ড নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া’র নিবন্ধঃ মানুষের সাহিত্য ও সাহিত্যের মানুষ প্রথম পর্ব।
ড. নেয়ামত উল্যা ভূঁইয়া : “কুবের হাকিয়া বলে, যদু হে এ এ এ–মাছ কিবা ? খানিক দূরের নৌকা হইতে জবাব আসে, জবর।” ‘পদ্মা নদীর মাঝি’র এই একটি সংলাপ থেকেই অনায়াসে ঠাওর করা যায়, এ উপন্যাসের মানুষ কারা এবং লেখক কোন শ্রেণি–পেশার মানুষের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। আর ময়না দ্বীপের মতোই রহস্যময় হোসেন মিয়ার গীত ‘নিদ ভাঙে না, দিল জাগে না, বিবির বুকের শির,/ পাড়ি দিবার সময় গেল, মাঝি তবু থির / মাঝি কত ঘুমাইবা?’— প্রতীকী অর্থে কেতুপুরের কোন সমাজের কোন শ্রেণির চির বঞ্চিত অসহায় ও চিরসুপ্ত অচেতন মানুষের বাস্তব চিত্র লেখক রূপায়িত করেছেন, তাও পাঠকের বোধাতীত থাকে না।
‘পদ্মা নদীর মাঝি’ পদ্মা তীরবর্তী অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়ের জীবন চিত্র। জেলে ও মাঝিদের দুঃসাহসিক জীবনযাত্রা এ উপন্যাসের উপজীব্য হলেও তাদের সীমাহীন দারিদ্র্যের নির্মম কষাঘাতে জর্জরিত বেদনার অন্তর্গত আর্তনাদ পরম বিশ্বস্ততার সঙ্গে চিত্রিত করেছেন যে সাহিত্যিক তিনিও একজন মানুষ। এ চিত্রকর সাহিত্য– শিল্পী। চিত্রশিল্পীর সামগ্রী রঙ, তুলি, ক্যানভাস। আর সাহিত্যশিল্পীর সামগ্রী শব্দ, কলম, কাগজ। তবে দুজনেরই যে–বাড়তি অথচ অতি প্রয়োজনীয় জিনিসটার দরকার তার নাম মননমধু, মনের মাধুরী। বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে একাকার হয়ে যখন কল্পনার বর্ণালী রঙ শিল্পীর অন্তর্গত জমিনে আল্পনা আঁকে তখন তা প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ততায় বহিরঙ্গনে পাড়ি জমায়। তখনই শিল্পী প্রাণের
উচ্ছ্বলতায় জানান দেয়, ‘জাগিয়া উঠেছে প্রাণ / ওরে উথলি উঠেছে বারি, / ওরে প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ/ রুধিয়া রাখিতে নারি।’ আর তখনি সে আপন হতে বের হয়ে বাইরে দাঁড়ায় এবং তার অন্তর জুড়ে বিশ্বলোকের সাড়া অনুভব করে। আত্মা যুক্ত হয় পরম আত্মীয়ের সঙ্গে; মানুষের সঙ্গে। মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ও তার বাস্তব অভিজ্ঞতার ছাঁকনিতে নিপুণ কলমের আঁচড়ের মমতার রস সিঞ্চনে করে কুবের, কপিলা, মালা, মহাজন, হোসেন মিয়া, গণেশকে চিত্রায়নের মাধ্যমে যুক্ত হয়েছেন পাঠকের সঙ্গে, মানুষের সঙ্গে। তার সাহিত্যের এই মানুষগুলোর আশ্রয়েই তিনি মানুষের জন্য সাহিত্য রচনা করেছেন।
যথার্থ অর্থে মানুষের সঙ্গে যুক্ত হতে পারলেই শিল্পী প্রকাশ বেদনার ভার থেকে মুক্তি পান। শিল্পীর ভাব শুক্তির জঠরে থাকা মুক্তার মতো — যার কদর অন্দরে নয়, বাইরে। শুক্তির অন্দরে তার মুক্তি নেই, সমাদরও নেই। মুক্তো মালায় যুক্ত হয়ে সমজদারের কণ্ঠে অলংকাররূপে সমাদৃত হলেই তার মণিকা জীবন সার্থক। সাহিত্যের কাজও ঐ মুক্তোর মতো। অন্দর থেকে বাইরে এসে দেশ কাল পাত্র মন মনন ও মানুষের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ ঘটিয়ে এবং বিচ্ছিন্নকে যুক্ত করে সার্থকতা লাভ করে। রবীন্দ্রনাথের মতে,
