বৈশ্বিক মহামারী করোনার সতর্কতার কথা বিবেচনায় রেখে বাড়ির সবাই মিলে ভবনের নিচতলার গ্যারেজে ইদের নামাজ আদায় করলাম। অনেকটা দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানোর মত। সারা বিশ্বের মুসলিমগণও এভাবেই সর্তকতার সাথে ইদ উদযাপন করছে- এটা একটি ভাল উদ্যোগ। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে মানুষের দুরাবস্থা দেখে কাউকে ইদ মুবারক বলতেও সংকোচ হচ্ছে। যদিও এটাই আমার জীবনে একমাত্র নিরানন্দ ইদ নয়। এরকম অনেক ইদ আমাকে আনন্দবিহীন কাটাতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাবাকে নিয়ে আতংকে থাকতাম, কখন তাঁর জীবন বিপন্ন হয়- এই ভেবে। আমাদের এলাকায় রাজাকার ছিল, স্বাধীনতাবিরোধী শক্তি ছিল (যদিও তারা এখন সবাই ‘জয় বাংলার’ লোক), তারা মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বাবার গতিবিধি লক্ষ্য রাখত এবং পাকহানাদার বাহিনীর কাছে ধরিয়ে দেয়ার জন্য তৎপর থাকত। সেসময়ের ইদও আমাকে আতংকে উদযাপন করতে হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ড, আমার বাবার হত্যাকাণ্ড- এতসব তাণ্ডবে ইদকেই বিসর্জন দিয়েছিলাম। সত্যি বলতে সৃষ্টিকর্তা সৃষ্টিকে বেশী ভালবাসেন না অনাসৃষ্টিকে – এটা উপলব্ধি করতে আমার অনেক সময় লেগেছিল। এজন্য দীর্ঘদিন ইদের আনন্দ থেকে দূরে থাকতাম। তবে যখনই জীবনের কোন অর্থ খুঁজে না পেতাম বা গতিপথ হারিয়ে ফেলতাম তখনই আমার মা বাতিঘরের মত আমার সামনে এসে দাঁড়াতেন। আজ মা নেই বলেই হয়ত সেই মহিয়সী নারীকে বেশী মনে পড়ছে। যাক, ক্ষুদ্র একটি রোগজীবাণু পৃথিবীকে এভাবে লণ্ডভণ্ড করে দিতে পারে, এটা ছয়মাস আগেও অন্যদের মত আমার ভাবনায় ছিল না। শুধু ভাবতাম পারমাণবিক শক্তিধর যেকোন দেশ একটি বোতাম টিপেই আমাদের মত দেশকে ধ্বংস করে দিতে পারে। ক্ষুদ্র এই রোগজীবাণু নিয়ে আমাদের ভাবনা না থাকাতেই এই অদৃশ্য শক্তি আজ দাপটের সাথে সারা বিশ্ব দখলে নিয়ে নিচ্ছে। জীবন ও জীবিকা আজ মানুষের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। অনেকটা ‘ডিম আগে না মুরগী আগে’ সেই ধাঁধার মত। যার সমাধান এখনও আমাদের জানা নেই। এপ্রসঙ্গে আমার আর একটি বিষয় মনে পড়ছে। আমরা এভূখণ্ডে বসবাসকারীগণ জন্মগতভাবেই একটু স্বাধীনচেতা। ছোটবেলায় কাউকে সিগারেট খেতে বারণ করলে মুখের উপর বলে দিত ‘আমার বাবার পয়সায় খাই’। বাহ! একটা স্বাধীনচেতা জবাব। এবারের করোনা পরিস্থিতিতেও এরকম স্বাধীনচেতা মানুষদের হাট-বাজারে, রাস্তাঘাটে স্বাধীনভাবে চলাফেরা লক্ষ্য করছি। পরাধীনতার আমলে আমাদের ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যদি মায়ের ডাক পেয়ে রাতের আঁধারে নদী সাতরিয়ে বাড়ী যেতে পারেন, তাহলে আমরা স্বাধীন দেশে বাস করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে ইদে বাড়ী গেলে আপত্তি থাকবে কেন? আর আপত্তি থাকলেই আমরা শুনব কেন? এই না শোনা বা আইনের তোয়াক্কা না করা আমাদের রক্তে-মাংসে, অস্থি-মজ্জাতে জন্মগতভাবেই মিশে আছে। এটা পাল্টাতে বেশ সময় লাগবে মনে হয়। এজন্যই আজ এই ইদের দিনে ঘরে বসে ভাবছি, ২০৪১ সালে আমরা উন্নত দেশ পেলেও উন্নত জাতি হব কবে? এজন্য পরিবার, সমাজ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্রকে ব্যবস্থা গ্রহণের এখনই সময়। অর্থনৈতিক উন্নয়নের পরিকল্পনার সাথে সাথে নীতি-নৈতিকতা বৃদ্ধির পরিকল্পনাও যুক্ত করতে হবে। কেননা, নীতি-নৈতিকতা বর্জিত কোন দেশ যত উন্নতই হোক- টেকসই হবে না। সবশেষে বর্তমান এই করোনা মহামারীর যুদ্ধে যারা শহীদ হয়েছেন তাঁদের বিনম্র শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করছি। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে এবারের ইদ কতটা আনন্দ দিতে পেরেছে তা জীবন থেকে উপলব্ধি করছি। করোনা প্রতিরোধযুদ্ধে সম্মুখসারির যোদ্ধা, করোনায় আক্রান্ত ভাইবোন, কর্মহীন হয়ে পড়া দরিদ্র জনগোষ্ঠী, ঘূর্ণিঝড় আম্ফানে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষদের প্রতি সহমর্মিতা পোষণ করছি। আশার কথা হল আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর ইতিহাস রয়েছে, রয়েছে বিজয়ের ইতিহাস। আজ মানুষ মানুষের পাশে দাঁড়ালেই আমরা একটি মানবিক জাতিতে পরিণত হতে পারব, নিয়ম মানার মধ্য দিয়ে আমরা একটি সুরক্ষিত সুস্থ জাতিতে পরিণত হতে পারব। সকলেই যদি এই দূর্যোগে পরস্পরের প্রতি দু’হাত বাড়িয়ে দেই তাহলেই ‘আবার জমবে মেলা, বটতলা-হাটখোলা’।

জাহীদ হোসেন সাবেক ছাত্রলীগ নেতা,করোটিয়া সা’দত কলেজ,টাঙ্গাইল।

