শিবরাম চক্রবর্তীর ভাষায় বন্ধু হয়, সেই ছেলে বেলায়, স্কুল কলেজে– প্রাণের বন্ধু।তারপর আর নয় আর নয়। আমরা কজন সেই বন্ধু।মলি, রোজী,জয়া,রিনাআপা,আমি।
অনেকদিন, আমাদের দূরে কোথাও যাওয়ার ইচ্ছা জেগেছিলো।যখনই যাওয়ার প্রসঙ্গ আসতো,বাঁধ সাধতাম আমি।হামিদ অসুস্থ। ওকে একা রেখে যাওয়া সম্ভব নয়।জয়া বলতো লিনু যাবে কি করে ? ওরতো বেবী আছে।বেবী সিটিং করতে হবে না?
রোজী থাকে আমেরিকা,মলি অস্ট্রেলিয়া, আমি রিনা আপা, জয়া ঢাকায়। রোজী বা মলি ঢাকায় এলে আমরা এক সাথে হই। কখনো রিনা আপার ওখানে কখনো জয়া কিংবা আমার বাসায়।
সেবার রোজী,মলি ঢাকায় ছিলো না। সুরভী ( জয়ার মেয়ে) এক সন্ধ্যায় আমাদের ওর বাড়ীতে আমন্ত্রণ জানালো। খাবারের সাথে গানের আয়োজন ছিলো।
কয়েক মাস পর জানুয়ারী ১৯ শে রোজী ঢাকায় এলো মার্চে ফিরে যাবে।জয়ার বাসায় আনন্দ আড্ডায় রোজী সুরভীর কাছে গান শোনার আবদার রাখলো।
সুরভী রোজীকে গান শোনাবার আয়োজন করলো।এবারো যথারীতি বাধ সাধলাম আমি।হামিদ অসুস্হ সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে।সুরভীর বাসায় আমি উপস্হিত থাকবো না।জয়ার ভালো লাগছিলো না। সামরিক হাসপাতালের নিয়ম অনুসারে রাতে পুরুষ ওয়ার্ডে মহিলা সেবিকা থাকতে পারে না।তাই রাতে আমাকে বাসায় ফিরতে হয়।জয়া ফোনে বার বার অনুরোধ কোরছিলো প্লিজ তুই আয়,কিছু সময়ের জন্য। জয়ার অনুরোধ ফেলতে পারলাম না, রাজী হয়ে গেলাম।রাতে সুরভীর বাড়ি গিয়ে দেখি বড়সড় আয়োজন।একে একে অতিথি আসছে।ব্যস্ততম ঢাকায়, বর্তমান সংস্কৃতি হলো রাত করে দাওয়াতে উপস্থিত হওয়া। আর হবেই বা না কেন? একেতো জান জটের নগরী তার উপর সবাই কর্মজীবী। সাপ্তাহিক ছুটির দিনে বাড়ীর কাজ কর্ম গুছিয়ে অতঃপর নিমন্ত্রণ রক্ষা করা।
রাত বাড়ছে- আমার উসখুস বাড়ছে, বাড়ি ফিরতে হবে।রাত দশটায়, অতিথি আসার পালা শেষ হলো।গানের আসর বসলো। আমার মুঠো ফোন একটু পর পর বাজতে শুরু করলো। আমার ফুপাতো ভাই কর্নেল মুনির( প্যাথলজিস্ট) ফোন দিচ্ছে।হামিদ এর বায়োপসি খারাপ দেখতে পাচ্ছে— তাই তার পুরনো রিপোর্ট গুলো দেখা প্রয়োজন।রিপোর্ট তো আমার সঙ্গে নেই।বাসায় রাখা আছে।সবার মাঝ থেকে উঠে গিয়ে ফোন ধরতে খুউব বিব্রত বোধ কোরছিলাম।রোজী আমার অবস্থা টের পেয়ে ইশারা করলো তুমি চলে যাও।জয়া খালি পেটে আমাকে বিদায় দিতে চাচ্ছিলো না।পাশের ঘরে গিয়ে আমার জন্য কিছু খাবারের ব্যবস্হা করলো।আমার গলা দিয়ে খাবার নামছিলো না।জয়া খাবার প্যাকেট করে দিলো।নিজকে খুউব অপরাধী মনে হচ্ছিলো।চুপি চুপি অতিথিদের কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে পালিয়ে চলে এলাম ।
