জীবন-জীবিকার বাজেট

জীবন-জীবিকার বাজেটকে তাঁরা বুঝেনি। প্রবৃদ্ধি নয়, পরিস্থিতিকে অনুকূলে রাখতে এ বাজেট, যা দুটো পূনর্গঠণে আরও ৩.৮% অনুকূলে রাখবে

জীবন-জীবিকা রক্ষায় মূল্য-সংষোজন অর্থনীতিভিত্তিক ব্যয়ের রূপকল্প হওয়ায় এবারের বাজেট একইসাথে বহুমুখী সামাজিক, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক। চলমান করোনা ও আসন্ন বন্যাদ্বয়ের ক্ষতির আঙ্গীক ও পরিবর্তনের দিকগুলো অজানা। তাই কর্মসূচী ভিত্তিক নির্দিষ্ট বরাদ্ধ-বাজেট করাও সম্ভব নয়।
চলমান পরিস্থিতিতে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব জাতি ও সরকারের সর্বোচ্চ আয়-ব্যয় নিশ্চিত করা। ফেব্রুয়ারী, ২০২০-এ প্রাক্কলিত অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হার ৮.২% যা নিকট-অতীতের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিদ্যমান কাঠামো-প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে ৪ বছর আগে থেকে আমার প্রাক্কলণ ছিলো ৮.৩% তা প্রধানমন্ত্রী জ্ঞাত।
প্রধানমন্ত্রী হাসিনার পরামর্শে ২০১৯-২০ অর্থবছরে বাজেট রূপকল্পের অর্জিত প্রাক্কলন ৮.২% এবং আমার ভবিষ্যতব্য ৮.৩%-এর ভিত্তিতে জিডিপি প্রবৃদ্ধির রাখা হয়েছে। একান্ত অপরিহার্ষ ক্ষেত্রগুলোর সংশোধন ছাড়া বাকী খাতগুলোর প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি ভিত্তিক আনুপাতিক বরাদ্ধ রাখা হয়েছে।
অর্থনীতি চলে বিদ্যমান কাঠামো-প্রতিষ্ঠানের ভিত্তিতে সরকারী-বেসরকারীখাতে ব্যয় থেকে। তাই অর্থনীতিতে ব্যয় সঞ্চালন হলে বিগত ৮.২% প্রবৃদ্ধির হার অর্জন হবে তা পরীক্ষিত। বেসরকারী সরকারীখাতের উচ্চতর আয়-ব্যয় কাঠামো নিশ্চিত থাকলে, পরিস্থিতি ও প্রয়োজনে ব্যয় বাড়ানো-কমানো যাবে, ।
-২-
কোন বিধান-প্রতিষ্ঠান-নীতিমালার ভিত্তিতে ও কিভাবে তা করা যাবে, তার ইঙ্গীত, রূপরেখা ও ব্যয়ের প্রাক্কলন ছাড়া সামাজিক রক্ষাখাত ও স্বাস্থ্যখাতে আরও বেশি বরাদ্দ প্রয়োজন ছিল—সিপিডি, টিআইবি, পিআরআইবি, পিপিআআরসি, সানেমসহ অর্থনীতিবিদগণ এমন মন্তব্য্ জাতির জন্যে বায়বীয়।
বিশ্বায়িত অর্থনীতির বন্ধকৃত পরিস্থিতিতে এবারের জীবন-জীবিকা বাজেটের এদিকটা সিপিডি, টিআইবি, পিআরআইবি, পিপিআআরসি, সানেমসহ অর্থনীতিবিদগণ বুঝে উঠতে পারেননি। তাই তাঁদের অন্বেষণ নেই, বিশ্লেষণ নেই, দক্ষতার অভাব, ইত্যাদি সমালোচনা গতানুগতিক, পশ্চাৎপদ, ও সংকীর্ণ হয়েছে।
চলমান করোনা ও আসন্ন বন্যাদ্বয়ের ক্ষতি মোকাবেলায় একাধিক বছরমুখী জীবন-জীবিকা রক্ষাসহ জনবান্ধব, কর্মসংস্থানমুখী ও উচ্চতর প্রবৃদ্ধির ধারায় এবারের বাজেট। এমন প্রজ্ঞাসম্মত বাজেট প্রনয়ণের জন্যে অর্থমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ।
বাজেটের নীতি-বরাদ্ধ সংশোধন যোগ্য। অজ্ঞাত-কাল্পনিক হিসেবে বরাদ্দ থেকে অর্জিত বিগত বছরমত বাজেট-প্রনয়ণ করা ভাল। লকডাউন পরিস্থিতিতে নুতন বিনিয়োগ-উন্নয়ণের পদক্ষেপসমূহ আরও নাজুক হতে পারে। তবে সার্বিক কল্যাণে দুটো মৌলিক কাঠামো-প্রতিষ্ঠানগত পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ আছে।

-৩-

প্রথমটি হলো, বাকী অঙ্গীকারকৃত কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ গঠণ। ১৯৮৪ সালে ৬৪টি জেলা গঠনের পরে প্রস্তাবমত বাংলাদেশকে ৯/১০টি বিভাগে বিভক্ত না করায় রাষ্ট্র-অবকাঠামো শীতিল হওয়ায় এবং জাতীয় বেতন স্কেল দূর্নীতিমুখী হওয়ায় দেশে লুট-দূর্নীতি-সন্ত্রাস-ধর্ষণ-হত্যা বাড়তে থাকে।

কাঠামো ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা ছাড়া শুধু কথায় সুপ্রশাসন, মানবাধিকার, গণতন্ত্র ও জাতীয় সম্মৃদ্ধি হয় না। রাষ্ট্র-অবকাঠামো একইসাথে সামাজিক, অর্থনীতিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। এর প্রভাব বহুমুখী। বিভাগদ্বয হলে রাষ্ট্র-অবকাঠামো ও বাজার কাঠামোও সুষমমুখী প্রতিযোগী হবে। সিন্ডিকেটের প্রভাব কমবে।

