দাগ
.ছুঁয়েছিলে অঘ্রানের কালে—
মৌমাছিদের ডানা-ভাঙা শব্দে যখন
ধূপের গন্ধে পোড়ে গোপন প্রশ্বাস।
ফাগুনের উষ্ণতায়
নাভিমূল থেকে কাটে তন্দ্রা-ঘোর
কেটে ঝেঁটে ছুঁড়ে ফেলি পুরনো অসুখ।
এবার ঘামের গায়ে স্মৃতির চাদর
স্মৃতি হয়ে, মেঘ হয়ে এ ভরা ভাদর
এখন স্পর্শে রাখ স্পর্শের দাগ।
.
প্রতীক্ষা
.জন্মের আরও আগে
স্নায়ুতে রোদের শিহর- চোখে দীপ্ত নীলিমা-
এক কোষী প্রাণ ভেঙে বহুকোষীর স্তরে
মুছেছি সরীসৃপ নখরতা-
খসিয়ে পাখির ডানা
শরীরে কামের গন্ধ- হৃদয়ে আশ্বিন দোলা
শরীরে ফুলের ডালি- নিঃশ্বাসে নির্যাস
শরীরে বাতাসের গতি- মননে আকাশ
হাঁটি হাঁটি পা পা
তোমারই প্রতীক্ষায়
এক বিংশ শতকের দূষণ-মুখে
রয়েছি তাকিয়ে….
কাল দেখা হলে
কাল দেখা হলে চুমু খাবো ঠোঁটে-
ঠোঁট থেকে তুলে নিও ভুল-চুমুর অদেখা দর্শন,
নিঃশ্বাস-হাহাকার…
‘ফুল নেবেন ফুল’ আগ্রহী ফুল-শিশুদের মতো
ভুল জমা আঙুলের ভাঁজে।
সে-সব কি মোছে স্পর্শের শিহরে!
কাল রাখবো বিকেল দুপুরের সাথে-
ঘরভাঙা আর্তনাদ, নিঃস্ব-কালিঝুলি রাত থেকে
খসুক অনাগ্রহে রোপিত রজন।
চুমুর সিঞ্চনে রূপকথার জিয়নকাঠি-স্পর্শ
স্পর্শ দাঁড়াক জীবনের সমান সমান…
কাল দেখা হলে চুমু খাবো ঠোঁটে—
ঠোঁট থেকে মুছো ভুল-চুমুর অদেখা দর্শন।
ব্রিজ
.ভেঙে পড়ছে ব্রিজ
কংক্রিট জ্বরে কাৎরাচ্ছে সামনের রাস্তা
কত সাধনা করলে সাধু ভেস্তে গেল ঘাম ও জঞ্জালে
গাছের ডালে ঝুলছে ঘুড়ি ও চামচিকা
মিলে মিশে থাকে মুক্তি ও বদ্ধতা
ব্রিজ ভেঙে পড়ছে
ঝুলে পড়ছে বাগান
চৈত্রের পুকুর থেকে উড়ে যায় মাছ
সম্পর্ক থেকে খুলে পড়ে হাড়
মাংসের ডিবি ধরে এগিয়ে যাচ্ছে উইপোকা..
মুণ্ডহীন ভোর নাচছে তাধিন তাধিন–
.
মায়াবতী
.হাসছে ভাসছে মায়াবতী মহাকাল।
কারো উষ্মায় কেউ কেউ বাগিয়ে নেয় পার্থিব পদক।
মনভোলা কেউ কেউ দমনহীন চিৎকার।
ইচ্ছার রিংটোনে কেউ অচেনা সংগীত।
স্বার্থান্ধ, ঈর্ষা দহনে সংসার ছায়াহীন বৃক্ষ ।
হাসি না, কাঁদি না–
চোখে ঝুলে থাকে অমরাবতী বিস্ময়;
কানে বধিরতা—
এই ভালো চেনা নয় কেউ কারো;
সরল শিশুর মতো সময়, নির্জন দ্বীপের মতো স্থানুবৎ…
.
বিবেক
.পড়ে থাকি এ শব্দায়মান শহরের একপাশে।
কঙ্কর জড়ানো ঘাস;
সময় শিথিল ঘাসের তলায় করাত বালুতে।
আমি দেখি-
কারও বিষণ্ণতা ও ছায়ায় কারও উন্নাসিকতার বিলুপ্তি;
এই ভালো কিছু নেই আকাঙ্ক্ষা বা আবদার।
জলে পাতা পড়ার শব্দে চতুর তক্ষক সতর্ক হয়
তেমনই সতর্কতা-
তেমন সুঁচের মতো সূক্ষ্ম বিবেক
হামাগুড়ি দিয়ে কোথাও লুকিয়ে থাকে…
.
গোলকধাঁধা
.হেঁটে যাচ্ছে পা
পা’র নীচে মাটি নেই
তবে কি বাতাস!
বিশাল বাংলাদেশ পড়ে আছে একাত্তরে
সমুদ্র পা’র কাছে চলে এলো বলে!
আমরা কার কাছে যাবো?
গন্তব্য জানা নেই অর্বাচীন মনের!
রাজাকার মুক্তিযোদ্ধা না মুক্তিযোদ্ধা রাজাকার-
চিনতে চিনতে কেটে গেছে পঞ্চাশ বছর।
কোনো খেলাই হলো না শেষ
খেলছি তো গোলকধাঁধা খেলা
এখন দেখছি করোনার খেলাধুলা…
করোনাও আমলাতান্ত্রিক ভাইরাস
শেষ হয়ে হইলো না শেষ…
.গাঢ়-নীল
.ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভুল করে প্রত্যাগত বেদনাকে
সাথী বানিয়ে লাভ নেই- জেনেও তো ছুঁই-
আস্তিন ও বোধের নিচে
বোধীভ্রমে ক্লান্তির ক্লেদ জমে।
নির্ভয় খুলে ধরে হিসাবের আদি-অন্ত ধারাপাত!
এ আমার দায়ভার নয়!
বিগত জনমের অথবা অনাগত কালে
তোমার আঙুল বেয়ে গড়িয়ে-পড়া রক্ত আমার আঙুলে
অথবা মরা-বিকেল গল্পে মেরুন রঙের শালিক-
ঠুকরে ঠুকরে খাবে- স্মৃতি,ঘ্রাণ,হর্ষ ও মর্ষতার দারুণ উপযোগ।
তারপরও সরাই কিছু গাঢ়-নীল।
উবে যাবার ভয়ে ঢাকি ঢাকনায়-
মাছিরা ঠিকই টের পেয়ে যায়!
.
জীবন-পাঠ
.শব্দেরা উঁকিঝুঁকি করে
কলমে তৃতীয়া চাঁদ
কোঁচড়ে কলমী-শাক যে মেয়েটি
দাঁড়ায় অবেলা খিলানে হেলান-
চোখে জমা কথকতা, বিস্ময় গ্রন্থিকা।
ওলানে-হাত লাথি খেয়ে বিহ্বল গোয়ালা-
সাপ সাপ
ঢালে বিষ জীবনের খোলা কলসিতে!
কী মায়ায় ডাকি-
‘আয় আয় সোনামুখী সুঁই
গাঁথি বেদনা খসার চাবি’
নাকছাবি খুলে কার আরুদ্র সকাল
কেঁদে-কেঁদে যায় রাতের বাড়ি
ছুঁই তার বিন্যস্ত বিরহ,
আদি-অন্ত দাবি।
শব্দেরা লুকোচুরি খেলে
জ্বলছে আগুন
আগুনপোড়া হাত আগুন কিভাবে নেভায়!
.
যুবতী জ্যোৎস্নায়
.নাড়ার আগুনে শীত ভাঙে যুবতীরা
উনুনের ভাপে রাখে ভেজা হাত
উষ্ণতা বেয়ে উষ্ণতা উঠে যায়
কোষ কলায় সঞ্চারী ধারাপাত…
শ্রাবণ ঝরছে অঘ্রান ডালে ডালে
ফাল্গুন চইত আড়াআড়ি চোখ মারে
গ্রীষ্মপ্রখর পোড়াবার কামনায়
পেড়োবাড়ি ধরে কোণাকোণি হেঁটে যায়…
ঢেউ ঢেউ ভাঙে স্রোত স্রোত টানে
দাঁতে কামড়ে ধরে আঁচলের খুঁট
রাতের ছায়ায় অমাবস্যা থমথম
দেহের পূর্ণিমা হতে চায় লুট…
.
পাতা ঝরার চমক
.পাতা ঝরার শব্দে চমকে চাইলে
যেন বা শুনতে পাও পুরনো দিনের স্পন্দন
যখন স্পর্শ করে সকাল সন্ধ্যা
চিরহরিৎ বনের পাশ দিয়ে বাঁকানো রাস্তায়
কয়েকটি থেমে যাওয়া মুহূর্ত ও তো
আঁজলা ভরে রাখে মুহূর্তকাল;
তোমার পিঠের কাছে জমানো ব্যথা
শরীরে প্রাগৈতিহাসিক ছায়া ও ইঁদুরের কঙ্কাল
তুমি কেটে যাচ্ছ আবহমান সুতো
শুধু নোঙ্গরে জমা হয় গুটিকয় মুহূর্তের
চমকে-ওঠা বার্তা…
ভোরের বেহালা
.সকাল গাইছে
মৃতদের জন্য কয়েক ছত্র শোক
কেন্দ্র ঝুলে পড়েছে বৃত্ত থেকে
শিশুরা গিলছে গপাগপ ললিপপ
বৃষ্টির বেহালা বাজছে
ভাষা ছুটে যাচ্ছে মুখ ও কলম থেকে
ধূসর পাতা উল্টাচ্ছে প্রগাঢ় ধূসরতা
কেউ চাইছে না কারও দিকে
দেখছে গোর খোদক
ছায়াহীন পাথর গড়িয়ে পড়ছে…
.
.প্রেমীর জন্য
.শরতের ঠোঁটে রাখা চিঠি পড়েছ কি তুমি?
