লোহানী ভাই , শত বছর বেঁচে থাকুন

কামাল লোহানী বলতে ভেসে ওঠে সফেদ পাঞ্জাবি পরা দীর্ঘদেহী এক ব্যক্তি। মিছিলে সবার ওপর দিয়ে তাঁর মাথা দেখা যায়। নামটাও বেশ লম্বা- আবু নাঈম মোহাম্মদ মোস্তাফা কামাল খান লোহানী। ঝামেলা বা বিনয়বশত বাবা-মায়ের দেওয়া নামটা ছেঁটে ছোট করেছেন কামাল লোহানী। সাংবাদিক, শিল্পী, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনৈতিক নেতাকর্মী, সবার কাছেই শুধু লোহানী ভাই। ফজলে লোহানী যতদিন বেঁচে ছিলেন, ততদিন প্রশ্ন দেখা দিত- কোন লোহানী। এখন লোহানী একজনই, তিনি কামাল লোহানী।

নানা গুণে গুণান্বিত কামাল লোহানী। সাংবাদিক, শিল্পী, রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক সংগঠক নানা পরিচয়ে তিনি পরিচিত। সবকিছুর আড়ালে একজন সংবেদনশীল মানুষ। বিনয় তাঁর স্বভাবজাত। পরিচিত হওয়ার পর আমার চেয়ে ১৮ বছরের বড় লোহানী ভাইকে বহুবার বলেছি, আমাকে তুমি বলবেন। তা পাত্তা না দিয়ে সর্বদাই আপনি ও সাঈদ ভাই-ই বলে আসছেন।

লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় হয় আশির দশকে। যদ্দুর মনে পড়ে, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আন্দোলনের সময়ে ঘনিষ্ঠ হই। তবে তাঁকে প্রথম দেখেছিলাম এক ভিন্ন পরিবেশে, ভিন্ন চেহারায়। ‘৬৯-এর উত্তাল দিনে ফরিদপুরে পিকিংপন্থি ছাত্র ইউনিয়নের এক অনুষ্ঠানে। ঢাকা থেকে আসা শিল্পীদের পরিবেশনা ‘জ্বলছে আগুন ক্ষেতে ও খামারে’ নৃত্য আলেখ্যের বিবেকের ভূমিকায় কামাল লোহানী। অনবদ্য সে নৃত্য। আমাকে রোমাঞ্চিত করেছিল, বিবেককেও জাগিয়েছিল; যা এখনও আমার স্মৃতিতে উজ্জ্বল।

বহু পরে জেনেছি- কিশোর কামাল লোহানী পাবনায় ভাষা আন্দোলনের মিছিলে হেঁটেছেন। পাকিস্তান রাষ্ট্র ও বৈষম্যমূলক সমাজ দুই-ই তাঁর চক্ষুশূল হয়ে উঠেছিল। ১৯৫৩ সালে পাবনা অ্যাডওয়ার্ড কলেজে ভর্তি হয়ে সমাজ বদলের মন্ত্রে দীক্ষা নিলেন। সে বছর ও পরের বছর পরপর দু’বার জেলে গেলেন। জেল থেকে বেরিয়ে ঢাকায় এসে উঠলেন চাচাতো ভাই ফজলে লোহানীর বাসায়। জীবিকার প্রয়োজনে সাংবাদিকতাকে বেছে নিলেন। সক্রিয় থাকলেন বাম রাজনীতিতে। চাকরি করেছেন মিল্লাত, আজাদ, সংবাদ, পূর্বদেশ, জনপদ, বাংলার বাণীসহ নানা পত্রপত্রিকায়। ১৯৭৮-৮১-তে রাজশাহীর দৈনিক বার্তার সম্পাদক ছিলেন। সাংবাদিকদের জন্য আন্দোলন-সংগঠন করেছেন। পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ও স্বাধীনতা-উত্তর ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি ছিলেন। সাংবাদিকতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সংগঠনও করেছেন। ছায়ানট, ক্রান্তি, গণশিল্পী সংস্থাসহ বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। সাংগঠনিক দায়িত্বও কাঁধে নিয়েছেন। শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ছিলেন। সবকিছুর মাঝেও তার কর্ম ও চেতনায় সমাজ বদলের স্বপ্ন।

