অঘোর মণ্ডল
তীব্র বিদ্রূপ মেশানো অবজ্ঞা আর বিরক্তি ঝরে পড়েছিল মানুষটার কথায়! ‘ফুটবল! আপনারা ফুটবল নিয়ে লিখবেন কেন! আপনাদের কাছে খেলা মানে তো ক্রিকেট! তারকা মানে ক্রিকেটাররা! আপনারা তো ছোটেন আশরাফুল-মাশরাফি-শাকিব-তামিমদের পেছনে! সাংবাদিকরা কি এখন আর সাংবাদিক আছে? ওরা যা লেখে তার পেছনে একটা মতলব থাকে! বিনা ধান্ধায় এক লাইনও লেখে না!’ বছর পাঁচেক আগে আবাহনী ক্লাবের বারান্দায় এক সান্ধ্য আড্ডায় প্রচণ্ড রকম অপমানিতবোধ করেছিলাম এক ফুটবল কর্মকর্তার মুখে ঐসব কথা শুনে! সরাসরি ক্রীড়া সাংবাদিকতা থেকে সরে আছি তাও বছর আটেক হতে চলল। কিন্তু তবুও সেদিন ভদ্রলোকের কথার প্রতিবাদ করেছিলাম। বলেছিলাম : ‘ফুটবল! ফুটবল মাঠে আছে কোথায় যে স্পোর্টস রিপোর্টাররা ফুটবল নিয়ে লিখবে? যে খেলাটাকে মাঠ থেকে প্রায় উধাও করে দিয়েছেন সেটা নিয়ে রিপোর্টাররা লিখবে কিভাবে? আর দয়া করে সবাইকে এক পাল্লায় মাপার চেষ্টা করবেন না। কথাগুলো শুনে ভদ্রলোকের বিরক্তি আরও বেড়ে গিয়েছিল বলে মনে হয়েছে। যথারীতি বিরক্তি মেশানো ঠঙে তিনি বলে চললেন; ‘ধুর! সাংবাদিকরাই ফুটবলটাকে আরও শেষ করে দিয়েছে!……….।’
তবে হ্যাঁ, ভদ্রলোকের রাগ কমতে লাগল আস্তে আস্তে। আর তার ভদ্রজনোচিত গালাগালির লক্ষ্যস্থল কেমন যেন পাল্টাতে লাগল! সাংবাদিক থেকে সেটা সরে যেতে লাগল ফুটবলার, কোচ, রেফারি এমনকি তার স্বগোত্রীয় কর্মকর্তা পর্যন্ত! এক কথায় বাদ গেলেন না কেউ। বাংলাদেশ ফুটবলের এই খারাপ অবস্থার দায় থেকে তিনি মুক্তি দিতে চাইলেন না বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকেও। ‘আপাও এখন বুঝে না বুঝে ক্রিকেটারদের গাড়ি-বাড়ি-প্লট-ফ্ল্যাট দিয়ে যাচ্ছেন! ওরা কি এমন খেলছে! কোথায় ওয়েস্ট ইন্ডিজের দুই নম্বর দলের বিপক্ষে জিতেছে, অমনি ওদের সংবর্ধনা! জিম্বাবুয়ের মতো খেতে না পাওয়া দলের বিপক্ষে সিরিজ জিতলেই বোনাস! আর আমরা ফুটবল দলের জন্য (আবাহনীর ফুটবল দল) টাকা চাইলে উনি বলেন; টাকা দেব কোথা থেকে?’ ভদ্রলোকের এই গালাগালি থেকে চেতনায় আঘাত করার মতো একটা বিষয় বেরিয়ে এলো। তাহলে সাংবাদিকদের না লেখা আর প্রধানমন্ত্রীর টাকা না দেয়াই কি বাংলাদেশ ফুটবলের বর্তমান এই দশা!