কাশফুলের উজান-ভাটায় বাতাসের ঢেউ
আবির মাখা ভোরের নকশা
ঘুমের দুপুর
বিকেলের স্মৃতি
সন্ধ্যার গতি
রাত্রির নিরিবিলি নির্মাল্য বিতান…
তোমাকে ছোঁয়ার মতো একটিও আকাশ নেই
সাগরের ঢেউ
বৃক্ষের অধরে জমা হাজার বছরের ক্লোরোফিল
বুকের উদার জমিন ছড়িয়ে বেগবতী মল্লার রাগ
বাঁশরীর উদাস গীতিকা ব’য়ে ঝরা শেফালিকা
তুমি কি জমাট বাঁধা হাজার বছরের অজন্তা ইলোরা…
তোমাকে পাঠাই হেমন্তের ছায়াবীথি
শীতের স্থবির সহ্যগাথা
বসন্তের রঙিন পৃথিবী
বৈশাখের বাঁধভাঙা ঝড়ের উন্মাদনা
বর্ষার বিবিধ রিমঝিম…
বিনোদিনীর প্রেমের বাতাসে উন্মাদিনী লক্ষণশ্রীর তেঘরিয়া
কাঁখে কলসী অগ্রসরমান ধোপাখালির রজকিনী
পাহাড়ি ফুলের ডাল হাতে ঢাল গড়ানো মারমা তন্বী
উজ্জয়িনী তটিনী কার অপেক্ষায় জমায় ভাটির গান!
তালে তালে সাঁওতাল পল্লী
তুমি কি ছুঁয়েছ কুয়াশা শেষে রোদের কেশর…
গানারিয়া মনিকাটা পাতার নৌকা বেয়ে
তুমিই কি গেয়ে যাও ডি নদীর গান!
লগ্নি
অন্ধকারে ঝলকে উঠলো তীর্যক আলোর গুহা
পুড়ে দিতে এলো আমারই মুখ।
কত প্লাবনে, ঝড়ে বাঁচিয়ে রেখেছি দুঃখী বাংলার মতো।
প্রতিদিন কর্কশতায় পিঠ ফিরিয়ে রুয়ে যাচ্ছি কাউন ও কালিজিরা;
এল.সির বানে ছড়াব বিশ্বময়।
কোথায় নর্দমার মুখ জানা হলো না এখনো…
রাজনীতির বর্জ্য জড়িয়ে ধরেছে পাঠালয়।
বুকেচাপা গোলাবারুদসহ নেতিয়ে পড়ছে নবীন
গুটিয়ে-থাকা শিয়াল টেনে নিচ্ছে হরিণের বাগান
অসূয়া-চোখ পাহারা দিচ্ছে অলৌকিক সন্দীপন সংযোগস্থল…
শুস্রূষার আশায় তাকেই লগ্নি করেছি কি রমন ও হৃদয়!
.
শীতাতপ্ততা
.নদীর দু’পারে কাশফুলের লাশ শুয়ে আছে;
সারি সারি শিমুলের চুড়ো লাল হলে শীত নামে
কুয়াশা কফিনে হেমন্তের নান্দনিকতা…
বাতাসের ছুরি ও বিশ্বগ্রাম আমার
নাড়ার আগুনে পোড়, পাতার ঘূর্ণিতে ধরুক আগুন;
শীতের চাদরে মেরুদন্ডের কলোনিতে হিমাগুন…
ধূলিতে ডুবে যাওয়া গরুর গাড়ির মায়াবী হট হট হুরর্
কোমর প্যাচানো কিশোরীর শাড়ির মতোই উদাসীন
ঝরা পাতাদের কান্না লেখা রয় অধরা গ্রন্থিকতায়
বেড়া ডিঙানোর অপরাধে খোয়াড়ে বন্দী ছাগল ছানা
হাতড়ায় হাটে আপন মানুষ-
যেন বন্ধ্যা রমণীর পালিত সন্তান…
পিতার পরিচয়হীন গাছি খেজুরের রস নামায়;
গলিত বিশ্বাসেরা রসের হাড়িতে বল্কায়
বৌ’রা রঙ পরে আসে মা’রা চলে যায়;
পূরণ মাঝি গায় পূনর্জন্মের গল্প…
.
অবকাশ
আপেল বা বলের মতো একটি ছায়া আমাকে নিয়ে লুফোলুফি খেলে।
আকাশে বিদ্যুৎ চমকে চলে গেলে
বাদামি বিকেল পরিহাস করে!
পাহাড়ের স্তব্ধতায় জমা হয় মান অভিমান কালের ফসিল…
পা ফেলতেই মচমচ কচকচ
আমি ও আমার শব্দগুলো গুটিদানার মতো ঝরতে থাকি শিশিরের সাথে
রোয়া ওঠা পুরনো ভিটিতে চাঁদের এক্কা দোক্কা।
স্বয়ম্ভর সময় হাতের মুঠোয় ধরতে ধরতে বাগিচায় জমে ঘাসপাতা,
সাগর উপকূলে বুলবুলের শোর; কখনো আইলা…
বাবা বলেছিল, ‘ধৈর্যের দিঘি প্রশস্ত কর তবেই অবগাহন হবে।’
অপেক্ষার আকাশ দৈর্ঘ্য-প্রস্থে ব্যাপ্ত হয়
অবগাহনের আগেই পৌঁছোই অবকাশের খেয়াঘাটে..
.
যুগান্তর
.স্পর্শাতুর দৃষ্টিতে লিখে রাখি যুগান্তর বিভা
কালে কালে উত্তরের ঘরে পৌঁছে যাবো
বাতাসের উরুছোঁয়া সূর্যমুখী
কচুরিপানার বিলে বেগুনী বিদ্রোহ
ছায়া মায়া রোদের আয়নায় রাখা জ্বলন, দহন;
আবেগের সেতার
নিপুন বাজবে সম্পর্কের ঝড়-দাবানলে…
জন্মান্ধতার ডোবায় ডুবে থাকা ঐতিহ্যের গাঢ় আবাহন
প্রেমের দুর্ভিক্ষ কালে হে মনীষা উন্মেষ,
স্বার্থহানিকরতার হাত– খুলে রাখো রুগ্নতার লিপি
এ যুগ, কাল, অমায় থাকুক ছন্নছাড়া ঘরে প্রণয়ের হ্যান্ডকাফ
ভোটের উন্নাসিকতায় ভাগাভাগি,
পেট্রোল বোমা আর ভগ্নতার জঞ্জির
জনক জননী ছুঁয়ে থাকে মৃত সন্তানের হাত।
ছুটছ কোথায়?
প্রতিদিন মৃত অক্ষর ও মৃতের মিছিল
অষ্টেপৃষ্ঠে ক্ষত আর ক্ষতির লাভা
প্রেমের আনন্দ ঘরে শুয়ে থাকে নাগিনী ও ডোম
এসবই ভাঙতে হয়
জন্মে জন্মে মায়ের উদর ফুঁড়ে পৃথিবীর ললাটে
মুছে দিতে তস্করের ছাপ…
এ জন্ম ইচ্ছায় নয়
ইচ্ছার ও অধিক কোন গূঢ়তর বিশালতা ছুঁতে পার
পৌঁছুতে পার অপেক্ষার খোলা দেউড়িতে…
হাতটা সরিয়ে নাও
এখানেই পড়ে থাক বৃক্ষের বাকল
শুষে নিই রস,
আঁজলায় এঁদো-ডোবা, বিস্তর জলের ক্রন্দন।
এখানে পিতার ঘাম,
মুগুরের ওঠা-নামা অবিরাম,
ঢেলার গুড়োয় বাঁধা বলদের টান।
মায়ের বড়শি-পাতা পুকুরের কোণে
কুমড়োর লতা খোঁজে জীবনের তল।
এখানে যে কার কায়া দূর অতীতের মতো!
ঝাঁপ-ফেলা দোকানির দিন-ভাঙা স্বর,
পড়শির কানাকানি
ধুলো হাঁটে বাতাসের সাথে
নারীর কান্নায় শিশুর প্রথম ক্রন্দন।
কোলাহলে জীবন-চক্র
টানে রশি কার হাতে বেঁধেছে নিয়ম!
পড়ে থাক এ বেলা এখানে।
রোমে রোমে পোঁতা বিচিত্র কলম;
অদলবদল খেরোখাতা, মনন সঞ্চার
অদলবদল খড়ি-মাটি, ছক-টানা
নুন, পান, চুন।
হাতটা সরিয়ে নাও
এখানেই থেমে থাক কিছুটা জনম।
ন আর্য
হাজার বছর ধরে বেড়ে ওঠা
অনার্য জাতির দুঃখ আজও মহীরুহ;
রক্ত-ভূমি ফুঁড়ে তুলে রাখে মাথা।
পূর্ব-জনের ভিটিবালির উত্তাপে-
বোবা-কান্নার কির্তীনাশা স্রোত
ঝলমল বর্তমান পাঁজরে ক্রীতদাসের দগদগে ঘা।
শিল্প মলম মেখে জীবন জরায়ু
মালিশ করে করে
যেতে হবে কত পথ কে বা জানে…
শান্তি ও শান্তি
বুকে উরাল পর্বত, বিস্তর আমাজন চোখে
তুমি আর ফিরলে না;
প্রহরের অনন্ত অপেক্ষা
দরোজায় করাঘাত করে-করে ফিরে যায়।
গলছে মনের মুখ ও মুখোশ
বোধ ও বধিরতার সংলাপ শেষে
মানুষের মেদ ও মাংস ঝুলে থাকে
বৈদ্যুতিক করাতে কাটা সময় শাখায়।
অন্ধকারে বুক-পোড়া গন্ধ-
জোনাকি ডানায় বুঝি আগুন দিয়েছে কেউ!
বৃক্ষদের আর্তনাদে ঘুম-ভাঙা দিন
খুঁড়িয়ে-খুঁড়িয়ে চলে পথ-ভাঙা পথ ধরে।
কেউ বোঝে না মর্ম কে যে কী কী বলছে!
তুমি কি করে ফিরবে ও-সই
পারাপারে গণধর্ষণ চলছে!
