নরমে গরম আর দূর্বলে সবল- এটা তো বর্তমানে বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদে একনিষ্ঠ নীতিতে চলে এসেছে। গ্লোবালাইজেশন বিষয়টি আর পূর্বের অবস্থানে মোটেও নেই । পূর্বে যেভাবে হাতি/ ঘোড়া দিয়ে সৈন্য- সামন্ত নিয়ে যুদ্বের মাঠে ছুঁটতে হতো, বর্তমানে তা অকল্পনীক বটে। অ্যাটোম বোমার এই আধুনিক যুগে বিশ্বের ভাগ্য ভালো যে যত্রতত্র অ্যাটোম বোমা নিক্ষিপ্ত হচ্ছে না। কেননা এই বোমাগুলো তো বিশ্বে শক্তি প্রদর্শনের কারণেই তৈরি হয়ছে । সুতরাং ব্যবহার হতেই পারে । আমি সব সময় একটি কথা বলি, ” অ্যাটোম বোমার চেয়েও মানুষ শক্তিশালী বোমা “। কেননা প্রথমত মানুষ (!) অ্যাটোম বোমা বানায় আবার মানুষের হাতেই সেটার সুইচ থাকে।
একবার কল্পনা করুন তো, উত্তর কোরিয়ার পাগলটার হাতে বা আমেরিকার ছাগলটার হাতে ( দুঃখিত এভাবে বলায় ) অ্যাটোমের সুইচ বা পিনকোড আছে বলে জানা যায়। এই দুই মানসিক ভারসাম্যহীন লোক দুটোর যদি ভাবনায় এমন কিছু খেলা করে এবং ফুঁটিয়ে দিলো অ্যাটোম ! তাহলে অবস্থা কেমন হবে ? বুঝি অত সহজ হয়তো বা নয়। তারপরেও কিন্তু সম্ভাবনা থেকেই যায়। অর্থাৎ অ্যাটোম ফুঁটবে কি ফুঁটবে না , সেটার সিদ্ধান্ত বা হাত কিন্ত মানুষের হাতে । সুতরাং মানুষ নামের বোমাই বেশি শক্তিশালী বলে প্রতীয়মান হয় । বিশ্বের ভাগ্য ভালো এমন কিছু ঘটছে না ।
বলছিলাম লৌহমানব মোদির কথা । কতটা লৌহমানব ? সে ব্যাখ্যায় খুব বেশি যাবার প্রয়োজন নেই । কেননা এক লাদাখই বর্তমানে তার বড় প্রমাণ। এই অঞ্চলে ভারত ও চীন সেনাদের সংঘর্ষে ২০ ভারতীয় সেনা ( কোনো কোনো পত্রিকার মতে ১৬ সেনা ) নিহত ও ১০ ভারতীয় সেনার আটককের পরে লৌহমানব মোদির বিবৃতিতে ল্যাজেগোবরে অবস্থা। মোদি বিবৃতিতে বড় মুখ ও স্পষ্ট করেই বলেছিলো, গালওয়ানে চীনা সৈন্যরা অনুপ্রবেশ করেনি বা ভারতের কোনো জায়গা তারা দখল করতে পারেনি । প্রশ্ন উঠেছে, ভারত চীনের বিতর্কিত ওই সীমানায় গত ৫০ বছরেও যেখানে এমন হতাহতের ঘটনা ঘটেনি, তাহলে এই রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের নেপথ্যে উসকানি ছিলো কাদের ? তারচেয়েও বড় প্রশ্ন উঠেছে, চীন সেনারা যদি অনুপ্রবেশ নাই করে থাকে, তবে কি উল্টো ঘটনা ঘটেছিলো ? চীন কিন্তু সেই দাবীই করে বসেছে । অবশ্য পরবর্তীতে সরকারি বিবৃতি প্রকাশের সময় ” আমাদের অঞ্চলের অভ্যন্তরে কেউ অনুপ্রবেশ করেনি” মোদির মন্তব্যের এই অংশটি কাঁটছাট করা হয়েছে ।
মোদির বক্তব্যের পরে আরো প্রশ্ন উঠেছে তাহলে ২০ ভারতীয় সেনার মৃত্যু হলো কি করে ? সেই ২০ ভারতীয় সেনাদের চীনা সেনারা নৃশংস অস্ত্র ব্যবহার করে হত্যা করে । লোহার ডান্ডার উপরে পেরেক বসানো এক অস্ত্র ব্যবহার করে হাতাহাতি যুদ্ধে ভারতীয় সেনাদের হত্যা করা হয়, এখানে বলা ভালো এক সামরিক চুক্তির কারণে ওই অঞ্চলে কোনো আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করা যায় না । অন্যদিকে ভারতের কিছু রির্পোটে দেখা গেছে চীনের প্রায় পঞ্চাশ জনের মতন সৈন্যকে হত্যা করা হয়েছে। এর কোনো প্রমাণ বা সূত্র সেই সব রির্পোটে উল্লেখ ছিলো না । বলা যায় চীনা সৈন্যসামন্ত হত্যা ভারতের একটি আষাঢ়ের গল্প ছাড়া কিছুই নয় ।
