মোনায়েম খান :মোহাম্মদ সাহেদ , সাহেদ করিম, রাজধানী ঢাকা শহরে অবস্থিত রিজেন্ট হাসপাতালের চেয়ারম্যান ও পরিচালক। বর্তমানে তিনি দেশে বিদেশে সবচেয়ে বেশী আলোচিত ব্যক্তিত্ব। তবে ভাল কিছুর জন্য নয় , দুর্নামের জন্য। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য , এই সেই মহারতি যার দাপট ছিল সর্বত্র । এ সুবাদে কোন প্রকার বাধ্যবাদকতার তোয়াক্ষা না করে পরীক্ষা নীরিক্ষা ছাড়াই করোনা ভাইরাসের সার্টিফিকেট বিক্রী করে কামিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।একদম বাধা বিপত্তিহীন জমজমাট ব্যবসা ছিল তার। কিন্ত ভাগ্যের নির্মম পরিহাস ,আকস্মাৎ বাধ সাঁধলো ইতালি । সাহেদের রিজেন্ট হাসপাতাল নামের কসাইখানা থেকে করোনা মুক্ত প্রত্যয়ন পত্র নিয়ে যাঁরা উড়াল দিয়েছিলেন ইতালির পথে ,তাঁ’দের মধ্যে কিছু যাত্রী করোনা পজেটিভ প্রমানিত হলে , ইতালি কতৃপক্ষ পুরো ফ্লাইটটি ফেরত পাঠিয়ে দেয় বাংলাদেশে । আর যায় কোথায় , জালে আটকে গেলেন সাহেদ করিম। মুহুর্তে সকল অর্জন ভস্মীভূত হয়ে গেল জনতার ঘৃনার আগুনে।
ইহা বললে অত্যুধিক হবে না, সাহেদের কৃতকর্মের বদৌলতে বাংলাদেশ পুরো বিশ্বে এক সূক্ষ জালিয়াতীর দেশ হিসেবে পরিচিতি লাভ করেছে । দেশের এমন গর্বিত নাগরিকের গর্বদ্ধোত আচরনের কারনে দেশের ভাবমূর্তিই শুধু ম্লান হয়নি , স্বাস্হ্য ব্যবস্হা যে পুরোপুরি ভেঁঙ্গে পরেছে বা নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে গেছে সে কথাই প্রমান হল আর একবার।
দেশে এই নব্য ভিলেন সাহেদকে নিয়ে কৌতুহলের শেষ নেই ।তাকে ঘিরে কত কিচ্ছা কাহিনী , শ্রুতিমধুর মিথ্ আর রসালো গল্প মানুষের মুখে মুখে ফিরছে । এ যেন সত্য মিথ্যের সংমিশ্রণে সৃষ্ট কল্পকাহিনী ইনিয়ে বিনিয়ে বলার অঘোষিত প্রতিযোগিতা সারা দেশে মহাসমারোহে চলছে । কিন্তু বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই লোকটি দেশের প্রানকেন্দ্র ঢাকা মহানগরে একদম প্রশাসনের নাকের ডগায় এতবড় একটি দুর্নীতির দুর্ভেদ্য সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হল কিভাবে ? সুধীজনের প্রশ্ন, তাহলে সরকারের বিশাল প্রশাসন যন্ত্র কি করছে ? অথবা সাহেদের নেপথ্যের শক্তির উৎসই বা কি ? এখনও কুয়াশাচ্ছন্ন ।
দেশের প্রচার মাধ্যম গুলোর অবস্হান কিছুটা ঘোলাটে মনে হচ্ছে । সাহেদের দুর্নীতির গভীরতা খোঁজার পরিবর্তে সে ক’টা বিয়ে করেছে , বা কোথায় বিয়ে করেছে , তা নিয়ে আনাবশ্যক উৎসুকতা সৃষ্টি করে জনতার দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন স্রোতে প্রবাহিত করার চেষ্টা বলে বিজ্ঞজনের অভিমত ।