বিচ্ছেদ
পরস্পরকে কিছু দিতে পারি না
অপরিমেয় বিচ্ছেদ গাথা
বিচ্ছেদ কেবলই বিচ্ছেদ…
অশ্রুতে মিশে থাকে ধর্মান্ধতার ক্রোধ
সব অর্জনের সাথে বিচ্ছেদ ঘটায়
হৃদয় প্রগতির তন্তু বয়ন করে এধার ওধার দোল খায়
যেন এ বাবুই ঘর
ঝড় ও তাণ্ডব বিচ্ছেদ ঘটায়
শিকড় ও চূড়ার সংযোগ…
কিছু কিছু অক্ষর তো ছেড়ে দিতেই হয়
কিছু কিছু মৌলিক মুহূর্ত
হোগলা বনের ঝুলনকাল নয়ত হঠাৎ চমকে দেওয়া
ভোরের স্থাপত্য
ইচ্ছার অনতিক্রম্যতায় জড়িয়ে থাকি অতি বিচ্ছেদ-কালে…
.
পাড়ি
দাঁড়িয়ে রয়নি কেউ পথের মাথায়
কথামালার জোনাকি ঝলকে
ডুবে যাবে একসময় দিনের কোলাহলে।
পুরনো দিনের ঘষে নেয়া আতর লোবান
ধরবে না কেউ নীরব দিনের শেষে।
অরন্যের টানে আবাহনের কাতরতা
সামনের মন উচাটন
পৌছে দেবে বলে হেমন্তের কুহেলী সরিয়ে,
কাশফুল উর্মী উড়িয়ে বালিকা মেঘদল
ঘূর্ণি নাচায়;
আমিও নির্ভিক নির্ভরতায় আঁকড়ে ধরি
সারাতে
জংধরা লণ্ঠনের নাগরিক সুতো;
জড়ো করি জংলী লতা-ফুল
নরোম ঘাসের বুকে কচি পদচ্ছাপ ;
কখনোবা শস্যশীষের
শিশিরে ঢাকি
চোখের পাপড়ি
এবং চলতে থাকি
এভাবেই…
সাঁতার
বাতাসে উড়ছে শব্দ ও ধ্বনি, তারপর
চুলগন্ধী ফুল মাড়িয়ে এসেছে যারা
তাদের পাশে খুঁজে পাবে আগুনের ওম
কফিনে দুলছে মাথা ও পার্থিব জগৎ
বাতাসে উড়ছে টিপ ও তিলের মায়া
উপাসনার মহড়ায় যারা উপুড় হয়ে আছে
ঘুমপথে কবেই হারিয়েছে পৌষের বাগান
ঘরগুলো যেন ভয়ের নদী
ঘরে-বাইরে নিকট-দূরত্বের মায়াজাল
আঙুলের স্পর্শ কাটুক নির্বাসনকাল…
.
পরিচয়
.কারো ঔদার্য যখন আকাশ স্পর্শ করে,
কারো স্নেহের হাত হৃদয় মুঠোবন্দি করে,
উদ্দীপিত সংগ্রামী প্রাণ কোটি প্রাণের তোরণে ধ্বনি তোলে
জীবনের সকল গান শুধু তার জন্যে…
নিঃশ্বাসে যে বাতাস দেহকে প্রাণ দেয়
চেতনায় যে আকাশ স্বপ্নদ্রষ্টা হয়
ভালোবাসায় যে মন সমর্পিত
মুঠো মুঠো প্রার্থনা তার জন্যে
সে যখন বাদল হ’য়ে আগলে রাখে মৃত্তিকা
ছায়াতরু হ’য়ে ধরে রাখে দুপুরের নির্জনতা
পিতা হ’য়ে এক জাতির সামনে তুলে ধরে পতাকা
তখন বেদনায়ও রাঙা হয় মন
হৃদয় আরশি থেকে তাকে মোছে
এমন সাহস কারো নেই…
নির্জন রাতের কথা
এ নিস্তব্ধ রাতে
কী যে হতে পারে লেখার বিষয়!
ভেবে ভেবে কত যে নক্সাঙ্কন, বিচিত্র অক্ষর।
চিত্রকর বিমূর্ত কোনো ছবি পেয়ে যেত হয়তোবা…
আমার কলম খোঁজে- অক্ষর ধ্বনির সুর,
দিবসের সুর,
অর্ধ দিনের সুর,
রাত্রির সুর, নিসর্গের নিমগ্ন সুর,
শিশুর বোল ও ভঙ্গি,
প্রেমীর সঞ্চিত সুর,
সঙ্গীর সুরবার্তা।
শুধু সুর খোঁজে,
আনন্দের স্রোত খোঁজে
মোহনার মতো সুরের আবর্তন…
বেদনা খুঁজতে হয় না।
আপনি চেপে থাকে
নিঃশ্বাসের ভারে স্নায়ু সঞ্চালনে টান
মড়মড়ে রবে পার্থীবতা
তিলেতিল সাজানো গোছানো যা-কিছু
সজল সুস্থির…
ঝুলে থাকে কষ্টের কঠিনতায়
চলতি অসম বিভাজন
পোষমানা বিভাজন
অনিদ্রায় ঘাই মারে
উচ-উচু ঠোকাঠুকি
উচু-নীচু কারসাজি
যুদ্ধের নিক্ষীপ্ত দামামা
দমনের হিংস্রতম কৌশল প্রযুক্তি
গোলকধাঁধা অবতরণ বিপদগামী পথে
পাশবিকতার উল্লাসে কাতর শিশু- নারীর শরীর
এইসব এতকিছু
প্রকৃতির হাতে সহজেই সমর্পিত
সব ছেড়ে
অন্যজীবন তালাশে
জীবন লাগাম এগুবার দায়ে
এসবকি শূন্য নয়!
শূন্যে শুন্যে কাটাকাটি
শূন্যে ঘাটাঘাটি ;
তারচেয়ে ভালো
টুকরো টুকরো আলো
দেয় কালে কালে
আবেগ দুয়ার খুলে নান্দনিক স্মৃতির খোরাক
(যে কুঁচকে রাখে তার কথা থাক
ফনি মনসার কাঁটায়,
কঠিন শিলালিপির প্রস্তর ফলকে)
কলম তুলুক ভরে সেসব নিরিবিলি দিন
বোঝেনি যে জীবনের বুকে এত শোরগোল
মিষ্টি মিষ্টি আবদারের দিন
উড়ে উড়ে বেড়াবার দিন
প্রকৃতির দিন সেঁচে তুলে আনা পূর্ণিমায়
বয়ে চলা সামনের দিনে যতদিন চলা যায়
একা একা অথবা একত্রে
জীবনের জল ঘোলা করে…
নগ্নতা
জীবন থেঁতলে থাকে ফুটপাতে, নগ্ন কলেবরে…
আবহমানের ধুলোমলিনতা
পলিমাটি ঘেঁটে ঘেঁটে প্রজন্ম’র বয়ে দেয়া ক্ষয়প্রাপ্ত
বন্যা, খরা, সুনামি বয়ে–
সাগর নদীর গহ্বর হ’য়ে ওঠে আসে ভগ্ন ফুটপাতে-
ভগ্নতা শাশ্বত রয় জীবন জীবন।
লক্ষ্মীর চিরকাল অলক্ষ্মীর সাথে দিনাতিপাত
ভালোবাসার গঙ্গায় ধোয় অপ্রেমিক পাত্রের পাদুকা…
রাম রাবণের পায়রবিতে-
ঘাম, ধুলো চাটতে চাটতে জীবনের পাদদেশে…
কৃষ্ণ-রাধার মুরলীতে জীবন ভাঙার বেদনাও হয় না তোলা।
দুর্গার দুর্বার তেজ ম্লান করে শরীরের বিকিকিনি…
মোহাম্মদ নিশ্ছিদ্র আঁধারে অস্ত্র, বোমা গ্রেনেডের ঘোরে-
হিরোইন, মারিজুয়ানা, গাঁজার পুরিয়া পাচার করেও
ঘুরে ফিরে আসে ফুটপাত লগ্ন কলেবরে…
ফাতেমা ও সরস্বতী ঢাকে-
শিক্ষা-সংস্কৃতি-সভ্যতার সুকুমার লালিত্য
একমুঠো অন্ন, বিন্দু বিন্দু জলের তৃষ্ণায়।
আয়েশার চোখে লাঞ্ছিতজনের আগুন আর শরীরের হাহাকার…
মরিয়মের জীবন ঝুলন্ত তালি-পলিথিন।
যিশুর প্রশান্তি পাথর হয় ফুটপাতমগ্ন কলেবরে।
উপরে বস্তা-কাঁথার ছেঁড়া চালা
সম্মুখে নর্দমার দুর্গন্ধ, ক্ষয়ে ভীত
সিফিলিস, গনোরিয়া, এইডস
জন্ডিস, যক্ষা, কুষ্ঠ, কালাজ্বরে নিপতিত।
অবশেষে খোঁড়াতে খোঁড়াতে
খাদ্য, বস্ত্র আর চিকিৎসা বিহীন
মাতা-পিতামুখী
লক্ষী-সরস্বতী-দুর্গা-ফাতেমা-জুলেখা-আয়েশা-মরিয়ম-রাম-কৃষ্ণ-যিশু
ও মোহাম্মদ…
নারী
ও নারী
জল নয়—চোখের কাজলে ঢাক
যাবতীয় কালিমার কাল
বৃক্ষের আবাস থেকে শোষে নাও
অমানিশার জন্য সবুজ ভূভাগ।
আঁচলের খুঁটে বাঁধো এক-পৃথিবী ফুলের সুবাস…
ও নারী
শোক নয়—শিশুর হাসিতে দাও মন;
বীজতলা, ঝাউবন,, নির্ঝরিণী-বনের কূজন।
সম্মুখে দাও খুলে অবারিত সাম্যের আকাশ।
ও নারী
ভীরুতা নয়—পায়ের ঘুঙ্ঘুরে তোল ঝড়—
দুমড়ে মুচড়ে যাক অহেতু বিরোধ-বাঁধ
আপন রত্নে সাজ পরম যত্নে গড়া নিরেট পুতুল।
সংঘবদ্ধ হাত ছড়াক দিকবিদিক
জয় এনে দেবার সাহস।
ও নারী
ভগ্নতা নয়— দেহের নিপুণ বাঁধ খোল—
জীবন অঙ্কুরে দাও প্রিয়তম কামনার বাস;
দিনের আলোয় ধরে ঝলসানো সুখের মোড়ক
সচল সুষম হোক রাখ ঢাক পথের প্রকাশ।
উঠান বাগানবাড়ি দেশ মহাদেশ বুঝে নাও
খুঁজে নাও রিক্ততার জড়
যৌবনের গান সহাস্যমূর্ত করুক মননের সরল অক্ষর;
দুর্বল-প্রাণে গেঁথে মানবিক প্রেমের সাক্ষর।
আবর্তিত
ছুঁতে পারছি না তোমার স্পর্শ—হে নিস্তব্ধতা
আকর্ষি হ’য়ে জড়ায় অস্থিরতা
আঙুলের সঙ্গমে যে কলম তার নিবে লেপে আছে চিরহরিৎ রক্ত
লেখনি বেপথু হবার পথে আবর্তিত প্রায়…
যেমন বৃত্তের আলিঙ্গনে জড়ানো বৃত্ত
প্রেমালিঙ্গনে চতুরতা
মাছির ঘোঙানিতে মাতোয়ারা চেনা জানা
গড়িয়ে পড়া ভুলের ঝনাৎকার
হ্রস্বস্বরে হারানো স্বরলিপি সমাচার…
ছুঁতে পারছি না তোমার স্পর্শ— হে নির্জনতা
দূরে ঠেলে দেয়া অক্ষরের অহংকার ঝেড়ে
নিকোটিনের টানে কেবল ধোঁয়া আর ধোঁয়া
ঠোঁটের কিনারে চোটের বাড়াবাড়ি
দাঁতে চেপে ধরা ঘা থেকে গড়িয়ে পড়ে কাল, মহাকাল…
বিন্যাস
হারাতে দেবো না, হারতেও নয়
এ যন্ত্রায়নীয় দ্যুতি ও বিন্যাস
আবেগের উজ্জয়িনী স্পর্শ করা অনুভূতির উপ্ত রোয়াকে
দাঁড়িয়েছে সাক্ষর সময়ের সপ্তডিঙি
তোমাকে ছুঁয়েছি কেবল
হে সুর ও আকাশগঙ্গা, নাক্ষত্রিক বৈঠক
কালের অধর চুমে যাওয়া সম্পর্ক স্বরলিপি
জাগুক নবরূপতায় পুরনো হিসাবের ঢোল ও তরঙ্গ
বাজুক মৃদঙ্গ ও শাঁকের সজ্জিত রূপায়ণ
বাঁচার জন্য চাই ফসলের ঢেউ ও পরাগ
জীবনের অধর চুমুক চুমুক পান করুক বেহালার মিড়
অমনিবাস জুড়ে কালহরণকারী কালকেতু
কৃষ্ণগহ্বরে গঠিত হোক অজস্র বসন্তবায়ু…
.