পরেরদিন সকালে সি এম এইচ গিয়ে কঠোর কঠিন খবর পেলাম।হামিদের ব্লাড ক্যান্সার। সাধারন ক্যান্সার নয়।টি সেল লিম্ফোমা। এশিয়ায় হাতে গোনা কিছু মানুষ এ রোগে আক্রান্ত। হামিদ তাঁদের মধ্যে একজন।শুরু হলো আমাদের ক্যান্সার এর সাথে যুদ্ধ। আমাদের মুক্তি যুদ্ধটা ছিলো নয় মাসের।সে যুদ্ধে আমরা জয়ী হয়েছিলাম। আর ক্যান্সার এর সাথে পাঁচ মাসের যুদ্ধে আমরা হেরে গেলাম।২৪, শে আগস্ট হামিদ আমাদের ছেড়ে চলে গেলো সীমানাহীন সীমানায়। রিনাআপা, জয়া আমার কষ্টের সময়টা আমাকে ঘিরে থাকলো।প্রিয় জন হারাবার অভিজ্ঞতা জয়ার আছে।আমাদের কেন্টু ভাই জয়ার স্বামী ২৬, বছর আগে জয়াকে ছেড়ে অনন্তলোকে।আমার প্রতিদিন এর কষ্ট গুল জয়া অনুভব করতো। আমাকে বলতো, আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকতাম।২৬, বছর আগের কষ্ট গুলো এখন কত জীবন্ত।একদিন ও বললো তুই চাইলেই তো আর হামিদভাই কে ফিরে পাবি না।তোকে সত্যি টা মানতেই হবে।ফিরিবার পথ নাহি, সব থেকে সত্য মোর।

অক্টোবরে আমার কিছু শারীরিক পরীক্ষার প্রয়োজন দেখা দিলো।সি এম এইচ যেতে আমার মন চাইছিলো না।মাএ দুমাস আগে হামিদ সেখান থেকে চির কালের জন্য বিদায় নিয়েছে।রিনা আপা আমাকে শ্যামলী স্পেশালাইজড হাসপাতালে ডাক্তার আরিফের কাছে নিয়ে গেলো।ডাক্তার দেখিয়ে ফিরে আসার সময় জয়া বেড়াতে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠালো ,রোজী,ডিসেম্বরে মলি জানুয়ারী আসছে আমরা এক সাথে কোথাও ঘুরে আসি।বুঝতে পারছিলাম আমার মন ভালো করার পরিকল্পনা ।পরিকল্পনার কথা মলি রোজী কে জানানো হলো, দুজনই রাজি । কিন্তু সময় টা সবার সময় অনুযায়ী মেলানো কঠিন হয়ে পড়েছিলো– শেষ অবধি ঠিক হলো, ফেব্রুয়ারি প্রথম সপ্তাহে শান্তি নিকেতন যাবো।ফেব্রুয়ারি বই মেলার মাস।বই মেলায় তাহের সংসদের স্টল থাকবে।সে স্টলের দায়িত্ব আছে।তার উপর আবার রোজীর বই প্রকাশ হবে এবারের বই মেলায় ।সামাদ বেহেরেঙ্গীর সব চাইতে জনপ্রিয় শিশু সাহিত্য The little black fish এর অনুবাদ কাজলা মাছের সমুদ্র যাত্রা । ঈশিতা ,ইরেশ দুজন চাইছিলো আমরা শান্তি নিকেতন যাই।কারণ ওদের বাবার শান্তি নিকেতন যাওয়ার খুব ইচ্ছা ছিলো তা পূরণ হয়নি।সেনাবাহিনীর চাকরিতে থাকাকালীন কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়া বিদেশ ভ্রমণ করা যায় না।