ভারত আর চীনের এমন অঞ্চলভিত্তিক যুদ্ধ কেবলি কি একটি যুদ্ধের দামামা না ভিন্ন কিছুর আভাস দেয় ? লক্ষণীয় যে সীমান্ত দন্ধের পেছনে লৌহমানব মোদির ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের অতিমাত্রায় মাখামাখি চীন খুব সহজভাবে গ্রহণ করেনি । এমনকি ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমবর্ধমান সম্পর্ককেউ চীন ভালোভাবে নিচ্ছে বলে মনে হয় না । গতবছর কাশ্মীর আর লাদাখ অঞ্চলকে ঘিরে ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ ধারা বাতিল করে ইউনিয়ন টেরিটরি ঘোষণাতেও চীন বেশ ক্ষুব্ধ বলেই মনে হয় । ইতিমধ্যেই ভারত মধ্য জাপান, ফিলিপাইন ও যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্মিলিত নৌমহড়ায় অংশ নেয়, যে মহড়াটি অনুষ্ঠিত হয়েছিলো বিরোধপূর্ণ দক্ষিণ চীন সাগরে । ২০১৯ সালের সেই মহড়ার পরে চীন ভারতের ব্যপারে একটু বেশিই সতর্ক হয়ে উঠে । ভারত গত কয়েক সপ্তাহ পূর্বে অস্ট্রেলিয়ার সাথে একটি মিউচুয়াল লজিষ্টিক সার্পোট অ্যাগ্রিম্যান্ট করে। এই অ্যাগ্রিম্যান্টের আওতায় দুই দেশ সামরিক কারণে একে অপরের নৌঘাঁটি ব্যবহার করতে পারবে । এই বিষয়গুলো ভারতীয় অনেক গণমাধ্যমে তেমন জোরালোভাবে না আসলেও অনেক নেট মাধ্যমে কিছু কিছু বেরিয়ে আসা শুরু হয়েছে। স্বাভাবিক কারণেই চীন সকল বিষয়গুলোকে একত্রিত করেই ভাবছে বলেই প্রতীয়মান হয় । চীন তার বৃহৎ প্রতিবেশিকে তীক্ষ্ম নজরেই রাখবে , কেননা চীন নিজেই যে বিশ্বের মহাশক্তিধর হতে ব্যস্ত।
কোথাও একটি জরিপে দেখেছিলাম ৭০% মানুষ দরিদ্রসীমার নিচে বসবাস ভারতে, ৫৫% মানুষ খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগ করে এবং ১২২ তম নম্বরে বিশ্বের দরিদ্রতম দেশ হিসেবে অবস্থান করে । সেই দেশের লৌহমানব মোদির দেশ হবে বিশ্বের সুপার পাওয়ার ! বিষয়টি কেমনজানি অদ্ভুত ঠেকে ( ব্যক্তিগত মত)। বাস্তবা হলো লৌহমানব মোদি এই অব্দি হিন্দু জাতীয়তাবাদের ধুলো তুলে, ভারতীয়দের ধর্মীয় অনুভূতি আর দেশপ্রেমকে পুঁজি করে ক্ষমতায় বসেছে । ক্ষমতায় গিয়ে কাজের কাজ যেটি করতে পেরেছেন তা হলো সারাদেশের জনমানুষের মাঝে বিভাজন।
এই লৌহমানব মোদি যে কাজে এই অব্দি স্বার্থক হয়েছেন, তা কেবলমাত্র আমাদের মতন দুর্বল প্রতিবেশির ( এটা অবশ্যই আমদের রাজনীতির শতভাগ দোষ ) সাথে বাহাদুরি দেখাতে এবং দাদাগিরি করতে । লক্ষণীয় যে এক সময় নেপালেও কিন্তু ভারতের মনঃপূত সরকার থাকতো। নেপাল বা বাংলাদেশের সরকার পরিবর্তনে ভারত বরাবরই সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে বেশ পারদর্শী বটে । আমরা ভৌগলিকভাবে সত্যিই বিপদে। আমাদের সাথে ৫৩ টি নদির জল নিয়ে যে ব্যবহার করে, এক সময় নেপালের সাথেও একই ব্যবহার করতো জল বন্টনে । নেপালের সংবিধান পরিবর্তনে ভারত সরকারের তীব্র প্রতিক্রিয়া ছিলো নেপালিদের জন্য একটি আঘাত। ভারত প্রতিবেশি দেশগুলোর সরকারের সাথে সম্পর্ক রাখলেও , প্রতিবেশী দেশের জনগণকে গণনায় নেয় না । ঠিক সেটাই ভারতের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বর্তমানের নেপাল ।
তাই বলতেই হয় লৌহমানব মোদিকে , বাংলাদেশের সীমান্তে অনায়াসে গুলি আর ফেলানিদের কাঁটাতারে ঝুলিয়ে রাখাটা খুব সহজ, কেননা এটাতো চীনের বর্ডার নয় । তবে এটাও মহা ভারতের মতন সত্য যে, স্বাধীনতা যুদ্ধে যতই সহযোগিতা বাংলাদেশকে করে থাকুন না কেন ( যদিও সেখানে অবশ্যই পাক- ভারত শক্তির একটি রাজনৈতিক হিসেব ছিলো ), যদি সময়ে বাংলাদেশের জনমানুষের সাথে সম্পর্ক গড়ে না উঠে কেবলমাত্র সরকারের সাথে ( ফয়দার জন্য) সম্পর্ক থাকে, তাহলে একদিন নেপালের উদাহরণ এই দেশেও তৈরি হতে বাধ্য হবেই হবে। কেননা এই দেশটি যে এই মাটির জনমানুষের রক্তেই স্বাধীন হয়েছে। আর একটি কথা পরিষ্কার বলা প্রয়োজন, প্রতিবেশী দেশের জনমানুষের সাথে সম্মানের সম্পর্ক না থাকলে, আর যাই হোক বিশ্বে সুপার পাওয়ার হওয়ার স্বপ্ন কখনোই বাস্তবায়ন হতে পারে না । থিংক টুয়াইস ।

বুলবুল তালুকদার
যুগ্ম সম্পাদক শুদ্ধস্বর ডটকম

