস্তাব গৃহীত হয় সেই সময় মার্ক্সবাদী আন্দোলন এর সাথে ধীরে ধীরে এই অংশের পরিচয় ঘটতে শুরু করেছে মাত্র ।
SUCI এর বিপ্লবের স্তর সমাজতান্ত্রিক গ্রহণের পিছনের ইতিহাস ভিন্ন। ভারতের বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী দল- আরএসপি থেকে রাজনৈতিক মত পার্থক্যের কারণে SUCI গঠিত হয়েছি। আর এস পি বা রেভুলেশনারী সোশ্যালিস্ট পার্টিটি গঠিত হয়েছিল সেই সব রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্বদের দ্বারা যাঁরা ভারতের স্বাধীনতা ও ব্রিটিশ বিরোধীতার ব্যাপারে ছিলেন আপোষহীন এবং সশস্ত্র সংগ্রামের পন্থায় আস্থাশীল ছিল । লেনিন পরবর্তী তৃতীয় আন্তর্জাতিকের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের সাথে আর এস পি দ্বিমত পোষণ করত। দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালীন সময়ে তৃতীয় আন্তর্জাতিক অনুমোদিত ফ্যাসীবাদের বিরুদ্ধে সাম্রাজ্যবাদের সাথে জোট গঠনের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেছিল আর এস পি । মূলত দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধকালীন সময়ে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দুর্বল অবস্থার সুযোগ গ্রহণ করে সশস্র সংগ্রামের মাধ্যমে ভারতের স্বাধীনতার পক্ষে ছিল আর এস পি । আরএসপি ভারতে বিপ্লবের স্তর হিসেবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পথ কে গ্রহণ করেছিল। আরএসপি যে মাত্রায় স্টালিন বিরোধী ছিল SUCI সেই মাত্রায় স্টালিন অনুরক্ত হয়ে নতুন দল গঠন করে পথ চলা শুরু করলেও পূর্বসূরি আরএসপি এর সমাজতান্ত্রিক দলের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কর্মসূচি রেখে দেয়।
বাংলাদেশের বামপন্থীদের মধ্যে জাসদ এর উত্থান এর পিছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাত ও নানান জাতীয় ‘ ষড়যন্ত্র ‘ তত্বের কথা বহুল আলোচিত। জাসদের পিছনে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার হাত থাকা না থাকার বিষয়টি প্রমানিত নয়, প্রমান করার কোন সহজ পথ নেই। তবে সাদা চোখে কিছু প্রশ্ন এই ষড়যন্ত্র ‘ তত্বের স্বরূপ কিছুটা হলেও পরিষ্কার করতে পারবে।
SUCI এর রাজনীতি নিয়ে , শিবদাস ঘোষের মার্ক্সবাদী ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ নিয়ে পক্ষে বিপক্ষে বিস্তর আলোচনা রয়েছে এবং করার অবকাশ রয়েছে। ১৯৭৩ সালে SUCI রাজনীতির ২৫ বছর পার করে এসেছিল। এই পঁচিশ বছরে তাদের সাধ্যমত আন্দোলন সংগ্রামে ছিল। SUCI এর নেতা কর্মীরা এই সময়ে জেল- জুলুম নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছিল। পঁচিশ বছরের অভিজ্ঞতায় SUCI বাংলাদেশের বাম রাজনীতিতে জাসদীয় নিন্দায় যে সমস্ত কথা প্রচলিত ছিল সেগুলো আমলে নিয়েই জাসদের সাথে যেটুকু সম্পর্ক গড়েছিল তা জাসদ ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থার গড়ার ‘ ষড়যন্ত্র ‘ তত্বের গালে সামান্য হলেও চপেটাঘাত করে ।
ন্যাপ গঠনের পিছনে কমিউনিস্ট পার্টির উল্লেখযোগ্য অবদান ছিল। কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাপ থেকে অগ্রবর্তী কর্মীদের দলে টানতে সক্রিয় ছিল। বামপন্থার বিকাশ ঘটাতে ন্যাপ কর্মী সংগ্রহ ও গণসংগঠনে কাজ করতে কমিউনিস্ট পার্টি সুমহকে সহায়তা করেছিল। জাসদ গঠন ছিল অনেকটা উল্টো ন্যাপ গঠন এর মত। জাসদের অগ্রবর্তী কর্মীদের নিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করতে উদ্যোগী হয়েছিল। জাসদ ও ন্যাপ এর সাংগঠনিক পরীক্ষা বহুলাংশে কাজে লাগেনি, সফল হয়নি। তবে এই দুই ধারার অসফলতার কারণ ভিন্ন ভিন্ন।
তথ্য সূত্র:
(১) মুক্তিযুদ্ধে পিকিংপন্থী কমিউনিস্ট পার্টিসমূহের ভূমিকা- মো. আব্দুল আলীম, দৈনিক সোনার দেশ – রাজশাহী , ৩০ জুলাই ২০১৭।
(২)পৃষ্টা ১১ ও ১৩, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে – শিবদাস ঘোষ , প্রকাশ কাল : ১৫জানুয়ারী ১৯৭২।
(৩)পৃষ্টা ২৮ ” কমিউনিস্ট পার্টি নাই ” প্রসঙ্গে – লেখক হেলাল উদ্দিন। প্রকাশ কাল ১৫ সেপ্টেম্বর ২০০৩। ঢাকা ।
(৪)লেখক মহিউদ্দিন আহমদ।অক্টোবর ২০১৮। প্রথমা প্রকাশন – ঢাকা।
(৫)পৃষ্টা- ১২১, জাসদের উত্থান পতন :অস্থির সময়ের রাজনীতি লেখক মহিউদ্দিন আহমদ।অক্টোবর ২০১৮। প্রথমা প্রকাশন – ঢাকা।
(৬) আব্দুল্লাহ সরকার স্মারক গ্রন্থ : কমরেড আব্দুল্লাহ সরকারকে চেনার পথে – খায়ের এজাজ মাসউদ , পৃষ্টা ৯৫। প্রকাশ ২০১৪। ঢাকা।

অপু সারোয়ার
লেখক পরিচিতি :১৯৮০ সাল থেকে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল – বাসদ রাজনীতির সাথে যুক্ত ছিলেন অপু সারোয়ার । ১৯৮৬ থেকে ১৯৯১ পর্যন্ত বাসদ সর্মথিত ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য , দপ্তর সম্পাদক ও সহ – সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্র বিজ্ঞান এর ছাত্র ছিলেন। জেনেরাল এরশাদ সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলনের সময় বিভিন্ন দফায় আড়াই বছর কারাগারে ছিলেন। ১৯৯০ এর দশককে জাপান থেকে প্রকাশিত বাংলা মাসিক বাংলার মুখ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে লেখালেখির সাথে যুক্ত। প্রকাশিত বই মার্কসবাদীরা যে উত্তরাধিকার পরিত্যাগ করবে।