‘ অন্তরের জিনিসকে বাহিরের, ভাবের জিনিসকে ভাষার, নিজের জিনিসকে বিশ্বমানবের ও ক্ষণকালের জিনিসকে চিরকালের করিয়া তোলাই সাহিত্যের কাজ।‘ এভাবেই সাহিত্য মানুষের জীবন–মানসের প্রতিফলন ঘটায় পরম নিষ্ঠায়, অবিচল বিশ্বস্ততায় ও শৈল্পিক সুষমায়।
বস্তুত মানুষ প্রকৃতির মতো কিছুই সৃষ্টি করতে পারে না। পারে রূপান্তর করতে, মূল্য সংযোজন করতে। কিন্তু যে অমূল্য জিনিসটি সে সৃষ্টি করতে পারে , তার নাম শিল্প–সাহিত্য। সাহিত্য মানুষের এমন এক সৃজনশীল কর্ম যার লক্ষ্যও এবং উপলক্ষ্যও মানুষ। এর স্রষ্টাও মানুষ, সৃষ্টি তথা পাত্রপাত্রি, চরিত্রগুলোও মানুষ। আবার এর অংশিজন বা উপকারভোগি এবং উদ্দেশ্য ও বিধেয়– সবই মানুষ। এক কথায়, সাহিত্যের কর্তা, কর্ম, করণ— সবই মানুষ। আর মানুষ সামাজিক প্রাণী বলেই পরস্পর এমনভাবে সংসৃষ্ট যে তাদের একে অপরকে ভালবাসা ছাড়া উপায়ন্তর নেই। হ্যাঁ, এ ছন্দেরও পতন ঘটে বটে, তবে তা সর্বজনীন নয়। স্বনামধন্য জাপানি সাহিত্যিক হারুকি মুরাকামি বলেছেন, “কোনও ব্যক্তি বিশেষের জীবন প্রাকৃতিকভাবে নি:সঙ্গ হতে পারে ; তবে তা বিচ্ছিন্ন নয়। সেই জীবনের সঙ্গে অন্য জীবনের নিবিড় সম্পর্ক অবশই আছে। কিটস –এর বিখ্যাত কবিতা ‘ওড টু নাইটিংগেল’-এর বহুলউদ্ধৃত উক্তি “Here, where men sit and hear each other groan”– ‘এখানে মানুষ বসে বসে একে অন্যের দুঃখ–দহনের কাহিনী শোনে মাত্র‘ ছত্রটি আমাদের জানান দিয়ে যায়, মানুষ পরস্পর কেমন সুনিবিড়ভাবে যুক্ত হয়ে আছে, দেখো।
সাহিত্য মানুষের দ্বারা লেখা, মানুষকে নিয়ে লেখা এবং মানুষের জন্য লেখা। মানব সমাজের মতো
সাহিত্যও বিবর্তনাধীন। এর আদি শব্দশিল্প ‘কবিতা’ হলেও বিচিত্র আবর্ত আঘাতে মানব সমাজ ও সভ্যতার বিবর্তনের ধারায় মানুষ ক্রমান্বয়ে তাদের ভাব, অনুভূতি ও অভিজ্ঞতাকে শিল্পময় করে প্রকাশের তাগিদে কবিতার বীজ থেকে অঙ্কুরিত, পল্লবিত, পুষ্পিত করেছে সাহিত্যের–বৈচিত্র্যময় বহুব্রীহি আঙ্গিক।
সুদীর্ঘ পথযাত্রায় বোধ করি আজ অব্ধি সাহিত্য সুনির্দিষ্ট কিংবা সর্বজনগ্রাহ্য কোন সংজ্ঞার উপর থিতু হতে পারে নি। আর হবেই বা কেন! এ–যে এক চির চলমান শিল্প। সদা–চলিষ্ণু পাথরে শ্যাওলা জমে না। কোন নির্দিষ্ট নিগড়ে বাঁধা পড়েনা। আর এ কথাও আমার বোধে আসেনা যে , সব কিছুর সংজ্ঞা থাকতে হবেইবা কেন? মায়ের মমতা, বোনের সোহাগ, বাবার স্নেহ, মিত্রের মৈত্রি, প্রেমের পুলক, বন্ধুর দরদ, সখার সখ্যতা, প্রসূতির প্রসন্ন প্রসূনে নিহিত নন্দিত আনন্দ, মোনালিসা’র হাসি — এ সবের কি কোন সংজ্ঞা আছে?