তোমার ফাগুন চোখ
.তোমার ফাগুন চোখ জেগে
এই শিল্পিত কল্পিত কাননে
সিঁদুরের ছায়াঘন আলো যেন সিঁথির ছায়ায়…
ফাগুন কি ফোটায় ফুল দূরতম গ্রাম, মরুপথে!
ফাগুন কি অপেক্ষা জ্বালে যেখানে নদীর ডাক,
বটের ঝুরি নুয়ে ছুঁয়ে দেয় অনুপ্রাসকাল!
তোমার ফাগুন মন বাকল খুলে
ডেকে দেয় মহাজাগতিক সৌরভ-স্মরণ।
তোমাকে ভেজাবে বলে স্নিগ্ধতা শিশির হয়;
সেঁজুতির নীচে ছায়া জমে;
জাগতিক ছায়াসব সরে যাবে কিনা!
ছায়ারা থাকুক আলোছায়া দুই বোন
সুফির ক্কালব
তোমার ফাগুন চোখে নেচে বেড়াক
আহ্লাদী অহল্যার মতো।
উড়ো ডানার অক্ষর
বিকেলের আলো পড়তেই ইচ্ছে জাগে-
নিয়মিত ভিড়ে
আসুক অচেনা কোনো ডাক, ডাক-নামে–
নির্ধারিত ডাকবাক্সে।
নাই থাক
প্রণয়ের উদাত্ত আহ্বান
প্রিয়তমা সম্বোধনে অবতরণিকা…
অন্তত খোঁজ নিক
যাপিত দিনাতিপাত
ঝড়,জল,কুয়াশা,ফাগুন
ঘেঁটে ঘেঁটে
প্রত্যাশা-প্রাপ্তি প্রান্ত হেঁটে
উদাস শিশির মাখা হৃদি-বন।
প্রেরকের নামধামহীন উড়োচিঠি…
নিস্পলক দেখে নেব আগ্রহের শতভাগে
যুথবদ্ধ আকাঙ্ক্ষা অনির্বাণ…
হেঁটে যাবো ফেলে আসা জংলা সিঁড়ি
বেওয়ারিশ লাশ হয়ে পড়ে থাকা
জীবনের বারোমাসি;
বাজিয়ে নেবো হারানো ধুন্দুল-খোল
কাড়াকাড়ি লেনদেন কলকাকলি…
লাজুক লাজুক ঢেউ
আবেগের উপ্ত জলসায়
জড়তা-বাঁধ ভেঙে শুদ্ধতা ছেঁকে
ঋদ্ধ করার দাবি রেখে চায় পেতে
উড়ুউড়ু ডানার অক্ষর।
.
মুগ্ধতা
মুগ্ধতায় ছায়া ফেলে দৃষ্টির বিভোরতা
চুপ করে থাকা ঠোঁটের কিনারে তিলের ভাষা
সন্ধ্যার পূরবীতে পাখিদের ডানা থেকে ঝরে যায় ঘাম
বিহাগ আলাপে বিলিকাটা মিহিরাত..
মুগ্ধতায় ধরে রাখো ভোরের ভৈরব
সেতারের সিম্ফনিতে মেঘের বৃষ্টি
কান্নার কুয়াশার কৈশোরের মেদুরতা
কৈশোর মানে সবুজ স্পর্শ করা সবুজের ভাষা
ধীরে ধীরে সরু হয়ে আসা গ্রাম পথ…
মুগ্ধতায় স্পর্শের গাঁথুনি
কাঁচভাঙা শব্দে ঝরে পড়া কিছু রাগ
টুপটাপ শিশিরে হাতের তালুতে জমা পড়ুক–
অভিমান শেষে অনুরাগের হিন্দোল
প্রতীক্ষা শেষে অনুভবের অতলান্ত স্বরলিপি…
.
একুশ
ঘুমে কাঁপে–
শৈশবের আধ-ছেঁড়া ধারাপাত,
ভোরের সারগাম।
মা নেই, থাকে মায়ের অক্ষর।
টুনটুনি দোয়েল শিস
ডাল -ডুমুরের প্রাণ
সাথে কিছু মাটিয়া নির্যাস
কচু, ঘেঁচু স্বাদ–
আঁচলে নিয়েছি বেঁধে
ছড়িয়েছি পথেঘাটে
কত যে বাড়তি ব্যয়।
ঘামের গরল কুরে
দূরত্বের ধোঁয়াশা ফোঁড়ে
চকিতে কে ডাকে!
ভাসে ও বর্ষণ হয়
ভাষার অহংবোধে একুশ বিস্ময়!
.
ব্যবচ্ছেদ
মানুষ শব্দটি মর্মার্থ হারিয়ে মাকাল মাকাল
ধূর্তেরা খেলছে মানবতা-মুক্ত গুঁটিবল
কতকাল কাঁটাফ্রেমে লটকানো
ব্যবচ্ছেদিত নিয়ম আর স্তূপিকৃত পাপের পাহাড়
বন্য শুকরের আস্ফালনে বারুদের রাত্রি জেগে ওঠে না
মুখপোড়া ডাহুকের দল লুকিয়ে থাকে
মাঝখানে খোলস ও ডিম…
অপারেশন টেবিলে সারি সারি অস্ত্র,
মস্তক, কঙ্কাল, পেশী, জঙ্ঘা, উরু
লউয়ের ধারা
বহমান ক্রোধ, ফনায়মান বিবমিষা
ব্যবচ্ছেদ কেবল ব্যবচ্ছেদ
.
ক্রান্তিকাল
নিদ্রা নিংড়ে নেবার পর
জেগে থাকা ক্লান্তিকে পুঁতে রাখি-
সম্পর্ক সমাধির পাশে
ঘাম কিংবা অশ্রু প্রবাহ
এ সবে তফাৎ নেই…
অনুভবের কম্পন জমা থাক মনন মূদ্রায়
কিছু তো আছে তাতে
ক্রান্তির বিভাস…
ইচ্ছা সতর্ক হয় অভিজ্ঞতা সঞ্চয়নে…
খেয়া পারাপারের পারানি যেমন
ভগ্ন নাওয়ের ফুটোতে চেপে রাখে ঋদ্ধ হাত
আগত আগামী ও আশা জমা থাক-
ঝড়ের আগাম সংকেতে…
.