রাষ্ট্র-অবকাঠামোর শীতিলতা হ্রাসসহ আয়-বন্টনের সুষমধারা সংরক্ষিত হওয়ায় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ১.৩% এবং কর-আয় অধিকতর হারে বাড়বে। বছরে ১৫/১৬ কোটি টাকা ব্যয়ের অঙ্গীকারকৃত জরুরী ভিত্তিতে কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ চালু করার চেয়ে রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি কমাতে সহজ ও টেকসই বিকল্প নেই।

-৪-

দ্বিতীয়টি হলো, অন্তর্বর্তীকালীণ সুষমমুখী জাতীয় বেতন স্কেল। এটা সরকারী সংস্থাসমূহের প্রধান এবং বেসরকারীসংস্থার জন্যেও অন্যতম রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। জাতীয় আয়বন্টনের সাথে সামঞ্জসে সুষমমুখী জাতীয় বেতন স্কেল হলে সরকারীসংস্থা কর্মশীল থাকে এবং সেবা-উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি হার বাড়ে।

ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের জাতীয় আয়বন্টনের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন ধারা যথাক্রমে প্রায় ৩৪:১, ৩৩:১ ৩২:১। আয়কর বাদে প্রদেশিক-সর্বনিম্নসহ ভারত-পাকিস্তানের জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন অনুপাত ১৮.:১-এর উপরে। বাংলাদেশের সুষমমুখী জাতীয় বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন অনুপাত প্রায় ২০:১।

জুলাই, ২০১৫ অর্থবছরে চালুকৃত সর্বোচ্চ-সর্বনিম্ন ৯.৫:১ অনুপাত ভিত্তিক “দুর্ণীতিমুখী” ৮ম জাতীয় বেতন স্কেলের বেতন-ভাতা ২০১৯/২০ অর্থবছরে ৬৫%-এ হ্রাস পাবে। তাই সংস্থাসমূহের সেবা কমছে এবং দুর্ণীতি বেড়েছে। আগেরমত এখন ২০% মহার্ঘ দেওয়া হলে সরকারী সংস্থাসমূহের সেবার চেয়ে ব্যয় বেড়ে যাবে।

মুজুরী স্কেল, ২০১৯-এর আলোকে সর্বনিম্ন ১০,০০০/০০ টাকা এবং ভারত-পাকিস্তানের আলোকে ১ম পদক্ষেপে ১৬:১ অনুপাত ভিত্তিক “অন্তর্বর্তীকালীণ জাতীয় বেতন স্কেল” চালু করা জরুরী। সমীক্ষামতে জিডিপির প্রবৃদ্ধির হার চালুর অর্থবছরে ন্যুনত ২.৫% বাড়বে। ইতিবাচক প্রভাব হওয়ায় কর-আয় বাড়বে।

-৫-

৬ দফার রাষ্ট্রদর্শনের আলোকে ১৯৮২ থেকে আমার (রাষ্ট্রবিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহসানুল করিম) প্রস্তাবানা ও উদ্যোগগুলো থেকে “উচ্চতর সমৃদ্ধিশীল বাংলাদেশ” বা “হীরকবাংলা” গড়ে উঠছে (প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার রূপরেথা, ১৯৮৫, প্রগতিশীল গণতন্ত্র, ১৯৯১ ও সুপ্রীমকোর্টে পেশকৃত প্রতিবেদন, ২০১১)।

বাকী কুমিল্লা ও ফরিদপুর বিভাগ, সুষম জাতীয় বেতন স্কেল, দুইকক্ষ সংসদ এবং দুইবারের বেশী সরকার প্রধান না হওয়ার বিধান চালু হলে “হীরকবাংলা” গড়ার ১ম-পর্ব শেষ হবে। ২য়-পর্বে ১০টি প্রদেশ/অঞ্চল (বিভাগগুলো) ভিত্তিক বাংলাদেশ হলে “কয়েক শতাব্দী” উচ্চতর সম্মৃদ্ধিশীল রাষ্ট্র থাকবে।

সুষমমুখী জাতীয় বেতন স্কেল চালু হলে বেতন-মঞ্জুরী-অবসরভাতা ব্যয় প্রায় ৩০% বাড়বে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৫ বছরে ক্রমে ২.৭% থেকে ৩.৮% এবং মুদ্রা আয়ও ক্রমে ০.৬% থেকে১০.৮% বাড়বে। বেতন-ভাতার বাড়তি ব্যয় মিটিয়ে মাসিক দরিদ্র-ভাতাসমূহ ২৫০০/০০ টাকায় উন্নীতসহ করোনার আংশিক অর্থায়ণও হবে।

মূল্য-সংষোজন অর্থনীতি-চক্র লক-ডাউনে এখন “বিনিয়োগ=>উৎপাদন=>বিপণন=>ভোগ” বদলে “ভোগ=>বিপণন=>উৎপাদন=>বিনিয়োগ” রূপা নিয়েছে। এ চক্রের গতি থাকলেই অর্থনীতিরও গতি থাকবে। তাই  অনুদান/ঋণ দিতে হবে। লক-ডাউন প্রত্যাহার হলে অর্থনীতির চক্র আবার পূর্বের ধারায় আসবে।

11111111.PNG

=============================================

2222.PNG

রাষ্ট্রবিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ আহসানুল‍ করিম সাবেক বিসিএস কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা, মেরিল্যন্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ফোনঃ ২১৪-২৯৩-৪১২৪

 

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.