কিন্তু তাই বা হয় কিভাবে? ফুটবল প্রেসবক্সে আগের চেয়ে সাংবাদিকের সংখ্যা কমপক্ষে পাঁচ থেকে সাতগুণ বেশি। সাকিব-তামিম-মুশফিকের চেয়ে ক্লাব থেকে বেশি টাকা পান এমন ফুটবলারের সংখ্যাও অনেক। ঢাকার ক্লাবগুলোর বাজেটের বড় অংশ এখনও ফুটবলের পেছনেই চলে যায়। ফিফার মতো সম্পদশালী সংস্থা এখনও বিশ্বফুটবলের নিয়ন্ত্রক। বিশ্বকাপ আসলে এখনও এদেশের মানুষ ক্রিকেট-ট্রিকেটকে ছুটি দিয়ে এক মাসের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েন টেলিভিশনের সামনে। এমনকি বাংলাদেশ শব্দটা ভুলে(!) গিয়ে আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল-স্পেন-জার্মানি বলতে বলতে জ্ঞানহারা হয়ে যান! অথচ সেই দেশের ফুটবলাররা সাফ ফুটবল থেকে ফিরে আসেন খালি হাতে। ফিফা র্যাংকিং-এ নামতে নামতে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে! আর ক্লাব থেকে গ্যালারি, মিডিয়া থেকে কর্মকর্তা সবাই বলছে, ‘ধুর! এদের দিয়ে হবে না।’ এই ‘ধুর’ আর ‘বিরক্তি’র সংস্কৃতির মধ্যেই ঘুরপাক খায় আবাহনী ক্লাবের সান্ধ্যকালীন আড্ডাও। সেই ধুর শুধু ফুটবল আর ফুটবলারদের নিয়ে তা নয়। ফুটবল-ক্রিকেট-হকি থেকে বঙ্গভবন-গণভবন-হাওয়া ভবন বাদ যায় না কিছুই। ফুটবল-ক্রিকেট-রাজনীতি-অর্থনীতি-শিক্ষা-সাহিত্য-গান-নাটক-টকশো। সব জায়গায় বিরক্তি। অবজ্ঞা। আর অসন্তুষ্টি।
সাবেক ফুটবলারদের দু’একজন তো প্রায়ই বলেন : কি পেলাম ফুটবল খেলে! অথচ জাতীয় পুরস্কারও তারা পেয়েছেন! আবার এমন ফুটবলারও আছেন দীর্ঘদিন জাতীয় দলে খেলেছেন। আবাহনীর মতো ক্লাবের অধিনায়কত্ব করেছেন। এই ক্লাবে খেলে জেল পর্যন্ত খেটেছেন! গুগলে সার্চ দিয়ে দেখছি, ফুটবল মাঠে মারামারি-হাঙ্গামা-আগুন-ভাঙচুর এর ঘটনা অনেক ঘটেছে। প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। কিন্তু ফুটবল মাঠে মারামারির ঘটনায় ফুটবলারদের জেলহাজতখানায় রাত কাটাতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে, এমন ঘটনার নজির ঢাকার ফুটবলে ছাড়া খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। গুগলে সার্চ দিতে দিতে আরও একটা তথ্য বেরিয়ে এলো, বিশ্ব শান্তি দিবসে অর্থাৎ ২১ সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ফুটবলে সবচেয়ে অশান্তির ঘটনাটা ঘটেছিল! আজ থেকে একত্রিশ বছর আগে ১৯৮২ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে ঢাকার ফুটবল লিগে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচ ছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে। সেই ম্যাচে মারামারি-ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছিল। রাতের অন্ধকারে আবাহনী ক্লাবে পুলিশ ঢুকে আনোয়ার-সুহাস-পাকির আলী-অশোকাকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়েছিল। এনএসসি-তে জাতীয় দলের ক্যাম্প থেকে হাতকড়া পরিয়ে থানায় নিয়ে এসেছিল আশরাফউদ্দিন চুন্নু, খোরশেদ বাবুল-আশিস ভদ্র-মোতালেব-গোলাম রব্বানি হেলালসহ আবাহনীর ফুটবলারদের। গুলশানের বাসা থেকে তুলে আনা হয়েছিল সালাউদ্দিনকে। মার্শাল ল-তে সাজা দেয়া হয়েছিল আনোয়ার-চুন্নু-হেলাল-সালাউদ্দিনকে। চার দেয়ালের বন্দী জীবন কি সেটা টের পেয়েছিলেন বাংলাদেশ ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকা সালাউদ্দিনসহ চুন্নু-আনোয়ার-হেলালের মতো তারকারা!