১৯৭১ সালে তাঁর রাজনৈতিক সতীর্থদের অনেকে যখন দিশেহারা, কেউ কেউ দুই ফ্রন্টে যুদ্ধের তত্ত্ব দিচ্ছিলেন, তখন কামাল লোহানী কোনো দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেননি। সীমান্ত পেরিয়ে কলকাতায় মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে একাত্ম হন। তার ওপর অর্পিত হয়েছিল এক গুরুদায়িত্ব। তিনি ছিলেন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সংবাদ বিভাগের প্রধান। যেখানে কেবল সংবাদ বিভাগ পরিচালনা করেননি; আবৃত্তি করেছেন, কথিকা লিখেছেন, পড়েছেন। ‘৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে তাঁর কণ্ঠেই প্রথম উচ্চারিত হয়েছিল- পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের সংবাদ।

১৯৭৫ সালের কথা। তখন সাংবাদিকদের মধ্যেও বাকশালে যোগ দেওয়ার হিড়িক। প্রতিযোগিতা হচ্ছে- কে কার আগে যোগ দেবেন। নির্মল সেন ও কামাল লোহানী বাকশালে যোগদানে অস্বীকৃতি জানালেন। বলা বাহুল্য, বুকভরা সাহস না থাকলে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব ছিল না।

মনে পড়ে, বাম সংগঠনগুলো স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী উদযাপন কমিটি গঠনের জন্য বসল। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীকে আহ্বায়ক ও কামাল লোহানীকে সদস্য সচিব করার কথা ভাবা হলো। এমন সময় একজন বললেন, লোহানী ভাই ‘সিক স্যারের’ (সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী) তিন বছরের বড়। যখন সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী আহ্বায়ক, তখন লোহানী ভাই সদস্য হতে রাজি নাও হতে পারেন। বিকল্প ভাবনা শুরু হলো। এর মধ্যে লোহানী ভাই এসে বয়সের ব্যাপারটা উড়িয়ে দিলেন। বললেন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী অনেক কিছুতেই বড়।

লোহানী ভাইয়ের সঙ্গে অনেক সভা-সমাবেশ করেছি। একসঙ্গে ‘৭২-এর সংবিধান বাস্তবায়ন কমিটি, কর্নেল তাহের সংসদসহ অনেক ক্ষেত্রে কাজ করেছি। তিনি বরাবরই সময়সচেতন। যথাসময়ে আসেন। আর আড্ডায় মেতে উঠলে সবার পরে যান। বন্যা (কামাল লোহানীর মেয়ে) সঙ্গে থাকলে যথাসময়ে ফিরতে বাধ্য হন। আমি অবাক হই- আড্ডায় যে লোকটা গল্পে, রসিকতায় সবাইকে মাতিয়ে রাখেন। বক্তৃতার মঞ্চে বদলে যান। তাঁর কণ্ঠ ঝাঁঝালো হয়ে ওঠে। ক্ষোভে-ক্রোধে ফেটে পড়েন। মনে হয়, তাঁর মধ্যে এক বিদ্রোহী বসত করে। বক্তৃতার সময় সেই সত্তা জেগে ওঠে, তাকে তাড়িত করে।

কামাল লোহানী বহুদিন ধরে লিখছেন। ধর্মনিরপেক্ষ, বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার কথা বলছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় পথ চলতে আহ্বান জানাচ্ছেন। তার লেখা ‘দেশ আমার গর্ব’, ‘মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীন বাংলা বেতার’সহ ১২টি বই প্রকাশিত হয়েছে।

বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক থেকে সমাজ বদলের স্বপ্ন বুকে নিয়ে পথ চলছেন কামাল লোহানী। সেই স্বপ্ন বুকে নিয়ে আগামী  ২৬ জুন ৮৭  বছরে পা দেবেন । এখন চোখে কম দেখেন। আগের মতো ছুটতে পারেন না। লিখতেও পারছেন না। কিন্তু এখনও ভাবেন সমাজ বদলের, বৈষম্যহীন সমাজের; যে স্বপ্ন নিয়ে ‘৭১-এ ঘর ছেড়েছিলেন, মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছিলেন।

আশা করি, আমাদের প্রয়োজনেই কামাল লোহানী শত বছর বেঁচে থাকবেন। লোহানী ভাই, আপনাকে বেঁচে থাকতে হবে- সত্য কথা বলতে, নতুন প্রজন্মকে পথ দেখাতে।

আবু সাঈদ খান, সাংবাদিক এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.