সাহিত্যের রূপ অন্তহীন। কখনো হয়ছে জীবনের রঙ্গমঞ্চ, কখনো হয়েছে জীবনালেখ্য, কখনো সমাজের প্রতিচ্ছবি, কখনো জীবন ও সমাজের প্রতিফলন, কখনো সময়ের দর্পণ। কখনো নিজেই হয়েছে প্রশ্ন, নিজেই হয়েছে জবাব, আবার মানুষ ও সমাজকে জোর তাগিদ দিয়ে বলেছে, “ প্রশ্ন করো, জানতে চাও।” কখনো হয়েছে আবেগের আতিশায্যে উদ্বেল, কখনো অনুভূতির বাঁধভাঙ্গা প্রকাশ, কখনো সমকালের মুখপাত্র, কখনো শব্দ ঝংকার, কখনো মিলনের মোহনা, কখনো প্রাণোচ্ছ্বাসের প্রেরণা, কখনো বিরহের বিলাপ , কখনো শোকের আর্তনাদ; আবার কখনো প্রেমিক, কখনো বিপ্লবী, কখনোবা বঞ্চিতের সঞ্চিত ক্ষোভের ক্ষুব্দ প্রকাশ, দ্রোহর স্লোগান, আবার কখনোবা হয়েছে একান্ত শিল্পের জন্যই শিল্প। সাহিত্য আসলে অনামিকা। তাকে যার যার পছন্দের নামে ডাকা যায়। বোধ করি, সেই তরিকাতেই রসবোদ্ধারা কালে কালে ‘আপন অন্তর হতে সৌন্দর্য সঞ্চারী’ তাদের আদুরে সাহিত্য লতিকাকে নানান শোভা–সৌরভে সাজিয়েছেন স্বপ্নিল সুষমায়।
সাহিত্যের পরিধি এতোটাই ব্যাপক যে, মানুষের কল্যাণের জন্য জগতে যত বাণী উচ্চারিত হয়েছে , সবই সাহিত্যের পর্যায়ভুক্ত। এ ব্যাপকতাকেই লক্ষ্য করে বোধ করি ডাঃ লুৎফর রহমান সাহিত্যের বিষয়ে একটি স্মরণযোগ্য মন্তব্য করেছেন,”জীবনের কল্যাণের জন্য, মানুষের সুখের জন্য এ জগতে যিনি যত কথা বলিয়া থাকেন,- তাহাই সাহিত্য।” আর সাহিত্যের লক্ষ্য যে একমাত্র মানুষই তা রবীন্দ্রনাথের জবানিতেই শুনুন,’ পাখির গানের মধ্যে পক্ষিসমাজের প্রতি যে কোনো লক্ষ্য নাই, এ কথা জোর করিয়া বলিতে পারি না। না থাকে তো না’ই রহিল, তাহা লইয়া তর্ক করা বৃথা, কিন্তু লেখকের প্রধান লক্ষ্য পাঠকসমাজ।”
শিল্পের চিরায়ত উপাদান তিনটিঃ মানুষ, সময় ও নিসর্গ। মানুষের যাপিত জীবন, সময়ের প্রবহমানতা, প্রকৃতির পালা বদল— এ সবের মাঝে রয়েছে এক অলৌকিক ছান্দিক সাযুজ্য। আত্মপ্রকাশের আকাঙ্ক্ষা, বাইরের জগত ও জনের সঙ্গে যুক্ত হবার আকুলতা, বাস্তব জগতের অপূর্ণতাকে কল্পজগতের বিত্ত–বৈভব দ্বারা পূর্ণতা দানের আকুতি , সহজাত রূপপ্রিয়তা —মোদ্দা কথায়, এ চারটিই মানুষের সাহিত্য সৃষ্টির মূল উৎস। তাহলে স্বভাবত:ই প্রশ্ন আসে— সাহিত্য কি ? শিল্পমান সম্পন্ন কাল্পনিক বা সৃজনশীল রচনার নাম সাহিত্য।তাহলে সাহিত্যের উদ্দেশ্য কী?রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, “ বিষয়ী লোকে বিষয় খুঁজিয়া মরে। লেখা দেখিলেই বলে, বিষয়টা কী? কিন্তু লিখিতে হইলে যে বিষয় চাই-ই এমন কোনো কথা নাই। বিষয় থাকে তো থাক্, না থাকে তো নাই থাক্, সাহিত্যের তাহাতে কিছু আসে যায় না। … বিশুদ্ধ সাহিত্যের মধ্যে উদ্দেশ্য বলিয়া যাহা হাতে ঠেকে তাহা আনুষঙ্গিক। এবং তাহাই ক্ষণস্থায়ী। যাহার উদ্দেশ্য আছে তাহার অন্য নাম… লক্ষণ অনুসারে তাহাকে দর্শন বিজ্ঞান বা ইতিহাস বা আর-কিছু বলিতে পারো। কিন্তু সাহিত্যের উদ্দেশ্য নাই।” সাহিত্যের সাধারণ উদ্দেশ্য যদি থেকে থাকে , তা কেবলই আনন্দ সঞ্চার। “অন্তর হতে আহরি বচন/ আনন্দলোক করি বিরচন / গীতরসধারা করি সিঞ্চন সংসার–ধূলিজালে।” আর সংকুচিত বৃত্ত–ব্যূহ থেকে মুক্ত করে অবারিত উদার জমিনের বিশ্ব মানবের সঙ্গে পরস্পরকে যুক্ত করাই সাহিত্যের ঐতিহাসিক দায়। আর সে লক্ষেই সাহিত্য কাল- কালান্তে নিবেদিত।
সাহিত্যের’ উদ্দেশ্য’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ উল্লেখ করেন” , সাহিত্যের প্রভাবে আমরা হৃদয়ের দ্বারা হৃদয়ের যোগ অনুভব করি, হৃদয়ের প্রবাহ রক্ষা হয়, হৃদয়ের সহিত হৃদয় খেলাইতে থাকে, হৃদয়ের জীবন ও স্বাস্থ্য-সঞ্চার হয়। যুক্তিশৃঙ্খলের দ্বারা মানবের বুদ্ধি ও জ্ঞানের ঐক্যবন্ধন হয়, কিন্তু হৃদয়ে হৃদয়ে বাঁধিবার তেমন কৃত্রিম উপায় নাই। সাহিত্য স্বত: উৎসারিত হইয়া সেই যোগসাধন করে। সাহিত্য অর্থই একত্র থাকিবার ভাব—মানবের ‘সহিত’ থাকিবার ভাব—মানবকে স্পর্শ করা, মানবকে অনুভব করা। সাহিত্যের প্রভাবে হৃদয়ে হৃদয়ে শীতাতপ সঞ্চারিত হয়, বায়ু প্রবাহিত হয়, ঋতুচক্র ফিরে, গন্ধ গান ও রূপের হাট বসিয়া যায়। উদ্দেশ্য না থাকিয়া সাহিত্যে এইরূপ সহস্র উদ্দেশ্য সাধিত হয়।” অক্ষয়কুমার বড়ালের ‘মানব বন্দনা ‘ কবিতার সেই প্রতীকী প্রশ্ন পক্ষান্তরে মানুষেরই মাহাত্ম্য প্রকাশ, মানুষেরই জয়গান।“সেই আদি-যুগে যবে অসহায় নর নেত্র মেলি ভবে,/ চাহিয়া আকাশ পানে কারে ডেকেছিল, দেবে না মানব?” বাংলার মধ্যযুগের কবি বড়ু চণ্ডীদাস উচ্চারণ করেছিলেন মানব-ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানবিক বাণী—‘সবার উপরে মানুষ সত্য, তাহার উপরে নাই’। সমগ্র বিশ্ব যখন হিংসায় উন্মত্ত, রক্ত ঝরছে পৃথিবীর নাজুক শরীর থেকে, তখন বাংলাভাষী এক কবি বিশ্বকে শুনিয়ে ছিলেন মানবতার বাণী চিরন্তনী। আর সেই ধারাবাহিকতায় বিদ্রোহী কবির শাণিত উচ্চারণ ‘মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহিয়ান।’
চলবে………..