কিন্তু যাদের পায়ের জাদু লাখ লাখ সমর্থকের চোখে তৃপ্তির কাজল এঁকে দিতেন, যাদের নামে সমর্থকরা জয়ধ্বনি দিতেন, যাদের একটু দেখার জন্য ক্লাবের গ্রিল ধরে দাঁড়িয়ে থাকতেন হাজার হাজার সমর্থক, যাদের একটু ছুঁয়ে দেখতে পারাও অনেকের কাছে ছিল অনেক বড় প্রাপ্তি। অনেক প্রশান্তির বিষয় সেই ফুটবলারদের সেদিন কেন হাতকড়া পরানো হয়েছিল? কেন তাদের ঠিকানা হলো কারাগার? এরকম অনেক প্রশ্নের একত্রিশ বছর পেরিয়ে যাওয়ার পরও মেলেনি। কিন্তু সেই সব প্রশ্নের উত্তর সবার অজানা তাও নয়। এত বছর পরও সেই ক্ষোভ কঠিন থেকে খানিকটা তরল হয়েছে সেদিনের আবাহনী অধিনায়ক কাজী আনোয়ারের। তাই জাতীয় দলের এই সাবেক ফুটবলার সোজাসাফটা বলতে পারেন; ‘হাফিজ ভাইয়ের (অবসরপ্রাপ্ত মেজর হাফিজ) ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার হয়েছিলাম সেদিন আমরা। তিনি কোনোদিন আবাহনীকে ভালো চোখে দেখতে পারেননি। এখনও পারেন না। কিন্তু দুর্ভাগ্য সেদিন এই সাবেক ফুটবলারই ছিলেন বাফুফের সেক্রেটারি। তার ধারণা স্বাধীনতার পর শেখ কামালের কারণে তিনি জাতীয় দলে খেলতে পারেননি। অথচ তিনি বুঝতে চাননা সালাউদ্দিন ভাই-এনায়েত ভাই দলে থাকলে, তার জায়গা কিভাবে হয় জাতীয় দলে? কিন্তু তিনি সেই সব যুক্তি-টুক্তি মানতে চান না বলেই একটা প্রতিহিংসাপরায়ণ মন নিয়ে আবাহনীর প্রতি অবিচার করেছেন সবসময় ক্ষমতায় থেকে। সেদিনও তাই হয়েছিল। এরশাদ সাহেব মার্শল ল জারি করলেন। তার সঙ্গে হাত মিলিয়ে মেজর হাফিজ সেদিন নিজের প্রতিহিংসা চরিতার্থ করেছিলেন সালাউদ্দিন ভাইসহ আবাহনীর ফুটবলারদের জেলে ঢুকিয়ে! সঙ্গে ছিলেন এরশাদ সাহেব। এক ঢিলে দুই পাখি মারতে চেয়েছিলেন। এক. রাজনীতি। দুই. তার নিজের একটা ঘটনার প্রতিশোধ। ’৭৮ এ এশিয়ান গেমসে বাংলাদেশ ফুটবল দলের অধিনায়ক করা হয়েছিল নান্নু ভাইকে (মরহুম মনোয়ার হোসেন নান্নু)। তিনি ছিলেন আবাহনীর ফুটবলার। হঠাৎ এনএসসি’র চেয়ারম্যান এরশাদ নান্নু ভাইকে পাল্টে সান্টু ভাইকে (সাবেক গোলকিপার) অধিনায়ক করলেন! আবাহনীর খেলোয়াড়রা এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করেছিলাম। আমরা শেষ পর্যন্ত এশিয়ান গেমসে যাইনি। এরশাদ সাহেবও তাই প্রতিশোধ নিলেন আমাদের জেলে পাঠিয়ে। ফুটবলে প্রতিহিংসা আর রাজনীতির খারাপ উদাহরণ এরচেয়ে আর কিছু আছে কি না আমার জানা নেই।’
