ধর্ম মানুষের জন্য শান্তির বার্তা নিয়ে আসে—এটাই আমরা ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছি। ধর্ম মানুষের হৃদয়ে নৈতিকতা, সহমর্মিতা এবং ন্যায়বোধ জাগ্রত করে। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, আজ সেই ধর্মকেই ব্যবহার করা হচ্ছে বিভেদ, সহিংসতা এবং অশান্তি সৃষ্টির হাতিয়ার হিসেবে।
ধর্ম কখনো মানুষকে ঘৃণা করতে শেখায় না। বরং সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসা, সহনশীলতা এবং পারস্পরিক সম্মানের শিক্ষা দেয়। তবুও আমরা দেখি, কিছু উগ্রপন্থী গোষ্ঠী ধর্মের নামে নিজেদের সংকীর্ণ মতবাদ চাপিয়ে দিতে চায়। তারা ভিন্নমতকে সহ্য করতে পারে না; বরং ভয়ভীতি ও সহিংসতার মাধ্যমে তা দমন করতে চায়।
এই প্রবণতা শুধু সমাজের জন্য নয়, ধর্মের প্রকৃত সৌন্দর্যের জন্যও হুমকিস্বরূপ। যখন ধর্মকে ভয় দেখানোর হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে ধর্ম সম্পর্কে ভুল ধারণা তৈরি হয়। মানুষ ধর্মকে আর শান্তির উৎস হিসেবে দেখে না; বরং ভয় ও দ্বন্দ্বের কারণ হিসেবে দেখতে শুরু করে।
আমাদের সমাজে ভিন্নমত থাকা স্বাভাবিক। ইতিহাস জুড়েই মতের পার্থক্য ছিল, আছে এবং থাকবে। কিন্তু সেই ভিন্নমতকে সহিংসতার মাধ্যমে দমন করা কখনোই সমাধান হতে পারে না। বরং এটি সমাজকে আরও বিভক্ত করে এবং অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করে।
ধর্মীয় উগ্রবাদীরা সাধারণত একটি কৌশল অবলম্বন করে—তারা নিজেদের মতকে একমাত্র ‘সত্য’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে চায়। যারা সেই মতের সঙ্গে একমত নয়, তাদেরকে তারা শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। এই মানসিকতা থেকেই জন্ম নেয় অসহিষ্ণুতা, আর সেখান থেকেই শুরু হয় অশান্তির বিস্তার।
ধর্মের নামে এই ধরনের অপব্যবহার বন্ধ করতে হলে আমাদের প্রথমেই ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা বুঝতে হবে। ধর্ম কখনো জোরজবরদস্তির বিষয় নয়; এটি বিশ্বাসের বিষয়, যা হৃদয়ের ভেতর থেকে আসে। কাউকে ভয় দেখিয়ে বা চাপ প্রয়োগ করে ধর্মীয় বিশ্বাস প্রতিষ্ঠা করা যায় না।
একই সঙ্গে সমাজের প্রতিটি স্তরে সহনশীলতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তোলা জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক সংগঠন—সব জায়গাতেই এই মূল্যবোধ চর্চা করতে হবে। অন্যের বিশ্বাসকে সম্মান করা এবং ভিন্নমতকে গ্রহণ করার মানসিকতা তৈরি না হলে, উগ্রবাদ সহজেই জায়গা করে নেবে।
রাষ্ট্র এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। ধর্মের নামে সহিংসতা বা হুমকি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়—এ বিষয়ে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। একই সঙ্গে নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কেউ আইনের ঊর্ধ্বে না থাকতে পারে।
ধর্ম আমাদের বিভক্ত করার জন্য নয়, বরং একত্রিত করার জন্য। তাই এখনই সময়—ধর্মের প্রকৃত চেতনায় ফিরে যাওয়ার, সহনশীলতা ও মানবিকতার পথে হাঁটার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
আমরা কি ধর্মকে শান্তির পথেই রাখব, নাকি উগ্রতার হাতে তুলে দিয়ে সমাজকে অশান্তির দিকে ঠেলে দেব?
এই সিদ্ধান্ত আমাদেরই নিতে হবে।
লেখক: সোলায়মান জামান সুমন