যাপিত জীবন
স্লেট‐কোলে দিনকাল মুক্তো ছড়ায়,
কুলায় ঝেড়ে নিই আতপ জীবন
ঘুরেফিরে মিহিন মৌসুম থেকে ছিটেফোঁটা স্মৃতির দহন
ঢেঁকিছাটা চাউলে আবীরমাখা জাউভাত
রোদ‐সুখ, পাখার বাতাস, ছড়াকাটা প্রহর প্রহারে।
তুমি-আমি চিনি না কাউকে
দিনগুলো চিনে রাখে
এখনো পথের বাঁকে হাত ইশারায় থামায় পলক
প্রাকৃত জনের কাছে শেখা সেই বর্ণের বাতাস
হাতপাখা দুপুর মায়ের কোল ঘেঁষে মেনিবিড়ালের আদরে
জাফরান দিন
সুষমা পলির গান
ছড়া আর গান
পিঠে-ভাজা ঘ্রাণ
আদরে উৎসুক শাসনেরও জোর কলেবরে
অক্ষরেরা এলিয়ে নেতিয়ে থাকে
স্লেট, খাতায়, ঝরা পৃষ্ঠার প্রদেশে…
মা’র সবক
ভাইবোনের সবক
দাদীমা বিহীন বাবার নির্জন গল্প-বলা রাত
আধা আধো সীমানা ডিঙ্গায়
দিনের ভিতর রাত রাতের ভিতর দিনরাত
সহস্র জাগ্রত কাল–
দৈনন্দিনে মিশে থাকে ভাষা শহীদেরা
এ অক্ষর ও জ্যোতির্ময় দিনের আভায়…
ভাষা শহীদেরা অমর অজয়
দীর্ঘ দীর্ঘ দিন পার হলে
বটমূলের পাদদেশে চৈতালী রাতের পালাগান
শ্রদ্ধা ও আনত চোখের ভাষা ও ভাটিয়ালি
বিশ্ব বাগানে ফসল ফলায়
যে পথের বাঁক চলে গেছে আকাশ পথের ধারে
প্রিয় রঙ, প্রিয় প্রিয় ভুল স’য়ে ধানকাটা শেষে
শুয়ে থাকে ক্লান্তির ক’ফোঁটা ঘাম ও তৃষ্ণাসহ
খাতা থেকে পৃষ্ঠা ছেঁড়া ঘুড়ি ও রকেট
শৈশব খুঁজছে পথ
যুবাকাল খোঁজে পথ
প্রৌঢ়ত্ব খোঁজে অন্তঃদহন থেকে মুক্তির ভাসান…
যে পথে হয়নি যাওয়া কোন কালে
মুক্তির মিছিলে সেও শামিল হয়
লক্ষ এক ভাষা ও শ্লোগান
যে পূর্বজন প্রহরায় শিউলি বিছানো বাগিচায়
আশীর্বাদ হ’য়ে ঝরে ফুল, আমরা কুড়াই।
জীবনের প্রথম ও শেষ গান অনন্ত দহন
মুক্তাঙ্গনে স্বাধীনতার অন্তহীন সুখের স্মরণ
এ সবের ভাষা এক
স্বপ্নের ভাষাও এককে মিলায়…
.
মানচিত্র
জীবনের পেন্ডুলামে ঝুলে থাকে আহত ইচ্ছার সন্ধি
ছুটে আসে এলোমেলো বাতাস পুব থেকে পশ্চিমে
বিষাদ যেন গেয়ে ওঠে গান
সূর্যের মতো এক টুকরো বাসনা ছবি ঘরে
নাচঘরে তখনো নেচে চলছে বিরহী বিউগল
আমরা কি হারিয়ে ফেলেছিলাম প্রিয় আয়না!
তৈরি করা বৃত্তে কাঁপছে শ্যাওলার ছায়া
এক পশলা আশার প্রত্যাশা ছিল,
একমুঠো ধান তোলার গান
প্রতিটি প্রতিবিম্ব আলাদা প্রতিটি ঢেউয়ের রোমন্থনের মতো
সুর ও সংলাপ ঘষে নতুন পৃষ্ঠা–
গাছ তলে খেজুর রস পাত্রে পড়ছে বেশ শব্দ করে
কুড়োতে যাইনি ঝড়ে থুবড়ে পড়া ভীত পাখির ছানা
ছেঁড়া ছেঁড়া কলা পাতা শূন্য বাতাসে
খুলে খুলে পড়ছে থোড়ের সাম্পান…
বনের আনাচে কানাচে
কি কথা বলে আজও হারিয়ে ফেলা অশ্বের খুর,
মৃত প্রাণীর জীবাশ্ম,
সঙ্গী হারানো হরিণের আর্তনাদ!
কঙ্কর ভেঙে উড়ে যায় কালো মেঘের হাসি
কালো মেয়ের কালো চুল বেয়ে নামে বছরের প্রথম বৃষ্টি
ঝিঁঝিঁ পোকার গান –
পরিচিত উইয়ের ডিবি বেয়ে উড়ে আসে ডানাওয়ালা উই…
এসব গল্পের আভাস বিরহের হরিফুল
জোনাকির হাত ধরে রাতের মানচিত্র ঠিকই চেনা যায়…
.
বিভাস
এড়িয়ে এসেছি অরণ্যের অভিমান
ঝুল বারান্দায় কালিঝুলি মাখা রাত—
পথের উপর শুয়ে থাকা শাখা পথ
অর্ধেক ভাঙা সাঁকোয় ঝিমানো দিন
তোমার আমার হাতে ছিলো ইশতেহার
প্রথম প্রেমের দুরু-দুরু মাখা বুক
পাহাড়ের শিরে কারা যেন তুলে দেয়
ভোরের কুয়াশা মিঠা মিঠা কচিরোদ
সরল রেখায় প্রজাপতি রঙ ছিলো
ছিলো স্বর ও সুরের যাবতীয় বিভাস;
সামনে কঠিন জীবনের জয়গান
এসব ভাবনা ঠাঁই পাওয়া ঠিক নয়—
ধুলিখাম ধরে বীজ বনে বীজ উড়ে
শিশুকাল থাকে বড়দের স্বরে সুরে…
.
দ্রৌপদী
.১.
মনের অজান্তে ছোটে কালান্তরে দ্রৌপদী মন
আলোছায়া হাতে দূরে দাঁড়ায় এস্রাজ
অলঙ্কার নাই পেল ছোটখাটো রূপকল্প হোক
বেদানার লালে কার অস্ফুট ক্রন্দনের দাগ
হোমলোকে হোম শিখা পরিযায়ী দিন উড়ে যায়
পাখার বাতাসে ঋতু, বাহুর আলয়ে শৈশব
দিন উড়ে উড়ে চেনা আর হলো কৈ বেলা!
২.
কতকাল হয়ে গেল চেনা ছিল সেই কতকাল
নূপুরের ধ্বনি আর ঘাসফুল ইতিউতি স্তব
হিজলের বন ভরা স্নেহলতা কালের শিশির
কষ্ট কেষ্ট দুই ছিল ছায়া ও আলোর প্রহরা
ওপারের কূল হতে কার টানা চোখের আকুতি!
টুপ করে ছুঁয়ে যাওয়া দিনাতিকালের সরল যোজন
এখন এ-বেলা যেন পড়ে গেছে ধরা!
৩.
বাতাসে আলোর কণা যত্রতত্র ছড়ানো ছিটানো
পাতারা বিবর্ণ বাতাসে অজীর্ণতার ঢেউ খেলে
আবদ্ধ কালের জ্বর, চারপাশে লাশ আর লাশ
মায়েরা জন্ম দিয়ে কেন যেন হয়ে যায় নারী!
এখন সভ্যতার চড়া প্রাচীন প্রস্তর যুগ নয়
কেন হয় ছোঁড়াছুঁড়ি মানবের জীবন মানবে!
.
গোধূলি-রাঙা ধূলি
গান শুনতে শুনতে মিশে যাচ্ছি গোধূলি বেলায়
বাইরে ঝরছে অজস্র বৃষ্টির আহ্বান
কালের অধরে রেখেছি যে কত আঙুলের ছাপ
আবিরমাখা কাব্যকথন…
তুমি কি শুনছ?
উত্তালতার ঐকতান
দৈনন্দিনে মেশে ধূসর হয়ে যায়
তুমি কি দেখছ সেসব চিঠির কারুকাজ…
যৌবন রাঙানো মান অভিমান দিন
সুপ্ত সময়টাকে অবগুণ্ঠনে মুড়ে হারানো নূপুরের ক্রন্দন
আমরা চিনেছি নুড়ি ও পাথরের গান
বিষন্ন গাঙচিলের বিদগ্ধ দুপুর ঢেউ খেলে চলে যায় চরাঞ্চলের দিকে
ঘুরছে ঘূর্ণিতে পাতিহাঁসকাল
কচুরিপানার বেগুনী মিশে আছে চোখের পাতায়
নাব্যতায় কত কপোতাক্ষ সাগর হয়েছে
তুমি কি দেখছ?
ঝর্ণার উৎস চিনবে বলে গ্রামের ঝিনুক মেয়ে পা ফেলছিল
খাড়াইয়ে সন্তর্পণে
সেসব পায়ের ছাপ
তোমার সতর্ক বার্তা
মনে রেখেছে কি সে পাহাড়, সে খরস্রোতা পাহাড়ী উর্বশী?
সে বন বনান্তর লিখে রেখেছে পাতার শিরা উপশিরায়
পথ খুঁজে ফেরা বাউল গীত…
নির্মীলিত পাহাড়পুরের বাতাস
মেঘনার পাড় ছুঁয়ে হেঁটে যাওয়া প্রেমগীত
তুমি কি রেখেছো ধরে পথ হারানো সকল সুন্দর?
.
ফনিমনসায় ঢাকা ভোরের রেণু কথা.
বীথিকা ডাল সরিয়ে ছড়িয়ে দিচ্ছিল উষা। রোদের কাচে প্রগল্ভ সূর্যটা ফেটে পড়ছিল চৌকোনা ছাদের যৌথ টেবিলে। কোথা থেকে বইলে পবন দেব! মারিজুয়ানার স্রোতে ভেসে গেল অপেক্ষার মনিকাঞ্চন। সারারাত কাঁচ-কাটা হিরার কৌটো যোগ করে স্মৃতির মেদুরতা। দূরে অপেক্ষার সাইরেন । লোটাকম্বল সমেত পথ আটকাতে চায় সাহারার ফনিমনসার বন…
ছুটছি আমরা ছুটছে আমাদের আশালতা নদীর তীরবর্তী হাওরের ইতিহাস। কতকাল আগে রাজন্যবর্গের মাথা খুলে পড়েছিল বাঘের পাকস্থলীতে আর বুনো মহিষেরা তেড়ে আসছিল শস্যক্ষেতের আড়াল থেকে। হাওরের জলে মানুষ ও মহিষ। আশালতার শাখায় তৈরি হচ্ছিল সমুদ্র-গুহা। জীবিত সমাধিতে রাজার শত শত দেহামোদি সমেত…
হাঙ্গর শিকারি তুমি ইতিহাস কাঁধে নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়লে বৃষ্টির পথ রেখায়–হাওরের ওখানটায়–
.বিন্যস্ত
১.