কিন্তু আসলে সেদিন মাঠে কি হয়েছিল; যার জন্য এতবড় ঘটনা ঘটল। জেল-জরিমানা-মারামারি-ভাঙচুর অনেক কিছু ঘটল? ‘ম্যাচটা গুরুত্বপূর্ণ এবং মর্যাদার ছিল। আমরা প্রথমার্ধে মোহামেডানের সঙ্গে এক গোলে পিছিয়ে ছিলাম। দ্বিতীয়ার্থে আমি রাইট ফ্ল্যাঙ্ক দিয়ে বল ধরে ক্রস করেছিলাম। বল বাতাসে ভেসে বাঁক নিয়ে মোহামেডানের জালে ঢুকে যায়। মোহসিন ভেতর থেকে বলটা বের করেছিল। কিন্তু রেফারি মুনীর হোসেন গোল বাতিল করলেন! লাইন্সম্যান মহিউদ্দিন বললেন বল জালে ঢোকেনি। অথচ বল জালে। আমি তেড়ে গিয়েছিলাম মহিউদ্দিনের দিকে। উত্তেজিত হয়ে ওর গায়ে ধাক্কাও দিয়েছিলাম। হেলাল, খুরশীদ বাবুল, চুন্নু, সালাউদ্দিন রেফারি মুনীর হোসেনকে ঘিরে ধরেছিল। দু’একজন পা দিয়ে ধাক্কাও দিয়েছিল। আমরা গোলের দাবি জানিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি সেদিন আমাদের ন্যায্য গোল বাতিল করেছিলেন। দর্শকরা উত্তেজিত হয়েছিল। রাস্তায় ভাঙচুর করেছিল। খেলা পণ্ড হয়েছিল।’-সরল স্বীকারোক্তি সেই সময়ের আবাহনী অধিনায়কের।
কিন্তু তার পর যা ঘটল সেটা আনোয়ার কেন? আবাহনীর ফুটবল কর্মকর্তারা কেন? কেউ-ই ভাবতে পারেননি। রাতে আবাহনী ক্লাব ঘেরাও করল পুলিশ ওসি কুদ্দুসের নেতৃত্বে। তারপর খেলোয়াড়দের নিয়ে যাওয়া হলো রমনা থানায়। রাতে সেখানে রেখে দিনে নেয়া হলো পুলিশ কন্ট্রোলরুমে। এবং সেটা হাতে হ্যান্ডকাপ পরিয়ে! মার্শাল ল আইনে তাদের দাঁড় করানো হলো কাঠগড়ায়। ‘আজকের রূপসী বাংলা হোটেলের উল্টো দিকে ছিল মার্শাল কোর্ট। কর্নেল আনোয়ারুল আজিম ছিলেন বিচারকের চেয়ারে। আমাদের এতগুলো প্লেয়ারকে একসঙ্গে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে বলা হলো। কিন্তু সেটা প্রায় অসম্ভব ছিল। কিন্তু তিনি বললেন; আরে প্লেয়াররা তো প্লাস্টিকের মতো। ওরা পারবে দাঁড়াতে। তারপর চলল জেরা। সরকারি উকিল মানে পিপি বলতে শুরু করলেন, স্যার, এরা সব আওয়ামী লীগার। শেখ কামালের ক্লাবে খেলে। এরা মাঠে মারামারি করে দর্শকদের উসকে দিয়েছিল দেশে আনরেস্ট সিচুয়েশন তৈরি করতে। ওরা মার্শাল ল ভঙ্গ করছে। ওরা দেশের শত্রু! বলে ঐ দিনের খবরের কাগজের খবরের ক্লিপিংস দেখাতে চাইলেন। ভদ্রলোক বললেন ওটা দেখানোর দরকার নেই। আমি দেখেছি। ওরা প্লেয়ার। ওরা কিভাবে দেশের শত্রু হয়। আর আপনি