করোনাযুদ্ধের দিনগুলো (পাঁচ)

অদৃশ্য শত্রুর কালো থাবায় সমস্ত পৃথিবী অচল। সবকিছু লন্ডভন্ড হয়ে গেছে। প্রিয়জনকে হারিয়ে, সবাই যেন শোকে মূহ্যমান। তাদের ভালোবাসার প্রকাশ ইলেক্ট্রনিক মিডিয়া ও ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সয়লাব হয়ে গেছে। নানা জনের ভাবের প্রকাশ দেখে স্বজনরা নিরবে অশ্রু বিসর্জন অথবা চোখ মুছেন। কারণ যারা হারিয়েছেন তারাই বুঝেন এর ব্যাথা। আমি হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছি; যারা চলে গেলেন তারা যদি দেখতেন, কতোটানা আনন্দিত হতেন। চতুর্থ দিনের পর আমার খাবার রুচি একটু একটু আসতে শুরু করেছে। ডাক্তার, নার্সরাও খুশি। আস্তে আস্তে একটু একটু করে সবকিছু আয়ত্তের মধ্যে আসতেছে। তখন আমি ভাবলাম আল্লাহর মেহেরবানীতে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা আমিই সৌভাগ্যবান ব্যক্তি, আমাকে নিয়ে যে স্বজনরা ভালোবাসার প্রকাশ করেছেন তা আমি দেখতে পারতেছি।
আমাকে নিয়ে যারাই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে স্ট্যাটাস দিয়েছেন প্রত্যেকের লেখা ছিল হৃদয়ছোঁয়া, আবেগঘন। এই স্বল্প পরিসরে সবগুলো তুলে ধরা সম্ভব নয় বলে দুঃখিত। অনেকের সাথে কয়েক যুগ দেখা নাই। কিন্তু তাদের ভালোবাসার প্রকাশ দেখে আমি অভিভূত। যেমন স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয়, মেধাবী, ডাকসুর ইতিহাসে প্রথম দুইবারের নির্বাচিত ভি. পি. আমাদের বিপ্লবী জীবনের স্বপ্নের প্রাণপুরুষ নাগরিক ঐক্যের আহবায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ফেসবুকে লিখেন, শাহাব উদ্দীন আমার দীর্ঘদিনের অন্তরঙ্গ সাথী, তার অসুস্থতার খবরে চিন্তিত। আশু রোগ মুক্তি কামনা করি। পরে আবার লেখেন, তোমার সর্বশেষ খবরে চিন্তামুক্ত হলাম। দোয়া করি শিগগরই তুমি সুস্থ হয়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে এসো।’ একইভাবে বলেছেন, জয়নাল আবেদিন, মুমিনুল ইসলাম, সাইদুল ইসলাম (আমার সময়ের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক), ইসমাইল হোসেন, মহিউদ্দিন চৌধুরী লিটন, ইমাম গাজ্জালী, শহীদুল্লাহ, মোশাররফ হোসেন, শওকত হোসেন বায়রন, সাত্তার খান, মুন্সি মুজিবুর রহমান, একরামুল হায়দার, মোফাক্কারুল হায়দার নবাব, আল মামুন, রেজাউল করিম, আবুল হাসেম, শামসুন্নাহার মুন্নী, সেলিনা ইয়াসমিন শেলী।
৫ এপ্রিল দেখলাম আতিকুর রহমান, আমাদের দীর্ঘদিনের সংগ্রামের সাথী, বন্ধু ভাইয়ের মতো হয়ে গিয়েছিল। তার সাথে আমার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল, ঢাকার সব খবর পেতাম। দেশে গিয়ে দেখা করিনি বিধায় অভিমানও করেন। পরে ক্ষমা চেয়ে রক্ষা পাই।
তিনি আমার অসুখের খবর শুনে লিখেন, আল্লাহ তুমি শাহাব ভাইকে রহম করো। আল্লাহ তার কথা শুনলেন, আমাকে রহম করলেন। কিন্তু আতিক ভাই পরের দিন হার্ট অ্যাটাক করে ঢাকার একটি ক্লিনিকে মারা যান। আমি তার মতো নির্লোভ, সাদা মনের নেতাভক্ত মানুষ জীবনে খুব কম দেখেছি । আজীবন তিনি মান্না ভাইয়ের সাথেই ছিলেন। তার মৃত্যুর খবরে আমার এই দুর্বল সময়ে মনে হয়েছিল কলিজাটা ছিড়ে গেছে, দারুণভাবে ব্যতিত হয়েছি।
স্বৈরচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে সময়ে ঢাকার সহযোদ্ধারা এখনো আমাকে ভুলে জাননি। একসাথে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজপথসহ সারা বাংলাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান চষে বেড়িয়ে গণতন্ত্র ও শিক্ষার দাবিসহ ছাত্রসমাজের দশ দফা দাবি আদায়ের লক্ষ্য ছাত্রদের ঐক্যবদ্ধ করেছি। অনেক শহীদের রক্তস্নাত, জেল জুলুম, অত্যাচারের নির্যাতনের মাধ্যমে ৯০ এর গণঅভ্যূত্থানের মধ্যে দিয়ে সামরিক জান্তা এরশাদ শোচনীয়ভাবে বিদায় নিতে বাধ্য হয়েছিল।