দেহের আগুন; কষ্টের কল্পদ্রূম। জ্যোৎস্নায় ভেসে গেছে। কিছুটা ছল-ছুতোয় গুটিসুঁটি । শোনানো হলো না গান পঞ্চদশীর কালে। খরা ও জলোচ্ছাসে ঘরভাঙা-গল্প।
২.
সুখ গচ্ছিত রেখেছি তোমায়। আঁজলা খুলে দিলে কোথায় যাই বলো…
৩.
তুমি শরতের রোদ ; গা খুলে দাঁড়াই তবে ? পাড়ায়-পাড়ায় কি ঘাম ও ঘেন্নার গল্প শুরু হবে?
৪.
বিরহে বিবর্ণ পথ। ময়ুরাক্ষী নদী হ’য়ে কে যায়? আশার গুঞ্জরণ ব’য়ে কার মন এইমাত্র বাড়ল সামনে!
৫.
অপেক্ষায় অপেক্ষায় আরেকটি সকাল বিরহী হল।
৬.
পায়ের ধ্বনিতে রাতের শরীরে কত আনন্দাশ্রু জমা হল; বুঝতেই পারলে না।
৭.
পুরাতন স্মৃতি যক্ষের ধনের মতো আগলে, কৌটা খুলে দেখি উপরে দূর্বাঘাস; এবার সরস্বতীকালে পুজোয় বসবো।
৮.
শিখিয়েছিলে দ্বিতীয় ভোরে প্রজাপতি নীড় বাঁধবার কাল, প্রজাপতি গন্ধ মেখে সুতো হাতে সেই তো ঘুরে বেড়াচ্ছি।
৯.
ইচ্ছে জড়িয়ে কিছু আদিচিহ্ন এঁকে দেই, অলঙ্কার সমেত; তুমি অনাদি থেকে মিশে আছো অনন্ত- স্মৃতি ও স্নেহাতুর চোখের ভাষায়।
১০.
পুরাতন কথা তাড়িয়ে দি। তারা ফিরে-ফিরে আসে, আমিও তোমার নিমিত্তে ; তোমার আলোকিত মুখে কত আর চন্দ্রফোঁটা দেবো!
১১.
বালিশে একটুকরো জ্যোৎস্না ফেলে গেছো ভুলে–তুমি চাইলেই পারো আকাশটাকে সুগন্ধি রুমাল বানিয়ে মুঠোয় পুরে দিতে!
১২.
ভোর কিংবা বিভোর যাই হও তুমি তো এসেছো; চৈত্রের বাতাস জানিয়ে দিল সে কথা। বিনির্মাণের কঠিন পাথরে মাথা ঠুকে-ঠুকে দেরিতে হলেও ফুটে আছে কিছু ঘাসফুল।
১৩.
আমাকে সহজ করে আর কী দেবে নতুন! তুমিও তো খু্ইয়ে বসেছো তোমার আসল। এসো স্মৃতি-মোহনায় হই রজনীগন্ধা চারা; প্রজাপতির বংশবৃদ্ধি হোক।
.
বিমূর্ত
.১.
খরায় পুড়ছে শহর ও শহরতলী। কাকের কর্কশে মিশিয়ে দি দহনপোড়া চিৎকার; কেউ শুনতে পায় না।
২.
ঘেটুপুত্রের কাছে শিখেছি দুঃখকে কৌতুকে উড়ানো ঔদার্যের কথা। রাতভর লজ্জা মেখে গড়িয়ে পড়া দেহপসারিণী সকালের রোদে ধুয়ে নেয়, অবলীলায়। তাঁর মনের বৃষ্টিতে ধুয়েছি সকাল, কতকাল।
৪.
উঠে দাঁড়াতেই কয়েকজন যুবা বুটে পিষে গেল। সেই থেকে ধুলো হ’য়ে আছি। মাঝে মাঝে তোমাদের চোখে পড়ি…
৫.
সকালের আলো ফুটতেই এ পাড়ার মেয়েরা গান গা্ইতে-গাইতে পাথর ভাঙতে যায়। একটাও ভাঙা হয়নি। সবকটা পাথর বুকে গেঁথে এ-ঘর ও-ঘর করি।
৬.
পরীক্ষায় নকল হয়, নকল প্রশ্নও মেলে অনলাইনে রেঁস্তরা ও রাস্তায়। সের, ছটাক, পোয়া ও গ্রাম দরে মগজ ও মনন; আমরাও ভুল বানান ও হরফে ফেরি হই। নকল ফুলের মতো চেয়ে থাকি দুর্বোধ্য সম্পর্কে…৭.
অঘ্রান বিদায়ী সুর সেধে-সেধে বাতাসে মিশিয়ে দিচ্ছে শীতের কণিকা। তার সাথে বদল পোশাক, প্রাতরাশ, বিকেলের আয়েস, রাতের ঘুম। শুধু শ্রেণিবৈষম্যের পীড়নটা ঘুরে ফিরে থাকে।
৮.
বৃষ্টি এক পাগলী মেয়ের। তার শরীর সারাতে গিয়ে মনকে বলাৎকার করে যে এলো সে এখনো অহিংসা ও সাম্যের কথা বলে!
৯.
রোদের দহন সয়েছো কখনো? এই যে সোমত্ত মন পোড়ে, গলে— গলে-গলে মিশে ঘাম ও গরলে—তোমরা মাঝেমাঝে অমৃত মেনে পান করতে বসো।
১০.
কাল সারারাত বৃষ্টিরা কাঁদলো।
.
বিচ্ছিন্নতা
.১.
নামটা হারিয়ে গেছে পাশা খেলার রাতে। পুঁটি পাতা হ’য়ে ডাকছি; হে আমার বাল্যসখা ছাগল ছানারা। হাঁটের মাঝে বিকিকিনিরত কৃষাণী বোনটি — এক সাথে কত পথ উড়িয়েছি—
২.
হারিয়ে ফেলেছি চলবিদ্যুৎ। মোমবাতি ও চেরাগ জ্বালাবার সুতা সরানো । কেটে যাচ্ছে মৌপ্রহর; মৌমাছিরা মরে গেছে কবেই সরিষার ক্ষেতে— অনিয়মতান্ত্রিক কিটনাশকে-
৩.
কাল ভোর হলে নদীর ছবি আঁকব। নদীর নাভিতে রেখে এসেছি সাঁতার। এখনো ভোরের বাগানে হল্লা করে পাতিহাঁস কাল। মা আমার কাঁচাআম-দুধ মেখে আজও অপেক্ষা করে স্কুলফেরত বিকেলে–
৪.
কুঠারের কোপে কত সাবাড় হলো বাগান। মাটির ডিবি হতে মাটি ও সিমেন্ট। তোমাদের ভাস্কর্য বানানো হলো না জনকজননী। জানোই তো শিল্পের আঙুল কেটে ফেলা হয়েছে চৌদ্দ ডিসেম্বরে…
৫.
তোমার ঘাড়ে ও গর্দানে চাপাতির কোপ। হে আমার সহোদর আমি তো কাটা গলা নিয়ে ধর্না দিচ্ছি সচিব ও সম্পাদকের টেবিলে-মহলে।
৬.
বাইরে কুয়াশা বৃষ্টির শব্দ! শব্দের গভীরে মাছের সাঁতার। মাছেরা হারিয়েছে সমুদ্রের পথ। সরকার খাল খনন কর্মসূচী শুরু করবে আবার…
৭.
মা-বাবা শুয়ে আছে যৌথ কবরে। ছেলেরাও শোবে। মেয়েদের তো কবর কিনে নিতে হবে। আসো বোনেরা একই কেটলিতে বিগলিত হই। পিতার কবরে বাসক গাছের গোড়ায় ঢালি মেয়েজল।
৮.
শব্দের ঝাঁকুনিতে তোকে ভুলে গেছি। পাশবালিশে শুয়ে থাকা কথা ছুঁয়ে দেখি তার গায়ে নক্ষত্রের গুড়ো…
বিহ্বল
১.
কবেই ছেড়েছি নিজস্ব কক্ষপথ । এখনো ভোরের বাতাসে শৈশব ঘ্রাণ, দুপুরে জারুল। ও পাড়ার মাসি-পিসিরা উলুধ্বনিতে মাতাতো সন্ধ্যা; তাদের পায়ের ছাপে কতকালের গল্প! এখনো পাথুরে ছায়ায় সে ধ্বনি-প্রতিধ্বনি…
২.
পুলি-পিঠা-পায়েসের কাছে জমা মাতৃস্নেহ। তাল, তমাল, তেঁতুই পাতা, পাখি-ঠোঁটে শৈশবের উচ্ছলতা। শীতের সকালে রোদ পোহানো প্রহরে মুড়ি, চিঁড়া, খৈ এর আহ্লাদ— পিছু নেয়া মুরগির আঁচড়ে-কাটা ক্ষত থাক শৈশব আঙুলে।
৩.
সন্ধ্যার নিকটে চেয়েছি ঘরে ফেরা বাসনা; শিরিষ শাখায় শেষ বিকেলের ছায়া। বাল্যসখী, চোখে গোধূলি কাতরতা— তুমি ভালো থেকো—
৪.
কেমন আছো গো খোয়াসাগর দিঘি? গাঁয়ের বৌ’দের গোসলে সিঁদুরধোয়া। কুমার বাড়ির ঋতুবতীও হোক ঠাঁই মূহুর্মুহু ঢেউয়ে…
৫.
কাটতে-কাটতে কাটিয়ে এসেছি শহুরে কঙ্কর—ও আমার বাটুই ফুল, পাকা জামরুল উঠে আসো শহরের খোপে—সন্ধ্যার সুগন্ধি রঙে একাকার হোক ক্লান্তির বিনিময়ে ক’ফোঁটা ঘামের দাম..
খাতুনে জান্নাতের কবিতা নিয়ে সুধীজনের অভিমত
………………………………………………….