যার যার নাম বলছেন তাদের চেনেন? এরপর মহিউদ্দিন আর মুনীর হোসেনকে জেরা করলেন। জানতে চাইলেন ওরা কি করছে? মহিউদ্দিন বলল, ওরা আমাকে মেরেছে? কে মেরেছে? জানতে চাইলে ও আমাকে দেখায়। আমি বললাম, স্যার ও তো রাতে চোখে দেখেন না বলেই যত গণ্ডগোল। ও আমাদের ন্যায্য গোল বাতিল করেছে। তাছাড়া ও কোরিয়ায় গিয়েও ম্যাচ পরিচালনায় সমস্যা করেছিল। ওর নামে রিপোর্ট দিয়েছে সেদেশের ফুটবল ফেডারেশন! এরপর ঘিয়ে রঙের সাফারিপরা এক ভদ্রলোক উঠলেন জেরা করতে মহিউদ্দিনকে। কর্নেল আজিম জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কে? ভদ্রলোক বললেন : ‘আমি ওদের লইয়ার।’ তারপর তিনি একের পর এক আইনের ধারা বলতে লাগলেন আর বলতে লাগলেন এদের যে শাস্তি হতে পারে তার চেয়ে বেশি হয়ে গেছে। এরা যা করেছে তাতে এক দিনেরও কম সময়ের শাস্তি হয়। কিন্তু ওদের একরাত জেলে রাখা হয়েছে। আজ সারাদিন এখানে রাখা হয়েছে। আর কি শাস্তি হতে পারে। কর্নেল আজিম সাহেব বেরিয়ে গেলেন। যাওয়ার সময় বললেন আধা ঘণ্টা পরে রায় ঘোষণা। তার কথা শুনে মনে হচ্ছিল তিনি আমাদের খুব একটা শাস্তি দেয়ার পক্ষে নন। আমাদের হয়ে যিনি কোর্টে দাঁড়িয়েছিলেন তিনি খন্দকার মাহবুব হোসেন। এখন যিনি বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা। তিনি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু সাহেবের মামা। আওয়ামী লীগ নেতা মরহুম মহিউদ্দিন আহমেদ, আমাদের ববির বাবা তাকে লইয়ার হিসেবে নিয়ে গিয়েছিলেন আমাদের ছাড়াতে। মহিউদ্দিন সাহেব ছিলেন অসম্ভব খেলা পাগল মানুষ। আবাহনীর খেলা থাকলে গ্যালারিতে হাজির থাকতেন। তিনি, হারুন ভাইসহ ক্লাব কর্মকর্তারা ছুটলেন কিছু টাকা যোগাড় করতে। কারণ, লইয়ার বলেছিলেন কিছু জরিমানা-টানা হতে পারে। টাকা দরকার হবে। কিন্তু কর্নেল আজিম ফিরে এসে রায় ঘোষণা করলেন, আমাকে এক বছরের জেল আর এক হাজার টাকা জরিমানা। হেলালের ছয় মাসের জেল আর এক হাজার টাকা জরিমানা। সালাউদ্দিন আর চুন্নুর এক মাসের করে জেল হলো। আমরা একটু বিস্মিত হলাম।’ সেই সময়ের এক প্রত্যক্ষদর্শী, আবাহনীর এক কর্মকর্তা, জানালেন আসলে কোর্টের সামনে একটা জিপ এসে থেমেছিল। একজন সামরিক কর্মকর্তা নেমেছিলেন একটা খাম হাতে নিয়ে। মূলত রায়টা হয়ে যায় ঐ খামের মধ্যে থাকা চিঠির নির্দেশনা অনুয়ায়ী!’
