সামনে কি আবার যুদ্ধ, নাকি দীর্ঘস্থায়ী ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ পরিস্থিতি ?

মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে আবারও এক অনিশ্চয়তার ছায়া নেমে এসেছে। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য দ্বিতীয় দফার শান্তি আলোচনা ঘিরে যে কূটনৈতিক আশাবাদ তৈরি হয়েছিল, তা হঠাৎ করেই ধাক্কা খেয়েছে। পাকিস্তানে নির্ধারিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক বাতিলের সিদ্ধান্ত শুধু একটি সফর স্থগিত হওয়ার ঘটনা নয়—এটি বৃহত্তর ভূরাজনৈতিক সমীকরণে নতুন প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। প্রশ্ন একটাই: সামনে কি যুদ্ধ, নাকি দীর্ঘস্থায়ী এক ‘না যুদ্ধ, না শান্তি’ পরিস্থিতি?

সাম্প্রতিক এই ঘটনাপ্রবাহে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ বিষয় হলো সিদ্ধান্তের আকস্মিকতা। কূটনৈতিক প্রস্তুতি যখন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে, তখন এমন একটি সফর বাতিল হওয়া সাধারণত গভীর কৌশলগত বার্তা বহন করে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে স্পষ্ট কারণ জানানো হয়নি, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে অনেক সময় ‘অঘোষিত কারণ’ই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

প্রথমত, এই সিদ্ধান্তকে একটি কৌশলগত চাপ সৃষ্টির প্রয়াস হিসেবে দেখা যেতে পারে। আলোচনার টেবিলে বসার আগেই প্রতিপক্ষকে মনস্তাত্ত্বিকভাবে দুর্বল করে দেওয়ার কৌশল নতুন নয়। সফর বাতিল করে যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানকে বুঝিয়ে দিতে চেয়েছে যে, তারা আলোচনায় আগ্রহী হলেও কোনও অবস্থাতেই দুর্বল অবস্থানে নেই। বরং শর্ত নির্ধারণের ক্ষমতা এখনও ওয়াশিংটনের হাতেই।

দ্বিতীয়ত, অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বাস্তবতাও এখানে ভূমিকা রাখতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে পররাষ্ট্রনীতি প্রায়ই অভ্যন্তরীণ ভোটব্যাংকের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ইরানের সঙ্গে নমনীয় অবস্থান গ্রহণ করলে তা রাজনৈতিকভাবে কতটা গ্রহণযোগ্য হবে—এই হিসাবও বিবেচনায় থাকতে পারে। ফলে, সফর বাতিল করে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দেওয়া একটি ‘ডোমেস্টিক পলিটিক্স’-চালিত সিদ্ধান্তও হতে পারে।

অন্যদিকে, ইরানের অবস্থানও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তেহরান দীর্ঘদিন ধরেই যুক্তরাষ্ট্রের ওপর অবিশ্বাস পোষণ করে আসছে। অতীতে একাধিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে দাঁড়ানোর নজির ইরানকে আরও সতর্ক করে তুলেছে। ফলে, তারা এমন কোনও আলোচনায় যেতে চাইবে না যেখানে নিজেদের স্বার্থ সুরক্ষিত নয়। এই পারস্পরিক অবিশ্বাসই শান্তি প্রক্রিয়ার সবচেয়ে বড় বাধা।

এখন প্রশ্ন হলো—এই পরিস্থিতি কি যুদ্ধের দিকে এগোচ্ছে? আপাতদৃষ্টিতে তার সম্ভাবনা কম। কারণ, সরাসরি সামরিক সংঘাত উভয় পক্ষের জন্যই ব্যয়বহুল এবং ঝুঁকিপূর্ণ। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতা, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের প্রভাব, এবং আন্তর্জাতিক মিত্রদের অবস্থান—সবকিছু বিবেচনায় যুদ্ধ কোনও পক্ষের জন্যই সহজ সিদ্ধান্ত নয়।

তবে যুদ্ধ না হলেও, ‘ছায়াযুদ্ধ’ বা প্রক্সি সংঘাতের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইতোমধ্যেই অঞ্চলজুড়ে বিভিন্ন গোষ্ঠীর মাধ্যমে প্রভাব বিস্তারের লড়াই চলছে। এই পরিস্থিতি আরও তীব্র হতে পারে, যেখানে সরাসরি সংঘাতের বদলে পরোক্ষ উত্তেজনা দীর্ঘায়িত হবে।

এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বাস্তবসম্মত যে চিত্রটি সামনে আসে, তা হলো একটি দীর্ঘস্থায়ী ‘স্টেলমেট’ বা অচলাবস্থা। যেখানে না পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধ হবে, না স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠিত হবে। বরং মাঝামাঝি এক উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করবে, যা মাঝে মাঝে সংকট তৈরি করবে, আবার কূটনৈতিক তৎপরতায় সাময়িকভাবে প্রশমিত হবে।

এই ধরনের পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে নতুন নয়। শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে ‘কোল্ড পিস’ ছিল, তার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির কিছু মিল খুঁজে পাওয়া যায়। সরাসরি যুদ্ধ এড়িয়ে চলা, কিন্তু প্রতিনিয়ত চাপ ও প্রতিযোগিতা বজায় রাখা—এই নীতিই হয়তো আবারও ফিরে আসছে নতুন আঙ্গিকে।

তাহলে এই সংকটের শেষ কোথায়? এর উত্তর সহজ নয়। কারণ, এটি কোনও একক ঘটনার ফল নয়; বরং বহু বছরের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত দ্বন্দ্বের সমষ্টি। এই সংকটের সমাধান নির্ভর করছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ওপর।

প্রথমত, পারস্পরিক আস্থার পুনর্গঠন। কোনও শান্তি প্রক্রিয়া তখনই সফল হয় যখন উভয় পক্ষ অন্তত ন্যূনতম বিশ্বাস স্থাপন করতে পারে। দ্বিতীয়ত, আন্তর্জাতিক মধ্যস্থতাকারীদের ভূমিকা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বা আঞ্চলিক শক্তিগুলো যদি সক্রিয় ভূমিকা নেয়, তবে আলোচনার পথ আবারও খুলতে পারে। তৃতীয়ত, বাস্তববাদী কূটনীতি—যেখানে আদর্শের চেয়ে বাস্তব স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘ভুল হিসাব’ বা miscalculation। ছোট কোনও ঘটনা যদি বড় সংঘাতে রূপ নেয়, তবে পরিস্থিতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। তাই উভয় পক্ষের জন্যই সংযম ও কৌশলী পদক্ষেপ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সবশেষে বলা যায়, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। সফর বাতিলের মতো একটি ঘটনা হয়তো সাময়িকভাবে উত্তেজনা বাড়িয়েছে, কিন্তু এটি চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে না। বরং এটি একটি দীর্ঘ কূটনৈতিক দাবা খেলায় নতুন একটি চাল মাত্র।

এই খেলায় শেষ পর্যন্ত কে জিতবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় নিশ্চিত—যুদ্ধের চেয়ে শান্তিই সবার জন্য কল্যাণকর। প্রশ্ন হলো, সেই শান্তির পথে হাঁটার রাজনৈতিক সদিচ্ছা কতটা আছে।

হাবিব বাবুল
প্রধান সম্পাদক, শুদ্ধস্বর ডটকম

Leave a Reply

This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.