কবি ও সাহিত্যিক খাতুনে জান্নাতের জন্ম ১২ জুলাই ১৯৬৯ ইং ও ২৮ আষাঢ় ১৩৭৫ বাংলা। ফেঞ্চুগঞ্জ, সিলেটে তাঁর জন্ম হলেও তিনি লক্ষীপুরের বাসিন্দা। পিতা: শামছুল হুদা মিঞা, মাতা:গোলেয়ার জান বেগম। বিলেতে ছয় বছর বসবাস করে বর্তমানে ঢাকায় বসবাস করছেন। বিলেত ছাড়া ভ্রমন করেছেন ভারত। পেশাগতভাবে সমাজকর্মী ও শিক্ষক ছিলেন। জীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন শেষে তিনি ২০০৮ সাল থেকে নিয়মিত লিখছেন। ২০০৯ সালে প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। কবির প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা পাঁচ। “চারটি কবিতা ও একটি উপন্যাস। পাশাপাশি লিখছেন ছড়া, ছোটগল্প, গান, চিত্রনাট্য। ছবিও আঁকছেন নিয়মিত।
কবি ভালোবাসেন মানুষ ও প্রকৃতি; দুর্বলের প্রতি সহিংসতা ও অভিন্নতার মুক্তি চান তিনি। তাঁর কবিতা নস্টালজিক অনুভূতি, নারী মুক্তি, প্রকৃতি, বোধ ও বিভেদ, আবহ, ও উজ্জীবন মূলক।ছন্দ ও অলঙ্কারের গাঠনিক বিন্যাসে তাঁর কবিতা সুখপাঠ্য ও গভীর ভাবের দ্যোতনায় আবিষ্ঠ। কবি খাতুনে জান্নাত কবি হিসেবে যেমন কাব্যপ্রেমী পাঠকের কাছাকাছি চলে এসেছেন, তেমনি সাহিত্য-বোদ্ধা বিদগ্ধ জনেরও দৃষ্টি আবর্ষণ করেছেন।তাঁর সাহিত্যকর্ম বিশালতায় ব্যাপ্ত না হলেও ইতোমধ্যে তিনি যতটুকু দিতে পেরেছেন তা অকিষ্ণিৎকর নয় সুধীজনের দৃঢ় বিশ্বাস, খাতুনে জান্নাতের হাত দিয়ে আসবে আরও নতুন সাহিত্য-সওগাত। তাই তো তাঁর সাহিত্যকর্ম সম্পর্কে বিশিষ্ট কবি, সাহিত্যিক ও সমালোচক বুদ্ধিজীবীগণ তাঁদের মতামত ব্যক্ত করেছেন। এসব আলোচনার মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এসেছে আধুনিক কাব্য-সাহিত্যে খাতুনে জান্নাতের প্রতিশ্রুতিশীল অভিজ্ঞান।তাঁদের সুচিন্তিত মতামত থেকে কিছু অংশ তুলে ধরা হলো…
…………………………………………………………..
আব্দুল গাফফার চৌধুরী
……………………………..
প্রখ্যাত সাহিত্যিক-সাংবাদিক, খ্যাতিমান কলাম লেখক,‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ অমর গানের রচয়িতা আদুল গাফফার চৌধুরী বলেন–খাতুনে জান্নাত বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের একেবারেই নতুন এক কবি। তাঁর এবং তাঁর কবিতার সঙ্গে আমার পরিচয় আকষ্ণিক।কিন্তু তাঁর সমাজচিন্তা ও ব্যক্তিগত ভাবনা যখন জাগতিক স্থূলতা পেরিয়ে পাঠকের সূক্ষ্ন মননে আঘাত করে, তাকে সুপ্ত অথবা উদ্দীপ্ত করে, তাকে স্বসময়ের বাইরে অনাদি আধুনিকতার স্পর্শ দেয়, তখন বিস্মিত হয়েছি। তার কবিতা প্রথাগত চিন্তার নয়, একেবারে প্রথাগত আঙ্গিকেরও নয়। তার কবিতায়ব্যক্তি মনের যন্ত্রণার সঙ্গে যুগযন্ত্রনাও আছে। কিন্তু প্রকাশটি কাব্যিক। তা অকাব্যিক শ্লোগান হয়ে উঠেনি। এ জন্যই তার কবিতা পাঠকের মন স্পর্শ করার ক্ষমতা রাখে।তার কবিতার এ যাদুস্পর্শ আমি পেয়েছি এবং বিস্মিত হয়েছি।আমার ধারণা তিনি বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের কবিতার আকাশে একটি উল্কা হয়ে থাকতে না চাইলে একদিন নক্ষত্র হয়ে উঠতে পারবেন।
………………………………………
মহাদেব সাহা
…………..
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি মহাদেব সাহা বলেন, খাতুনে জান্নাত তার কবিতায় জীবনকে নানা মাত্রায় অনুভবের চেষ্টা করেছেন।তার সেই অনুভব যে কবির অনুভব, তা স্বীকার করতে হয়। এখানে জীবনের বহুতল স্পর্শ করার চেষ্টা যেমন রয়েছে তেমনি আছে নিজেকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও উন্মোচনের প্রয়াস। এ কাজে তাকে আমার সাহসী বলেই মনে হয়। কিছু কিছ কবিতার শব্দ ব্যবহারে, ব্যঞ্জনা ও চিত্রকল্প সৃষ্টিতেতার এ শক্তি ও সাহসের পরিচয় আছে। তার অনেক কবিতার অন্তর্নিহিত দ্যুুতি যে সহজেই চোখে পড়ে, তা তার নিজস্বতারই পরিচয়।তার কবিতা পড়তে গিয়ে মনে হয়েছে তার একটি চমৎকার কবিমন আছে যা নিয়তই জীবন ও জগতের রহস্য সন্ধান করে, জীবনের সব স্তর উপলব্ধি করতে চায়। যেকোন কিছুকেই কবিতা করে তোলার একটা সহজাত ক্ষমতা তার মধ্যে। তার কিছু কিছু কবিতা অন্তরস্পর্শী একইসঙ্গে সাবলীল।–অসংকোচে প্রকাশের একটা দৃঢ়তাও আছে তার মধ্যে যা সবার থাকে না।
………………………………………………………………
সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
……………………
উভয় বাংলার জনপ্রিয় সাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় খাতুনে জান্নাত সম্পর্কে বলেন ‘‘খাতুনে জান্নাত প্রবাসে থেকেও বাংলায় কবিতা লিখছেন। এই প্রচেষ্টা অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য। তাঁর কবিতায় উঠে আসে প্রেম, প্রকৃতি এবং হারিয়ে যাওয়া ভিটে মাটির জন্য বেদনা। তার কণ্ঠস্বর আন্তরিক। আমি তার উজ্জ্বল ভবীষ্যৎ কামনা করি।
……………………………………………………………………………
কেতকী কুশারী ডাইসন
……………………
কবি-সাহিত্যিক, সমালোচক, গবেষক কেতকী কুশারী ডাইসন বলেন, কবি হিসাবে তার মধ্যে প্রতিশ্রুতি আছে। জীবন সংগ্রামের নানা খাতে কবিতাই অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে। বিষয়বৈচিত্র, সংবেদন, প্রকৃতি আর মানুষের সাথে মিথস্কিয়ার প্রতিবেদন, ভাষাচেতনা, ছন্দের দোলা, শব্দদের নিয়ে কারুকাজ-নানা দিক দিয়ে তার বই আমাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে। কবি হিসেবে তার বিবর্তনের জন্য চাই সে সামর্থের বিকাশ,বিবর্ধন ও পরিশীলন- মূলধনকে না হারিয়ে নূতন বৃদ্ধি।
…………………………………………………………………….
নুরুজ্জামান মনি
…………………..
সাংবাদিক, কবি গীতিকার নুরুজ্জামান মনি বলেন–কবি খাতুনে জান্নাত শিখে নিয়েছেন ব্যক্তিগত অভাববোধকে কী করে সামাজিক যন্ত্রণায় পরিণত করা যায়। কী করে সমাজ ও ব্যক্তির স্হূল ভাবনা ও আচরণকে বাগদেবীর সূক্ষ্ন বীণার তারে ঝংকৃত করে তোলা যায়। প্রথম কাব্যগ্রন্থে তার ছাপ পাওয়া যায়।তিনি আরও বলেন, খাতুনে জান্নাত নিজেকে তৈরী করেই কবিতা লিখতে শুরু করেছেন। বিশুদ্ধতা, উদারতা আর প্রগতীশীলতার আদর্শ আর বিশ্বাস দিয়ে গড়া তাঁর মনোজগৎ। তিনি চান শুদ্ধ মানবিকতার উদার একটি আকাশ। যে আকাশে থাকবে না কোন অশিক্ষা-অজ্ঞানতার অন্ধকার। ধর্মের ভেদ রহিত হবে মানুষের মন থেকে।তাঁর আহ্বান–বাঙালি নারীদেরকে এগিয়ে আসতে হবে চির অবরোধের দেয়াল ভেঙে, হতে হবে আত্মনির্ভর।
………………………………………………..
সালেহা চৌধুরী
……………………………..
সাহিত্যিক, আলোচক সালেহা চৌধুরী বলেন, খাতুনে জান্নাতের কিবিতায় তার নিজস্ব চিন্তা রয়েছে। আমরা সবসময় মৌলিক চিন্তার কাছে কৃতজ্ঞ। তাঁর লেখার কৌশল ও বিন্যাস সুন্দর। তিনি পরীক্ষা নীরিক্ষা নিয়ে ভাবেন না, কবিতার শর্ত মানেন।যথাযথ শব্দ, ভাব, প্রতীক,দৃশ্যকল্প,উপমা,উৎপ্রেক্ষার বিন্যাসে তার কবিতা সত্যিই মনোগ্রাহী ও হৃদয়গ্রাহী হয়ে ওঠে। তার কবিতায় দুঃখ আছে, মৃত্যু আছে তারপরও জীবন থাকে। যেখানে জীবন-পিপাসা স্পষ্ট, আশাবাদও বেশ পরিষ্কার। তার কবিতা পড়তে পড়তে ধ্যানস্থ হয়ে যাই।
তিনি আরও বলেন–ছাই দিয়ে ঢেকে রাখলেও সত্যিকারের মনিমুক্তা যেমন চাপা থাকে না তেমনি চাপা থাকেনি খাতুনে জান্নাতের অসাধারণ কাব্য প্রতিভা। কবিতার তিনি ইতিমধ্যেই স্বতন্ত্র পরিচয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠেছেন। তার কবিতা সহজ, গভীর ও স্বতন্ত্র।
……………………………………………………………..
