সুইজারল্যান্ডে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠান বাতিল হওয়ার পরপরই লেবানন ফ্রন্টে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য এসেছে। লেবাননে রাতভর তীব্র সংঘাতের পর অবশেষে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে ইসরায়েল এবং ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ। শুক্রবার স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার কথা।
শুক্রবার (১৯ জুন) স্থানীয় সময় বিকেল ৪টা (বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা ৭টা) থেকে এই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়েছে বলে বিবিসির কাছে নিশ্চিত করেছেন একজন উচ্চপদস্থ মার্কিন কর্মকর্তা।
এদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে গেছে। সুইজারল্যান্ডে শুক্রবার দুই দেশের প্রতিনিধিদের এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল।
রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, ‘হিজবুল্লাহ এবং ইসরায়েল যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে।’ তিনি জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা এই চুক্তির রূপরেখা তৈরি করেছেন এবং এতে ইরান সহযোগিতা প্রদান করেছে।
শুক্রবার দিনের শুরুতে দুই পক্ষের মধ্যে ব্যাপক গোলাগুলির পর মার্কিন প্রশাসন জানিয়েছে, ‘আমরা বুঝতে পারছি যে আজ সকালের সংঘাতের পর ইসরায়েল ও হিজবুল্লাহ এখন একটি যুদ্ধবিরতির অবস্থানে রয়েছে।’
যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তি আলোচনা স্থগিত: মধ্যপ্রাচ্যের রক্তক্ষয়ী সংঘাতের অবসান ঘটাতে বহুল প্রতীক্ষিত যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার শান্তি আলোচনা শেষ মুহূর্তে স্থগিত হয়ে গেছে। সুইজারল্যান্ডে গতকাল শুক্রবার দুই দেশের প্রতিনিধিদের এই বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শেষ সময়ে বৈঠকটি স্থগিত হওয়ায় সদ্য অর্জিত অন্তর্বর্তীকালীন যুদ্ধবিরতি চুক্তিটির স্থায়ী রূপ পাওয়া এবং এর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে গভীর অনিশ্চয়তা ও শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
সুইজারল্যান্ডের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বরাতে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানায় এক প্রতিবেদনে। একই সঙ্গে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সুইজারল্যান্ড সফরের পরিকল্পনা বাতিল করেছেন। এতে যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।
সুইস পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, বৈঠকটি আপাতত না হলেও শান্তি প্রক্রিয়াকে সহায়তা দিতে তারা প্রস্তুত রয়েছে। আলোচনার সম্ভাব্য আয়োজন ঘিরে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতিও চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এদিকে, আলোচনা স্থগিতের বিষয়ে ইরানের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। এর আগে তেহরান জানিয়েছিল, বিদ্যমান ৬০ দিনের যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো হলে তারা কারিগরি পর্যায়ের আলোচনায় অংশ নিতে প্রস্তুত।
গত বৃহস্পতিবার দুই দেশের প্রেসিডেন্ট একটি সমঝোতা স্মারকে ভার্চুয়ালি স্বাক্ষর করেন। এরপর সুইজারল্যান্ডের জেনেভায় চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে আলোচনা শুরুর কথা ছিল। আলোচনায় ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎসহ বিভিন্ন বিষয় স্থান পাওয়ার কথা ছিল। প্রথম দিনেই অংশ নেওয়ার কথা ছিল মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের।
জেডি ভ্যান্সের সফর স্থগিত: ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনার জন্য আজ সুইজারল্যান্ডে যাচ্ছেন না মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। হোয়াইট হাউসের এক মুখপাত্র এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছেন আল জাজিরা। মুখপাত্র বলেন, ‘ভাইস প্রেসিডেন্ট তার সংবাদ সম্মেলনে যেমন বলেছিলেন, আসন্ন কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা নিয়ে পরিকল্পনা এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদল সুযোগ পেলেই রওনা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই ধরনের আলোচনার আয়োজন কখনোই সহজ বা পুরোপুরি পূর্বানুমানযোগ্য নয়। তাই এই মুহূর্তে ভাইস প্রেসিডেন্ট আজ রাতে রওনা হচ্ছেন না।’
মুখপাত্র জানান,‘পরবর্তী পদক্ষেপ সম্পর্কে নির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হলে আমরা দ্রুত তা জানিয়ে দেব।’
নৌ অবরোধ তুলে নিল যুক্তরাষ্ট্র: মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ইরানের ওপর থেকে নৌ অবরোধ তুলে নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনি বলেছেন, এই চুক্তির বিষয়ে তাঁর ভিন্ন মত রয়েছে।
তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘মরিয়া হয়েই’ এই চুক্তিতে সই করেছেন। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে অবরোধ তুলে নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তারা জানিয়েছে, ‘প্রেসিডেন্টের নির্দেশ অনুযায়ী’ এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সব শর্ত মানবে না ইরান: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক পরবর্তী আলোচনায় ওয়াশিংটনের অতিরিক্ত দাবি মেনে নেবে না তেহরান। আগামী ৬০ দিনে পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হওয়ার অর্থ এই নয় যে, ভবিষ্যৎ সংলাপে ওয়াশিংটনের সব শর্ত মেনে নেবে তেহরান। গত বৃহস্পতিবার এক্স-এ দেওয়া পোস্টে এ তথ্য জানিয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ইমাম মোজতবা খামেনি।
এছাড়া জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে মোজতবা খামেনি বলেন, ভবিষ্যতে ব্যক্তিগত বা সরাসরি আলোচনা হলেও তা শত্রুপক্ষের অবস্থান মেনে নেওয়ার সমান নয়।
খামেনি জানান, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আলোচক দলের একাধিক আশ্বাসের ভিত্তিতেই তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে অনুমোদন দিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগতভাবে তার ভিন্ন মত ছিল। তবে, জাতীয় স্বার্থ ও প্রতিরোধ ফ্রন্টের অধিকার রক্ষার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকারের কারণে তিনি অনুমতি দেন।
পাল্টাপাল্টি হামলায় লেবাননে নিহত ২৪, ইসরায়েলে ৪: দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়াহ শহর ও আশপাশের এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ২৪ জন নিহত হয়েছেন। এছাড়া আহত হয়েছেন আরও বেশ কয়েকজন। অন্যদিকে, এসব হামলার প্রতিক্রিয়ায় হিজবুল্লাহর চালানো পাল্টা হামলায় চার ইসরায়েলি সেনা নিহত এবং পাঁচজন আহত হয়েছেন।
শুক্রবার হতাহতের এসব তথ্য প্রকাশ করেছে জেরুজালেম পোস্ট এবং লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা। এদিকে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারক বাস্তবায়নে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি না করতে ইসরায়েলকে সতর্ক করেছে চীন। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা জোরদারে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে বেইজিং।
বৃহস্পতিবার এক বিবৃতিতে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিন জিয়ান সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, পশ্চিম এশিয়া ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং সংলাপ প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টায় চীনের সমর্থন অব্যাহত থাকবে।
লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পরও মধ্যরাতের পর হামলা চালিয়ে যায় ইসরায়েলি বাহিনী। স্থানীয় সময় রাত ২টা ১০ মিনিটের দিকে ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান নাবাতিয়াহ শহর, কাফর তেবনিত, নাবাতিয়াহ আল-ফাওকা এবং রাইহান পাহাড়ি এলাকায় একাধিক বিমান হামলা চালায়। এর কিছু সময় পর নাবাতিয়াহর বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা, কাফরজোজ এবং হারুফের আল-বাইদার এলাকায় নতুন করে হামলা হয়। এসব হামলায় অন্তত আটজন নিহত হন। এছাড়া আল-আশামিয়া এলাকায় একটি বাড়িতে চালানো হামলায় ভবনটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং সেখানে চারজন নিহত হন। কাফর সির এলাকায় পৃথক আরেক হামলায় প্রাণ হারান আরও তিনজন।
ভোরের দিকে দুইর পৌরসভা ভবনের কাছে এবং দেইর আল-জাহরানি-নাবাতিয়াহ মহাসড়কে মোটরসাইকেল লক্ষ্য করে চালানো দুটি চালকবিহীন উড়োজাহাজ হামলায় আরও দুইজন নিহত ও দুইজন আহত হন। অন্যদিকে, দুইর এলাকার একটি আবাসিক ভবনে ইসরায়েলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে সাতজনে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে লেবাননের জাতীয় সংবাদ সংস্থা।
প্রসঙ্গত, জেনেভা শহরে আলোচনা চলা অবস্থায় গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা চালায় মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথবাহিনী। এতে আয়াতুল্লাহ আলি খামেনিসহ বেশকিছু শীর্ষ কর্মকর্তা নিহত হন। এর প্রতিবাদে ৩৯ দিনে ইসরায়েল ও মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটিগুলোতে ১০০ দফা হামলা চালায় ইরান। এরপর ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবের ভিত্তিতে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব দেন ট্রাম্প। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় ৮ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয় এবং ১১ এপ্রিল ইসলামাবাদে সরাসরি বৈঠক করেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। আলোচনা ফলপ্রসূ না হওয়া ১৩ এপ্রিল হরমুজে নৌ-অবরোধ আরোপ করা হয়। এরপর কয়েক দফা যুদ্ধবিরতির সময় বাড়ান ট্রাম্প।
সর্বশেষ, ইরানের ১৪ দফা শর্তের ভিত্তিতে চলতি সপ্তাহের ১৪ জুন একটি সমঝোতা স্মারক নিয়ে সম্মতিতে পৌছায় দুই পক্ষ। অ্যাক্সিওস এর সংবাদের তথ্য মতে, ১৪ দফার ভিত্তিতে দুই পক্ষ ৬০ দিনের জন্য আলোচনায় সম্মত হয়েছে এবং ইরানের ওপর হামলা তথা যুদ্ধ বন্ধের বিনিময়ে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া হয়েছে।