এরপর কোর্ট থেকে কেন্দ্রীয় কারাগার। ‘সেখানে যাওয়ার আগে হারুন ভাই কাকে যেন পাঠিয়েছিলেন। ক্রিকেটার বেলালের ভাই ছিলেন ডেপুটি জেলার। তাকে সব বলা হয়েছিল। সে আমাদের জেলখানায় থাকার জায়গা ঠিক করে দিলেন। জেলে দেখা বিএনপি নেতা কে এম ওবায়দুর রহমানের সঙ্গে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন তোমরা এখানে কেন? বললাম, মাঠে মারামারি হয়েছে তাই আমাদের ধরে জেলে ঢোকানো হেয়েছে! প্রচণ্ড রেগে গিয়ে ভদ্রলোক বললেন, রাজনীতিবিদদের চোখ বেঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে! ফুটবলারদের হাতকড়া পরিয়ে জেলে ঢোকানো হচ্ছে। এরা দেশটাকে কি বানাতে চাইছে! ঠিক আছে, তোমরা রেস্ট নাও। সমস্যা হলে জানিয়ে।’ একদিন নিজের অফিসে বসে স্মৃতিচারণ করছিলেন আশরাফউদ্দিন চুন্নু। সেই সঙ্গে আনোয়ার যোগ করলেন, জেলখানায় দেখা হলো তান্না ভাইয়ের সঙ্গে। উনি একজনকে আমাদের ঠিকমতো নাস্তাটাস্তা দিতে বললেন। নাস্তা খাব তার আগে খবর এলো আমাদের কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হবে। ডেপুটি জেলার খবরের সত্যতা নিশ্চিত করলেন। বললেন : আনোয়ার আর হেলালকে যেতে হবে রাজশাহী জেলে। সালাউদ্দিন আর চুন্নুকে যশোর জেলে। রিকশায় করে নেয়া হলো কমলাপুর রেলস্টেশনে। কিন্তু সেখানে গিয়ে শুনলাম ট্রেন রাতে। অনেক মানুষ ভিড় করল আমাদের দেখার জন্য। একপর্যায়ে আবার আমাদের ফিরিয়ে আনা হলো রমনা থানায়। রাতে তুলে দেয়া হলো ট্রেনে। ঈশ্বরদী পর্যন্ত এক সঙ্গেই গেলাম আমরা চারজন। সেখান থেকে আলাদা হয়ে গেলাম আমরা দুজন করে। রাজশাহীতে গিয়ে দেখি স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছেন আমাদের জন্য শামসু ভাই (ক্রিকেটার খালেদ মাসুদ পাইলটের বাবা), যিনি আবাহনীর ফুটবলার ছিলেন। আর জাফর (মরহুম জাফর ইমাম) ভাই জেলগেটে। আমাদের কারাগারে নেয়া হলো। সেখানে দেখলাম বিএনপি সরকারের সাবেক উপপ্রধানমন্ত্রী জামালউদ্দিন সাহেব। তিনি আমাদের দেখে প্রচণ্ড রেগে গেলেন। বললেন : দেশে হচ্ছে কি? ফুটবলারদের পর্যন্ত জেল খাটাতে হবে? জেলে থাকলাম বটে। কিন্তু জাফর ভাই আমাদের প্রায় জামাই যতেœই রেখেছিলেন। রোজ ডাব. আপেল, খাবার সবই পাঠাতেন। কোরবানির ঈদে ভাবী জাফর ভাইয়ের স্ত্রী আমাদের জন্য টিফিন ক্যারিয়ারের বারোটা বাটি ভরে খাবার পাঠিয়েছিলেন। জামালউদ্দিন সাহেব বলেছিলেন আমরা ছাগল কোরবানি দেব। কোরবানির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। তাছাড়া ঢাকায় আমাদের মুক্ত করার জন্য কি কি করা হচ্ছে তার সবই রোজ জাফর ভাই জানাতেন।’-একত্রিশ বছর আগের সেই দিনগুলোকে মনে করলেন কাজী আনোয়ার।