অলোক কুমার বসু
…………………………………………
কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক অলোক কুমার বসু বলেন-খাতুনে জান্নাতের সবচেয়ে অর্জন এই যে, তার গদ্যধর্মী ও বিমূর্ত চিন্তা নিছক বিবৃতি হয়ে থাকেনি। তা কবিজনোচিত অনুভূতির প্রসাদে রীতিমত কাব্যধর্মী ও সাবয়ব। সার্থক কবিতার জন্ম স্থির-আত্মস্থ মননে। খাতুনে জান্নাতের কবিতায় অনুভূতির প্রকাশের সঙ্গে এই মননের লক্ষন পরিস্ফুট। ব্যক্তিগত অনুভূতির নৈব্যক্তিক বর্ণনায় তার কবিতা উত্তীর্ণ বলা যায়।
……………………………………………………………
গোলাম কবির
………………….
কবি ও সংস্কৃতিকর্মী গোলাম কবির বলেন,একজন নবাগত কবি যে এতখানি সমৃদ্ধি নিয়ে বৃটেনে বাংলা কবিতার ভুবনে আবির্ভূত হতে পারেন, তাতেই আমার বিস্ময়।একই সঙ্গে আমি আনন্দিত এই জন্যে যে, তাঁর মতো একজন মেধাবী এবং অনহঙ্কারী সদালাপী মিশুক কবিকে পেয়েছি আমাদের কবিদের আঙিনায় এবং আড্ডায়।
তিনি আরও বলেন, কবি খাতুনে জান্নাতের কবিতা বিশেষত্ব পায় মূলত প্রগতিশীলতায়। আবার তার সঙ্গে রয়েছে তার স্মৃতিময় শৈশব-কৈশোর-যৌবনের ঘাত-প্রতিঘাতে তিক্ত সুখ-দুঃখময় অভিজ্ঞতা। এ বিষয়গুলো মোটামুটি তার কবিতায় ফুটে ওঠে বলেই পাঠক তার কবিতা পড়তে গেলে একেবারেই সাম্প্রতিক সময়ের গ্রামবাংলার সামাজিক চিত্রকে খুঁজে পাবেন।এখানেই একজন সাহিত্য স্রষ্টার পরিতৃপ্তি।
কবি খাতুনে জান্নাতের কবিতা ভালো লাগার কবিতা। কবি হিসেবে তিনি স্বভাব কবির মতোই প্রতিভাত হচ্ছেন আমার কাছে। তার এই প্রতিভা ক্রমশঃ প্রস্ফুটিত হবার লক্ষন রাখে। তার কাব্যমানের বিচরণ ভূমি অতীব সরস। এখন শুধু তাকে হতে হবে পরিশ্রমী কৃষক।
……………………………………………………………………………
সন্দিপক মল্লিক
………………………………………
কবি খাতুনে জান্নাত কবিতায় জীবন পূর্ণতার জ্যোতিকেই লালন করেন। তাঁর শিল্পবোধ এবং জীবনায়োজনের বৃত্ত বিন্যস্ত হয় সত্যায়ত রূপমায়। দেশ-কাল-বোধের পরিচ্ছন্ন চিত্রদীপ্তি সম্যকভাবে সংবৃত হয় তাঁর কবিতায়। উপযুক্ত শ্রীমগ্ন অনুভাবনায় ‘সত্য’ই সংস্থিত। শব্দ-সত্য-জ্যোতির্ময় কবি জীবন- বিশ্বস্ততার আল্পনা এঁকেছেন অবলীলায়। জয়শ্রীমান দেশদীপ্তি আর জীবন সৌন্দর্যের সন্দীপ্তি কবির সৃজন পরিব্যাপ্তিতে। সত্তার পুলক সঞ্চারী উপমা আর উৎপ্রেক্ষার ফাগুন, ছন্দ, -মাধুর্যমন্ডিত অন্তমিল দিব্যশ্রীমান হয়েছে কবির শিল্পায়নে।অপরূপ প্রেমাত্মক কবির শব্দ-সন্দীপনার বৃত্তায়ন। বাক্যময় অনুভব – সুষম প্রিয় সান্নিধ্যযাপন – যৌবন মদিরতা! কবির প্রাণ- সম্পুষ্ট শিল্পানুগ দিশা কষ্ট বেদনার বৃত্ত অতিক্রমী। কবি তো স্বার্থান্ধ ‘শিয়াল’ কে পশ্চাতে ফেলে লুকনো আতরের আবাসন গড়তে আগ্রহী। প্রেম-অন্বীক্ষুমুগ্ধতায় তাঁর কবিতালাপ সজ্জিত হয় হৃদয় মোহন ভঙ্গিমায়। কবির মনন স্পন্দনে উত্তরাধুনিকতার রূপান্বয় আর লোকজ সংবৃত্তির সুধা। উদ্দেশ্য শান্তি, স্বধা আর স্বস্তি। যতোই বেদনার্ত হোক অস্তিত্ব; বস্তু জাগতিক অপঘাতে শোষণে যতোই বিধ্বস্ত হোক সত্তার সজ্জাপ্রভাত-প্রশান্তি আর প্রাণ-প্রেম সুষমাই কবির প্রার্থিত। যা সার্বজনীন। সর্বাত্মক স্বস্তির আরাধনায় পল্লী সৌন্দর্যের আনুপূর্বিক অন্বেষায় কবির কবিতা-জ্যোতির্ময় অনুভব অনুবন্ধের আয়োজন। কবির অনুভবের বিস্তারণ, সূক্ষ্ন সমুজ্জ্বল সত্যাহরণ, প্রবুদ্ধ বিচক্ষণতা, মনস্বিতা- সমৃদ্ধি অতুল্য। কবি সম্পূর্ণ জীবনেরই সম্পোষক। পূর্ণতার চন্দন শুদ্ধতাই তার প্রাপ্তব্য। যা সার্বজনীন পূণ্যের আধার।
……………………………………………………………..
তুষার কবির
…………………………………………
কবি খাতুনে জান্নাতের কবিতা—পাঠ সারাৎসারে বলা যায়—সহজ, সরল, স্নিগ্ধ, আটপৌরে শব্দে ভরা, যাপিত জীবনের টুকরো টুকরো অনুষঙ্গে ঠাসা! অহেতু জটিলতার পথ পরিহার করে তিনি লিখে চলেছেন মুঠো মুঠো পংক্তিগুচ্ছ—যা পাঠকের সাথে কমিউনিকেট করে সহজেই। ‘‘সহজ লোকের মত কে চলিতে পারে’’—কবি জীবনানন্দ দাশের এই সরল জিজ্ঞাসার উত্তর দিতেই যেনবা খাতুনে জান্নাত সহজভাবেই হেঁটে চলেছেন কবিতার পথে।তাঁর বই পড়তে পড়তে যে কথা সবার আগে মনে হয়েছে তা হল তিনি শব্দ নিয়ে খেলা করতে ভালোবাসেন। শব্দকে নেড়ে চেড়ে, ছেনে, উল্টেপাল্টে সৃষ্টি করেন খণ্ড খণ্ড কবিতা-প্রিজম! ‘শব্দ হাতে পেলেই আমি খরচা করে ফেলি’—কবি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের এ পংক্তিঘোরে মনে হয় খাতুনে জান্নাত মোহাচ্ছন্ন! তাই তো ‘কবির পংক্তিতে পংক্তিতে উঠে আসে খৈ-রঙা বিকেল, বাতাসে ঘি-পোড়া গন্ধ, লুটানো ঘুঙুর, সরোদ ও মৃদঙ্গের টুংটাং, গোছানো বিষাদ, ইন্দ্রিয়ের অনুষ্টুপ, চিরহরিৎ রক্ত, আতপ জীবন, জলের জারক—এরূপ বহুবর্ণিল উপমা, রূপক ও চিত্রকল্প! খাতুনে জান্নাত বাগ্দেবীর আরাধ্য আশ্রমের দিকে হেঁটে চলেছেন। তবে এই পথ চলায় তাকে মগ্ন হতে হবে বিস্তর পঠন-পাঠনে, নিজস্ব ক্র্যাফ্টম্যানশিপে, ভিন্ন কোনো ইশারা লিখনে!
……………………………………………………………..
হাসান ওয়াহিদ
………………………………………..
খাতুনে জান্নাতের কবিতাভূবন বৈচিত্রময় ও প্রাণশীল। তিনি জীবনটাকে কবিতার মধ্য দিয়েই দেখেন। আমাদের চোখে তাঁর অস্তিত্ব কবিতা হয়েই ভেসে ওঠে। তিনি কবিতার মধ্যে দিগন্তের দিকে ঢেউ খেলানো অদৃশ্য বাতাসকে খোঁজেন। কবিতার সংজ্ঞা কী? এক কবি থেকে আর-এক কবির কাছে কবিতার সংজ্ঞায় কোনো মিল নেই, অথচ আমরা সমবেতভাবে কবিতা ব্যাপারটা কী তা বুঝি, অকবিতা থেকে তাকে আলাদা করে নিতে পারি। একারণে আমরা ভালো কবিতা খারাপ কবিতা নিয়ে তর্ক করতেও উদ্যত হই। এই বিতর্কে দেখা যায় অনেকেই আলাদা, আবার সবাই কোথাও গিয়ে এক। খাতুনে জান্নাতের কবিতা, তাই স্ব-স্পর্শকারী, আত্মমুখী, নিটোল ও সুন্দরাভিসারী। তিনি কবিতাবিশ্বকে তাঁর নিজস্ব ও নির্জন করে গড়ে তুলেছেন। তিনি কবিতার মধ্যে যুক্ত করেন ও যুক্ত থাকেন বিবিধ কবিতার ভাষাসাজের ঐতিহ্যের সঙ্গে। একটি সার্থক কবিতাপাঠ আসলে পাঠকেরও দায়িত্ব বাড়ায়। কবিতার মধ্য দিয়ে একটি নতুন পৃথিবীর জন্ম দেয়া কবিকে খুঁজে পান পাঠক। খাতুনে জান্নাতের কবিতা তাই কবিতা পাঠকারীদের সুখপাঠ্য।
……………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………………

খাতুনে জান্নাত
.