যাক সেই সময়কার আওয়ামী ছাত্রলীগের সভাপতি পরবর্তীতে ডাকসুর ভি.পি বর্তমান সাংসদ আমাদের প্রিয় সোলতান ভাই ফোন করে আমাকে কুশলাদি জিজ্ঞেস করেন এবং তারই বন্ধু আমারও ঘনিষ্ঠ বড় ভাই সুফিয়ান খানসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নিয়মিত খবর নিয়েছেন। সেই সময়ের ডাকসুর জি. এস এবং জাসদ ছাত্রলীগের সভাপতি মোশতাক ভাই সব সময় তারই খালাতো ভাই হাছানের মাধ্যমে প্রতিদিনের খবর নিয়ে অবশেষে লিখেন,
‘শাহাব উদ্দীন তুমি একটু ভালো হয়েছো, ভাই শুনে আশ্বস্ত হলাম। তুমি আমাদের বেঁচ থাকার প্রেরণা।’ একইভাবে তৎকালীন জাসদ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাবেক সাংসদ ও বর্তমান বাংলাদেশ জাসদের সাধারণ সম্পাদক নাজমুল হক প্রধানসহ তৎকালীন সময়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতা সাবেক সাংসদ জহির উদ্দিন স্বপন, আমানউল্লাহ আমান, মোস্তফা ফারুক, আশরাফুল হক মুকুল, আখতার সোবহান মসরুর, কমরেড জহিরুল ইসলাম, রাজেকুজ্জামান রতন, বজলুর রশিদ ফিরোজসহ ঢাকার রাজপথের বিভিন্ন দলের সাথীরা এবং জাতীয় অনেক নেতা, এক সময়ের আমাদের সংগ্রামের সাথী বর্তমানের বড় বড় আমলা, বেশ কয়েকজন খবরা খবর নিয়ে যে হৃদয় নিঙ্গড়ানো ভালোবাসা দেখিয়েছেন আমি তাতে ভীষণ কৃতজ্ঞ।
প্রতিদিন হাসপাতালে আমার অবস্থার উন্নতি দেখে ডাক্তার, নার্স সবাই খুশি। ইতোমধ্যে দশ দিন অতিবাহিত হয়েছে। আমি অক্সিজেন ছাড়া আস্তে আস্তে নিজে শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে পারছি। সংশ্লিষ্টরা তাদের চিন্তা ভাবনা আমার সাথে শেয়ার করেন। যেমন হাসপাতালে নতুন রোগীদের প্রচন্ড চাপ। তাই হাসপাতালে স্থিতিশীল রোগী যাদের নিয়মিত শুধু ঔষধ বিশ্রামের দরকার তাদেরকে হোটেলে ব্যবস্থা করে দেয় অথবা নার্সিং হোমে। আর যাদের বাসায় ভালো ব্যবস্থা আছে নিজের বাসায় দিয়ে দেয়। আমি বাসায় আসার ব্যাপারে মত দিলাম। কারণ আমেরিকানরা ব্যস্ত তাদের সংস্কৃতি নিয়ে। পারিপার্শ্বিক কারণে তারা আলাদা বাসায় থাকে, বাসায় দেখার কেউ নাই, যে কারণে কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেই তাদের জন্য হোটেল বা নার্সিং হোমের ব্যবস্থা করে। কিন্তু আমাকে ছাড়ার পূর্বে সবকিছু চেক করতে গিয়ে করোনার কারণে আমার নার্ভে একটু সমস্যা হয়েছে। তাই নিউরোলজি ডাক্তার এসে আরও দুই দিন সকাল বিকাল ব্যায়াম এবং ঔষধ দিয়ে সামান্য উন্নতি করে বারো দিন পর বাসায় আসার ছাড়পত্র দিয়ে হুইল চেয়ারে করে তাদের গাড়িতে আমাকে বাসায় এনে দিয়ে গেল। কিন্তু সাথে কড়া নির্দেশনা, আমার রুমেই থাকতে হবে। বাথরুম, খাবার, গ্লাস, প্লেট ইত্যাদি ব্যবহারিক সব জিনিস আলাদা রাখতে হবে। অর্থাৎ পুরো তিন সপ্তাহের কোরায়েন্টাইন। সাথে ঔষধপত্র, ব্যায়াম করার জিনিস, কোন অসুবিধা হলে চব্বিশ ঘণ্টা / সাতদিন যে কোন সময় যোগাযোগের জন্য ফোন নাম্বার দিয়ে গেল।
বাসায় এসে প্রথমেই দুই সপ্তাহ পরে সেইভ করে গোসল করলাম। হাসপাতালে রুমের সাথেই সুন্দর বাথরুম ছিল, ডাক্তার, নার্সরা বিদায়ের পূর্বে অনেক পিড়াপীড়ি করেছে গোসল করার জন্য। সাবান, ক্রিম, রেজার প্রয়োজনীয় সবকিছুই ছিল কিন্তু আমি কেন যেন কমফোর্ট ফিল করিনি। নার্সরা চায় একজন রোগী দেখতে সুস্থ সুন্দরভাবে সর্ম্পূন্ন মনোবল নিয়ে হাসপাতাল থেকে বিদায় নিয়ে যাক। কিন্তু আমাকে বারবার সাবধান করে দিল কভিড-১৯ দুই, তিন সপ্তাহ পর্যন্ত শরীরে সুপ্ত অবস্থায় থাকে। পরবর্তী টেস্ট না করা পর্যন্ত সবার কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে। শুরু হলো আমার বেড রুমের ভিতরে কোরারেইন্টাইন। চলবে….

26195622_143370233029778_6765122721416600831_n
লেখক: স্বৈরচার বিরোধী আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা ও সাবেক সভাপতি বাংলাদেশ ছাত্রলীগ।

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.