আশার কথা,খবরে প্রকাশ, কাপুরুষের মত বোরকা পড়ে সাহেদ ভারতে পালিয়ে যাওয়ার সময় সাতক্ষীরা সীমান্তে অবৈধ অস্ত্রসহ RAB এর হাতে গ্রেফতার হয়েছে।তার এই গ্রেফতারের খবর শুনে দেশবাসী যেমন স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলছেন ঠিক তেমনি উৎসুকতা বেড়েছে দ্বিগুন মাত্রায়। বিশেষ করে তার কুকীর্তি জনসমক্ষে উন্মোচিত হলে ছি: ছি:’র বাণে সারা দেশে প্লাবন নিয়ে এসেছে।
বিস্ময়ের ব্যপার, ইতিমধ্যে কিছু সুযোগসন্ধানী বর্ণচোরা লোক সাহেদকে ক্রস ফায়ারে হত্যা করার পক্ষে অত্যন্ত খেয়ালী অভিমত ব্যক্ত করছেন । তাঁদের যৌক্তিক দাবী হল এমন জগন্য দুর্নীতিবাজের শাস্তি একমাত্র মৃত্যুদন্ডই শ্রয় । জানি না তাঁরা এমন যুক্তি ভাব তাড়িত হয়ে দিচ্ছেন কি-না, অথবা নেপথ্যে কোন অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করার চেষ্টা করছেন কি-না বোধগম্য নয় ।
ইহা যুক্তি সাপেক্ষ সত্য, সাহেদের এই বিশাল দুর্নীতির সাম্রাজ্যে সে যে একা নাটের গুরু নয়, তা প্রায় নিশ্চিত। ইতিমধ্যে সরকারের মন্ত্রি, আমলা, পদস্হ কর্মকর্তাসহ অনেক হোমরা-চোমরার সম্পৃক্ততা বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে ফিল্মী রিলের মত ভাসছে । কাজেই ধৃত দুষ্টলোকটিকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে মেরে ফেলা মানবাধিকার যেমন লঙ্ঘন হবে ঠিক তেমনি সাহেদের সহযোগী সুবিধাভুগি রাঘববোয়ালরা পর্দার আড়ালেই থেকে যাবে।অতএব, অভিযুক্ত ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সর্বাগ্রে প্রয়োজন ।
অবশ্যই, সাহেদের আইনী সহযোগিতা পাওয়ার মৌলিক অধিকার রয়েছে । সে অধিকার খর্ব করা যুক্তিসঙ্গত বা গ্রহনযোগ্য নয় । কোন প্রকার চাপ বা ভয়ভীতি না দেখিয়ে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করা সংশিষ্ট কতৃপক্ষের দায়ীত্ব ও কর্তব্য বলে অভিমত বিজ্ঞজনদের।
আমার বিশ্বাস , প্রশাসনের আন্তরিকতা দৃশ্যমান হলে সাহেদের ন্যায্য বিচার কার্য পরিচালনা করার অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করা সম্ভব । এবং তখনই তাঁর সাথে সম্পৃক্ত সকল দোষীদের কাঠগড়ায় দাঁড় করানো যাবে।গর্তে লুকিয়ে থাকা মুখোশধারী ভদ্রলোকদের চেহারা উম্মোচিত হবে।
ভুয়া করোনা ভাইরাসের সার্টিফিকেট জালিয়াতির সাথে জড়িত আরেক নিন্দিত নায়িকার নাম ডা: সাবরিনা চৌধুরী । তিনিও এখন লাল দালানের মেহমান । বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় , একজন উচ্চশিক্ষিতা উচ্চবিত্ত পরিবারের সদস্যা হয়ে এত নিচে নামলেন কিভাবে ? মানবতার কর্মি হয়ে এমন জগন্য কাজ করতে তাঁর বিবেক সায় দিল কি করে ?
বন্ধুমহলের অনেকে বলেন, সরকার দুর্নীতি দমনে বদ্ধপরিকর , যদি তাই হয় , তবে বুদ্ধিভ্রষ্ট দু:শ্চরিত্র দুই মহারতি সাহেদ-সাবরিনার বিচারের মাধ্যমে সরকারের সদিচ্ছা প্রতিফলিত হবে , আশাহত জনতার এমনই প্রত্যাশা ।
লেখক: বৃটেন প্রবাসী উপন্যাসিক ও কলামিস্ট।

