“একসাথে রয়েছি দুজন, এক ডোরে বাঁধা দুটি প্রাণ। ছিঁড়বেনা কভু এ বাঁধন,আসলে আসুক তুফান”।
সেই রকম একটি তুফান এসেছিল আমার বন্ধু রহিম এর জীবনে, কোভিড-১৯ তথা করোনা পজেটিভ। জ্বর, কাশি, শ্বাসকষ্ট নিয়ে ছিলেন একা ঘরের এক নিভৃত কোণে আলাদা রুমে আইসোলেশনে। ২ছেলে মেয়ে সহ প্রিয় সহধর্মিণীকে কাছে না ঘেঁষতে দিল কড়া নির্দেশ। কিন্তু “স্বামীর পায়ের নীচে স্ত্রীর বেহেশত” সে কথা ভাল জানেন রক্ষণশীল পরিবারের স্বামীভক্ত আয়েশা। প্রথম দুই এক দিন বারণ শুনলেও নিজেকে আর ধরে রাখতে পারেননি। তিনি কিছুতেই আর কারো বারণ শুনেননি। সাফ কথা তার- ” যদি বাঁচি, তবে এক সাথে, মরলেও এক সাথে। স্বামী না বাঁচলে তার বেঁচে থেকে লাভ কি? বেঁচে থাকলে দু’জনেই থাকবো এমনটা জানালো স্ত্রী আয়েশা। শুধু মনে মনে বলত, তোমার এই গাঢ় মমতার কাছে নিভৃতে সমর্পিত আমি! সেই আমি আসলেই কে? তোমাকে নিভৃত দহণে রেখে কি করে কাটাই দিবসযামী”! যে ভাবা সেই কাজ, ছেলে মেয়েদের রক্ষণাবেক্ষণের দায়ভার নিকট আত্মীয়দের উপর ন্যস্ত করে নিজেকে উৎসর্গীত করলেন স্বামী সেবায়। নিজের জীবনের দিকে না তাকিয়ে স্বামীর পাশে একই বিছানা থেকে তার সেবা করতে থাকেন। দিন নাই রাত নাই একই রুমে স্বামীর সেবায় রইলেন নিয়োজিত। অনেকে অনেক কিছু বুঝাতে চাইলেও তিনি কারো কোন কথায় কর্ণপাত করেননি। স্বামীর সেবা, নামায দোয়া, কোরআন তেলাওয়াতই হয়ে উঠল তার ধ্যানজ্ঞান। সপ্তাহ পেড়িয়ে পক্ষকালে পড়ল। রহিম এর অবস্থা নাজুক হতে নাজুকতর পর্যায়ে পৌঁছল। এই বেলা মুছে গেল সমস্ত রোদ্দুর, কপালে চিন্তার ভাঁজ স্পষ্ট, মরণ ভাইরাস উম্মত্ত সুখে অপেক্ষামান! তবে কি আসল অকাল? তবুও তিনি ছাড়েননি হাল। সময়মত স্বামীর সেবা নীরবে নিভৃতে যায়নামাজে দিতে লাগলেন অশ্রুবিসর্জন। পরিস্থিতি আরো নাজুক, শুরু হল শ্বাস কষ্ট। তার নিকট আত্মীয় শ্রদ্ধেয় বড় ভাই এর সার্বিক সহায়তা ও সহযোগিতায় রহিমকে ভর্তি করানো হল হাসপাতালে! সেখানেও সেই আয়েশা স্বামীকে জোগাতে লাগল বুকে সাহস মনে বল। চিকিৎসা ও স্ত্রীর সেবা আর প্রেরণায় রহিম আস্তে আস্তে সুস্থ হতে লাগল। দীর্ঘ প্রায় দুমাসের ধাক্কা কাটিয়ে আল্লাহ রহমতে, রহিম আজ করোনা মুক্ত, আলহামদুলিল্লাহ। এবার আশংঙ্খা জীবন বাঁজি রেখে সেবা শুশ্রূষা দেওয়া সেই আয়েশাকে নিয়ে। কোনো সুরক্ষা ব্যবস্থা ছাড়াই স্বামীর সেবাও করেছেন তিনি। ছোঁয়াছে করোনা তাকে পেয়ে বসেনিতো? করানো হল তার কোভিড-১৯ টেস্ট তথা করোনা পরীক্ষা! সকলের উৎকন্ঠা দূর হল তিন দিন পর ফলাফল আসল “নেগেটিভ ” আলহামদুলিল্লাহ। যেটুকু মমতা শুশ্রূষা লেগে ছিল তার হাতে সবটুকুর পরশ শরীরে মেলেছে ডানা মুক্তির উল্লাসে। যত দূরেই হোক আকীর্ণ বেদনার ঘর, স্পর্শহীন তবু ছুঁয়ে থাকে অন্তরে অন্তর! অতিমারীর এই রুগ্ন, নষ্ট সময়ে যেখানে রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করছে রক্তের সাথে। পথে প্রান্তরে ফেলে যায় আত্মার আত্মীয় তথা জন্মদাতা জন্মদাত্রীকে। কে লিখে তার হিসেব কিংবা কোন জন, মৃত্যুর স্তব্ধ -অক্ষরে ! রুষ্ট সময়ে আয়শা দেখিয়ে দিল কিভাবে জীবন বাঁজি রেখে বাঁচাতে হয় জীবন, জীবনের তরে!! আমরা চোখে অশ্রু, হাতে ফুল আর হৃদয়ে অকৃত্রিম কৃতজ্ঞতা নিয়ে আপনাকে(আয়েশা) জানাই অভিবাদন। স্যালুট, হে বীর, আমার দেখা সেরা সাহসী এই মহিয়সী নারীকে। নিয়ম মানুন, ঘরে থাকুন, সুস্থ থাকুন। নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদেরও প্রত্যেককে নিয়মটি মেনে চলা উচিত। খুব জরুরি প্রয়োজন না হলে আমরা যেন ঘরের বাইরে না যাই। অন্যের সংস্পর্শ যেন এড়িয়ে চলি। আর বাইরে বের হলেও যেন শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখি। আঁধার কেটে যাবে, পৃথিবীর অসুখ সেরে যাবে, সুদিন আসবে, ইনশাআল্লাহ।

লেখক: আবু জাফর শিহাব (এল এল বি)