অন্যদিকে, সালাউদ্দিন আর চুন্নুকে যশোর জেলগেটে স্বাগত জানালেন আবাহনী এবং জাতীয় দলের সাবেক লেফট ব্যাক রকিব। প্রায় সবসময় তিনি খোঁজখবর নিতেন তার দুই টিমমেটের। ‘রকিবভাই অনেক করেছিলেন আমাদের জন্য। ঢাকায় মোহামেডানের গাফফার-ডানা ওরাও অনেক কিছু করেছিল আমাদের মুক্তির দাবি জানিয়ে।’ বললেন চুন্নু। চার তারকা ফুটবলারের মুক্তির জন্য উদ্যোগ নিয়েছিলেন বেগম খালেদা জিয়া-আরাফাত রহমান কোকো এবং শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের ভাই পর্যটন কর্মকর্তা কামালউদ্দিন, যিনি এক সময় আবাহনীর সঙ্গে জড়িত হয়েছিলেন। আবাহনীর কর্মকর্তা হারুনুর রশীদ নিজেই জানিয়েছেন : ‘মূলত; কোকোর কারণে ম্যাডাম নিজে টেলিফোন করেছিলেন জেনারেল এরশাদ সাহেবকে। বলেছিলেন ওদের কেন মুক্তি দেয়া হচ্ছে না? এরশাদ সাহেব নাকি বলেছিলেন, দুষ্টমি করেছে। একটু শাস্তি পাক। ছেড়ে দেয়া হবে।’
এরশাদ সাহেব ভারত সফরে যাওয়ার অক্টোবরের পাঁচ তারিখে এয়ারপোর্টে বলে গিয়েছিলেন, ওদের ছেড়ে দেয়া হচ্ছে। তারপর ছেড়ে দেয়া হলো। ঢাকা থেকে হারুনুর রশীদ, সেন্টু, মন্টু, অমলেশ একটা গাড়ি নিয়ে প্রথম গেলেন যশোর। সেখান থেকে তুলে নেয়া হলো সালাউদ্দিন আর চুন্নুকে। তারপর সেই গাড়ির গন্তব্য হলো রাজশাহী। সেখান থেকে আনোয়ার আর হেলালকে নিয়ে পরদিন ঢাকায় রওনা হলো সেই গাড়ি। পথে দর্শকদের প্রাণঢালা অভিনন্দন। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবাহনীর এক কর্মকর্তা বললেন : ‘এক ভদ্রলোক সারারাত মিষ্টি বানিয়েছিলেন আমাদের খাওয়াবেন বলে। আমাদের গাড়ি থামিয়ে ভদ্রলোক সেই মিষ্টি দিয়েছিলেন!’ তারপর বিকেলের দিকে ক্লাবে ফিরল সেই গাড়ি। সেখানেও দর্শকদের উপচেপড়া ভিড়। দর্শক-সমর্থকদের ভালোবাসা। জয়ধ্বনি। এই ভালোবাসার চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি-ই বা হতে পারে একজন ফুটবলারের জন্য! চার দেয়ালের সেই দিনগুলো ভুলে যেতে চার সেকেন্ডের বেশি সময় কি লেগেছিল সালাউদ্দিন-চুন্নু-হেলাল-আনোয়ারের!
একত্রিশ বছর আগের ফø্যাশ ব্যাক থেকে ফিরে বাংলাদেশ ফুটবলের যে চেহারাটাই ফুটে উঠুক না কেন, তার জন্য শুধু মিডিয়া দায়ী, এটা যারা বলেন তারা নিজেদের দায় এড়াতেই বলেন। আবার এই ফুটবল নিয়ে যতো রাজনীতির কথাই বলুন কেন, বাংলাদেশে অনেক রাজনীতিবিদ ছিলেন যারা ফুটবলকে ভালোবাসতেন মনপ্রাণ দিয়ে। কিন্তু আমাদের অসুস্থ রাজনীতির বিভাজন ফুটবলকে প্রায় বাতাস শূন্য করে দিয়েছে। ফুটবলটা প্রায় চুপসে গেছে। শেখ কামাল রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন! কিন্তু ফুটবল নিয়ে রাজনীতি করেননি বলেই তার আবাহনী ফুটবল দলের ভক্ত হয়ে গিয়েছিলেন কোকো-তারেক। সালাউদ্দিন-চুন্নু-আনোয়ার-হেলালকে জেল থেকে মুক্ত করতে তাই উদ্যোগী হয়েছিলেন স্বয়ং বেগম জিয়া! আবার এদের হাতকড়া পরিয়ে জেলে ঢোকানোর জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন দু’একজন সাবেক ফুটবলারই! ফুটবলাররাই ফুটবলারদের দেখিয়েছিলেন জেলখানার গেট। কিন্তু চার দেয়ালের মধ্যে তাদের আগলে রাখার দায়িত্ব যে দু’একজন নিয়েছিলেন তারা কিন্তু রাজনীতিবিদ। ফুটবল নিয়ে রাজনীতি করে আসলে লাভবান হতে চেয়েছেন দু’একজন ফুটবলার। কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ফুটবল।
অঘোর মণ্ডল