হামিদ এর আত্মসম্মান বোধ ছিল প্রচন্ড ।সহজে কোন কিছুর সাথে আপস কোরতে পারতোনা।সেনাবাহিনীর চাকরির সাথে তা বেমানান।সেনাবাহিনীর সৃঙ্খল অনুযায়ী উর্ধতন এর সিদ্ধান্ত চুরান্ত।আবেদন কোরে যদি নাকচ হয় ।তা মেনে নেয়া তার জন্য কঠিন।তাই সে আবেদনই কোরবে না। আমাকে বলতো লিনু অবসরে গেলে আমরা শান্তি নিকেতন যাবো।
সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণ করে হামিদ যোগ দিয়েছিলো বিশ্বব্যাঙ্ক আর ব্রাক এর যৌথ উদ্যোগে স্বাস্থ্য সংস্থার কর্মযজ্ঞে আফগানিস্তানে ।কাজটি ছিলো চ্যালেঞ্জিং।প্রতি মুহূর্তে মৃত্যুর মুখোমুখি ।অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলো এতো বিপদ জনক কাজে কেন? হামিদের উওর ছিলো যৌবন থেকেই তো জীবন এর সাথে লড়াই করছি।বিশ্ব বিদ্যালয়ের জীবনে শ্রেণীচ্যূত হওয়ায় জন্য ঢাকা মেডিকেল ছেড়ে গ্রামে গিয়ে সাধারণ মানুষের সাথে বসবাস কোরেছি। ইউ এন মিশনে সুদানে যুবায় কাটিয়েছি।সুদান পৃথিবীর অন্তর্দন্দ বহুল দেশ গুলোর অন্যতম ।সাংস্কৃতি,ধর্মীয় অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক বিভাজন মতবিরোধের ফলে আধুনিক কালের সব চাইতে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ অব্যাহত ছিল।একটা ঘটনা প্রায়ই স্মরণ করতো।একদিন প্রাতঃভ্রমণে বের হয়ে দেখে জায়গায় জায়গায় মানুষের জটলা।দূর থেকে গোলাগুলির শব্দ ভেসে আসছে।এ তো ওদের নিত্যদিনের ঘটনা।হামিদ এগিয়ে যাচ্ছে, হঠাৎ ৭/৮ বছরের একটি ছেলে বাড়ি থেকে দৌড়ে বের হয়ে হামিদের টি শার্ট টেনে ধরে ঝুলে আছে।আগাতে দিচ্ছে না।বাড়ির ভিতর থেকে মহিলারা ইশারা কোরছে আগাতে না।ক্যাম্পে ফিরে যেতে। সেদিন সেই ছোট্ট ছেলেটি ওর জীবন বাঁচিয়ে ছিলো।পরে জেনেছিলো দুই গ্রুপ এর রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে অনেক হতাহত হয়েছিলো। তিন বছর আফগানিস্তানে কাটিয়ে পারিবারিক প্রয়োজনে ফিরে এসেছিলো আরেকটি দায়িত্ববোধ থেকে। নিজ চাকরি,ঈশিতা,ইরেশ ইউরোপে, আমেরিকায় অবস্থান এর কারণ ওর অনেক জায়গা দেখার সুযোগ হয়েছিল।কিন্তু শান্তি নিকেতন যাওয়ার সুযোগ ঘটেনি।মৃত্যুর আগে ঈশিতা বাবা কে শান্তি নিকেতন নিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল, কিন্তু প্রকৃতি নির্ধারণ করে রেখেছিল শেষ আশ্রয় সেনাবাহিনীর ছায়া ঘেরা সুনিবির শান্তির নীড় ।

লিনু হক, ৭০ দশকের ছাত্রলীগ নেত্রী এবং মুক্তিযোদ্ধা ।

